যে রোদে সব পুড়ে যায়

শরতের আকাশ এমন হবার কথা ছিলোনা। গাঢ় নীল রঙের আকাশে কোথাও মেঘের ছিটেফোটাও নেই। চারপাশ ফুঁড়ে হাপরের মতো আগুনজ্বলা উন্মত্ত গরম বাতাস। যেন এক ক্লান্ত বৃদ্ধ শরীরে আগুন নিয়ে মৃদু পায়ে হেঁটে হেঁটে ছড়িয়ে দিচ্ছে সবখানে। ছয় তলা থেকে নামতে নামতেই ভেতর থেকে হৃৎপিণ্ড বের হয়ে যেতে চাইছে। কলাপসিবল গেইট খুলতে গিয়ে হঠাত হাতটা কেটে যায় উজ্জ্বলের। বাকিরা কেই খেয়াল করার আগেই কাটা জায়গাটা চেপে ধরে উনুনে ভাজা রোদে এসে দাঁড়ায়। তবু পেছন থেকে অনিকের চোখের আড়াল হয়না ব্যাপারটা। জিজ্ঞেস করতে গিয়ে এসে থেমে যায়। পকেট হাতড়ে দলামচা সিগারেট খুঁজে জ্বালিয়ে নেয় উজ্জ্বল। সাথে সাথেই ড্যাম হয়ে যাওয়া তামাকের একটা গুমোট গন্ধ চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে।

হালকা গাঁজা খেয়ে নিলে গরমটা আর গায়ে লাগতোনা, সাইরাস বলে ওঠে। কেউ কোন উত্তর দেয়না। নির্বিকার ভঙ্গিতে সামনে হাঁটতে থাকে সবাই। মেইনরোডে আসতে আসতেই হাঁপিয়ে ওঠে সবাই। একটা রিকশা পেলে মন্দ হতোনা। কিন্তু অসময়ের আগুনে পোড়া শহরে রিকশা ভালোবাসার মতোই দুর্লভ বস্তু হয়ে ঠেকে। শহরের যানবাহনের সাথে ভালোবাসা আর যৌনতার একটা গভীর মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ঘামে ভেজা গাদাগাদি বাসগুলো বারবার যেন বিছানায় ঘাম আর শরীরের গল্প বলতে চায়। যে গল্প এ শহরে সহজেই খুঁজে পাওয়া যায়। যে গল্প এই শহরে শহরের চেয়েও পুরনো হয়ে ওঠে।

মরুভূমিতে মরীচিকা দেখার মতো রিকশাওয়ালাও খুঁজে পাওয়া যায়। পরিত্যাক্ত ফিলিং স্টেশনের পাশে যেখানে অলিখিত ডাস্টবিনে কুকুর কিংবা কুকুরের মতো আর সব অভুক্তের দল দলিত গলিত খাদ্যের সন্ধানে নির্বিকারে ঘুরে বেড়ায়। তার ঠিক পাশেই রিকশাটা এক পাশে রেখে হুড তুলে পেছনের সিটে বসে পা দুখানি নিজের আসনে অতি আরামে দুলিয়ে দুলিয়ে ন্যাতানো বনরুটিটা চায়ে ডুবিয়ে খাচ্ছে। বেশ কয়েকবার জিজ্ঞেস করার পর রিকশাওয়ালা মাথাটা একটু কাত করে তাদের দেখে নেয়। তারপর আবার নীরবতা কয়েক হাজার বছরের ধুলো পড়া ইতিহাসের মতো বিবর্ণ হয়ে উঠলে সে জানায় ৫০ টাকার নিচে যাবেনা। সাইরাসের মাথায় রক্ত উঠে যায়। পকেটে আছেই মাত্র ৩০ টাকা আর সেখানে ৩০ টাকার ভাড়া ৫০ টাকা চাওয়ায় তার ইচ্ছে করে রিকশাওয়ালার পেছনে কষে একখানা লাথি বসিয়ে দিতে। তবু পেছনের কম্যুনিজমের গল্প আর লোকগাঁথা অথবা অন্য কোথাও তার আটকে যায়। মুখ ফসকে গালি কিছুটা বের হয়ে যেতে চাইলেও কণ্ঠনালীতেই তা আটকে দেয়। সাম্রাজ্যবাদী পৃথিবীতে সবাই এখন তার নিজেদের ক্ষমতা আর আধিপত্য দেখাতেই ব্যাস্ত। রিকশাওয়ালা এই থেকে বাদ যাবে কেন। তবু আফসোস এই খেটে খাওয়া মানুষেরা তাদের বিরুদ্ধে বিপ্লবে যায়নি বরং নিজেকে পুঁজিবাদী সমাজের সস্তা শিকারে পরিণত করে অসততাকেই টিকে থাকার অবলম্বন হিসেবে খুঁজে পেয়েছে। এতকিছুর ভীড়েও সাইরাসের আরও অর্ধযুগের পুরনো এক গল্প মনে পড়ে। পলাশী থেকে কাঁটাবন মোড়ে রিকশার গল্প। সেই গল্পে বিপ্লব ছিল, বেঁচে থাকার আগুণ ছিল। হতদরিদ্র রিকশাচালক মফিজুদ্দিন বিপ্লব ঘোষণা করেছিল এই অন্তঃসার শূন্য তথাকথিত পুঁজিবাদী সমাজকে।

সেই গল্প এখন অনেক পুরনো। আর কখনও কোন বিপ্লবীর সাথে দেখা হয়নি। শুধু আরেকবার মফিজুদ্দিন মিয়াঁর গল্প শুনেছিল সাইরাস। সেদিনের রিকশা যাত্রায় তার পাশে বসে থাকা মেয়েটি যে তার প্রেমিকা হতে পারেনি,এমনকি বিপ্লবের সঙ্গী। তার মুখেই শুনেছিল সেই বিপ্লবীর নিথর হবার গল্প। মুখভর্তি হাস্যরস আর কৌতুক নিয়ে বলেছিল সে, তোমার সেই বিপ্লবী তো প্রতিপক্ষ শ্রমিকেদের হাতে খুন হয়েছে। হাসপাতালে দেখেছি তাকে। তারপর থেকে সুদর্শন রমণীকে আর কখনও দেখেনি সাইরাস, যেমনটা সে দেখেনি এই শহরে আর কোন বিপ্লবী। শুধু সে জেনেছে বরফ শীতল হৃদয়ে মানুষ খুন করা যায় তবু বিপ্লবী হওয়া যায়না।

চলবে…..

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “যে রোদে সব পুড়ে যায়

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

15 − = 11