পাহাড়ি মায়ের শেষকৃত্য

এই পাহাড়ের পাদদেশে যুগের পর যুগ প্রকৃতির সাথে সংগ্রাম –সন্ধি করে যে মানববসতি গড়ে উঠেছে সেই পাহাড়ি মাটি ওদের একমাত্র আত্নপরিচয়; বেঁচে থাকার অবলম্বন। এই পাহাড়েই মানুষগুলোর বেড়ে উঠা; পাহাড়কে ঘিরেই মানুষগুলোর যাপিত জীবন, আর দুঃখ-কষ্ট ;পাহাড়ের বুকেই নিবিরভাবে নিজেকে সপে দেয়া ঠিক যেন পাহাড়ের সন্তান ওরা। পাহাড়ের মানুষের গান, কবিতা আর আবেগকে আর আট দশটা জাতিগোষ্ঠীর মতোই ওরা প্রাণাধিক ভালবাসে। যে ভাষায় কথা বলে ,যে প্রকৃতির সাজে সজ্জিত হয়ে ওরা নৃত্য করে সেই সংস্কৃতি ও আত্নপরিচয়ের সঙ্কট ওদেরকে ব্যাথা দেয় যেমনটি আমাদের দিয়েছিলো ১৯৫২ তে , ১৯৭১ এ।
?oh=f14dd183f78f1c4fe7d3ca7cc5f367de&oe=5897F595″ width=”400″ />

একটি বৃহৎ জাতিগোষ্ঠির সাথে সহবাসের প্রাচীনত্বকে ওরা ধারণ করতে চেয়েছিলো নিজের আত্নপরিচয় না ভুলে। কিন্তু সাংখ্যিক আধিপত্যের জাতিগত খবরদাড়ি এই পাহাড়কে , পাহাড়ের শান্তিকে বিনষ্ট করে তুললো। বাঙালির সুখস্বপ্নে পাহাড়কে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো কাপ্তাই বাঁধ দিয়ে । কিন্তু যে ভিটেমাটিতে পাহাড়ের সন্তানদের বেড়ে ওঠা সেই মানুষের জীবন কেমন করে টিকবে কিভাবে তাঁদের আহার-আবাস এর সংস্থান হবে তার চিন্তা ঐ পাকিস্থানিরাও করে নি আমরা বাংলাদেশি বাঙালিরাও করি না। দুনিয়ার প্রতিটি জাতির আত্নমর্যাদার আকাঙ্খা থাকে যেটিকে তারা আগলে রেখে চলতে চায় – এ তো অপরাধ নয়। আর আমাদের মাটির জাতিগোষ্ঠীকে এই আমরাই সম্মান করলাম না যারা কি না এই আত্নপরিচয়ের জন্যই লড়াই করেছি পাকিস্থানিদের বিরুদ্ধে। আজ একবিংশ শতাব্দীর প্রশ্নবিদ্ধ অর্থনৈতিক উন্নতির দোহাই দিয়ে প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ বিধ্বংসী তথাকথিত উন্নয়নযজ্ঞে উন্মত্ত আমরা আর এর নৃশংসতম বলি মনে হয় এই পাহাড়ের সন্তানরাই। তাইতো আমাদের পর্যটনের আহ্লাদ মেটাতে আমরা পাহাড়কাটা রিসোর্টে প্রকৃতিবিলাসে মত্ত হই, আমাদের পর্যটন অর্থনীতির জন্য পাহাড় প্রকৃতির মানুষের জীবন- জীবিকা কৃষির উপর লাঙল চালাই এবং পাহাড়ের দেড় লক্ষাধিক মানুষকে বাধের পানিতে ভাসিয়ে বিদ্যুৎবিলাস করি। এর থেকে নির্মমতা কি আর হতে পারে? কিন্তু এই নির্মমতার বিপরীতে প্রতিরোধের দেয়াল তুলে দাড়ালেই গর্জে উঠে শাসককুল। শাসকের আকাঙ্ক্ষায় রক্তারক্তিতে মেতে উঠে পাহাড়ি-বাঙালি। চিরায়ত সহাবস্থানের বহুকালের ভ্রাতৃত্বকে ওরা জাতিগত উন্মাদনায় ভ্রাতৃঘাতী রূপে পরিজ্ঞান করাতে চায়। বিপুল চাকমারা এই সংঘাত আর আত্নপরিচয় সঙ্কটের বিরুদ্ধে লড়াই করে চলে। নিজের পাহাড়, কৃষিজমি, প্রকৃতি বাচাতে বিপুল চাকমারা প্রতিরোধের ডাক দেয়। মানুষ নামের আত্নপরিচয়ে ওরা পাহাড়ের বুকে থাকতে চায়। এর ফলাফলই তো বিপুল চাকমার হাতে পায়ে ডান্ডাবেড়ি।

পাকিস্থানি সামরিক জান্তার ট্যাংকের সামনে দাড়িয়ে গণতন্ত্র আর অধিকারের ডাক দেয়া শিখেছে কোথায় বিপুল চাকমারা? এই শিক্ষা তো ওদেরই কোন বাঙালি সূর্যসন্তান শিখিয়েছে ওদের । কিন্তু সামরিক জান্তা , সামরিকতন্ত্রের এই বেড়াজাল যে এই পুনর্বার তাঁদের ঘিরে ধরবে তা ঐ বিপুল চাকমারাও ভাবে নি বোধকরি বোধসম্পন্ন বাঙালিরাও ভাবে নি। বছরের পর বছর পাহাড়ে সেনাবাহিনী অবস্থান করলেও আমাদের বোধে নাড়া দেয় না। জিয়া ,এরশাদের সামরিক শাসন আমরা সহ্য করতে পারি না কিন্তু অবিবেচকের মতো পাহাড়ে বছরের পর বছর সেনাউপস্থিতি আরোপ করি যুক্তিহীনভাবে। বাঙালি তার স্বাভাবিক জীবনধারাকে সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতে ভীতিকর করতে চায় নি তার প্রমাণ ৯০ এর স্বৈরাচারের পতন। কিন্তু পাহাড়ের ভীতিকর পরিস্থিতি জারি রাখতে আমাদের একচুল আপত্তিও চোখে পড়ে না। কিন্তু এই খবরদারি ,নজরদারির জীবন আর কতো? – বিপুল চাকমাদের প্রশ্ন মূলত এটি। এভাবে ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে কি এর বিরুদ্ধে জাগরণ থামানো যাবে? একজন বিপুলকে থামিয়ে কি করবেন, হে রাষ্ট্র?

আপামর ভূমিহীন বাঙালি জনগনের পুনর্বাসনের নামে সেখানে পাহাড়ি ও বাঙালিকে মুখোমুখি দাঁর করানো হলো। ১৯৭১ এর ঐক্যবদ্ধ জনগন পাহাড়ে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে উপনীত হলো। ক্ষণকাল পেরুলেই বাঙালি –পাহাড়ি সংঘাত চিরসবুজ পাহাড়ে রতের দাগ লাগিয়ে দেয়। এই সংঘাতের শেষে বাংলাদেশ কি পায়? সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবচের আওয়াজে কি একচুলও লভ্যাংশ বের হয়? উল্টো, এক ফোটা রক্তে পাহাড়ের প্রতিটি ভূখণ্ডে অবিশ্বাসের দাগ লাগে, ইঞ্চি ইঞ্চি করে পাহাড় সমতলে দূরত্ব বাড়ে। যে বিপুল চাকমা আত্নপরিচয় আর স্বাভাবিক জীবনযাত্রার গ্যারান্টি চেয়ে লড়ছে সেই বিপুল চাকমাকে রুখতে গেলে ভ্রাতৃত্বের বাধনে টান পড়ে তা এই রাষ্ট্র কেন বোঝে না? অসুস্থ মায়ের কাছ থেকে টেনেহিঁচড়ে যে তরুণকে বন্দী করা হলো সে তো জনগণের নেতা, ছাত্রনেতা সর্বত্র যার বিচরণ তার প্রতি এমন নিষ্ঠুর আচরণ হবে কেন এ রাষ্ট্রের? একটি রাজনৈতিক সংগ্রামে আসীন সংগঠনের নেতার প্রতি এমন গ্রেফতারী সংস্কৃতি চর্চা করবেই বা কেন রাষ্ট্র? ন্যায্য মুক্তি সংগ্রামে যে দেশের জন্ম তার মাটিতে এমন সংগ্রামীর অধিকার নিয়ে তো রাষ্ট্রের উৎসুক হয়ে আলোচনা করার কথা। কিন্তু এ রাষ্ট্র তা তো করেই নি বরং অসুস্থ মায়ের পাশ থেকে সন্তানকে তুলে নিয়ে গেছে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে । পুত্রের এহেন প্রস্থান মা সহ্য করতে পারে নি। পাহাড়ের কাছে রেখেই পাহাড়ে চিরতরে চলে গেছে শেষ নিঃশ্বাস নিয়ে। এই পাহাড়ি মায়ের শেষকৃত্যে অতিথি হয়ে এসেছিলেন বিপুল। হাতের ডান্ডাবেড়িতে দুহাতে ছুতেও পারে নি সন্তান। রাষ্ট্র চরম সফলতায় তার হুমকি আর দমনের কর্ম সম্পাদন করেছে । শেষ বিচারে রাষ্ট্র কি রক্ষা করতে তার নাগরিকের অসম্মান করলো তা রাষ্ট্রই জানে তবে একথা সত্য পাহাড়ি মায়ের শেষকৃত্যে ক্ষত আরো গাঢ় হয়েছে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

1 + 9 =