আন্ডারস্ট্যান্ডিং মুহাম্মদ, মূল – আলি সিনা , ভাষান্তর-দুরের পাখি ; পর্ব-৭

পরিবারের কারো মৃত্যু মস্তিষ্কে এমন কিছু রাসায়নিক বিক্রিয়ার শুরু করতে পারে যা শেষ পর্যন্ত বিষণ্ণতা রোগ ডেকে আনে । গর্ভাবস্থার বিষণ্ণতা রোগের আরো কারণের মধ্যে আছে, একাকীত্ব, অনাগত সন্তান নিয়ে দুঃশ্চিন্তা, আর্থিক ও দাম্পত্য সমস্যা এমনকি অল্পবয়সে গর্ভধারণও । আমিনার তখনকার অবস্থায় এইসব অনুঘটকের মোটামুটি সবগুলোই উপস্থিত ছিলো । স্বামী মারা গেছে মাত্র কিছুদিন আগে । থাকে একা । দরিদ্র ও অল্পবয়স্কা । তার সম্পর্কে যতটুকু জানা যায়, বিষণ্ণতায় ভুগার সম্ভাবণা তার প্রবল । মা ও শিশুর স্নেহের বন্ধন তৈরীতে সমস্যা করে থাকে বিষণ্ণতা । এছাড়া গর্ভাবস্থায় বিষণ্ণতায় ভোগা মা সন্তান জন্মের পরে আবার আরেকটি বিষণ্ণতার সময়কাল অতিক্রম করে থাকেন সাধারণত ।(Postpartum Depression) (টীকা ৯)

কিছু কিছু গবেষণায় এসেছে, গর্ভাবস্থার বিষণ্ণতা শিশুর উপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে । এধরণের মায়েদের শিশুরা সাধারণত অলস এবং খিটখিটে হয় । এইসব শিশু আরেকটু বড় হয়ে বোকাটে, নিরাবেগ বাচ্চাতে পরিণত হতে পারে । সাথে থাকে আচরণগত সমস্যা, যেমন আগ্রাসী মনোভাব । (টীকা ১০)

মোহাম্মদ বড় হতে থাকে অচেনা লোকদের মাঝখানে । বড় হতে হতে সে বুঝতে শুরু করে, যে পরিবারের সাথে সে আছে তাদের সাথে তার কোন রক্তসম্পর্ক নেই । তার নিশ্চয়ই মনে হচ্ছিল কেন তার আসল মা যাকে সে বছরে দুইবার দেখতে যেত, তাকে নিয়ে যায় না ।

মোহাম্মদের দুধ-মা হালিমা কয়েকযুগ পরে বর্ণনা করে যে সে আসলে মোহাম্মদকে নিতে চায়নি প্রথমে, কারণ সে ছিলো গরীব ঘরের এতিম ছেলে । কিন্তু ধনী ঘরের কোন শিশু না পেয়ে সে শেষ পর্যন্ত মোহাম্মদকেই নিতে বাধ্য হয় । অল্প স্বল্প যাই হোক এইটুক আয়ের খুব দরকার ছিলো তার পরিবারের জন্য । তার এই মনোভাব কি মোহাম্মদকে লালনের ব্যাপারে তার মনোযোগীতায় প্রভাব ফেলেছিলো ? মোহাম্মদ কি তার পালক ঘরের লোকজনের কাছ থেকে অবহেলাতেই জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বছরগুলো যখন মানুষের মৌলিক চরিত্র গড়ে উঠে, সে সময়গুলো পার করেছিলো ?

হালিমার বর্ণনা থেকে জানা যায় শিশু হিসেবে মোহাম্মদ ছিলো নিঃসঙ্গ । সে সাধারণত কল্পণার জগতে চলে যেত এবং অদৃশ্য বন্ধুবান্ধবের সাথে কথা বলতো । এটি কি বাস্তব জগতে ভালোবাসা না পেয়ে কল্পণার জগতে আশ্রয় এবং স্নেহ খুজতে চাওয়া শিশুর প্রতিক্রিয়া নয়?

মোহাম্মদের দুধ-মা হালিমা তার মানসিক সুস্থ্যতা নিয়ে ক্রমেই চিন্তিত হয়ে পড়ে । পাঁচ বছর বয়সে সে তাই তাকে তার মা আমিনার কাছে নিয়ে যায় । আমিনা ছিলো তখনো নিঃসঙ্গ এবং দরিদ্র । এজন্য সে প্রথমে মোহাম্মদকে ফিরিয়ে নিতে চায়নি । কিন্তু তার অদ্ভুত আচরণ এবং কল্পণাবিলাসিতার কথা শোনার পর সে বাধ্য হয় । ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় হালিমার জবানীতে ,

“ বাচ্চার(হালিমার নিজের বাচ্চা) বাপ বললো, এই ছেলে (মোহাম্মদ) সম্ভবত স্ট্রোক করেছে একবার, ওকে ওর মার কাছে দিয়ে এস , খারাপ কিছু ঘটার আগেই । সে (মোহাম্মদের মা) আমার কাছে জানতে চাইলো আসলে কি ঘটেছে এবং পুরো কাহিনী শোনার আগ পর্যন্ত আমাকে শান্তি দিচ্ছিলো না । আমিনা যখন জিজ্ঞেস করলো মোহাম্মদকে কি ভূতে ধরেছে, আমি বললাম, আমার তেমনই মনে হচ্ছে । “ (টীকা-১১)

বিছানার নিচে ভূত দেখা বা কাল্পণিক বন্ধুবান্ধব থাকা শিশুবয়সের স্বাভাবিক ব্যাপার । কিন্তু মোহাম্মদের ক্ষেত্রে সম্ভবত অবস্থা গুরুতর ছিলো । হালিমার স্বামী বলছিলো “আমার মনে হয় মোহাম্মদ একবার স্ট্রোকও করেছে ।” এ তথ্যটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ । অনেক বছর পরে মোহাম্মদের নিজের মুখ থেকে তার শিশুবয়সের এই অদ্ভুত অভিজ্ঞতা নিয়ে বয়ান পাওয়া যায়,

“ সাদা কাপড় পড়া দুইজন লোক সোনার পাত্রভরা ধবধবে সাদা তুষার নিয়ে আমার কাছে এসেছিলো । এরপর তারা আমার শরীর ফাঁক করে আমার হৃৎপিন্ড বের করে নিয়ে আসে, তারপর হৃৎপিন্ড ফাঁক করে সেখান থেকে এক দলা কালো রক্ত বের করে ফেলে দেয় । এরপর তারা সেই তুষার দিয়ে আমার হৃৎপিন্ড ও শরীর ধুয়ে দেয়” টীকা-১২

তুকতাক বাদ দিয়ে যতটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায়, হৃৎপিন্ডে কালো রক্তের দলা থাকার সাথে মনের ভিতরকার অপবিত্রতার কোন সম্পর্ক নাই । শিশুরা নিষ্পাপ হয় সেটা বাদ দিলেও, সার্জারি করে পাপ দূর করা যায় না, আর পরিষ্কার করার জন্য তুষার খুবেকটা ভালো কিছুও নয় । পুরো ঘটনাই কল্পণা অথবা দৃষ্টিবিভ্রম ।

মোহাম্মদ শেষ পর্যন্ত তার মায়ের কাছে ফিরে আসে , কিন্তু এই সুখ তার স্থায়ী হয়নি । এক বছর পরেই আমিনা মারা যায় । আমিনাকে নিয়ে মোহাম্মদের খুব বেশি হাদিস নেই । তার মৃত্যুর পঞ্চান্ন বছর পর মক্কা বিজয়ের পর মোহাম্মদ তার মায়ের কবর জিয়ারত করতে যায় এবং কিছুক্ষণ সেইখানে কাঁদে । মক্কা মদিনার মাঝপথে আবওয়া নামক জায়গাতে ছিলো আমিনার কবর । এই সময়ে সে তার সাথীদের বলে,

“এই হচ্ছে আমার মায়ের কবর, আল্লাহ আমাকে এখানে আসার অনুমতি দিয়েছেন । আমি তার জন্য সুপারিশের আবেদন করছিলাম কিন্তু আল্লাহ কবুল করেন নি । কিন্তু মায়ের স্মৃতি মনে করে আমার কান্না চলে এসেছিলো ।” (টীকা ১৩)

আল্লাহ কেন মোহাম্মদকে তার মায়ের জন্য সুপারিশ করতে দেয় নি ? আমিনা কি এমন খারাপ কাজ করেছিলো যে সে মাফ পায় নি ? আল্লাহ যদি ন্যায়বান হয়, তাহলে এই আচরণের কোন অর্থ করা যায় না । আদতে এখানে আল্লাহর কোন ব্যাপার নেই । আসলে মোহাম্মদ নিজেই তার জন্মদাত্রী মাকে ক্ষমা করতে পারেনি, এমনকি তার মৃত্যুর অর্ধশতাব্দী পরেও । তার স্মৃতিতে আমিনা সম্ভবত স্নেহহীন শীতল মহিলা হিসাবে ছিলো, যাকে নিয়ে তার অভিযোগ ছিলো এবং অনেক মানবিক ক্ষত ছিলো যেগুলো দীর্ঘদিনেও মুছে যায় নি ।

****************************************************************************
টীকা ৯ :
গবেষণা থেকে জানা যায়, প্রসবপূর্ব এবং প্রসব-পরবর্তী বিষণ্ণতায় ভোগা মায়েদের সন্তানদের রক্তে cortisol এবং norepinephrine মাত্রা বেশি থাকে এবং Dopamine এর মাত্রা কম থাকে , এবং মস্তিষ্কের সামনের ডানদিকের EEG তে তুলনামূলকভাবে অসামঞ্জস্যের মাত্রা বেশি থাকে । আবার প্রসবপূর্ব এবং প্রসব পরবর্তী বিষণ্ণতায় ভোগা মায়েদের সন্তানদের মধ্যে তুলনা করলে দেখা যায়, প্রসবপূর্ব বিষণ্ণতায় ভোগা মায়েদের শিশুদের রক্তে nonrepineprhine এর মাত্রা এবং মস্তিষ্কের সামনের ডানদিকের EEG তে অসামঞ্জস্যের মাত্রা , প্রসব পরবর্তী বিষণ্ণতায় ভোগা মায়েদের শিশুদের চাইতেও বেশি থাকে । এইসব উপাত্ত থেকে ধারণা করা যায় শিশুর শারীরবৃত্তীয় গঠনে প্রভাব ফেলার ক্ষেত্রে প্রসবপূর্ব বিষণ্ণতা বেশি বিপদজনক, এবং বিষণ্নতার সময়ের দৈর্ঘ্যের প্রভাবও লক্ষণীয় । ncbi.nlm.nih.gov

টীকা১০:
http://www.health.harvard.edu/newsweek/Depression_during_pregnancy_and_after_0405.htm

টীকা-১১:

ইবনে ইসহাকের সীরাত রাসুলুল্লাহ , পৃষ্ঠা -৭২ । ইবনে ইসহাক হলেন বিখ্যাত মুসলিম ইতিহাসবিদ । জন্ম মদীনায় আনুমানিক হিজরি ৮৫ সনে (জন্ম ৭০৪ সাল মৃত্যু ৭৬৮ সাল, মোহাম্মদের মৃত্যুর ৭৫ বছর পর জন্ম) । তিনি ছিলেন মোহাম্মদের প্রথম জীবনিকার , এবং তার যুদ্ধসমূহের কাহিনী লিপিকার । তার সংগৃহীত গল্পগুলার সংকলনের নাম ছিলো “সিরাত-আল-নবী” । এই বইটি এখন বিলুপ্ত । তার সংকলনের উদ্ধারকৃত অংশগুলোর সাথে নিজের কিছু মতামত জুড়ে দিয়ে এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবে লিপিবদ্ধ করেন ইবনে ইসহাকের ছাত্র হিবনে হিশাম (মৃত্যু ৮৩৪) । ইবনে হিশামের এই সংকলণের ইংরেজি অনুবাদ এখন বাজারে পাওয়া যায় । (অনুবাদক এ. গুলিয়োম) । ইবনে হিশাম স্বীকার করে গেছেন যে তিনি ইবনে ইসহাকের সংগ্রহ থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু অংশ বাদ দিয়েছেন যেগুলো মুসলিমদের জন্য অস্বস্তিকর । এইসব অস্বস্তিকর গল্পের কিছু অংশ পরবর্তীতে তাবারি (৮৩৮-৯২৩) উদ্ধার করেন । তাবারি হলেন অন্যতম বিখ্যাত পারসিয়ান ইতিহাসবিদ এবং কোরানের তাফসিরকারী ।

টীকা-১২:
W. Montgomery Watt: Translation of Ibn Ishaq’s biography of Muhmmad (পৃষ্টা-৩৬)

টীকা-১৩:
Tabaqat Ibn Sad, পৃষ্টা ৭ । ইবনে সাদ (৭৮৪-৮৪৫) ইতিহাসবিদ, আল ওয়াক্কিদির ছাত্র । তিনি তার সংকলনকে আটটি শ্রেণীতে বা তাবাকাতে ভাগ করেছিলেন, সেই থেকেই বইয়ের নাম তাবাকাতসমূহ । প্রথম ভাগে মোহাম্মদের জীবনি , দ্বিতীয়ভাগে মোহাম্মদের যুদ্ধসমূহ, তৃতীয়ভাগে মক্কার সাহাবীরা, চতুর্থভাবে মদীনার সাহাবীরা, পঞ্চমভাগে তার নাতি হাসান হুসেইন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মুসলিমগণ, ষষ্ঠভাগে সাহাবীদের অনুসারীরা (তাবেঈ), সপ্তভাগে পরবর্তীযুগের গুরুত্বপূর্ণ অনুসারীগণ, অস্টমভাগে প্রাথমিক যুগের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম মহিলাদের নিয়ে বর্ণনা এসেছে । এই বইয়ে ইবনে সাদের তাবাকাত থেকে যেসব উদৃতি দেয়া হয়েছে সেগুলো নেয়া হয়েছে তাবাকাতের পার্সিয়ান অনুবাদ থেকে । অনুবাদক, Mahmood Mahdavi Damghani, প্রকাশক, Entesharat-e Farhang va Andisheh, Tehran (2003) 

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “আন্ডারস্ট্যান্ডিং মুহাম্মদ, মূল – আলি সিনা , ভাষান্তর-দুরের পাখি ; পর্ব-৭

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

72 + = 78