Say no to boarder for friendship!

আদ্রিয়ানা গোমেজ ফাচিন। পেরুর পূর্বাঞ্চলীয় শহর ইকোইটসে জন্ম ও বেড়ে উঠা। ইকোইটোস সান মার্টিন ডি পরেস কলেজ থেকে ২০১১ সালে গ্রাজুয়েশন করে স্টেট ডিপার্টমেন্ট অফ আমেরিকায় এসেছিল কনফারেন্সে । আমি মালয়শিয়া থেকে উড়ে এসেছি স্টেট ডিপার্ট্মেন্ট এর বার্ষিক সাধারণ সবায় যোগ দিতে। আমার সাথে পরিচয় সেখানেই, ওয়াশিংটনডিসি তে। তিন দিনের সম্মেলন শেষ আমি ফিরলাম নিউইয়র্ক এর কুইন্সে আমার এক্স কলিগ জনের বাসায় আর ও গেলো ব্রোঞ্জে ওর চাচার বাসায়।

পরের দিন প্ল্যান হলো আমেরিকার প্রতি ফ্রান্সের জনগণের বন্ধুত্বের প্রতীক স্ট্যাচু অফ লিবার্টি দেখতে যব। পরদিন দুইজন এসে মিলিত হলাম গ্র‍্যান্ড জিরোতে। সকাল নয়টা, কনকনে শীত। টিকেট নিলাম লাইনে দাঁড়িয়ে। এর পর সিকিউরিটি চেক যে কোন দেশের ইমিগ্রেশন চেকের চাইতেও শক্ত আর কড়াকড়ি । পায়ের জুতা পর্যন্ত খুলে চেক করল। সম্ভবত এই সাবধানতা 9/11 এর পর থেকে শুরু হইছে। তারপর আবার লাইন ধরে ছোট জাহাজে চড়ে ইলিশ আইল্যান্ড আর স্ট্যাচু অফ লিবার্টির উদ্দেশ্যে যাত্রা। পনেরো মিনিটের নৌভ্রমণ।

এটি ফ্রান্স ১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে উপহার হিসেবে দিয়েছিল। ভাস্কর্যটি দাঁড়িয়ে আছে নিউয়র্কের লিবার্টি আইল্যান্ডে হাডসন নদীর মুখে যেখানে জাহাজ নোঙর করে, যা যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনকারী এবং অন্য দেশ থেকে ফিরে আসা আমেরিকানসহ সকল পর্যটকদের স্বাগত জানায়। এই তামার মূর্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের শতবর্ষপূর্তিতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ফ্রান্সের বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে উৎসর্গ করা হয়েছিল ১৮৮৬ সালের ২৮ অক্টোবর। ভাস্কর্যটির ভিতরের কাঠামোটির নকশা তৈরি করেছিলেন ফেড্রিক বারথোল্ডি এবং গুস্তাভ আইফেল, যিনি আইফেল টাওয়ার নকশা করেছিলেন।

ভাস্কর্যটি মূলত ঢিলা জামা ও মাথায় সূচালো কাঁটাওয়ালা মুকুট পরিহিত একটি নারী মূর্তি, যা লিবার্টাস নামক রোমান দেবীর আদলে করা। মূর্তিটির বাম হাতে রয়েছে একটি আইনের বই যাতে আমেরিকার স্বাধীনতার তারিখ “৪ জুলাই, ১৭৭৬” খোদাই করে লেখা এবং ডান হাতে উঁচিয়ে ধরা প্রজ্বালিত অগ্নিশিখার মত টর্চ। মূর্তিটির পায়ে পড়ে থাকা ছেঁড়া শিকল পরাভূত স্বৈরশাসনের প্রতীক। মূর্তিটি সাম্য, স্বাধীনতা ও মুক্তির প্রতীক। তামা ও লোহা দ্বারা নির্মিত ৩০৬ ফুট ৮ ইঞ্চি উঁচু এই মূর্তিটি সমুদ্রের বহুদুর থেকে দেখা যায়। ফ্রান্সের ঐতিহাসিক উপহারটি দেখতে প্রত্যহ অসংখ্য দর্শনার্থী দ্বীপটিতে ভিড় জমান।  

ফ্রান্সের রাজা তৃতীয় নেপোলিয়ানের সময়ে এডওয়ার্ড রিনি লাবুলাহ নামে এক ফরাসি পন্ডিত প্রথমে প্যারিসে বসে চিন্তা করেন যে, একটি বিরাট সিভিল ওয়ারে জিতে আমেরিকানরা প্রভূত সম্পদশালী জাতিতে পরিণত হতে চলেছে। তাই ওদের মধ্যে এমন কিছু একটা করা দরকার যা হবে ফরাসি ও আমেরিকান মৈত্রীর বন্ধন। এ লক্ষ্যে তিনি তদানীন্তন একজন বিখ্যাত ভাস্কর ফ্রেডারিক আগষ্টে বারথোল্ডির সঙ্গে আলাপ করেন। তিনি ১৮৭১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আসেন মনুমেন্টের প্রস্তাব নিয়ে ও স্থান নির্বাচনের জন্য। সে হিসেবে নির্বাচিত হয় নিউইয়র্ক শহরের লিবার্টি দ্বীপটি।  

এটি তৈরির জন্য ফ্রান্স ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সদস্যদের নিয়ে ১৮৭৫ সালে ফ্রান্স-আমেরিকান ইউনিয়ন কমিটি গঠিত হয়। কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক আমেরিকা বহন করবে ভিত ও বেদি তৈরির খরচ এবং ফ্রান্স বহন করবে মূল মূর্তি তৈরির খরচ। সে মতে আইফেল টাওয়ার খ্যাত ইঞ্চিনিয়ার আলেকজান্ডার গুস্তাভ আইফেলের জটিল ডিজাইনে প্রায় ২ বছর ফরাসি ও আমেরিকান ভাস্কররা এটি তৈরির জন্য পরিশ্রম করেন। এটি ৩০০ খন্ডে তৈরি করা হয় এবং এর উপরেও ২.৫ মিমি প্রস্থ তামার শীট দিয়ে জড়িয়ে দেওয়া হয়। এভাবে ১৮৮৪ সালে জুন মাসে তৈরির কাজ সম্পন্ন হলে ফ্রান্সের প্যারিসে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। পরবর্তীতে ১৮৮৫ সালে মূর্তিটির বিভিন্ন অংশ খুলে ২১৪টি বাক্সে ভরে জাহাজে করে আমেরিকায় পাঠানো হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড ১৮৮৬ সালের ২৮শে অক্টোবর এটির আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। 
মূর্তিটির উচ্চতা ১৫২ ফুট ২ ইঞ্চি। পায়ের গোড়ালী থেকে মাথা পর্যন্ত উচ্চতা ১১১ ফুট, হাতের দৈর্ঘ্য ১৬ ফুট ৫ ইঞ্চি, তর্জনী ৮ ফুট, নখের সাইজ ১৩ ইঞ্চি, নাক ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি, ডান বাহু ৪২ ফুট, দুই চোখের ব্যবধান ২ ফুট ৬ ইঞ্চি, কোমর ৩৫ ফুট, মুখের প্রস্থ ৩ ফুট, এক কান থেকে অন্য কান পর্যন্ত দূরত্ব ১০ ফুট এবং নখের ওজন ১ কেজি ৫০০ গ্রাম। মূর্তিটি ওজন ২৫৪,০০০ কেজি। 

ভ্রমণ- 
লিবার্টি আইল্যান্ডে প্রবেশের জন্য কোনো টিকেট প্রয়োজন হয় না। তবে লিবার্টি দ্বীপে ফেরিতে পৌঁছতে হয়, যার ভাড়া দিতে হয়। ফেরির সাথে মিউজিয়ামে প্রবেশের টিকেট কিনতে হয়। যে ফেরিগুলো এই রুটে চলাচল করে সেগুলো ভ্রমণকারীর নিরাপত্তাসহ যাবতীয় সুবিধা দিয়ে থাকে। ভাস্কর্যটির সিড়ি তে চড়া এবং মুকুটে আরোহনের জন্য আলাদা বিশেষ টিকেট অগ্রিম সংগ্রহ করতে হয় ১ বছর আগেই। প্রতিদিন ২৪০ জন মানুষকে ভ্রমণের অনুমতি দেয়া হয় যার প্রতি গ্রুপে ১০ জন মানুষ থাকতে পারবে এবং প্রতি ঘন্টায় ৩টি গ্রুপ প্রবেশ করতে পারবে। ভ্রমণকারীরা শুধুমাত্র পথ্য এবং ক্যামেরা নিয়ে প্রবেশ করতে পারবেন। অন্যান্য জিনিসের জন্য তাদের একটি লকার দেয়া হয়। প্রবেশের সময় অবশ্যই একটি সিকিউরিটি স্ক্যানিং এর মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
১৯৮৪ সালে ইউনেস্কো ‘স্ট্যচু অফ লিবার্টি’কে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা দেয়। ইউনেস্কোর ‘স্টেটমেন্ট অফ সিগনিফিকেন্স’ এ ভাস্কর্যটিকে উল্লেখ করা হয় ‘মাস্টারপিস অব হিউম্যান স্পিরিট’ হিসেবে। 

জাহাজ থেকে নেমে কাউন্টার থেকে স্ট্যাচুর ইতিহাস সমৃদ্ধ ডিভাইস গলায় ঝুলালাম। এই ডিভাইসে চ্যানেল পরিবর্তন করে বিভিন্ন ভাষায় স্ট্যাচুর ইতিহাস জানা যায়।
আমরা ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। বাংলাদেশের জাতিয় পতাকা নিয়ে ছবি তুল্লাম। এই প্রথম আদ্রিয়ানা আমাদের পতাকার সাথে পরিচয় হল। এই স্ট্যাচু যেমন ফ্রান্স আর আমেরিকার বন্ধুত্বের প্রতীক , বাংলাদেশের পতাকাও আমাদের বন্ধুত্বের প্রতীক হয়ে রইল। ও নিজ থেকে চেয়ে পতাকাটা নিয়ে নিল। অবশ্য ও আমাকে একটা কয়েন দিয়েছিল।


হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন আসে স্ট্যাচু অফ লিভার্টি দেখতে। তবে কোন ভীর বা তাড়াহুড়ো নেই। সব কিছু বেশ দারুণ ভাবে নিয়ন্ত্রীত। সবাই আসে যার যার মত করে ঘুরে বেড়ায়। চার পাশে নীলাভ পানির মাঝখানে স্ট্যাচু অফ লিভার্টি মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছ হাতে মশাল নিয়ে।
দুপর আড়াইটায় আমরা ফিরে আসলাম ম্যানহাটন । ফেডারেল রিজার্ভ বিল্ডিং এর পাশে ওর চাচার অফিস । সেখানে লাঞ্চ করলাম।
সন্ধ্যায় পোর্ট মিউজিয়াম ঘুরে নিজ নিজ গৃহে ফিরে গেলাম।


পরদিন আমরা বের হলাম নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির শিক্ষা সপ্তাহের উদ্ভোধনী অনুষ্ঠানে। আমরা সেখানে আমন্ত্রিত ছিলাম পশ্চিম আফ্রিকার বন্ধু নোহালান খেশোয়ার আমন্ত্রণে। পুরোদিন সেখানে বেশ ভালই কাটল।

এভাবে আমাদের পুরো এক সপ্তাহ বোস্টন, নিউজার্সি, ওয়াশিংটন ডিসি ঘুরাঘুরি শেষে আদ্রিয়ানা পেরুতে ফিরে গেলো। আমার আর যাওয়া হল না বাংলাদেশ কিংবা মালয়ষিয়ায়। আমার নতুন এস্যাইনমেন্ট হল আমেরিকার পষচিমের রাজ্য ইউটা তে ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “Say no to boarder for friendship!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

33 − 31 =