১৫ই আগস্ট, ১৯৭৫ পরবর্তী বাংলাদেশঃ মোশতাক সরকার, খালেদ মোশারফের অভ্যুত্থান, জেলহত্যা, ৭ই নভেম্বরের বিপ্লব (নির্বাচিত অংশ)

১৯৭৬ সালের ২১শে জুলাই কর্নেল তাহেরের ফাঁসি হয়। অন্যান্য নেতাদের বিভিন্ন মেয়াদের জেল হয়। ৭ নভেম্বরের বিপ্লবের অন্যতম প্রধান কারিগর ছিলেন তাহের। আর তার ফলে ক্ষমতায় বসলেন জিয়া।

ক্ষমতা, আদর্শগত দ্বন্দ এবং মানুষের নানা আপাত অকারণ কার্যকলাপের ফল অনেক অদ্ভুত হয়। এই দেশও তার বাইরে থাকেনি। জিয়া তাহেরকে প্রহসনের বিচারের মাধমে হত্যা করবেন, তাহের নিজেও মেঃ জেঃ খালেদ মোশারফ সহ অনেক মুক্তিযোদ্ধা অফিসারের মৃত্যুর কারণ ছিলেন। আবার তাহেরের বিপ্লব সফল হলে বঙ্গবন্ধু রক্ষা পেতেন নাকি তাও প্রশ্ন করবার বিষয়। আমি জানি না কেন এমন হয়, কিন্তু আমাদের দেশের সূর্যসন্তানেরাই আমাদের দেশের কলংকিত ইতিহাসের অংশ, খল চরিত্র।

১৫ আগস্ট, ১৯৭৫
ইসলামাবাদ, পাকিস্তান

শেখ মুজিব হত্যার অল্প কিছু সময় পরেই খন্দকার মোশতাক নিজেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসাবে ঘোষনা করলেন। আর এ সংবাদ পাকিস্তানে পৌছাতে না পৌছাতেই পাকিস্থানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভূট্টো ভ্রাতৃপ্রতীম খন্দকার মোশতাক আহমেদের সরকারকে স্বীকৃতি দিলেন। একই সঙ্গে তিনি ইসলামি সম্মেলন সংস্থার সব সদস্য এবং তৃতীয় বিশ্বের সব দেশের প্রতি নতুন সরকারকে স্বীকৃতি দেবার আহ্বান জানালেন। সেই সাথে তিনি বাংলাদেশী ভাইদের জন্য ৫০ হাজার টন চাল ও ১৫ মিলিয়ন গজ কাপড় পাঠানোরও নির্দেশ দিলেন।

এর মাত্র দুইমাস আগে কাকুলে পাকিস্থান মিলিটারী একাডেমীতে নতুন কমিশনপ্রাপ্ত সেনা অফিসারদের পাসিং আউট প্যারেডের বক্তৃতায় উনি বলেছিলেন,

– “এ অঞ্চলে শিগগিরই কিছু পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে”।

স্টানলি ওলপার্ট তার লেখা জুলফি ভুট্টো অব পাকিস্থান গ্রন্থে লিখেছেন,

– “দুই বছর যাবৎ ভুট্টো কয়েকটি মুজিব বিরোধী দলকে তার গোপন স্বেচ্ছাধীন তহবিল থেকে অর্থ সাহায্য অব্যাহত রাখেন এবং এর বিনিময়ে ফললাভ করেছিলেন।”

২০০০ সালে স্টানলি ওলপার্টের ঢাকা সফরের সময় লন্ডন প্রবাসী সাংবাদিক আব্দুল মতিন তাকে জিজ্ঞেস করেন ফললাভ বলতে আপনি কি বুঝিয়েছেন? মুজিব হত্যায় পাকিস্তান জড়িত ছিল? ওলপার্ট সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়েছিলেন,

– “হ্যা, আপনি তা বলতে পারেন।”

জুলফিকার আলী ভুট্টো ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারী পাকিস্থান কারাগার থেকে মুক্তিলাভের আগমূহুর্তে পাকিস্থানের সাথে যে কোনরকমই হোক, একটা যোগসূত্র রাখার অনুরোধ করেছিলেন বঙ্গবন্ধুকে। অবে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পরপরই বঙ্গবন্ধু জনতার সমাবেশে বললেন,

– “তোমরা সুখে থাক। পাকিস্থানের সাথে আর কোন রকম সম্পর্ক থাকতে পারে না।”

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষনার পরেও পাকিস্থান নিজেদের সংবিধানে ‘পুর্ব পাকিস্থান’ শব্দটি বহাল রাখে। ১৯৭৩ সালে ভুট্টো যখন নতুন সংবিধান প্রনয়ন করেন, তার তিন নং অনুচ্ছেদে বলা হয়,

– “‘পূর্ব পাকিস্থান’ প্রদেশের জনগন যখন বিদেশী আগ্রাসন থেকে মুক্ত হতে পারবে এবং তার প্রভাব প্রতিপত্তির বাইরে আসতে পারবে, তখন সেটি ফেডারেশনের প্রতিনিধিত্ব করবে।“

এ ব্যাপারে ভুট্টো সরকার পুর্ব পাকিস্তান বিষয়ক একটি মন্ত্রনালয়ও চালু করেন। এই মন্ত্রনালয়ের কাজ ছিলো বাংলাদেশে পাকিস্তানপন্থী গ্রুপগুলোকে অর্থ ও অস্ত্র সহায়তা দেয়া এবং একসময় আবার বাংলাদেশকে পাকিস্তান ফেডারেশনে নিয়ে আসা। স্টানলি ওলপার্ট’র লেখা ‘জুলফি ভুট্টো অব পাকিস্থান’ গ্রন্থে উল্ল্যেখ আছে যে, বাংলাদেশ মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী কমিউনিষ্ট পার্টির একাংশের নেতা আব্দুল হক ১৯৭৪ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্থানের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলীকে একটি চিঠি পাঠান যাতে তিনি লেখেন,

“আমার প্রিয় প্রধানমন্ত্রী ভুট্টো,
পুতুল মুজিব চক্র এখন জনগন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। এই চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্যে অর্থ, অস্ত্র ও ওয়্যারলেস সরঞ্জাম প্রদানের আবেদন জানাচ্ছি।”

১৯৭৫ সালের ১৬ই জানুয়ারী “টপ সিক্রেট/মোস্ট ইমিডিয়েট” প্রায়োরিটি এবং ক্লাসিফিকেশনের চিঠিটি ভুট্টোর হাতে পৌছালো। ভুট্টো চিঠিটাকে “ইম্পর্টেন্ট” হিসেবে মন্তব্যে উল্লেখ করেন এই ‘সৎ’ লোকটিকে প্রয়োজনীয় সাহায্য দেওয়ার অনুমোদন প্রদান করেন। এই আব্দুল হক সম্পর্কে তিনি মন্তব্যে উল্লেখ করেন যে তিনি পুর্ব পাকিস্তানকে আবার পাকিস্তানের অংশ করবার কাজের জন্য “ফেয়ারলী এফেক্টিভ”। এই চিঠিটি জুলফিকার আলী ভুট্টোর কাছে পৌছে দেন মাহমুদ আলী নামের এক বাঙ্গালী। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মাহমুদ আলী পাকিস্থানের পক্ষ নেন এবং এর পুরস্কার হিসাবে ভুট্টো তাকে পূর্ব পাকিস্থান সংক্রান্ত বিশেষ উপদেষ্টার পদে বসান।

ভুট্টোর আরেক বাঙ্গালী অনুসারী ছিলেন আব্দুল মালেক। বাংলাদেশ বিরোধী তত্পরতা চালানোর উদ্দেশ্যে এই ব্যক্তি সৌদী আরবে যান। সেখানে ভুট্টোও তার দু হিসেবে মাওলানা নিয়াজীকে সেখানে পাঠান। উনি সৌদী আরব এবং আরব আমিরাত গিয়ে এ ব্যাপারে আলোচনা করেন। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক, অস্ত্র এবং আর্থিক সাহায্য চাওয়া হয় যাতে শেখ মুজিব সরকারকে সংবিধানের পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ইসলামিক রিপাবলিক হিসেবে ঘোষনা করতে বাধ্য করা যায়, যে রাস্ট্রটি ইসলামিক ভাবধারার নেতাদের দিয়ে গঠিত উপদেষ্টা পরিষদের সুপারিশক্রমে পরিচালিত হবে পাকিস্তানের মতই। আব্দুল মালেক সেখান থেকে ১৯৭৫ সালের ২২ শে জানুয়ারী ভুট্টোকে চিঠি লিখেন ‘আমার প্রিয় নেতা’ সম্বোধন করে, যাতে লেখা ছিলো,

“বাংলাদেশের ৬৫ মিলিয়ন মুসলমান তাদের মুক্তির জন্যে আপনার দিকনির্দেশনা ও নেতৃত্ব লাভের জন্য গভীর উত্কন্ঠার সাথে অপেক্ষা করছে।”

স্টানলী ওলপার্ট তার বইয়ে আরও লিখেছেন যে, ১৫ই আগস্টের তিন সপ্তাহ পর ভুট্টোর বিশেষ উপদেষ্টা মাহমুদ আলী সবচেয়ে ভালো উপায়ে বাংলাদেশকে কিভাবে পাকিস্তানের সাথে পুনঃরায় একীভুত করা যায় এ ব্যাপারে আলোচনার জন্য লন্ডন পাঠান। তার আশা ছিলো যে উনি নতুন সরকারের পক্ষ থেকে কনফেডারেশন গঠনের ব্যাপারে সম্মতি পাবেন। তবে নতুন সেনাপ্রধান জেঃ জিয়া বাংলাদেশের স্বার্বভৌমত্বের বিরোধী এ ধরনের কোন কোন প্রচেষ্টার ব্যাপারে কিছু শুনতেই চাননি। (পৃষ্ঠা ২৭৬)

১৫ আগস্ট, ১৯৭৫
ঢাকা, বাংলাদেশ

সবাই যখন কিলিং এবং অন্যান্য মিশনে চলে গিয়েছিলো, মেজর রশীদ সেই সময়ে প্রথমেই স্কোঃ লীঃ লিয়াকতের বাসায় চলে গেলেন তাকে তার মিগ নিয়ে প্রস্তুত থাকতে। ঘুম থেকে তুলে তাকে সব ঘটনা বলতে কিছু সময় লাগলো, তবে স্কোঃ লীঃ লিয়াকত বিমান বাহিনী প্রধানের নির্দেশ ছাড়া কিছু করতে অস্বীকৃতি জানালেন। মেজর রশীদ সেনাবাহিনীর চেইন অফ কমান্ডের সাথে বিমান বাহিনীর তুলনা করে গুলিয়ে ফেলেছিলেন সম্ভবত। একজন অপস কন্ট্রোল অফিসারের পক্ষে সরাসরি বিমান উড্ডয়নের নির্দেশ দেয়া যায়না। বিমানবাহিনীতে এ ব্যাপারে নির্দিষ্ট কর্মপদ্ধতি আছে যার বাইরে একার সিদ্ধান্তে কিছু করা সম্ভব না। মেজর রশীদ নিরাশ হয়ে ৪৬ ব্রিগেডের ব্রিগেড মেজর, মেজর হাফিজের কাছে ছুটলেন। মেজর রশীদ চাচ্ছিলেন মেজর হাফিজ তার ১ম বেঙ্গল নিয়ে উপস্থিত থাকবেন, কারণ মেজর শাহজাহানের ১৬তম বেঙ্গল জয়দেবপুর থেকে আসেনি। তবে মেজর হাফিজও ব্রিগেড কমান্ডার কিংবা সেনাপ্রধানের নির্দেশ ছাড়া সেনা মোতায়েনে অপারগতা জানান। এ ব্যাপারে কিছু কথাকাটাকাটির পর টেলিফোনে কর্নেল শাফাত জামিলকে না পেয়ে মেজর রশীদ তার বাসার দিকে রওনা দিলেন।

যখন মেজর রশীদ ৪৬ ব্রিগেডের কম্পাউন্ডের কাছ দিয়ে কর্নেল শাফাত জামিলের সাক্ষাত লাভের জন্য যাচ্ছিলেন, তখন ধানমন্ডীর দিক থেকে কামানের গোলার শব্দ শুনতে পেলেন। উনি কর্নেল শাফাত জামিলের সাথে সাক্ষাতের পর তাকে বললেন,

– “স্যার, আমরা শেখ মুজিবকে উৎখাতের জন্য একশনে গেছি।“

কর্নেল শাফাত জামিল বিস্মিত হলেন এবং প্রচন্ড রেগে গেলেন। উনিও দূর থেকে কামানের গোলার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলেন। প্রচন্ড কথা কাটাকাটি হয় এ নিয়ে। আর এই মুহুর্তেই সেনাপ্রধান জেঃ শফিউল্লাহ টেলিফোন করে কর্নেল জামিলকে বললেন,

– “বঙ্গবন্ধু আমাকে টেলিফোন করে জানিয়েছেন কিছু সেনা তার বাড়ি আক্রমন করেছে। তুমি তোমার ব্রিগেড নিয়ে দ্রুত উনার সাহায্যের জন্য রওনা দাও।“

তবে মেজর রশীদ কর্নেল জামিলকে বললেন,

– “স্যার, অনেক বেশি দেরী হয়ে গেছে কিছু করবার জন্য। আমরা ইতিমধ্যে আমাদের কাজ শুরু করে দিয়েছি।“

কর্নেল জামিল টেলিফোন রেখে দিলেন। উনি ভীষন রেগে আছেন, প্রচন্ড ক্ষুব্ধ। তবে সেই মুহুর্তে উনার করবার মত কিছু ছিলনা। উনি যদি এই মুহুর্তে সেনা প্রেরন করন তবে সেনাবাহিনীর নিজেদের মধ্যেই সংঘর্ষ শুরু হবে। উনি এখন পর্যন্ত জানেন না এই ক্যুতে সেনাবাহিনীর কতটা অংশ জড়িত আছে। মেজর রশীদকে উনি বললেন,

– “আমাকে জেঃ জিয়াউর রহমানের সাথে কথা বলতে যেতে হবে।“

মেজর রশিদ তাকে থামানোর প্রয়োজন বোধ করলেন না। নিজের জীপে উঠে উনি রওনা দিলেন ধানমন্ডির দিকে।

মেজর রশিদ চলে যাবার পর কর্নেল জামিলে আরেকবার ফোন করলেন জেঃ শফিউল্লাহ। উনি কাঁদতে কাঁদতে জানালেন যে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে। উনি সম্পুর্নরুপে ভেঙ্গে পরেছিলেন এবং ঢাকার ব্রিগেড কমান্ডার কর্নেল জামিলকে অভ্যুত্থান দমাতে কোন নির্দেশনা দেয়ার মত অবস্থায় ছিলেন না। খুব দ্রুত ইউনিফর্ম পরে নিয়ে নিয়েই কর্নেল জামিল হেটেই রওনা দিলেন জেঃ জিয়ার বাসভবনের দিকে। সেখানে গিয়ে দেখলেন জেঃ জিয়া অফিসে যাবার জন্য সেভ করছেন।

উনি জেঃ জিয়াকে মেজর রশীদের আগমনের কথা এবং জেঃ শফিউল্লাহর টেলিফোনে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার কথা তাকে জানালেন। উনি বললেন,

– “স্যার, প্রেসিডেন্টকে হত্যা করা হয়েছে। আপনার নির্দেশ কি এ ব্যাপারে।“

জেঃ জিয়া তার স্বভাবসুলভ ঠান্ডা চরিত্র বজায় রাখলেন। যদিও তিনি ইতিমধ্যে সব জেনে গিয়েছিলেন। উনি কর্নেল জামিলকে জবাব দিলেন,

– “যদি প্রেসিডেন্ট আর না থাকেন, তবে ভাইস প্রেসিডেন্ট আছেন। হেডকোয়ার্টারে যাও এবং অপেক্ষা করো।“

ইতিহাস বলে জিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ও খুবই শান্ত মেজাজে ঠান্ডা মাথায় কাজ করতেন। তবে গোলাগুলির শব্দ আর সবকিছু জানবার পরেও কোন ধরনের তাড়াহুড়া না দেখা যাবার কারণ বোধগম্য হয়না আমার। অন্তত যেই মুহুর্তে উনি জানছেন একটা অভ্যুত্থান ঘটছে, সেই মুহুর্তে সেভ করবার কিংবা অফিসে যাবার চিন্তা স্বাভাবিকভাবেই আসবার কথা না। যে কেউ সে সময় তার নিজের বিশ্বস্ত লোকদের থেকে জানবার চেস্টা করতো কি ঘটছে এবং নিজের পাশে শক্তি সঞ্চয় করবার চেস্টা করতো। খুব সম্ভবত উনি জানতেন কারা এই কাজ করেছে এবং এটাও জানতেন তাদের পক্ষ থেকে উনার প্রতি কোন হুমকী আসবে না।

১৫ আগস্ট, ১৯৭৫
ঢাকা, বাংলাদেশ

পাখিরা ঠিকমত কিচিরমিচির শুরু করেনি তখনো। ভোরবেলায় বাংলাদেশ বেতারের নিয়মিত অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগেই একটি কর্কশ কন্ঠ ইথারে ভেসে এলো,

– “আমি মেজর ডালিম বলছি, শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়েছে”।

অপ্রত্যাশিত সেই ঘোষনাকে হয়তো অনেকে দুঃস্বপ্ন ভাবছিলেন, কেউ স্বপ্ন ভাবছিলেন, হয়তো তা কাউকে তীব্র বেদনায় স্তব্ধ করে দিয়েছে, কেউ কেউ এক ধরনের আনন্দের জোয়ারেও ভেসেছে, কিন্তু তাৎক্ষনিকভাবে সবাই নিশ্চয়ই ভেবেছিলো আসলেই কি এমন কিছু ঘটতে পারে? সত্যিই কি এমন কিছু সম্ভব?

তবে ঠিক তাই ঘটে গেছে। মেজর ডালিম আরও ঘোষনা করলেন নতুন প্রেসিডেন্ট হবেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ। সেই সাথে মার্শাল ল’ জারী করা হলো এবং ২৪ ঘন্টার জন্য কার্ফ্যু ঘোষনা করা হলো সারা দেশে। এর বাইরে মেজর ডালিম আরও ঘোষনা করলেন আজ থেকে ‘গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ কিংবা ‘পিপলস রিপাবলিক অফ বাংলাদেশের’ নতুন পরিচিতি হবে ‘ইসলামিক রিপাবলিক অফ বাংলাদেশ’। মেজর ডালিম সবাইকে এই বলে সতর্ক করে দিলেন যে কেউ যদি নতুন বিপ্লবী সরকারের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেয় কিংবা কোন নির্দেশনা অমান্য করে তবে কঠিন পরিনতি ভোগ করতে হবে।

যে মুহুর্তে মেজর ডালিম এই ঘোষনা দিচ্ছিলেন, ঢাকার রাস্তায় সেনাদের আর ট্যাঙ্কের টহল শুরু হয়ে গেছে। এরই মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম সামরিক শাসনের শুরু হলো এবং এর পরবর্তী ১৬টা বছর ধরে উর্দি পরিহিত মানুষেরাই দেশ শাসন করবে।

তবে এই ঘোষনার ব্যাপারটা মেজর রশীদের পরিকল্পনার বাইরে ছিলো। উনি চাইছিলেন পরে ঘোষনা দেবেন। উনি বুঝতে পারলেন বড় একটা ভুল হয়ে গেছে। ঢাকার বাইরের সেনা ব্রিগেডগুলোর মনে প্রশ্ন জাগবে কিভাবে একজন রিটায়ার্ড অফিসার সেনা অভ্যুত্থান ঘটালো এবং সামরিক শাসন জারীর ঘোষনা দিলো। স্বভাবতই তাদের সেটা মেনে নেবার কথা না। তাই প্রথমে খন্দকার মোশতাককে বাদ দিয়ে নিজেরাই ক্ষমতা দখলের পায়তারা করলেও সেই চিন্তা বাদ দিয়ে তিনি ছুটলেন পুরান ঢাকার দিকে, আগামসি লেনে।

সকাল সাড়ে সাতটার দিকে পুরান ঢাকায় জীপ নিয়ে একটা ট্যাঙ্কের প্রহরায় খন্দকার মোশতাকের বাড়িতে পৌছে গেলেন মেজর রশীদ। এই প্রথম মনে হয় পুরান ঢাকার গলিতে ট্যাঙ্কের আগমন ঘটলো, এবং হয়তো শেষবারের মতই। (এর আগে ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম-২৪ চ্যাফি ট্যাঙ্কের সাহায্যে অভিযান চালানো হয়।) আসেপাশের বাড়ী থেকে মানুষ বিস্ময়ের সাথে এ ঘটনা দেখছিলো। তারা রেডিওতে ইতিমধ্যে মেজর ডালিমের ঘোষনা শুনেছে। তারা ট্যাঙ্ক থেকে নিরাপদ দুরত্ব বজায় রেখে উকি ঝুকি মারছিলো জানালার ফাক দিয়ে, গলির মুখ থেকে কিংবা বাড়ির ছাদ থেকে। মেজর রশীদ জীপ থেকে একটী স্টেনগান সহ লাফিয়ে নেমে দুইজন সেনা সহ খন্দকার মোশতাকের বাড়ির উপরতলায় চলে আসলেন। মোশতাক তিনতলার ব্যালকনী থেকে সবই দেখছিলেন। উনি তখনো বুঝতে পারছিলেন না উনাকে প্রেসিডেন্ট ঘোষনা করলে ট্যাঙ্ক কেন আসবে। তবে উপরে এসে মেজর রশীদের সাথেই দুই সেনা যখন তাকে স্যালুট করলো তখন উনি নিশ্চিত হলেন এরা তাকে হত্যা করতে আসেনি। মনে মনে সাহস পেলেন উনি। কন্ঠে কাঠিন্য ধরে রেখে বললেন,

– “এখানে এসেছেন কেন?”

মোশতাক আহমেদ একজন অসাধারণ অভিনেতাও ছিলেন। চাটার দলের এই গুনটা থাকা খুবই জরুরী এবং অন্যতম পুর্বশর্ত।

মেজর রশীদ তাকে জানালেন যে তারা চাইছেন উনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বায়িত্ব নেবেন আর সে কারণে বক্তব্য দেবার জন্য রেডিও ষ্টেশনে নিয়ে যেতে এসেছেন। কথাগুলো সুমধুর সঙ্গীতের মত বাজলো মোশতাক আহমেদের কানে। তবু উনি নিশ্চিত হতে বললেন,

– “আমরা কিভাবে যাবো? আপনার জীপে নাকি আমার গাড়িতে?”

মেজর রশীদ বললেন,

– “আপনি আপনার গাড়ি নিতে পারেন যদি ড্রাইভারকে বিশ্বস্ত মনে করেন।“

খন্দকার মোশতাক বললেন,

– “আমাকে একটূ সময় দিতে হবে। আমি প্রস্তুত হয়ে আসছি।“

এরপর মোশতাক আহমেদ চলে গেলেন টয়লেটে। এন্থনী ম্যাসকারেনহাসকে দেয়া উনার ভাষ্যমতে, উনি মানব জীবনের সবচেয়ে জরুরী কিন্তু আরামদায়ক নোংরা কাজ করতে বসা অবস্থাতেই পরবর্তী করনীয় সম্পর্কে ভাবছিলেন।

পরে নীচে এসে গাড়িতে উঠবার সময় এক সেনা যখন তাকে স্যালুট করলো, তখন উনি মনে মনে আনন্দে ভেসে যাচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার শীর্ষে উঠছে যাচ্ছেন তিনি। রেডিও স্টেশনে যাবার পথে জনতার কোন ধরনের বিক্ষোভ না দেখে উনি স্বস্তি বোধ করলেন। জনতা তখনো বুঝে উঠতে পারছিলনা কি ঘটে গেছে। কোন সে শক্তি যা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করবার সামর্থ্য রাখে?

রেডিও স্টেশনে পৌছে খন্দকার মোশতাক আহমেদ মেজর রশীদকে বললেন তিন বাহিনীর প্রধানকে নিয়ে আসতে। খন্দকার মোশতাক এই সময়ে তথ্য প্রতিমন্ত্রী তাহেরুদ্দীন ঠাকুরকে নিয়ে তার বক্তব্য প্রস্তুত করতে বসলেন। মেজর রশীদ ১ম বেঙ্গলের সদর দফতরে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফকে পেলেন। তার সাথে ছিলেন কর্নেল শাফাত জামিল এবং আরো কিছু অফিসার। মেজর রশিদ খালেদ মোশাররফকে অনুরোধ করলেন ট্যাঙ্কের গোলার ব্যবস্থা করে দিতে। ব্রিগেডিয়ার খালেদ তার ব্যবস্থা করে দিতে রাজী হন। উনি তাকে আশ্বাস দিলেন তিন বাহিনী প্রধানকে রেডিও স্টেশনে যেতে রাজী করাতে উনি চেস্টা করবেন। আর মাত্র আধ ঘন্টার মধ্যেই তিনি তিন বাহিনী প্রধান জেঃ শফিউল্লাহ, এয়ার ভাইস মার্শাল একে খন্দকার এবং রিয়ার এডমিরাল এম এইচ খানকে মেজর জেঃ জিয়াউর রহমান সহ এনে উপস্থিত করলেন। মেজর রশীদ তিন বাহিনী প্রধানকে জানালেন যে তারা দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এই কাজ করেছেন। আর তারা ক্ষমতা দখল করতে চাননা। উনি আরও বললেন,

– “আমরা আপনাদের অবাধ্য হচ্ছি না বরং আপনাদের নেতৃত্ব চাইছি। আর এ কারণে আপনাদের রেডিও স্টেশনে যেতে হবে আর সেখানেই আপনাদের যা করবার আপনারা করবেন।“

তারা কোন এক অজানা কারণে সামান্য এই মেজরের কথা মেনে নিলেন সবাই। খুব সম্ভবত এই অজানা কারণটা ছিলো ভয়। সশস্ত্র অবস্থায় মেজর ডালিম সহ ঘাতকের একটা দল সেনা সদরে গিয়ে জেঃ শফিউল্লাহকে প্রায় হাইজ্যাক করে নিয়ে আসেন। মেজর হাফিজ সহ অন্য কিছু অফিসারের বিদ্রোহী সেনাদের প্রতি সমর্থনের ভঙ্গির কারণে উনিও সম্ভবত মনে করছিলেন সেনাবাহিনীর একটা বড় অংশই এতে জড়িত।

কিছুক্ষন পর রেডিও স্টেশনে উপস্থিত হলে খন্দকার মোশতাক জেঃ শফিউল্লাহকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

– “আমাকে বলুন, আপনারা কি এই কাজ করেছেন?”

জেঃ শফিউল্লাহ সম্ভবত সামনে অভ্যুত্থানকারী মেজরদের উপস্থিত দেখেই বললেন,

– “হ্যা, আমরাই এই কাজ করেছি।“

একে একে বাকী দুই বাহিনীর প্রধানকেও এই একই প্রশ্ন করা হলো। খন্দকার মোশতাক তাদের চোখে ভয়ের ছায়া দেখতে পেলেন। খন্দকার মোশতাক তাদের উদ্দেশ্যে বললেন,

– “আপনারা আমাকে কি করতে বলেন?”

তারা জবাব দিলেন,

– “আপনি ক্ষমতা গ্রহন করুন।“

খন্দকার মোশতাক তাদের বলেন,

– “আমি একজন বেসামরিক নাগরিক এবং আমার সরকারও হবে বেসামরিক সরকার। এতে আপনাদের কোন ভুমিকা থাকবে না।“

এরপরই সামরিক অফিসারেরা অন্য কক্ষে চলে গেলেন দ্রুত। আধঘন্টা পর তারা ফিরে এসে জানালেন যে তারা খন্দকার মোশতাকের প্রস্তাবে রাজী। এর পরপরই একে একে তারা বেতারে খন্দকার মোশতাক সরকারের প্রতি তাদের আনুগত্য প্রকাশ করেন।

সকাল ১১ টা ১৫ মিনিটে খন্দকার মোশতাক নিজের বক্তব্য প্রদান করলেন বেতারে। ইতিমধ্যে নিজের অবস্থান সুসংহত করে ফেলেছেন তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যার ঘন্টাখানেকের মধ্যে। এইদিনই তিনি সংক্ষিপ্ত এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেবেন। তাকে শপথ পাঠ করাবেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি সৈয়দ এ বি মাহমুদ। এইদিন রাতেই তিনি জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া তার ভাষনে বলবেন, ক্ষমতা গ্রহনে তাকে প্ররোচিত করেছে দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারীতা এবং ক্ষমতা এক ব্যক্তির কাছে কেন্দ্রীভুত করে ফেলবার চেস্টা। উনি শেখ মুজিবুর রহমানকে দেশের অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ বলে উল্লেখ করলেন এবং আরও বললেন যে এই অভ্যুত্থান ঐতিহাসিকভাবে প্রয়োজনীয় ছিলো।

তবে উনার তখন সম্ভবত মনে ছিলো না যে উনি মন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে এ ব্যাপারে কোন প্রতিবাদ করেননি এবং সরকারের সমালোচনাকারীদের সমালোচনায় তুখোড় এবং মুখর ছিলেন। যত যৌক্তিক কারণই থাকুক এই অভ্যুত্থানের পেছনে, উনি ভুলে যাচ্ছিলেন একটা কথা যে উনি ইতিমধ্যে হত্যার ষড়যন্ত্রে এবং হত্যাকান্ডে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছেন সরাসরি। আর হত্যার চেয়ে বড় কোন অপরাধ হতে পারে না।

নিজের বক্তব্যে নতুন প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমেদ বললেন যে বাংলাদেশকে গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ নামেই ঢাকা হবে। তবে এই ব্যাপারে চতুরতার আশ্রয় নিলেন তিনি। বক্তব্যের শুরুটা তিনি আল্লাহর নামে শুরু করলেন এবং বক্তব্য শেষ করলেন “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” বলে। “জয় বাংলার” উর্দু অনুবাদ এটা। কেবল বাংলার জায়গায় এলো বাংলাদেশ। ৮৫% মুসলিম অধিবাসীর দেশ এ ধারনা পেলো যে এক ইসলামপন্থী রাস্ট্রে পরিনত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। তবে তা করা হবে না এই সরকারের আমলে।

ক্ষমতা গ্রহনের পরপরই মোশতাক আহমেদ অনির্দিস্টকালের জন্য কার্ফ্যু জারী করেন তবে শুক্রবার তিন ঘন্টার জন্য তা স্থগিত করা হয় জুম্মার নামাজে যাতে মুসল্লীরা যেতে পারে সে কারণে।

এরপর পরই এ সরকারের নতুন বেসামরিক মন্ত্রীসভার নাম ঘোষনা করেন। এই মন্ত্রীসভায় বাকশাল সরকারের ১৮ জন মন্ত্রীর মধ্যে ১০ জন এবং ৯ জন প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে ৮ জনই স্থান পান। এই নেতাদের সবাই যে স্বেচ্ছায় সরকারে যোগদান করেন তেমনটা সত্যি ছিলো না। এদের অনেককেই জোরপুর্বক কেবিনেটের অংশ হতে বাধ্য করা হয়। বেশ কিছু প্রথমসারির নাতাকে জেলে প্রেরন করে অত্যাচারও করা হয় সরকারে যোগ দিতে। বাকশাল সরকার গঠনের পর প্রেসিডেন্ট হিসেবে বঙ্গবন্ধু মোহাম্মদ মাহমুদুল্লাহর স্থান নিয়েছিলেন। তাকে এই সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট করা হয়। পররাস্ট্রমন্ত্রী ডঃ কামাল হোসেন ছিলেন বিদেশে, তার বদলে বিচারপতি আবু সায়ীদ চৌধুরিকে নিয়োগ দেয়া হয়। মেজর ফারুকের চাচা এক বিশ্ববিদ্যাল্যের উপাচার্য্য ডঃ এ আর মল্লিককে করা হয় অর্থমন্ত্রী। বাকশাল সরকারের বিশ্বস্ত অনেক আমলাকে বদলী করা হয় এবং চাকুরিচ্যুত করা হয়। বাকশালের অনেক নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। এদের মধ্যে ছিলেন গাজী গোলাম মোস্তফা এবং আব্দুস সামাদ আজাদ। স্বাধীনতার পর মুজিবনগর সরকার বাংলাদেশে স্থানান্তরিত হলে খন্দকার মোশতাক আহমেদকে বরখাস্ত করে আব্দুস সামাদ আজাদকে পররাস্ট্রমন্ত্রী করা হয়েছিলো। তাকে এবং মেজর ডালিমের চক্ষুশুল গাজী গোলাম মোস্তফাকে ডিটেনশন সেলে রাখা হয় অন্য আরো বেশকিছু নেতার মতো।

মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, যিনি কয়েক মাস আগেই বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের প্রতি পুর্ন সমর্থন জানিয়েছিলেন, তিনিও নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানিয়ে বার্তা পাঠান। তবে কেউ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ জানিয়ে একটাও বক্তব্য প্রদান করলো না। দেশে তার নাম উচ্চারণ করাও যেনো রাতারাতি নিষিদ্ধ হয়ে গেলো। কেবল কাদের সিদ্দিকী এই হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে অস্ত্র তুলে নেন এবং ভারতে চলে যাবেন জেঃ জিয়ার সরকারের সময়। তিনি অবশ্য পরবর্তীতে সীমান্তবর্তী বিওপি এবং বিভিন্ন থানা আক্রমন করে কিছু নিরীহ আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যকে মেরে ফেলা ছাড়া আর কিছুই করতে পারবেন না। কর্নেল জামিল উদ্দীন আহমেদ অবশ্য আগেই তাঁর জীবন দিয়ে যান। জোরপুর্বকই হোক আর স্বেচ্ছায়ই হোক, আওয়ামী লীগ কিংবা বাকশাল সরকারের বড় একটা অংশ বঙ্গবন্ধুর রক্তের উপর দাঁড়ানো সরকারের অংশ হয়ে যান।

২০ আগস্ট – ২রা নভেম্বর
ঢাকা, বাংলাদেশ

খন্দকার মোশতাক আহমেদ দ্বায়িত্ব নেবার পর মেজর ফারুক এবং মেজর রশীদ সেনাবাহিনী সদর দফতরের অধীনে নিজেদের নিয়োজিত করেন। তারা সেনাবাহিনীর কমান্ডারদের নিয়েই চিন্তিত ছিলেন না কেবল, বরং যারা তাদের সাথে ষড়যন্ত্র নিয়ে কথা বলেছিলো কিন্তু শেষ মুহুর্তে পিছিয়ে যায় তাদের পক্ষ থেকেও বিরোধের মুখে পরেছিলেন। খন্দকার মোশতাক এই সমস্যারও সমাধান বের করে ফেললেন। উনি এই দুই মেজরকে তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে উনি বললেন,

– “এই দুই ‘চৌকস’ অফিসার আমার সাথেই সবসময় বঙ্গভবনে থাকবে।“

প্রথম কিছুদিন ঢাকায় ছিলো টানটান উত্তেজনা। অনেকেই পাল্টা অভ্যুত্থানের আশংকা করছিলো। প্রেসিডেন্ট মোশতাক ট্যাঙ্কের প্রহরায় বঙ্গভবনে ছিলেন এই দুই মেজর সহ, আর সেনাবাহিনীর কর্তারা ক্যান্টনমেন্টে।

এই সময়ে খন্দকার মোশতাক সামরিক বাহিনীর মাথা ছেটে ফেললেন। দুই মেজরের চাপে জেঃ শফিউল্লাহকে সরিয়ে ২৫শে আগস্ট জেঃ জিয়াকে করা হলো সেনাপ্রধান। জেঃ হুসাইন মোঃ এরশাদ, যিনি অভ্যুত্থানের সময়ে ভারতে ছিলেন স্টাফ কোর্সে, তাকেও ডেকে পাঠিয়ে চারমাসের মধ্যে দ্বিতীয় পদোন্নতি দিয়ে উপ-প্রধান সেনাপতির পদ দেয়া হলো। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ চীফ অফ জেনারেল স্টাফের গুরুত্বপূর্ন পদে বহাল থাকলেন।

খন্দকার মোশতাক সম্ভবত জিয়াকে সেনাপ্রধান করতে চাননি। এর প্রধান কারণ ছিলো, উনি জিয়াকে বিশ্বাস করতেন না। আরেকটা কারণ ছিলো সাধারণ সেনাদের মধ্যে জিয়ার জনপ্রিয়তা ছিলো, যেটা মোশতাক সরকারের প্রতি বিপদের কারণ হতে পারতো। কিন্তু দুই মেজরের চাপে তাকে সেনাপ্রধান করতেই হলো। সময়ই প্রমান করে দেবে মোশতাকের এই ধারনা সঠিক ছিলো। তবে এই হুমকী মোকাবেলা করতেও মোশতাক আহমেদ চতুরতার আশ্রয় নেন।

এর বাইরে বিমান বাহিনী প্রধানের পদ থেকে একে খন্দকারকে সরিয়ে গ্রুপ ক্যাপ্টেন এম জি তোয়াবকে জার্মানী থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। উনি জার্মানীতে তার জার্মান স্ত্রীর সাথে থাকতেন ইতিমধ্যেই অবসরে চলে যাবার পর। এমজি তোয়াব ছিলেন কিছুটা ডানপন্থী, জামাতে ইসলামীর সমাবেশে তাকে পরবর্তীতে বাহিনী প্রধান থাকা অবস্থাতেই বক্তব্য দিতে দেখা যাবে। এই দুই মেজর প্রচন্ডভাবে ডানপন্থী এবং কাজে কর্মে পাকিস্তানপন্থার পরিচয় দেন। তারা সেভাবেই সরকারকে সাজাতে তাদের প্রভাব খাটান। এমজি তোয়াবকে মুক্তিযুদ্ধের সময় একে খন্দকার নিস্ক্রিয় করে রাখেন অনেকটাই এবং স্বাধীনতার পর বিমানবাহিনীর অংশ করতে চাননি তার পাকিস্তানপন্থী হবার সম্ভাবনা থাকবার আশংকায়। খুব সম্ভবত একে খন্দকার সঠিক ছিলেন এ ব্যাপারে।

মেজর রশীদ সামরিক নানা বিষয়ে সরকারকে নির্দেশনা দিতেন। তবে খন্দকার মোশতাক তাদের টেক্কা দিতে বাহিনী প্রধানদের উপরে চীফ অফ ডিফেন্স স্টাফের পদ তৈরি করেন এবং বাংলাদেশ রাইফেলসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল খলিলুর রহমানকে সে পদে নিয়োগ দেন।

তবে জনগনের মনে বিস্ময়ের জন্ম দিয়ে এই সরকারের সামরিক উপদেস্টা পদে ২৫ আগস্ট অবৈতনিক উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দিলেন জেনারেল ওসমানী। মোশতাক আহমেদ সামরিক বাহিনীর শৃংখলা ফিরিয়ে আনার জন্য তাকেই আদর্শ ব্যক্তি হিসেবে অবিহিত করলেন। তবে উনি ঠিক উল্টো কাজটাই করে যাচ্ছিলেন। জেঃ খলিল, জেঃ ওসমানীর সাথে সেই মুহুর্তের তিন বাহিনী প্রধান সহ অন্যদের সম্পর্ক খুব একটা সুখকর ছিলনা।

খন্দকার মোশতাক চতুরতার সাথে সামরিক বাহিনির একজনকে আরেকজনের বিরুদ্ধে উস্কে দিচ্ছিলেন। এর বাইরে বেসামরিক প্রসাশনকেও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে দাড় করাতে চাইলেন নিজে টিকে থাকতে।

ক্ষমতা গ্রহনের পর নিজের প্রেসিডেন্ট পদ দখলকে জায়েজ করতে উনি সামরিক শাসন জারী করেন। যদিও সংবিধান সেই মুহুর্তেও কার্যকর ছিলো। ১ লা সেপ্টেম্বর সরকার একদলীয় ব্যবস্থাকে বিলুপ্ত ঘোষনা করে এবং বাকশাল বাতিল ঘোষনা করে। ৬০টি জেলায় দেশকে বিভক্ত করবার প্রক্রিয়াকেও বাদ দেয়া হয়।

৫ই অক্টোবর এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে রক্ষী বাহিনীকে বিলুপ্ত ঘোষনা করা হয় এবং এর সদস্যদের সেনাবাহিনীতে আত্মীকরন করা হয়। ইসলামপন্থী যেসব দল স্বাধীনতার বিরোধীতা করেছিলো এবং যাদের নেতাকর্মীদের দোসর হিসেবে বন্দী রাখা হয়েছিলো সেইসব দলের নেতাকর্মীদের (প্রধানত মুসলীগ লীগ ও জামাতে ইসলামী) মুক্তি দেয়া হয়। দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক সংবাদ এবং দৈনিক আজাদের প্রকাশনা উন্মুক্ত করে তাদের মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হয়।

২৬শে অক্টোবর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে মাধ্যমে ১৫ই আগস্টের হত্যাকারীদের যেকোন ধরনের বিচার প্রক্রিয়ার বাইরে নিয়ে আসলেন প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমেদ। এর মাধ্যমে বলা হলো যে, এই হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত কাউকে হত্যার অভিযোগে বিচারের আওতায় আনা যাবে না কোন আদালতে যেহেতু এই হত্যাকান্ড ছিল এক ‘ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা”। আর এর মাধ্যমেই সম্ভবত বাংলাদেশই একমাত্র দেশ হয়ে গেলো যারা আইনগতভাবেই হত্যাকারীদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করলো। এ ব্যাপারে মিডিয়াতে কোন ধরনের প্রচারণা চালাতে দেয়া হয়নি জনগনের মধ্যে বিরুপ প্রতিক্রিয়ার কারণে। আর এই অধ্যাদেশের কারণেই পরবর্তীতে হত্যাকারীরা দেশত্যাগের সুযোগ পায়।

?oh=e6afb9beb211d70f549ec38d8c06ddf6&oe=58965CD9″ width=”400″ />

খন্দকার মোশতাক কেবল তাদের আইনগতভাবে মুক্তির ব্যবস্থাই করেননি, উনি তাদের লেঃ কর্নেল পদে পদোন্নতিও দিলেন। ৩ রা অক্টোবর এক বেতার ভাষনে উনি তাদের সামরিক বাহিনীর ‘সূর্য্য সন্তান’ বলেও অবিহিত করলেন।

পরবর্তীতে জেঃ জিয়ার সরকার সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ থেকে ৯ই এপ্রিল ১৯৭৯ পর্যন্ত সরকার সমুহের নেয়া সকল পদক্ষেপকে আইনী বৈধতা প্রদান করেন। ৯ই এপ্রিল ১৯৭৯ সালে সামরিক আইন তুলে নেয়া হয়। পঞ্চম সংশোধনীতে এ ব্যাপারে বলা হয়,

“The measures were deemed to have been validly made, done or taken and shall not be called in question on or before any Court, or Tribunal on any ground whatsoever.

– Constitution of the People’s republic of Bangladesh, Fourth Schedule, 3A”

পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ইনডেমনিটি এক্ট বাংলাদেশের সংবিধানের অংশ হয়ে যায় এবং এটা নিশ্চিত হয় যে শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার সাথে জড়িতদের বিচারে কোন পদক্ষেপ নেয়া যাবেনা দেশের সংবিধান অনুসারেই।

এই সময়ে খন্দকার মোশতাক তার সকল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পঙ্গু করে দেবার চেস্টা করেন। উনি সেনাবাহিনীর বাইরে তার প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করেন তার পুরোনো দল আওয়ামী লীগকে। যখনই তিনি বুঝতে পারলেন বঙ্গবন্ধুকে হত্যার আর তেমন কোন প্রতিক্রিয়ার আশংকা নেই তখনই তিনি আওয়ামী লীগের শক্তির প্রধান স্তম্ভ মুজিবনগর সরকারের সদস্য চার নেতাকে গ্রেফতার করে জেলহাজতে প্রেরন করেন। তারা হচ্ছেন তাজউদ্দীন আহমেদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামান।

৩রা নভেম্বর, ১৯৭৫ সাল
ঢাকা, বাংলাদেশ

ঠিক মধ্যরাতে মেজর ফারুক এবং মেজর রশীদের সাথে পরামর্শক্রমে প্রেসিডেন্ট মোশতাক আহমেদের নির্দেশে জাতীয় চার নেতাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরেই নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো। এই হত্যাকান্ডের নেতৃত্ব দিলো মেজর ফারুকের বিশ্বস্ত সুবেদার মেজর মুসলেহউদ্দীন। ঠিক ১৫ই আগস্টের মত কালো পোষাকে কারাগারের অভ্যন্তরে গিয়ে খুন করে চলে আসলো ঘাতকের দল। ভোর না হতেই এই খবর পৌছে গেলো সিজিএস ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের কাছে। উনি তার অধীনের কিছু অফিসার এবং সেনাদের নিয়ে বঙ্গভবনে গিয়ে হাজির হলেন। উনি খন্দকার মোশতাককে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে বললেন। প্রায় পুরোটা দিন চলে গেলো ক্ষমতার পালাবদলের ব্যাপারে দেনদরবারে। সেখানে উপস্থিত আছেন সামরিক উপদেষ্টা জেঃ ওসমানীও। এরমধ্যে কর্নেল শাফাত জামিল তার অফিসারদের নিয়ে যখন বঙ্গভবনে প্রেসিডেন্টের কক্ষে প্রবেশ করছিলেন তখন তিনি খন্দকার মোশতাক আহমেদকে ব্রিগেডিয়ার খালেদকে উদ্দেশ্য করে বলতে শুনলেন,

– “আমি পাকিস্তান আর্মির অনেক ব্রিগেডিয়ার, অনেক জেনারেল দেখেছি, আমাকে শেখাতে এসোনা।“

এ কথা শুনে সেখানে উপস্থিত ১ম বেঙ্গলের মেজর ইকবাল তার অস্ত্র খন্দকার মোশতাকের মাথায় তাক করে বললেন,

– “আর এখন তুমি বাংলাদেশ আর্মির মেজরদের দেখবে।“

সেই অফিসারের লাথি আর ধাক্কা খেয়ে খন্দকার মোশতাক ফ্লোরে পরে গেলেন। তবে জেঃ ওসমানী খন্দকার মোশতাককে বাচাতে তাদের মধ্যে এসে দাড়ালেন এবং কর্নেল জামিলকে অনুরোধ করলেন যাতে কোন অঘটন না ঘটে। তবে এরপর পরই অস্ত্রের মুখে খন্দকার মোশতাক পদত্যাগ করলেন এবং নতুন সরকারের ঘোষনা দেয়া হলো। জেঃ ওসমানীও তার পদ থেকে সরে দাড়ালেন।

আর এভাবেই সেনাবাহিনীর সিজিএস ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ৪৬ ব্রিগেডের কমান্ডার কর্নেল শাফাত জামিলের সাহায্যে একটি রক্তপাতবিহীন সামরিক অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিলেন। শক্তিশালী ৪৬ নং পদাতিক ব্রিগেডের মোকাবেলার শক্তি ওই মুহুর্তে ঢাকায় অন্য কোন ইউনিটের ছিলো না। তবে অভ্যুত্থানের পর তিনি ১৫ই আগস্টের পথ বেছে নিলেন না। তিনি সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করলেন। এরপর তিনি নিজেকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করে সেনাপ্রধান হন । তবে তার প্রধান দুর্বলতাও ছিলো এটাই যে ৪৬ তম ব্রিগেডের সকল রেজিমেন্টের সিও তাকে সম্পুর্ন সমর্থন দেয়নি। এর বাইরে তার অনুগত অফিসাররা বেশিরভাগই ছিলেন ঢাকার বাইরে, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গে।

৭ই নভেম্বর, ১৯৭৫
ঢাকা, বাংলাদেশ

জেনারেল খালেদ মোশাররফ আদর্শগত কারণেই রক্তপাতহীন ক্যু করতে গিয়ে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে তার নিজ বাসভবনে গৃহবন্দী করেন। জিয়ার শুভাকাঙ্গী এবং বন্ধুর মত কর্নেল(অবঃ) আবু তাহের ছিলেন চট্টগ্রামে। জেঃ জিয়া যখন তার বাসভবনে বন্দী হয়ে ছিলেন জেঃ খালেদ মোশারফের নির্দেশে, তাকে বন্দী করে রাখেন ক্যাপ্টেন হাফিজুল্লাহ। জেঃ জিয়ার বাসার টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। তবে ক্যাপ্টেন হাফিজুল্লাহ একটি ভুল করে বসেন নিজের অজান্তেই। তিনি জানতেন না যে বেডরুমেও একটি টেলিফোন আছে। জেঃ জিয়া লুকিয়ে কর্নেল তাহেরকে ফোন করে খুব সংক্ষেপে বললেন,

– “সেভ মাই লাইফ”।

কর্নেল তাহেদের সাথে জেঃ জিয়ার সুসম্পর্ক ছিলো, যদিও কর্নেল তাহের সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন। সৈনিক আর অফিসারদের মধ্যকার বৈষম্য তার পছন্দ ছিলো না। এই মতবাদের কারণে কর্নেল তাহের সেনাবাহিনীর সাধারণ সৈনিকদের একটা বড় অংশের কাছে জনপ্রিয় ছিলেন। উনি বিশ্বাস করতেন জিয়াও তারই আদর্শের লোক। তাহের জিয়ার আহবানে সাড়া দেন। তিনি ঢাকাতে তার অনুগত ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সিপাহীদের পাল্টা প্রতিরোধ গড়ার নির্দেশ দিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা রওনা হন, এ সময় তার সফর সঙ্গী ছিল শত শত জাসদ কর্মী। ৭ নভেম্বরের ভোরের মধ্যেই বিদ্রোহী সেনারা পুরো ক্যান্টনমেন্ট দখল করে নিল। একদল জওয়ান গেল জেনারেল জিয়ার বাসভবনে। চারদিন বন্দি থাকার পর মুক্তি পেলেন জেনারেল জিয়া। নৈশ পোশাক পরা অবস্থাতেই জিয়াকে উল্লসিত জওয়ানরা কাঁধে করে নিয়ে গেল ২ ফিল্ড আর্টিলারির হেডকোয়ার্টারে। ঘটনার আকস্মিকতায় তখন বিহ্বল হয়ে পড়েন জিয়া। নাম না জানা অনেক জওয়ানের সঙ্গে আলিঙ্গন, করমর্দন করেন তিনি।

অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তার ‘বাংলাদেশঃ এ লিগ্যাসী অব ব্লাড’ বইতে এ ব্যাপারে লিখেছেন,

– “১৯৭৫ সালের ৫ ও ৬ নভেম্বর ক্যান্টনমেন্টসহ সারা শহরে ছড়ানো হলো হাজার হাজার প্রচারপত্র। একটি ব্যাপারে ডান ও বাম উভয় রাজনৈতিক দলই একমত ছিল, আর তা হচ্ছে খালেদ মোশাররফ একজন বিশ্বাসঘাতক, ভারতের দালাল এবং উনি ঘৃনীত বাকশাল ও মুজিববাদ ফিরিয়ে আনতে চাইছেন।”

এর আগে মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ এবং তার দুই সহকর্মী কর্ণেল নাজমুল হুদা এবং লেফট্যানেন্ট কর্ণেল এ.টি.এম. হায়দারকে নিয়ে তার প্রিয় ১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে গিয়েছিলেন। সেখানেই ১০ম বেঙ্গলের সেনারাই তাকে আটকে ফেলে। পরদিন সকাল ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ তারিখে, সকাল ১১টায় ২য় ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারীর লেঃ কর্ণেল মহিউদ্দিন আহমেদের নির্দেশে ১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর ক্যাপ্টেন আসাদ এবং ক্যাপ্টেন জলিল তাদের হত্যা করে সকাল ১১টার দিকে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এই দুই ক্যাপ্টেনই জেঃ খালেদের ‘কে’ ফোর্সের অধীনে যুদ্ধ করেন। একবার মেজর খালেদ নিজের জীবনের ঝুকি নিয়ে ক্যাপ্টেন আসাদের জীবন রক্ষা করেন। তবে তাদের হাতেই নিহত হয়ে তাঁর লাশ সেনানিবাসের ভেতর একটা খেজুরগাছের নিচে দীর্ঘ্যসময় পরে থাকে।

কর্নেল তাহেরের এই পাল্টা অভ্যুত্থান সফল হলো। কর্নেল তাহের, জিয়াউর রহমানকে বন্দী দশা থেকে মুক্ত করে নিয়ে আসলেন। কথা ছিল জিয়াউর রহমানকে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের করে আনা হবে। তারপর জাসদের অফিসে তাকে এনে তাহেরদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হবে। পরে সিপাহী-জনতার এক সমাবেশ হবে। সেখানে বক্তব্য রাখবেন জিয়া আর তাহের। কিন্তু মুক্ত হওয়ার পরে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। জিয়া ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হতে সম্মত হলেন না। জিয়ার অনুগত সামরিক অফিসাররা তাঁকে পরামর্শ দিতে থাকেন। তাহের জিয়াকে ভাষণ দিতে বললে জেঃ জিয়া ভাষণ দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

তাহের বুঝতে পারেন জিয়া তাদের সাথে আর থাকছেন না। তিনি পুনরায় সংগঠিত হতে থাকেন। কিন্তু জিয়া বুঝতে পারেন ক্ষমতায় টিকতে হলে তাহেরসহ জাসদকে সরাতে হবে। সেই অনুযায়ী গ্রেফতার হতে থাকেন জাসদের সব নেতারা। তাহেরও গ্রেফতার হন। এরপর শুরু হবে এক প্রহসনের এক বিচার। সামরিক আদালতে চলতে থাকে সেই বিচার

১৯৭৬ সালের ২১শে জুলাই কর্নেল তাহেরের ফাঁসি হয়। অন্যান্য নেতাদের বিভিন্ন মেয়াদের জেল হয়। ৭ নভেম্বরের বিপ্লবের অন্যতম প্রধান কারিগর ছিলেন তাহের। আর তার ফলে ক্ষমতায় বসলেন জিয়া।

ক্ষমতা, আদর্শগত দ্বন্দ এবং মানুষের নানা আপাত অকারণ কার্যকলাপের ফল অনেক অদ্ভুত হয়। এই দেশও তার বাইরে থাকেনি। জিয়া তাহেরকে প্রহসনের বিচারের মাধমে হত্যা করবেন, তাহের নিজেও মেঃ জেঃ খালেদ মোশারফ সহ অনেক মুক্তিযোদ্ধা অফিসারের মৃত্যুর কারণ ছিলেন। আবার তাহেরের বিপ্লব সফল হলে বঙ্গবন্ধু রক্ষা পেতেন নাকি তাও প্রশ্ন করবার বিষয়। আমি জানি না কেন এমন হয়, কিন্তু আমাদের দেশের সূর্যসন্তানেরাই আমাদের দেশের কলংকিত ইতিহাসের অংশ, খল চরিত্র।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

13 − 8 =