আমাদের রাজনীতি ও স্বপ্নের অপমৃত্যু !


সময় ২০০৬ সাল। বিএনপি জোট সরকার ক্ষমতায়। চট্টগ্রাম নাকি জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী লুতফুজ্জামান বাবারের গাড়িতে হামলা হইছে। পুলিশ রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে গেল আমার বন্ধু আফসার কে । (আফসার ছদ্ম নাম, ওর আসল নাম ব্যবহার করিনি কারণ ও এখন সামরিক বাহিনীতে কর্মরত)। ওর বিরুদ্ধে অভিযোগ ও বাবরের গাড়িতে হামলা চালাইছে। আফসার ছিল ওমরগনী এম ই এস বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ছাত্র, এবং ছাত্র সংসদ ঘেঁষা। আর সেই জন্যই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দাঁড় করানো সহজ ছিল।

অনেক চেষ্টা তদবির করেও তাকে ছাড়াতে পারছিলাম না। তৎকালীন ডি জি এফ আই এর এক আত্মিয়কে ফোন করেও কোন কিছুই করতে পারিনি। মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীর কাছে গেলাম উনিও সাধ্যমত চেষ্টা করলেন পুলিশ ছাড়বেন। এবার আমাদের আর সোজা পথে থাকার অফশন খোলা রইল না। আমাদের বাঁকা পথে হাটতে হল। সামহাউ আমরা সেদিন আফসার কে অনেকটা ছিনিয়ে নিয়েছিলাম পুলিশের গাড়ি থেকে।
না হলে আফসারের মত ভদ্র ছেলেটার জীবন ও স্বপ্ন সেখানেই মাটি হয়ে যেত। তার আজকে আর সামরিক বাহিনী তে চাকরি করা হত না।

গতকাল বিপুল চাকমা কে নিয়ে লিখছিলাম। এক বড় ভাই বুঝাতে চাইলো সে বিশাল রাষ্ট্রদ্রোহী। আমি ওনার কাছে জানতে চাইলাম। উনি কোন উত্তর দিল না। আমি আজ দুই দিন গুগোল করে বিপুল চাকমার রাষ্ট্রদ্রোহ কোন নিউজ আঞ্চলিক, জাতিয় কিংবা আন্তর্জাতিক পত্রিকায় কোন কিছুই পেলাম না। তার বিরুদ্ধে পুলিশ অভিযোগ এনেছে সে না কি প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি বহরে হামলা করেছে।
আপনারা কেউ এমন নিউজ গত দশ বছরে পড়েছেন? কোন ডকুমেন্টারি প্রমাণ দিতে পারবেন?

বিপুল চাকমার অপরাধ সে পাহাড়িদের অধিকারের কথা বলে। পাহাড়িদের জন্য আন্দোলন করে। সেটা খুবই একাডেমিক আন্দোলন। তারা মাওবাদী কিংবা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন করে না। তার পরো বিপুল চাকমা যদি অপরাধি হয়েই থাকে, প্রচলিত আইনে তার বিচার হবে।

আমার প্রশ্ন- বিপুল ত বর্ডার ক্রস করে পালিয়ে যাচ্ছিল না। সে তার মৃত্যু পথযাত্রী মাকে নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছিল। তাকে কেন এই ভাবে একজন মুমুর্ষ রোগীর সামনে লাঞ্চিত কয়রা হলো ? নিজের ছেলের লাঞ্চনা সইতে না পেরে মা মারা গেল, এটি মৃত্যু না রাষ্ট্রিয় হত্যা?

পাহাড়িদের বাংলাদেশের কোন সরকার মানুষ মনে করে না। মনে করে এলিয়েন। হলিউড সিনেমায় এলিন দের প্রতিহত করার জন্য যেমন সামরিক বাহিনী জাড়ি রাখে, তেমনি পাহাড়ি এলিয়েন দের জন্য আমাদের সরকার গুলো সেনাবাহিনী জাড়ি রাখছে।

বাংলাদেশের সবচাইতে বড় কুলাংগার দের একটা হল হোসাইন মুহাম্মদ এরশাদ। তার আমলে এই পাহাড়িদের উপর যা অত্যাচার হয়েছে সেটা সবাই জানেন। সেনাবাহিনীর প্রতি নির্দেশ ছিল রাতে যেন সবাই পাহাড়িদের ঘরে ঢুকে যায়, সবার পেটে বাংগালী বাচ্চা ধরিয়ে দেয়া হয়। এসব অমানবিক বর্বর কাজ গুলোও পাহাড়িদের সাথে হয়েছে। আপনি নব্বইয়ের দশকে অনেক পাহাড়ি ছেলে মেয়ের চেহারা, গড়ন, গঠন দেখবেন আমাদের সমতলের মানুষের মত। তারা সেই এরশাদ কুলাঙ্গারের নির্দেশের ফসল।

আমি ২০০৭-৮ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজস্থিলী উপজেলার বাংগালহালিয়া সহ আশে পাশের এলাকা গুলোতে কাজ করেছিলাম সেনাবাহিনীর সাথে। একজন সিভিলিয়ান হিসেবে সেই কথা এখন লিখলে আমার বিরুদ্ধেও রাষ্ট্র দ্রোহ মামলা হবে। শুধু এই টুকুন বলব সেনাবাহিনী এখনো পাহাড়িদের শান্তিতে ঘুমাতে দেয় না।

৯৬, পরবর্তি সরকার গঠনের পর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী পাহাড়িদের সাথে শান্তি চুক্তি করেছিলেন ” শান্তিতে নোবেল” পুরষ্কারের আশায়। সুইডিশ নোবেল জুরি আমাদের প্রধান মন্ত্রীর সেই খায়েশ পুরণ করে নাই। তাই তিনি আজ পর্যন্ত তিন মেয়াদে সরকারে থাকলেও শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন করেননি।

আমাদের পুলিশের দক্ষতার, নৈতিকতার, নিষ্ঠার ত জুড়ি নেই। ২০০১ সালের জোট সরকার আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফের বিরুদ্ধে বিয়ে বাড়ি থেকে খাবার প্লেট চুরির মামলা দিয়েছিল। আবার এবার আওয়ামী লীগ বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগিরের বিরুদ্ধে ডাস্ট বিনে আগুন দেয়ার মামলা করেছে।
আপনাদের এই নোংড়া রাজনীতি জাড়ি থাকুক। না হলে আপনাদের পেটের ভাত হজম হবে না।

তাই বলে এইভাবে সাধারন ছাত্র, একজন পাহাড়ি বাংগালী, একজন ছাত্রনেতার মা কে এই ভাবে খুন করবেন? জেল জুলুম হবে জেনেই বিপুল চাকমা এই পথে নেমেছে। তাই বলে এইভাবে অত্যাচার করবেন?
আমরা দেখেছি যুদ্ধাপরাধের মামুলায় মৃত্যু দন্ড প্রাপ্ত রাজাকার দেলোয়ার হোসেন সাঈদী তার ছেলের মৃত্যু তে পেরোলে মুক্তি পেয়েছিলেন। কই সেই মৃত্যু দন্ড প্রাপ্ত আসামিকে ত হাতকড়া লাগান নাই? কই তাকে ত ডান্ডাবেরি পরান নাই? যাকে চাঁদে দেখার গুজব রটিয়ে দেশে ৭৮ জন মানুষ হত্যা কয়রা হল সে কি এতই নিরাপদ ছিল?

বিপুল চাকমা কি মৃত্যু দন্ড পাওয়া সাঈদীর চাইতেও ভয়ংকর ? তার অপরাধ কি সাঈদীর চাইতেও বেশী মারাত্মক?
আমি জানি এই রাষ্ট্র আমার এই প্রশ্নের কোন উত্তর দিবে না, দেয়ার সৎ সাহস এই রাষ্ট্রের নাই।

শুধু এই কথা জেনে রাখুন, হাতকড়া পরে যে আগুন মায়ের চিতায় দেয়, সে আগুন একদিন আপনার সিংহাসন, আপনার ক্ষমতার গদিতেও লেগে যেতে পারে। সেদিন বাংগালী জাতিকে বেঈমান বলে গালি দিয়েন না। যা কিছু হবে সেটা আপনাদের কৃত কর্মেরই ফল।
সব অশুভ শক্তি পরাজিত হবেই।
জয় বাংলা।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “আমাদের রাজনীতি ও স্বপ্নের অপমৃত্যু !

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 4 = 2