ব্রাহ্মণবাড়িয়া টু মোল্লানগর

আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলা এবং রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। একটা অর্জনের জন্য আমাদের পূর্ব প্রজন্মের লোকেরা জীবন দিয়েছেন এবং অন্যটা পাওয়ার ফলে আমাদের প্রাণের অপচয় হচ্ছে। দ্বিতীয়টা নিয়েই লিখবো।

আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনায় প্রথমে” বিসমিল্লাহির রাহমানির রহিম “, তারপর ধর্মনিরপেক্ষতার জায়গায় “সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর আস্থা “এবং সর্বশেষ অষ্টম সংশোধনীতে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা। এই হলো জন্মকালে ধর্মনিরপেক্ষ প্রেরণা নিয়ে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশের ধর্মবাদিতার দিকে অভিগমনের পথরেখা। মূল সংবিধান থেকে একটু একটু করে সরে গিয়ে সংবিধানে ধর্মের অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়েছে। আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে ধর্ম সংক্রান্ত যেসব অনুচ্ছেদ বা পরিচ্ছেদ সংবিধানে যুক্ত হয়েছে সেগুলোর কোনটাই জনদাবী ছিলো না। জনগন ওইসব ধারা উপধারা চেয়ে আন্দোলন করেনি। অথচ শাসক শ্রেণী এটা করেছ জনগনকে ভোলানোর জন্য, খুশি রাখার জন্য, আর জনপ্রতিরোধের সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করে দেওয়া এবং নিজেদের অবৈধ ক্ষমতা দখলকে স্থায়িত্ব দেওয়ার জন্য।

বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানও রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে নিজেদের ধর্মের সাংবিধানিক মর্যাদা পেয়ে হাতে যেন আকাশের চাঁদ পেয়েছে। তার আত্মপরিচয়ের যে সংকট ছিলো এতোকাল অর্থাৎ আগে মুসলমান না আগে বাঙালি সেই টানাপোড়েনের মীমাংসা করে দিয়েছে এই রাষ্ট্রধর্ম। অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত, কুশিক্ষিত আর শিক্ষিত ধর্মব্যবসায়ীরা তাদের সেই আজন্ম আত্মপরিচয়ের সংকট থেকে মুক্ত করে নিজেদেরকে দৃঢ়ভাবে আগে মুসলমান পরে বাঙালি বা বাংলাদেশি বলে স্থির করেছে। তার অহমিকায় নতুন রাষ্ট্রধর্মের পালক যোগ হয়। অন্য ধর্মের লোকদের আশ্রিত, অনাহূত ভাবতে শুরু করে।

রাষ্ট্রই তার জনগনকে সাম্প্রদায়িকতা শিক্ষা দিয়েছে বলা চলে। সম্প্রদায়গত মতাদর্শিক ভিন্নতাকে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের দিকে চালিত করেছে। এটা এখন এমন পর্যায়ে পৌছেছে যে রাষ্ট্রযন্ত্র চাইলেও হয়তো এই সাম্প্রদায়িক নিপীড়ন ঠেকাতে পারবেনা। কারণ সমাজ ও রাজনৈতিক কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে এবং ক্ষমতা পরিধিতে যারা বিচরণ করছে অর্থাৎ শাসন ক্ষমতার বিভিন্ন স্তরে যারা বসে আছে তাদের অধিকাংশ লোকই সাম্প্রদায়িক। এরা সাম্প্রদায়িক ঘৃণার পরিবেশ থেকেই উঠৈ এসেছে। তাদের শিক্ষা সাম্প্রদায়িক, রাজনীতি সাম্প্রদায়িক, সংস্কৃতি সাম্প্রদায়িক। তাইতো সংবিধানের মৌল কাঠামোর বিরোধী হওয়ায় অষ্টম সংশোধনীর একাংশ বাতিল হলো অথচ রাষ্ট্রধর্ম বাতিল হয়না। এটা বাতিল করে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগনকে ক্ষেপাতে চায়না সরকার। যে সোনার চাঁদ একবার জনগণ না চাইতেই পেয়ে গেছে সেই সোনার চাঁদকে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগন আর হারাতে চাইবেনা কিছুতেই। কারণ ওই রাষ্ট্রধর্ম জিনিশটা এতোদিনে তাদের আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে। এটা হারানোর কথা ভাবলে তারা বিপর্যস্ত বোধ করে, পরিচয় নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ততায় ভোগে। এই রাষ্ট্রধর্মের ফলাফল কি হয়েছে তা টের পাচ্ছে অমুসলিম জনগোষ্ঠী।

একটা রাজনৈতিক দলও একটা দারুণ খেলা খেলছে সংখ্যালঘুদের নিয়ে। এতোদিন এটা তাদের ভোটব্যাংক বলে বিবেচিত ছিলো। কিন্তুু বর্তমানে তাদের ভোটব্যাংকে নানা কৌশলে নতুন ভোট যুক্ত হয়েছে এবং হচ্ছে। বাংলাদেশে জনসংখ্যায় হিন্দুর সংখ্যা কত? ঠিক জানেনা কেউ। এই জনসংখ্যার বিন্যাসটা এমন যে দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের দু চারটে এলাকা ছাড়া কোন জেলায় তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়। হাতে গোনা দু তিনটি সংসদীয় আসনে হয়তো হিন্দু ভোটাররা সংখ্যাগরিষ্ঠ। অর্থাৎ ওই দুই তিনটি আসনে জিততে হলে হিন্দু ভোট লাগবেই। এর বাইরে হিন্দুরা সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কোন সংসদীয় আসনেই তারা জয় পরাজয় নির্ধারণী প্রভাবক নয়।সেই দলটি তাই আর হয়তো ধর্মীয় সংখ্যালঘু ভোট নিয়ে তেমন মাথা ঘামাচ্ছে না। মাথা না ঘামানোর আরেকটি কারণ হচ্ছে ইসলামী আদর্শের ঘোল খাইয়ে এবং নানান কৌশলে উগ্রপন্হী ইসলামী দলগুলোকে কিংবা এদের কিছু ভোটকে তারা নিজের থলেতে পুরতে সমর্থ হয়েছে। এতে করে হিন্দু ভোটের চাহিদা হ্রাস পেয়েছে সেই দলের কাছে। তৃতীয় একটা কারণ অনুমান করা যায়। দেশে সংখ্যালঘু থাকলে সেটা নিয়ে টেনশন থাকবেই কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠরা ক্রমবর্ধমান হারে অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে দেশীয় এবং আর্ন্তজাতিক নানা ঘাত প্রতিঘাতের জেরে- সরকার সেটা ভালোই বুঝতে পেরেছে। একটা দল যারা কিনা ইসলামী মৌলবাদীদের কাছে প্রায়ই ভারতের দালাল এবং হিন্দুঘেষা বলে সমালোচিত হয়, তারা নিজেদের শরীর থেকে এই অপবাদ মুছে ফেলতে চাইছে। তারা ভাবছে সংখ্যালঘু এদেশ থেকে বিদায় হলেই ভালো।এজন্যই তারা সবকিছু দেখেও না দেখার ভান করছে। তারা ভাবছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় না থাকলে আর সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষও হবেনা। আর সাথে করে তাদের নিজেদের শরীর থেকে হিন্দুত্বের অপবাদও মুছে যাচ্ছে। যেহেতু দেশে কোন বিরোধী দল নেই, থাকলেও নপুংসক, আর যারা আছে তারাও সাম্প্রদায়িক, এবং বামপন্থিরা তো জানেই না তারা নিজেরা জীবিত না মৃত, সুশীল সমাজও নীরব এবং সম্প্রদায়ঘেঁষা -এই অভূতপূর্ব সুযোগটা সরকার কেন ছাড়বে? দেশটাকে হিন্দু মুক্ত করে ইসলামিক রিপাবলিক ঘোষণা করতে পারলেই ইহলোকের রাজত্ব এবং পরলোকে বেহেশতের টিকিট দুটোই কনফার্ম। সুতরাং আজই আপনার টিকিটটি বুকিংয়ের জন্য প্রতিবেশী হিন্দুর ঘরে আগুন দিন!

রাষ্ট্রকে বলা হয় সর্ববৃহৎ পলিটিক্যাল এ্যাসোসিয়েশন। তার নির্দিষ্ট লক্ষ্য উদ্দেশ্য থাকে। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য উপযুক্ত শাসকের প্রয়োজন হয়। এই উপযুক্ত শাসকের বৈশিষ্ট্য কী? প্লেটোর মতো হচ্ছেন Philosopher king. প্লেটোর সেই আদর্শ রাষ্ট্রও হয়নি, সেই আদর্শ শাসকদের দেখাও পৃথিবী পায়নি। ১৬ শতকের শুরুতে ইতালিয়ান রাজনীতিবিদ ম্যাকিয়াভেলি লিখলেন বিখ্যাত বই “The Prince ” .সেখানে বললেন শাসকের চরিত্রে থাকতে হবে সিংহ ও শেয়ালের মিশেল। অর্থাৎ সিংহের মত শক্তিশালী আর শেয়ালের মতো ধূর্ত। এটা লিখেছিলেন মধ্যযুগের রাজতান্ত্রিক প্রেক্ষাপটে। এরপর তো আমেরিকান বিপ্লব হলো, মন্টেস্কু, জন লক, রুশো, ভলতেয়ারেরা বই লিখলেন, ফরাসিরা তাতেই অনুপ্রাণিত হয়ে ঘটিয়ে ফেলল ফরাসি বিপ্লব। সাম্য, স্বাধীনতা এবং ভাতৃত্বকে মূলনীতি করে একে একে গড়ে উঠতে থাকলো পৃথিবীর আধুনিক রাষ্ট্র। আমাদের প্রথম সংবিধান প্রণেতাগণ সংবিধানে মার্কিনদের Bill of Rights থেকে কিছু বিষয় নিয়েছেন, ফরাসিদের Declaration of the Rights of Man and of the Citizens থেকেও নিয়েছেন। এখন সেসব সভ্য বিষয়গুলো বেমালুম ভুলে গিয়ে বা চেপে গিয়ে অসভ্য মধ্যযুগীয় ম্যাকিয়াভেলিয়ান ক্যারেক্টারের দিকে ফিরে যাচ্ছে। রাষ্ট্র যখন এমন পেছন দিকে দৌড়ায়, ইতিহাসের শিক্ষা এই যে জনগন তখন রাষ্ট্রকে ত্যাগ করে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে। বাংলাদেশে এখন সেই নৈরাজ্যের যুগ চলছে।নৈরাজ্যর পথে হেটে আমরা যাচ্ছি ব্রাহ্মণবাড়িয়া টু মোল্লানগর।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “ব্রাহ্মণবাড়িয়া টু মোল্লানগর

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

9 + 1 =