বাংলাদেশে অভিজিত রায়ের হত্যাকান্ড এবং প্রাসঙ্গিক কয়েকটি কথা

অভিজিত রায়ের জঘন্যতম হত্যাকান্ডের খবরটা প্রথম পেয়েছিলাম ফেসবুক পোষ্ট থেকে। প্রথমটায় বুঝতে পারিনি। ভেবেছিলাম অচেনা, অজানা কোন মানুষের হত্যার ঘটনা। অবশ্য যে কোন হত্যাকান্ডই নিন্দনীয়, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।
ব্যক্তিগতভাবে অভিজিত রায়কে চেনার কোন কারন ছিল না। ২০১০ সালে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আমাদের ভারতীয় একটি দলকে সম্বর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানের আয়োজকদের অন্যতম ছিলেন বাংলাদেশের বিখ্যাত মুক্তমনা মানুষ অজয় রায়।

সেখানেই অজয় রায়ের সাথে আলাপ। সেই সুবাদেই তার আমেরিকাবাসী পুত্র অভিজিত রায়, তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যার কথা জানতে পারি। জানতে পারি অভিজিত রায়ের সৃষ্ট মুক্তমনা ব্লগের কথা। তারপরে একের পর এক মুক্তমনা ব্লগে
অভিজিতের লেখাগুলো পড়েছি। অভিজিত রায় আমারই বয়সী একজনা মুক্তমনা মানুষ। ১২ই সেপ্টেম্বর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের মাটিতে তার জন্ম হয়েছিল। তার জন্মের সেই সময়ে বাংলাদেশ ছিল স্বাধীনতার মুক্তিযুদ্ধে উত্তাল। তার বাবা অজয় রায় ছিলেন সেই সময় মুক্তিযুদ্ধের একজন সাথী। বাবার দেখানো পথ ধরেই অসম্ভব মেধাবী অভিজিত বাংলাদেশের মুক্ত চিন্তার আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন। শুধু বাংলাদেশ নয়, তিনি মার্কিন নাগরিকও ছিলেন। একই সাথে ছিলেন একজন ইঞ্জিনিয়ার, লেখক ও ব্লগার। বাংলাদেশ সরকারের সেন্সরশিপ এবং ব্লগারদের কারাদণ্ডের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রতিবাদের ঢেউ তুলেছিলেন অভিজিত। তার সৃষ্ট মুক্তমনা ব্লগ তাবৎ বাঙ্গালী দুনিয়ায় পরিচিতি লাভ করেছে খুব অল্প সময়েই। অভিজিৎ রায়ের বাবা অসংখ্য পুরস্কার বিজয়ী অজয় রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। তিনিও পেশায় ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। অভিজিত বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক হন। সেই একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবেও তিনি বেশ কিছুদিন কাজ করেছিলেন। এরপরে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ সিঙ্গাপুর থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার্স এবং পিএইচডি করেন। তারপরে আটলান্টা ও জর্জিয়াতে একজন ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে কাজ করতে চলে যান। তিনি ২০০১ সালের শেষের দিকে মুক্তমনা কয়েকজন লেখকদের নিয়ে তৈরি করেন মুক্তমনা ব্লগ। যার ৮ জন নিয়ন্ত্রককের মধ্যে তিনিই ছিলেন প্রধান। ২০০৭ সালে মুক্তচিন্তা, বিজ্ঞানমনস্কতার প্রসার, মানবাধিকার ও সমকামীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অবদানের জন্য মুক্তমনা ব্লগ শহীদ জননী জাহানারা ইমাম স্মৃতি পদক লাভ করে। কিন্তু ধর্মের অসারতা, মৌলবাদ, ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কারের লেখালেখির কারনে তিনি বিপক্ষের দ্বারা সমালোচিত হন। ইন্টারনেটে, বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় বিভিন্ন ভাষায় নিয়মিত লিখতেন তিনি। লেখার বিষয় অবশ্যই ছিল আধুনিক বিজ্ঞান, নাস্তিক্যবাদ, সমকামিতা এবং মুক্তচিন্তার দর্শন। তার প্রচুর বই প্রকাশিত ও জনপ্রিয় হয়। যেমন, আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী, মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে, স্বতন্ত্র ভাবনা : মুক্তচিন্তা ও বুদ্ধির মুক্তি, সমকামিতা: বৈজ্ঞানিক এবং সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান, অবিশ্বাসের দর্শন, বিশ্বাস ও বিজ্ঞান, ভালবাসা কারে কয়, শূন্য থেকে মহাবিশ্ব, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো: এক রবি-বিদেশিনীর খোঁজে ইত্যাদি। কিন্তু তার চিন্তার যারা বিরোধী, তারা এসব মানবে কেন? এ তো অনন্ত কাল ধরে সারা দুনিয়াজুড়েই চলে আসছে।

অভিজিতের মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বাংলাদেশে মুসলিম মৌলবাদ হুমায়ুন আজাদ, রাজীব হায়দারদের খুন করেছে। আর সেই মৌলবাদীদের জাতভাইরা আমাদের ভারতে হত্যা করেছে মুক্তচিন্তা, যুক্তিবাদী আন্দোলনের কর্মী নরেন্দ্র দাভোলকর-কে। কিছুদিন আগেই এদের হাতে গোভিন্দ পানসারে খুন হন। অভিজিতের মৃত্যুও একই ধারার ঘটনা। মুক্তচিন্তার যারা শরিক, তাদের যেভাবে হোক দমন করো। তিনি জন্মসুত্রে হিন্দু সম্প্রদায়ভূক্ত হয়েও স্ত্রী হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন জন্মসুত্রে ইসলাম সম্প্রদায়ভূক্ত রাফিদা আহমেদ বন্যাকে। কারন তার কাছে ধর্মের কোন বেড়াজাল ছিল না।

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ রাত্রি সাড়ে আটটা। ঢাকা বইমেলায় প্রকাশিত নতুন বইয়ের উদ্বোধন অনুষ্ঠান সেরে, অনুরাগীদের অটোগ্রাফ দিয়ে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্টো দিকের রাস্তায় আকস্মিক হামলার শিকার হন। তার মস্তিস্ক ও গলায় ধারালো আঘাতে প্রচন্ড রক্তপাত হয়। স্ত্রী বন্যা বাঁধা দিতে গেলে তাঁকেও এলোপাথাড়ি আঘাত করা হয়। এরপর অস্ত্রগুলি ফেলে রেখেই দুষ্কৃতীরা উধাও হয়ে যায়। তাদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরে কিছুক্ষণের মধ্যেই মারা যান অভিজিৎ। বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে ওঠে এই জঘন্য হত্যাকান্ডে। বাংলাদেশের সংসদেও এই নিয়ে হৈচৈ হয়। সারা দেশে, বিদেশে শোক, ক্ষোভ, প্রতিবাদে সামিল হয় মুক্তমনা মানুষেরা। ইতিমধ্যেই আনসারুল্লাহ বাংলা টিম সেভেন নামক একটি সন্ত্রাসবাদী সংস্থা এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। কিন্তু এই হত্যা কি শুধুই ব্যক্তি অভিজিতকে হত্যা? না কি সারা দুনিয়ার মুক্তচিন্তার আন্দোলনের উপর আঘাত? আজ মানুষ যত উন্নত হচ্ছে, দুনিয়া যত আধুনিক হচ্ছে, ততই কি আরো জেঁকে বসছে ধর্মীয় গোঁড়ামি ও মৌলবাদ? কেন তারা এত অসহিষ্ণু? ধর্ম কি তাহলে এতই ঠুনকো, যা কয়েকজন মুক্তমনা মানুষের জন্য লাটে উঠে যেতে পারে? ধর্ম রক্ষা করতে কি তাহলে হত্যাই ভরসা? প্রশ্নগুলো যুগে যুগেই উঠেছে। এই ঘটনার পরে আরো প্রাসঙ্গিকভাবেই উঠছে। তবে এই সব প্রশ্নের মুখে একটা জোরালো বক্তব্য রেখেছে অভিজিত-বন্যার একমাত্র কন্যা তৃষা আহমেদ। সে ফেসবুকে লিখেছে, ”আমি ক্রুদ্ধ বা ভেঙ্গে পড়েছি, এমনটা বলাও কম! কিন্তু দুনিয়াটা এতটাই ঘেঁটে আছে যে, সেটাকে ভালো করতে গেলে কোনও কারনই যথেষ্ট নয়। আমার বাবার শেখানো যাবতীয় শিক্ষা নিয়েই আমার জীবনটা চলবে।” ছোট্ট অথচ অনেক বড় কথা বলেছে তৃষা। এই কথাগুলো এই হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে একটা চপেটাঘাত। সেলাম তৃষা। অনেক ছোট হয়েও তুমি যা বলতে পেরেছ, সেটাই প্রমান করে, মুক্তচিন্তা শেষ হবার নয়। মুক্তচিন্তা অজেয়। অভিজিতেরা কখনো হারে না, মরে না, বেঁচে থাকে মানুষের হৃদয়ে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

17 − = 16