মুসলমানরা কেন মূর্তি ভাঙে

মহান মুক্তিযোদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে এখন বলতে গেলে মহা সমারোহেই চলছে মূর্তি ভাঙা ও সাম্প্রদায়িক হামলার উৎসব। এই বিষয়টা এদেশে এখন যেন একটা স্বাভাবিক ব্যপার হয়ে গেছে। ৪৫ থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত হামলার এই উৎসব থেমে নেই। সাম্প্রতিক সময়ে রামুর বৌদ্ধদের উপর হামলা থেকে শুরু করে ব্রাহ্মনবাড়িয়ায় হিন্দু পল্লীতে হামলাগুলো বহুল আলোচিত হলেও ছোটখাট হামলা বিরতিহীনভাবে চলছেই। আজ এক হিন্দু পরিবারকে বাস্তুভিটা থেকে উচ্ছেদ করা হলো, তো কাল আরেক মন্দিরের প্রতিমা তথা মূর্তি ভাঙা, পরশু কোন বৌদ্ধ পরিবারকে হেনস্থা। এই ভাঙাভাঙিটা এখন নিত্যদিনের চিত্র। এই পোস্ট লিখতে লিখতে যশোর, বগুরা এবং ফরিদপুরে মন্দিরে আক্রমণ ও প্রতিমা ভাঙার খবরও নিউজ ফিডে চলে এসেছে।

এই হামলা, আক্রমণ রাষ্ট ধর্মের অনুসারী মুসলমানদের এক ধরণের ধর্মীয় অধিকারে গিয়ে ঠেকেছে। হ্যাঁ, মুসলমানদের অধিকার বলতে হচ্ছে, কারণ হামলাকারী মুসলমান ছাড়া অন্যান্য মুসলমান নামধারীরাদেরকে এসবের বিরুদ্ধে বলা দূরে থাক, ইনিয়ে বিনিয়ে ধর্মীয় অনুভূতির ধোয়া তুলে প্রকারান্তরে হামলাগুলোকে বৈধতাই দিতেই ব্যস্ত দেখা যায়। প্রানী সম্পদ মন্ত্রী সায়েদুল হকের বক্তব্য থেকেই পরিষ্কার হয়ে যায়, সারাদেশের মুসলমানদের মানসিকতার পরিচয়। এখন পর্যন্ত বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবী দূরে থাক, সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে এ বক্তব্যের নিন্দা জানানোর পর্যন্ত তাগিদ নেই। সত্যি বলতে কী, মন্ত্রীর মুখ দিয়ে হিন্দুদের প্রতি মুসলমানদের মনোভাবটার একটা স্পষ্ট চিত্র ফুটে উঠেছে। অবশ্য মডারেট অর্থাৎ আধুনিক জাতে ওঠা মুসলমানদের একটা অংশ মনে এসব হামলা যারা করে তারা প্রকৃত মুসলমান নয়। ইসলাম বিধর্মীদেরকে ধর্মের কারণে হামলা করা, আক্রমণ করাটা সমর্থন করে না। সত্যি কি তাই! কোরান হাদীস কী বলে জেনে নেয়াটা দরকার।

আব্রাহামীয় ধর্মের গোড়াপত্তন যার হাতে, অর্থাৎ ইব্রাহীমই ইসলামের ইতিহাসে প্রথম মূর্তি ভাঙার সূত্রপাত করে বলে কোরানে উল্লেখ পাওয়া যায়। একবার মূর্তিপূজারীরা উতসব পালনের জন্য শহরের বাইরে চলে যাওয়ার পর ইব্রাহীম পূজামণ্ডপে চলে যায় এবং একটি ছাড়া অন্য সব মূর্তি ভেঙে ফেলে। এরপর কুড়ালটি বড় মূর্তির গলায় ঝুলিয়ে দিয়ে চলে আসে। শহরের বাইরে উতসব পালনের পর মূর্তিপূজারীরা যখন নিজেদের শহরে ফিরে এসে পূজামণ্ডপের মূর্তিগুলোর ধ্বংসাবশেষ মাটিতে পড়ে থাকতে দেখলেন তখন তারা ইব্রাহীম কে আটক ও শাস্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। মূর্তিপূজারীরা যাতে তাদের বিশ্বাসের অসারতা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে বাধ্য হয়, সে লক্ষ্যে ইব্রাহিম কৌশল অবলম্বন করে। সে মূর্তিপূজারীদের প্রশ্ন করে- তোমরা কেন অন্য অপরাধীর সন্ধান করছ? এ কাজতো নিশ্চয়ই ওই বড় মূর্তিটি করেছে, যাতে তার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীর অস্তিত্ব না থাকে এবং সবাই যাতে কেবল তারই পূজা করে। যদি আমার কথা বিশ্বাস না হয়, তাহলে এ চূর্ণ-বিচূর্ণ মূর্তিগুলোর সঙ্গে কথা বলে দেখ, তারা কী বলে?

  • “একথা শুনে তারা নিজেদের বিবেকের দিকে ফিরল এবং পরস্পরকে বলতে লাগলো, সত্যিই তোমরা নিজেরাই জালেম।” (২১:৬৪)
  • “অতঃপর তারা মস্তক নত করে বলল, তুমি তো জান যে,এরা কথা বলে না।” (২১:৬৫)
  • “তিনি বললেন: তোমরা কি আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুর এবাদত কর,যা তোমাদের কোন উপকারও করতে পারে না এবং ক্ষতিও করতে পারে না?” (২১:৬৬)
  • “ধিক তোমাদেরকে এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে যেসব উপাস্যের তোমরা পূজা করছো তাদেরকে। তোমাদের কেন চিন্তা করো না?” (২১:৬৭)

ইব্রাহীমের মূর্তিভাঙার ইতিহাস সমর্থনে এই আয়াতগুলোর অবতারনা হয় কোরানের সূরা আম্বিয়ায়। ইব্রাহীমের মূর্তিভাঙার পুরো কাহিনী পাওয়া যাবে সূরা মরিয়ম (১৯:৪১-৪৫), সূরা শো‘আরা (২৬/৬৯-১০৪), আম্বিয়া (২১/৫২-৫৭) আয়াতগুলোতে। সন্দেহ থাকলে চোখ বুলিয়ে আসতে পারেন। মক্কা বিজয়ের সময় মোহাম্মদ নিজে ক্বাবা থেকে ৩৬০টি মূর্তি ভেঙে ফেলে দেয়। যে ধর্মের গোড়াপত্তনকারীরা নিজেই মূর্তি ভাঙে সে ধর্মের অনুসারীরা মূর্তি ভাঙাকে তাদের কর্তব্য মনে করবে এটাই তো স্বাভাবিক। না হলে প্রকৃত অনুসারী হয় কীভাবে!

কোরানে ভাঙাভাঙির আয়াত থেকে আসুন হাদীসের দিকে যাই।

  • ‘জাবের (রাঃ) বলেন, মক্কা বিজয়ের সময় যখন আমরা নিকটবর্তী ‘বাত্বহা’ উপত্যকায় ছিলাম, তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ)-কে নির্দেশ দেন যেন কা‘বা গৃহের সকল ছবি (মূর্তি) নিশ্চিহ্ন করে দেন। অতঃপর উক্ত ছবি সমূহ নিশ্চিহ্ন না হওয়া পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কা‘বা গৃহে প্রবেশ করলেন না’। (ছহীহ আবুদাঊদ হা/৩৫০২ ‘ছবিসমূহ’ অনুচ্ছেদ)।
  • ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিজ হাতের ধনুক দ্বারা প্রথমে কা‘বা গৃহের বাইরে রক্ষিত ৩৬০টি মূর্তিকে আঘাত করে ফেলে দেন। অতঃপর কা‘বা গৃহে প্রবেশ করেন। সেখানে তিনি ইবরাহীম ও ইসমাঈলের প্রতিকৃতি দেখতে পান। যাদের হাতে ভাগ্য গণনার তীর ছিল। এটা দেখে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আল্লাহ ওদের ধ্বংস করুন! আল্লাহর কসম! এই নবীদ্বয় কখনোই তীর দ্বারা ভাগ্য গণনা করতেন না’। অতঃপর তিনি সেখানে একটি কবুতরীর কাঠের প্রতিকৃতি দেখেন এবং নিজ হাতে তা ভেঙ্গে ফেলেন। অতঃপর হুকুম দেন সকল ছবি-মূর্তি নিশ্চিহ্ন করার জন্য’। (ছফিউর রহমান মুবারকপুরী, আর-রাহীকুল মাখতূম পৃঃ ৪০৪)

উপরের আয়াত ও হাদীসগুলো থেকে এ কথা সহজেই বলা যায়, যারা মূর্তি ভাঙার উৎসবে অংশ নেয়, তারা প্রকৃত মুসলমান এবং সঠিকভাবে ইসলামের পথে আছে। আর যদি কারও মনে সন্দেহ থাকে যে ইসলাম মূর্তি ভাঙাকে সমর্থন করে না, যারা মূর্তি ভাঙে তারা প্রকৃত মুসলমান না, তাহলে সেই হল প্রকৃত মডারেট কিংবা ভণ্ড মুসলমান। তবে, এটা সত্য যে, যারা মূর্তি ভাঙার উৎসবে নীরব আছেন, তারাও অন্তরে এক ধরণের পুলক অনুভব করেন; মালাউনদের একটা শিক্ষা হয়েছে, এরকম শিক্ষা নিয়মিতভাবেই দরকার।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “মুসলমানরা কেন মূর্তি ভাঙে

  1. **ভাই খাসলাত বদলান…আপনার
    **ভাই খাসলাত বদলান…আপনার কথাবার্তাগুলো উসকানিমূলক। মুসলমানদের খোঁচা দিয়ে আপনি সহানভুতি পাবেন না বরং উল্টো হবে। সব মুসলমানরা যদি মূর্তি ভাঙাকে সমর্থন করতো তাহলে আপনারা এই দেশে এতদিন থাকতে পারতেন না। আপনাদের মতন লোকেরাই অন্যের ধর্মকে আঘাত করে এই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করে। আপনারা চান এদেশে শুধু আপনারই থাকবেন কোন দাড়ি -টুপিওালারা থাকবেনা । সেটা ইনশাআল্লা কখনোই হবেনা । এদেশ ভাল না লাগলে থাকেন কেন?

  2. মুসলমানেরা মূর্তি ভাঙ্গে যাতে
    মুসলমানেরা মূর্তি ভাঙ্গে যাতে হিন্দুদের বিলাপ শুনে সারা বিশ্বের মানবতাবাদীরা একজোট হয়ে বাংলাদেশের মুসলমানদের পেছনে আইক্কাওয়ালা বাঁশ ভরে দিতে পারে। সিরিয়া কাশ্মীর আরাকানের অসহায় মুসলমানদের কান্না ওদের কানে যায়না। কিন্তু আওয়ামীলীগের দুপক্ষের সংঘর্ষের বলি হওয়া কয়েকটা মাটির মূর্তির ছিন্ন ভিন্ন চেহারা ওদের মানবতা বোধ চাগিয়ে তোলে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

8 + = 12