আয়নাবাজী বিতর্ক

১.
আয়নাবাজী ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর থেকে নানা বিতর্কের মধ্যদিয়ে আজ এই পর্যন্ত এসেছে। কেউ কেউ এটাকে কোরিয়ান মুভীর নকল বলতেও ছাড়েন নি। সম্প্রতি আমাদের চলচিত্র জগতের অভিনেতা কাজী মারুফও এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি মন্তব্য করেন আয়নাবাজী থেকে শেখার কিছু নেই বরং খারাপ কিছু শেখার আছে, তিনি আরো মনে করেন ছবিটি ৫০-৬০ টি প্রেক্ষাগৃহে চলেছে মাত্র। সাতক্ষীরার দিকে নাকি ঠিকমত যায় ই নি। যদি ১০০টা হলে ফুল ফিলাপ হয় তাহলে মুভীটি সফল না হলে অসফল এবং বাজে। তার বক্তব্য থেকে এটাই আমার অভিমত।

আমার ব্যক্তিগতভাবে তার এই মন্তব্যগুলো খুব অবান্তর বলে মনে হয়েছে।
একটা ছবিতে পজেটিভ এবং নেগেটিভ দুই চরিত্রই দেখা যায়। কিন্তু কে পজিটিভ গ্রহন করবে আর কে নেগেটিভ গ্রহন করবে সেটা দর্শকের দায়িত্ব পরিচালকের দায়িত্ব না। যদি আপ্নি নেগেটিভ সাইড গ্রহন করেন তবে বুঝতে হবে আপ্নি মাল আগেই নেগেটিভ হয়ে আছেন তাই চরিত্রের নেগেটিভ সাইড আপ্নাকে বেশি আকৃষ্ট করেছে। আয়নাবাজী ছবি থেকে যদি শেখার কিছু না থাকে তাহলে বুঝতে হবে আপনি ছবিটি ভাল করে দেখেন নি। ছবিতে দেখানো হয়েছে সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের নিয়ে একটা স্কুল করা হয়েছে যেখানে একসাথে গান, বাজনা, অভিনয় শেখানো হয়। সেটা শিশুদের প্রতি অসম্ভব ভালবাসা না থাকলে হয় না। মারুফ সাহেব আপনি কি সেখান থেকে শেখার মত কিছু খুঁজে পান নি? সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল মারুফ সাহেব বলেছেন আয়না নাকি সে স্কুলে চাকরি করে কিন্তু আয়না সে স্কুল্টা তার পয়সায় পরিচালনা করে। আয়না যে তার কথার জাদুতে তার আশেপাশের মানুষ এর মন জয় করে রেখেছেন তা বুঝা যায় যখন সাংবাদিক নাস্তার হোটেলে বসে হোটেলের মালিক কে বলেছিলেন যে আয়না আর ফিরে আসবে না, তখন হোটেল মালিকের রিএকসান থেকে তার চিত্র স্পষ্ট। কিন্তু ঠিকি আয়না ফিরে এসেছে সকল বাধা কাটিয়ে, কঠিন সময়েও মাথা ঠান্ডা রেখে জিতে আসা যায় আপনি কি তা থেকে কিছু শিখতে পারেন নি মারুফ সাহেব? যদি আপনি বলেন যে তাও শেখার কিছু নেই তাহলে আপনার জন্য আমার আফসুস হচ্ছে এই ভেবে যে আপনি ছবিটি উপভোগ করতে পারেন নি, মনে সন্দেহ রেখে দেখেছেন তাই। ছবি দেখার সময় নাক উঁচিয়েছেন। আমাদের অভিনেত্রী কিন্তু বলেছেন যে সন্দেহ নিয়ে দেখলে ছবিটি উপভোগ করতে পারবেন না, সেই কথা কি আপনি শুনেন নি? নাকি মনে ছিল না?
২.
কাজী মারুফ সাহেব ছবিটি নিয়ে অনেক অভিযোগ করেছেন ।
তার ১ম অভিযোগ ছবির শুরুতে আয়না মাছ বিক্রেতা কে ঠকিয়েছেন,
–কিন্তু আমার প্রশ্ন হল আয়নার কথার জালে মুগ্ধ হয়ে যদি মাছ বিক্রেতা কম দামে মাছ দিয়ে দেন তাহলে কি তাকে ঠকানো বলে?
২য় অভিযোগ হল আয়না কেস না শুনে কাজে হাত দেয় না, আর প্রথম কেস্টা ছিল নারী নির্যাতন। হিরোর কি নারী নির্যাতন ভাল লাগে?
–প্রথম কথা হচ্ছে আয়না কেস না শুনে কাজ করেন না মানে হচ্ছে ঝুঁকি বেশি হলে নেন না, কম হলে নেন । এখানে নারী নির্যাতন মুখ্য বিষয় নয়।
৩য় অভিযোগ হল কোন সিনেমায় গান বাজনা হয় না, হলেও স্যাড সং হয় বা কল্পনায়।
–মারুফ সাহেব আপনাকে আমি বলতে চাই আপনি হয়ত গানের মর্মার্থই বুঝতে পারেন নাই। জেলের ভিতরে হওয়া গানটি ভাল করে পর্যবেক্ষন করলে বুঝতে পারবেন সকলের মনের ভেতরেই একটা চাপা কষ্ট লুকিয়ে আছে গানটিতে সেটাই প্রকাশ করার চেষ্টা করা হয়েছে। আপনি দয়া করে গানটি আবার দেখবেন তাহলেই বুঝতে পারবেন। আমার মতে একে স্যাড সং ই বলা যায়। এট লিস্ট গানের কথা সেটাই প্রকাশ পায়।
৪র্থ অভিযোগ হল কয়েদিদের কি গাড়ি কখনো থামে?
–রাঘব বোয়াল মার্কা ব্যক্তিরা তাদের পাপ ভোগ করার জন্য আয়নার মত মানুষদের ব্যবহার করে। টাকা ঢেলে জামিন পায়, মুক্তি পায় জেল থেকে, তাহলে সামান্য কয়েদিদের গাড়ি থামতে পারবে না কেন? এই সামান্য লজিক আপনার মাথায় ঢুকে না?
৫ম অভিযোগ সাংবাদিক ছবিতে প্রকাশ্যে মদ্য পান করেছিলেন কিন্তু আয়নাবাজি কর্তৃপক্ষ “মাদক স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর ” লেখা দিয়ে সাবধান করেনি।
— সব ছবির শুরুতেই এটা সাবধান করা হয় এটা পাগলেও জানে।
৬ষ্ঠ অভিযোগ সাংবাদিকরা সমাজের বিবেক, সাংবাদিক প্রকাশ্যে মদ পান করেছেন, ঠিক মত সঠিক সংবাদ পরিবেশন করতে পারেন নি।
—প্রথম কথা হচ্ছে সাংবাদিক পরিস্থিতির শিকার হয়ে বার বার সংবাদ সংগ্রহে ব্যর্থ হয়েছেন বা ব্যর্থ করানো হয়েছে। সাংবাদিক সঠিক সংবাদ সংগ্রহ করেছেন ঠিকি কিন্তু পরিস্থিতি বিবেচনায় তা প্রকাশ করেন নি তা আমরা যারা আয়নাবাজী দেখেছি সবাই জানি। সাংবাদিকের মদ্য পান এটা কি সমাজের বিবেকবান মানুষের কাজ? আমাদের দেশের সাংবাদিদের মদ খেলে বিবেকের প্রশ্ন উঠে কিন্তু আমি যদি এই কথাটি সেসব দেশের সাংবাদিকদের জন্য বলি যাদের দেশে মদ খাওয়া বৈধ। তাহলে তো বলা যায় তারা সবাই বিবেকহীন মানুষ। মদ খেলে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয় তা ঠিক কিন্তু যে খায় সে জেনে বুঝেই খায়। সিগারেটও আমাদের ক্ষতি করে আমরা যারা জেনে বুঝে সিগারেট খাই তারাও কি বিবেকহীন মানুষ?
৭তম অভিযোগ হল আয়না ছবির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ক্রাইম করে গেছেন, ক্রাইম করে তিনি শেষ হাসী ও হেসেছিলেন।
— মারুফ সাহেব আপনি কোনটাকে ক্রাইম বলছেন? অন্যের পাপ নিজের ঘাড়ে নিয়ে পটু অভিনেতার মত অভিনয় করে গেছেন সেটাকে বলবেন নাকি যারা তাকে ব্যবহার করেছে তাদেরটা ক্রাইম? নাকি যারা ক্রাইম করার সুযোগ করে দিয়েছেন তাদের টা ক্রাইম?
৮তম অভিযোগ হল পুরো ছবিতে পুলিশকে বোকা বানানো হয়েছে।
—পুলিশকে যদি বোকা বানানো হত তাহলে কি কয়েদিদের গাড়ি থামিয়ে চেঞ্জ করা যেত? তার মানে কিছু পুলিশও এ অন্যায়ের সাথে জড়িত থেকে সাহায্য করেছে তাদেরকে বোকা বানানো হয় নি।
৯ম অভিযোগ নায়ক তার মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও নায়িকার সাথে অভিনয় করে গেছেন এটা কতটুকু বাস্তব?
–হুম মারুফ সাহেব এখনেই একজন অভিনেতার অভিনয়ের সার্থকতা। ছবিতে জেলখানাকে নায়ক তার অভিনয়ের মঞ্চ বানিয়েছেন। সংলাপে ভুল হলে তিনি কি মঞ্চ থেকে পালিয়ে যাবেন নাকি তার ক্ষমতা দিয়ে নাটক শেষ করার চেষ্টা চালিয়ে যাবেন? তিনি যদি সাংবাদিক আর নায়িকার কাছে ধরা দিতেন তাহলে তা তার মঞ্চ থেকে পালিয়ে যাওয়ার সামিল হত।

কিন্তু তিনি তা না করে নিজ ক্ষমতায় কনস্টেবলকে অভিনয়ের জাদুতে ভুলিয়ে নিজের জীবন বাঁচান যা আমার কাছে তার জীবন মঞ্চের অভিনয়ের সার্থকতা মনে হয়।
৩.
মারুফ সাহেব আপনি সব কিছুতে বাস্তবতা খোঁজেন কিন্তু আপনি কয়টা ছবি বাস্তবতার সাথে মিল রেখে করেছেন? সেগুলোর একটারও মান আছে? আমি তো মনে করি আয়নাবাজী চলচিত্র জগতে স্মরনীয় হয়ে থাকবে কিন্তু আপনার কয়টা ছবি স্মরনীয় হবে বলতে পারেন? আয়নাবাজী ছবি ৫০টা না, ৫টা হলও ২য় সপ্তাহে হাউজফুল করেছে, আপনার কয়টা ছবি হাউজফুল করেছে? সবকিছুতে সন্দেহ বাধাবেন না। ব্যক্তিগত রোষ ব্যক্তিগত ভাবে ছাড়েন পাবলিকলি ছড়াইতে আইসেন না। আমাদের চলচিত্রকে একটু আগাইতে দেন, সন্দেহ করে আজাইরা প্রশ্ন তুলে গ্যাঞ্জাম বাধাইয়েন না।
আয়নাবাজীর জয় হোক

বিঃ দ্রঃ এখানে একান্তই আমার অভিমত প্রকাশ করা হয়েছে, ভুল ত্রুটিতে ক্ষমা চাইছি।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “আয়নাবাজী বিতর্ক

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

32 + = 41