“হ্যাপি হ্যালোউইন, ইয়াকুব”!

‘হ্যালোউইন’!

‘হাস্যরস ও উপহাসের সাহায্যে মৃত্যুর ক্ষমতার মুখোমুখি হওয়া’।

বেশ ঠাণ্ডা পরেছে। একটু বেরুতে হবে। বেরিয়ে দেখি রাস্তাঘাট কেমন শুনশান, ফাঁকা ফাঁকা। গুটি কয় খাবারের দোকান খোলা। এই ঠান্ডার মধ্যেও দেখি খাবারের দোকানের সামনে চেয়ার পেতে জনা কয়েক টুকটাক করে এটাসেটা খাচ্ছেন, কেউবা কফি। বাচ্চারা কেউ কেউ আইসক্রিমও খাচ্ছে! হ্যালোউইন উৎসব বলে মনেই হচ্ছে না। অন্য আট-দশটা শহরের তুলনায় এই শহর আকারে ছোট ও খানিকটা মফস্বলী, গ্রামীণ আবহ। মাঝেমধ্যে ফুঁটছে বাজি-পটকা, অদ্ভুত রঙঢঙের পোষাক পরা লোকজন দেখতে পাচ্ছি অন্য আর তেমন কিছু চোখে পরেনি। পেট্রোল পাম্প থেকে মোবাইলে টাকা ঢুকিয়ে ফিরতি পথ ধরছি। হঠাৎ দেখি কে যেনো পেছন দিকে দিয়ে ডাকে! অগত্য দাঁড়াতেই হলো। দেখি রাস্তার মোড় থেকে সোমালিয়ান ইয়াকুব (ছদ্মনাম)।

‘হ্যালোউইন’!

‘হাস্যরস ও উপহাসের সাহায্যে মৃত্যুর ক্ষমতার মুখোমুখি হওয়া’।

বেশ ঠাণ্ডা পরেছে। একটু বেরুতে হবে। বেরিয়ে দেখি রাস্তাঘাট কেমন শুনশান, ফাঁকা ফাঁকা। গুটি কয় খাবারের দোকান খোলা। এই ঠান্ডার মধ্যেও দেখি খাবারের দোকানের সামনে চেয়ার পেতে জনা কয়েক টুকটাক করে এটাসেটা খাচ্ছেন, কেউবা কফি। বাচ্চারা কেউ কেউ আইসক্রিমও খাচ্ছে! হ্যালোউইন উৎসব বলে মনেই হচ্ছে না। অন্য আট-দশটা শহরের তুলনায় এই শহর আকারে ছোট ও খানিকটা মফস্বলী, গ্রামীণ আবহ। মাঝেমধ্যে ফুঁটছে বাজি-পটকা, অদ্ভুত রঙঢঙের পোষাক পরা লোকজন দেখতে পাচ্ছি অন্য আর তেমন কিছু চোখে পরেনি। পেট্রোল পাম্প থেকে মোবাইলে টাকা ঢুকিয়ে ফিরতি পথ ধরছি। হঠাৎ দেখি কে যেনো পেছন দিকে দিয়ে ডাকে! অগত্য দাঁড়াতেই হলো। দেখি রাস্তার মোড় থেকে সোমালিয়ান ইয়াকুব (ছদ্মনাম)।

তার সাথে বেশ কয়েক মাস পর দেখা। এটা সেটা নানান আলাপ-সালাপ শেষে সে ধুম করে বললো- কেমন কাটালে এই হ্যালোউইন? উত্তরের অপেক্ষায় বসে নাই সে। বলা ভালো সে মদ্যপান করে বেরিয়েছে। মনে মনে প্রমাদ গুণলাম। আলাপে আলাপে এও বুঝলাম ব্যাটা মাত্রই পান করে বেরিয়েছে, মনে হচ্ছে। এক্ষণে বেশ জ্বালাবে। যাই হোক আমারও হাতে বিশেষ কাজও নেই, খুব এএকটা তাড়াও নেই। আড্ডা দেওয়ার আসলেই কেউ নেই এখানে। কিছুক্ষণ কাটালে মন্দ কি? এই ভেবেই কি না জানি না, প্রশয় সংযত হাসি দিয়ে বলি- ইয়াকুব আজ ভদকা পান করলে বুঝি? দেখি শাদা দাঁতগুলো বেশ হালকা বিবর্ণ রঙের হয়ে বেশ শাসন-মাতাল হাসি হাসতেছে। যাক নিশ্চিত হলাম। ব্যাটা নিয়ন্ত্রণে আছে।

আবার আগের প্রসঙ্গে ফিরে গেলো সে। আমার নাম ধরে বলছে জানো তো, সোমালিয়ায় কিন্তু এই হ্যালোউইন-ফেলোউইন কিস্যু নাই। আচ্ছা, তোমাদের সিরিয়ায় কি হয়, ওই হ্যালোউইন? রাগ, উষ্মা ও বিরক্তি চেপে ধরে বললাম, বাংলাদেশ। আমি বাংলাদেশি। স্যরি মনে থাকে না ফ্রেন্ড! কিছু মনে করো না, স্যরি। এই বলে সিগারেট বের করে বলে, আসো দু’জনে মিলে পেট্রোল পাম্প থেকে একটা একটা করে বিয়ার খাই, কি খাবে? বিল কিন্তু আমিই দেবো। সচেতনভাবে এড়িয়ে যাওয়াই সমীচীন। এর একটা বিয়ারে হবেনা। যতক্ষণ না ও পুরোপুরি আউট হয়। না করতেই বলে ধুউশ…! কি মনে করে আর বলতে যেয়েও বলেনি। বাঁচিয়েছে। হাটতে হাটতে সামনেই বেঞ্চ পেয়ে গেছি। ভাবছি এখানেই একে বসিয়ে রেখে কোনোরকমে যদি চম্পট পারি, বেশ হয়। বেশিক্ষণ থাকলে কি কান্ড করে কে জানে। মনে মনে এই ভাবছি। সিগারেট ধরিয়েই পরক্ষণেই বললো কই বললে না তো, বাংলাদেশে হ্যালোউইন হয়?

‘হ্যালোউইনের রাতে মৃত্যুর দেবতা, আঁধারের রাজপুত্র, সব মৃত আত্মা ডাক দেয়।’

আমি বললাম হয়। ব্যতিক্রম না হলে পরে প্রায় প্রতি মাসেই হয়। এই যেমন ধরো… কোনোটা ছোট, কোনোটা মাঝারি, কোনোটা বড়। আবার ধরো, কোনোটা সহ্য করা যায়, কোনোটা যায় না, এক কথায় বিভৎস। কোনোটা আর কোনো শব্দ বা বিশেষণেই বিশেষায়িত করা যায় না!

চোখ কুঁচকে, হা করে ইয়াকুব পুরো গজার মাছের মতো করে এক দৃশ্যে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। ততক্ষণে তার বেশ ঘোর ঘোর ভাবটা কি কেটে গেলো? তার চাহনি দেখে মনে হচ্ছে আমি তার রুটিন খাদ্যচক্রের তালিকায় পুটি মাছের বদলে ভুল করে শিং মাছ ঢুকে পরেছি। খেতে পারছে না, আবার ছাড়তেও পারছে না! কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে।

হুউউশ… তুমি গ্রেট চ্যাপলিনের বিগ ফ্যান বুঝেছি আমি। চ্যাপলিন আমিও কমবেশ দেখি। কিন্তু তুমি দেখছি হে, আমাকে তোমার টার্গেট অডিয়েন্স ভেবে প্র‍্যাকটিস চালিয়ে নিচ্ছো, ব্যাপার কি? হে হে হে… একি রসিকতা, হে বাংলাদেশি…!

বললাম, না সত্যি। যে দেশে ক্ষয়িষ্ণু, সংখ্যায় লঘু ও ভিন্নমতালম্বীদের, ব্যক্তি কিংবা সম্প্রদায়দের প্রকাশ্যে, যেকোন উসিলায় ঘোষণা দিয়ে হাজারে হাজার মুমিন-মুসলমান দল বেধে, মিছিল করে গ্রামকে গ্রাম, জেলা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিতে পারে তাকে কি বলবে, শুনি?

সোল্লাসে মূর্তি ভাংচুর করে, কুপিয়ে কুপিয়ে নাস্তিক-ভিন্নমতালম্বী বা ভিন্ন ধর্মের লোকেদের মগজ-রক্ত রাস্তায় নিমিষেই মিশিয়ে একাকার করে দিতে পারে তাকে তুমি কি বলতে পারো?

যে দেশে সরকার আছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আছে সে দেশে দিনেরাতে হরদম বৃদ্ধা-কন্যা-জায়া-জননী যে কারও হাতে ধর্ষিত হতে পারে! প্রকাশ্যে ধরে নিয়ে তরতাজা প্রাণকে নিমিষেই গুম-খুন করে দিতে পারে তাকে কি হ্যালোউইন উদ্যাপন বলে না, ইয়াকুব?

এবার দেখি ইয়াকুব বলে হ্যা…! তা ঠিক! তবে এ তো সোমালিয়ায় প্রতি ঘন্টার খবর। আল শাবাব, ইসলামিক কোর্ট অব মুভমেন্ট এইসব ইসলামি জঙ্গিরা আমাদের সব তছনছ করে দিচ্ছে। আমরা শেষ… তার কথা শেষ হওয়ার আগে ও এই উথলে উঠা আবেগ থাকতে থাকতেই বলা নিরাপদ মনে করে বললাম… শোনো ইয়াকুব, সোমালিয়া আর বাংলাদেশ এক না। আমাদের সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতিক্ষা, ইতিহাস ঠিক সোমালিয়ার সাথে যায়না, আবার সোমালিয়ারটা আমাদের সাথে যায়না, না? সেসব না হয় অন্যদিনের জন্য তোলা থাক। সে আরেকদিন সময় করে না হয় সবিস্তারে আলাপ করা যাবে। আর হ্যা, হ্যালোউইন নিয়ে বলছিলাম… তো, বাস্তবতা বলো আর নির্মমতাই বলো আজকের পৃথিবীতে মুসলমানদের মতো করে কেউই ভয়াবহ, বিভৎসভাবে হ্যালোউইন উদযাপন করে কি না সন্দেহ আছে। আইএস, তালিবান বোকো হারাম, আলশাবাব দেখো এদের কাজ। আর তুমি মানো আর নাই মানো এইসবই মুসলমানরা মনেপ্রাণে জানে মানে ও বিশ্বাস করে। ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক ও ঐশী গ্রন্থ কুরানের পাতায় পাতায় এসবেরই নজির আছে। সুতরাং পৃথিবীর সব মুসলমানই মুখে বলে এ মানুষে মানুষে বর্বরতা ঠিক না, ইসলাম সমর্থন করে না। কিন্তু কুরান-সুন্নাহ মতে সে জানে, মানে ও অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করে তার ধর্ম ইসলাম, কুরান-হাদিসই ঠিক! পৃথিবীর জন্য ইসলাম এক আদি ধ্বনন্তরী দাওয়াই!

বেশ ঠাণ্ডা পরেছে। রাতও বাড়ছে, হালকা কুয়াশা ও ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি পড়তেছে। ফেরা দরকার। ইয়াকুবের সাথে এরপর আর কথা বাড়ানো ঠিক নয়। তার ঘোর আস্তে আস্তে কাটতেছে, রাতেরও ঘোর লেগেছে। ইয়াকুবেরও নিশ্চয় আমার মতো একটু একটু ক্ষিধে লাগছে। এই রাগ-ভাবের মধ্যেই কেটে পরা যাক। তো আজ উঠতে হবে ইয়াকুব… স্যরি, আমি এখন বাসায় গিয়ে রাঁধতে হবে। খেতে হবে। আর তাকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া মানে রিস্ক আছে, থেকে যায়…! অগত্য নিরাপদ দুরত্ব থেকে গলার স্বর খানিকটা হালকা উঁচু স্কেলে বলি…

‘হ্যাপি হ্যালোউইন, ইয়াকুব!’

তার প্রতি উত্তর না শুনেই হাটি, হাটতে হবে…।

‘হ্যালোউইন’ অন্য চোখে…
‘রোমান ভোজোৎসব অথবা মৃতদের উৎসব’!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৭ thoughts on ““হ্যাপি হ্যালোউইন, ইয়াকুব”!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

54 + = 62