মালাউন, কুন্তীপুত্র ও তার ভাবনা।

মালাউন শব্দটির সাথে কুন্তীপুত্রের প্রথম পরিচয় ঘটে ছোট থাকতে। সে একবার মাঠে খেলতে গিয়েছি। এলাকার এক বড় ভাই তার হাত থেকে বলটি কেড়ে নেয়। তারপর সে প্রতিবাদ করায় ভাইটি বলে উঠে, “এই শালা মালাউন।” তখন কুন্তীপুত্র অনেক ছোট। তাই সে এটা নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন মনে করেনি।

একটু বড় হবার পর কুন্তীপুত্র বুঝতে পারে এটা খুব খারাপ একটা কথা। বুঝতে পারার কারন ইতিমধ্যে সে অনেকবার একথা শুনেছে। ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচ হলে বাংলাদেশকে সাপোর্ট দিয়েও তাকে শুনতে হয়েছে মালাউন কথাটি। সবাই বলেছে, “তুইতো মালাউন, তুই ইন্ডিয়ারে সাপোর্ট দিবি।” কুন্তীপুত্র সারারাত কেঁদেছে, কিন্তু কিছু বলতে পারেনি।

মালাউন কথাটি আরবি ভাষা থেকে পাওয়া। এর অর্থ ‘অভিশপ্ত'(পাঠকদের বিরক্ত করার জন্য পুরান কথাই আবার বললাম)। মুহম্মদের সময়ে যারা মূর্তিপুজা করত তাদের মালাউন বলা হত। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে হিন্দুদের উদ্দেশ্যেই একথা বলা হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধে পাক বাহিনীর প্রধান টার্গেটই ছিল এই মালাউনরা। একক সম্প্রদায় হিসেবে এমন ক্ষতি আর কোন যুদ্ধে কারো হয় নি যতটা এই মালাউনদের হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে।

মুক্তিযুদ্ধের পর সবারই স্বপ্ন ছিল একটী অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তোলার। সে হিসেবেই ৭২’এর সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছি ধর্ম নিরপেক্ষতা। কিন্তু কে জানত এই বাংলাদেশেই এই মালাউনদের স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটবে।

৭৫-৯০ সাল। বাংলাদেশের পশ্চাৎপদতার একটি সময়। যেই পাকিস্থান থেকে স্বাধীনতা অর্জন করা হয়েছে, সেই পাকিস্থানের দিকে হাঁটার সময়কাল এটি। এসময়ে ধর্ম নিরপেক্ষতাকে বারবার ধর্ষিত করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীশক্তির পুনরুত্থানে এবং ধর্ম নিয়ে রাজনীতির অবাধ সুযোগ থাকায় পাকিস্থানপন্থীরা সেই সুযোগ কাজে লাগায়। ধর্মভিত্তিক যে দ্বি-জাতি তত্বকে লাথি মেরে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম, সেই বাংলাদেশেই সকলকে শিখানো হল, হিন্দু-মুসলিম এক হতে পারে না, তারা ভাই হতে পারে না। হাতে হাত রেখে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে পারে না।

বর্তমানে এক দারুন শব্দ প্রচলিত আছে। কথাটি সংখ্যালঘু। সংখ্যাগুরু মুসলিম সম্প্রদায় বাদে সকল ধর্ম ও জাতের মানুষ এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। সেই মোতাবেক আদিবাসীরা, হিন্দুরা, বৌদ্ধরা, ক্রিশ্চানরা সকলের প্রথম পরিচয় তারা সংখ্যালঘু। তারপর সংখ্যাগুরুদের দয়ায় তারা বাংলাদেশের নাগরিক। তাই যখন তাদের দয়া সামান্য কমে যাবে তখন বোঝা যায় তান্ডব কি জিনিস।

২০০১ সাল বলেন অথবা ২০১৬। সবসময় খড়গটা নেমে এসেছে হিন্দুদের উপরেই। সবকিছুতে আপনি দেশের নাগরিক এই পরিচয়ের পূর্বে আসবে আপনি সংখ্যালঘু। সেজন্য আপনি বিচার পাবেন না। কাউকে বিচার দিতে পারবেন না। লাথি খেয়ে আপনাকে থাকতে হবে। যদি প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেন তবে আপনার মেয়েকে ধর্ষিত হতে হবে। নতুবা আপনার জাতিভাই সকলের ঘড় ভাঙ্গা হবে।

প্রসঙ্গত, একজন মন্ত্রী বলেছে মালাউন শব্দটা। সত্যি বলতে কি, হিন্দুরা এই শব্দটিতে বর্তমানে অভ্যাস্ত হয়ে পরেছেন। একজন মন্ত্রীর কথা বলে সকলে জেনেছে। কিন্তু প্রতিদিন কতবার সে এই কথাটি শুনে সেকথা অজানাই থেকে যায়। এই সেদিন কুন্তীপুত্র বাসে যাওয়ার সময় শুনতে পেল, “এই শালা মালাউনরাই দেশে ভেজাল করে।” তাই কুন্তীপুত্র একথাটা এখন আর গায়ে মাখায় না।

সমাধান নাই। এমন কথা হবেই। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন মদিনা সনদে দেশ চলবে। অতএব, সবাই জিজিয়া কর দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নাও। গনিমতের মাল হিসেবে তোমার মেয়েকে, তোমার বোনকে স্যাক্রিফাইস কর। আর যদি শান্তিতে থাকতে চাও, তবে হয় ভারতে চলে যাও, নতুবা রাষ্ট্র কাঠমো ভাঙ্গার যুদ্ধে সামিল হউ।

কুন্তীপুত্র
০৪-১১-২০১৬ইং

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

61 − 59 =