একটু খানি খালেদ…

“আমি তাদের বলছিলাম ঢাকার আশে পাশে বোমা ফাটায়ে আসতে, তারা ইন্টারকন্টিনেন্টালের ভিতরেই ফাটায়ে আসছে। দিজ আর অল ক্র্যাক পিপল” কথাটা বলেছিলেন গেরিলাযুদ্ধের ইতিহাস বদলে দেওয়া ফিল্ড কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ, সেক্টর কমান্ডার, সেক্টর টু এন্ড কে ফোর্স। প্রোফাইল এ তার ছবি দেয়ার পর কয়েকজন জানতে চাইলো ,ইনি আসলে কে? আমার কাছে এটা মোটেও অবাক হওয়ার মত না।বরং স্বাভাবিক ব্যাপারই। আমাদের জন্য এটা বিশাল ব্যর্থতা যে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে আমাদের জানার পরিধি যেমন কম তেমনি আগ্রহ ও কম।কারন এই বিষয়ে কোন চাকুরী তে প্রশ্ন করবে না।ব্যাবসা তেও লাগে না। মুক্তিযুদ্ধের সাথে জড়িত থাকা ব্যক্তিদের ই বা আমরা কয় জন চিনি? বঙ্গবন্ধুর নাম টা জানি।নজরুল ইসলাম,তাজঊদ্দীন আহমেদ আর এম মনসুর আলি। পাশাপাশি হয়তো কাদের সিদ্দিকী। আর সামরিক বাহিনী থেকে যারা দেশের টানে যুদ্ধ করেছেন তাদের মধ্যে সাত বীরশ্রেষ্ট এর নাম কিছু মানুষ নিমিষে বলে দিতে পারবেন।কেউ কেউ আবার সালাম, রফিক অথবা বরকত এর সাথে গুলিয়ে ফেলবেন। মুক্তিযুদ্ধের সাথে অংশগ্রহনের ব্যাপারে সন্দেহ থাকার পর ও জিয়ার নাম আসে। তারপর এম এ জি ওসমানীর নাম টা জানা।তারপর? তারপরে যে নাম গুলো বলা দরকার তা যে অধিকাংশই জানে তা এক রকম নিশ্চিত। বলতে চাই মেজর জেনারেল খালেদ মোশারফ,লেফটেনেন্ট কর্নেল আবু তাহের,মেজর জেনারেল মঞ্জুর,কর্নেল এটিএম হায়দার,মেজর রফিক,লেফটেনেন্ট জেনারেল শফিউল্লাহ এবং আরোও অনেকে।কিন্তু তাদের নাম গুলো কোথায়?না পাঠ্য বইয়ে আছে না আছে ক্লাসের লেকচার এ।

এরা অনেকের কাছেই অজানা।এদের কারো নাম পরবর্তীতে ক্ষমতার রাজনিতী তে কলুষিত হয়েছে।কেউ বা হারিয়েই গিয়েছেন।নাম ই আমরা ঠিকঠাক শুনিনি আগ্রহ প্রকাশ অনেক দূরের ই ব্যাপার। যারা ব্যক্তিগত আগ্রহ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পড়াশুনা করেন তারা জানেন নাম গুলোর মাহাত্ম।নামগুলোর পাশে লিখা বিরত্ব।ক্লাইমেক্স।(জিয়া সাহেব ব্যতীত)

বলি একটু বীর সেনানী খালেদ মোশারফ এর কথা।মার্চের ১৯ তারিখে ফোর্থ বেঙ্গলের হেডকোয়াটার হঠাৎ ঢাকা থেকে সরায়ে কুমিল্লায় নিয়ে গেল পাকিস্তানীরা, লক্ষ্য ঢাকায় যেন অপারেশন সার্চলাইটের সময় বিদ্রোহের মুখোমুখি হতে না হয়। খালেদকে পাকিস্তানীরা বিশ্বাস করত না, তারা জানতো, খালেদ জিয়া না, খালেদ বিদ্রোহ করতে পারে। তাই মার্চের ২৪ তারিখ কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে যোগদানের সাথে সাথেই খালেদকে ট্রুপস নিয়ে জরুরিভিত্তিতে সিলেট রওনা হতে বললো ফোর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডার কর্নেল খিজির হায়াত খান।

অনেকভাবে চেষ্টা করেও যখন এড়ানো গেল না এই অর্ডার, তখন মনে একরাশ সন্দেহ আর দুশ্চিন্তা নিয়ে সন্ধ্যায় রওনা হলেন খালেদ। তবে যাবার আগে মেজর শাফায়াত জামিলসহ বাকি অফিসারদের ঠিকই নির্দেশ দিয়ে গেলেন খালেদ। একটু এদিক সেদিক দেখলেই রিভোল্ট করতে হবে, যেভাবেই হোক তার সাথে যোগাযোগ করতে হবে।

সিলেটের পথে শমসেরনগরের কাছাকাছি গিয়েই অল্পের জন্য পাকিস্তানীদের অ্যাম্বুশ থেকে বেঁচে গেলেন খালেদ। পাকিস্তানীরা তাকে খুব ভালোভাবেই চিনতে পেরেছিল, আলাদা করে মেরে ফেলতে চেয়েছিল। অসম্ভব প্রত্যুতপন্নমতিতা আর অকুতোভয় সাহসে সেই ফাঁদ এড়িয়ে খালেদ ফিরে এলেন কুমিল্লায়, ততক্ষণে কর্নেল খিজিরসহ পাকিস্তানদের ডিজআর্ম করে সারেন্ডার করিয়ে ফোর্থ বেঙ্গল রিভল্ট করেছে মেজর শাফায়াতের নেতৃত্বে। দ্বিতীয় কোন চিন্তা না করে ফোর্থ বেঙ্গলের বঙ্গশার্দুলদের নিয়ে মার্চ করলেন খালেদ, অথচ ঢাকায় যে তার বউ-বাচ্চা আছে, তাদের মেরে ফেলতে পারে, একটাবার ভেবেও দেখলেন না।

ঢাকা থেকে স্রোতের মত ট্রেনিং নিতে আসা ১৮-২০ বছর বয়সের হাজার হাজার পোলাপানরে সে আর ক্যাপ্টেন হায়দার মিলে গেরিলাযুদ্ধের ট্রেনিং দিছিল, বারুদ বানায়ে দিছিল একেবারে। একটুও ভয়-ডর ছিল না ওদের, জানের মায়া ছিল না, গ্রেনেড থ্রো করতো খেলার ছলে, চোখের পলকে এসএমজি বাইর কইরা ট্রেইনড পাকি আর্মিরে ব্রাশফায়ার করত পোলাগুলা, হিট অ্যান্ড রান শেষে মিনিটের মধ্যে আবার সব ভদ্র।

২৩শে অক্টোবর কুমিল্লা অঞ্চলে প্রচণ্ড যুদ্ধ চলতেছে, এক হাতে স্টেন, আরেক হাতে সিগারেট, ব্যাটলফিল্ডে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতেছে , এমন সময় হঠাৎ ঠিক সামনে এসে পড়লো পাকিস্তানী মর্টার শেল।অসংখ্য স্পিন্টার ঢুকল মাথায়, কপালের উপরে সামনের অংশ স্রেফ খুলে হাঁ হয়ে গেল, চুইয়ে চুইয়ে গ্রে ম্যাটার পড়তেছে, সহযোদ্ধারা কোনরকমে সেগুলো ভেতরে ঢুকায়ে একটা গামছা দিয়ে মাথাটা বেধে ছুটলো কাঁধে করে, রক্তে ভেসে যাইতেছে পুরো শরীর। তৎক্ষণাৎ হেলিকপ্টারে হাসপাতালে নেওয়া হইল।

ভারতের একটার পর একটা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হইল, কোমায় চলে যাওয়া এই ভিআইপি পেশেন্টের দায়িত্ব কেউ নিতে চায় না। এই অবস্থায় যে কেউ বাঁচতে পারে না, বাঁচা সম্ভব না। অবশেষে ভারতীয় সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপে খালেদের চিকিৎসা হলো, যমে-মানুষে এক অসম লড়াই চললো অনেকদিন। মেডিকেল সায়েন্সের আশ্চর্যতম মিরাকেল হয়ে বেঁচে উঠলো খালেদ, যদিও সেই তীক্ষ্ণ ধারালো খালেদকে আর ফিরে পাওয়া গেল না, মাথার ভিতর তখন যে বয়ে বেড়াচ্ছে পাকি মর্টারের স্পিন্টার।

মেজর খালেদের ডান হাত ছিল ক্যাপ্টেন হায়দার নামে ঠাণ্ডা মাথার এক অমিত বীর। খালেদ ছিল অমিত ব্যক্তিত্বের, লিড দিত সবার সামনে থেকে, আর হায়দার আগলাইয়া রাখতো সব সোলজারগুলারে, একেবারে নিজের সন্তানের মত… বারুদের টুকরা ছিল একেকটা, মাই বয়েজ বইলা ডাকতো সোলজারগুলারে হায়দার। খালেদ এই দলটার নাম দিছিল ক্র্যাক প্লাটুন।
পয়লা নভেম্বর ছিল এই বীরের ৭৯তম জন্মবার্ষিকী।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

69 − = 64