ধর্মের নামে হিন্দু নিধনের রাজিনীতি !

শুরুটা হয়েছে ৪৭ এর দেশ ভাগের পর থেকে।
আর আমি শুরু করতে চাই ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে ।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের একতরফা নির্বাচনে যশোহরের মালোপাড়া থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে হেরে যায়। তখন ভয়ানক এক হামলা চালানো হয় মালোপাড়ারা হিন্দুদের উপর। তাৎক্ষণিক সেটাকে জামাত-বিএনপির হামলা বলে চালানো হলে এর ন্যাপথ্যে রয়েছিলেন আওয়ামী লীগের পরাজিত প্রার্থী । তার ধারণা সে হিন্দুদের ভোটের কারণে হেরে যায়। তখন জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো ফটোশপ করে কিছু মহিলার কপালে সিধুর লাগিয়ে সাম্প্রদায়িক হামলার উস্কানি দিয়েছিল। আর সেই কাজটা করেছিল উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে শুধু হিন্দুরা সেই নির্বাচনে ভোট দিয়েছে সেটা জামাত-বিএনিপি কে বুঝানোর জন্য। আর এই অফারটা লুফে নীল আওয়ামী লীগের পরাজিত প্রার্থী। তার নেতৃত্বে মালোপাড়ায় হামলা হয়েছিল।

আমি তখন মালোপাড়া পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। সবাইকে জিজ্ঞেস করলাম কারা হামলা করেছে? কেউ সাহস করে কিছুই বলেননি । আমি এবার একজন একজন করে ঘরে ঢুকে আলাদা ভাবে কথা বলতে লাগলাম। নিজের পরিচয় দেয়াড় পর তাড়াও মুখ খুলতে লাগলো। খুব দোরে, ভয়ে তারা বলতে লাগলেন আওয়ামী লীগের পরাজিত প্রার্থী এই হামলা চালিয়েছে। সেটা নিশ্চিত হলাম আর একদিন পর । যখন দেখলাম থানায় মামলা নিচ্ছে না। জামাত – বিএনপি র হামলা হলে ত পুলিশ মামলা নেয়াড় কথা, তাহলে এর পেছনে ক্ষমতাবান এমন কেউ আছেন যে প্রশাসন মামলা পর্যন্ত নিচ্ছেন না। সেই হামলার পর গণজাগরণ মঞ্চ মালোপাড়ায় তাৎক্ষণিক ত্রাণ ও সহায়তা নিয়ে ছুটে গেলে ক্ষমতাসীনরা কেউ পরের এক সপ্তাহেও যায়নি সেই মালোপাড়ায়।
বুঝা যায় ক্ষমতাসীনরাও হিন্দুদের উপর রাগ করেছেন।

তারপর থেকে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হিন্দুদের উপর হামলা হয়েছে। মন্দির ভাঙ্গা হয়েছে, পুরোহিত হত্যা করা হয়েছে, হিন্দুদের জোড় করে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে, হিন্দু বাড়ি দখল করা হয়েছে। ২০১৪ সালে হিন্দু সম্পত্তি দখল করার অনন্য নজির স্থাপন করেছে ফরিদপুরের রাজাকার নূরু মিয়াঁর ছেলে সাবেক রাজাকার ও বর্তমানে শেখ হাসিনার বেয়াই ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন। এক হিন্দু পরিবারকে রাতারাতি ভারতে চলে যেতে বাধ্য করেন এই জাতীয় বেয়াই মোশারফ। এই নিয়ে প্রতিবেদন করলে সাংবাদিক প্রবীর শিকদার কে ৫৭ ধারায় মামলা করে হাতে হ্যত কড়া লাগিয়ে জেলে পাঠিয়েছিলেন । ২০০১ সালে বিএনপির হামলায় পা হারানো প্রবীর শিকদারের অথচ হাতকড়া লাগানোর কোন দরকার ছিল না। যেখানে কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী রাজাকার সাঈদী,কাদের মোল্লা, গোলাম আযমেরা কোটে হাজিরা দিয়েছেন কোন হাতকড়া ছাড়া।

২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতকে দিয়ে আওয়ামী লীগ আরেক ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতির চর্চা শুরু করে। মূলত বিএনপি-জামাত আর জাতীয় পার্টি এই সমাবেশ ঘটানোর সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলে আসল কলকাঠি পেছন থেকে নেড়েছে আওয়ামী লীগ। তার কিছু প্রমাণ দেই। মাওলানা আহম্মদ শফি ওরফে তেঁতুল শফি তৎকালীন আওয়ামী প্রবেশ ও বনমন্ত্রী হাসান মাহমুদের আপন খালু। ঢাকায় হেফাজতের শোডাউনের পেছনে এই হাসান মাহমুদের হাত রয়েছে। সে প্রকাশ্যে ও গোপনে হেফাজতি বদমাইশ দের সাথে একাধিক বৈঠক করেছিলেন। পরে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা , শেয়ার বাজারের কালপ্রিট , দরবেশ বাবা সালমান এফ রহমান হেলিকপ্টার পাঠিয়ে তেঁতুল শফিকে ঢাকায় নিয়ে আসে। হেফাজত ঢাকায় এসে এবং সারাদেশে তান্ডভ চালালে আজ পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার কিংবা বিচার সরকার করেনি। হেফাজতের দাবি সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী তাদের হাজার হাজার মাদ্রাসা ছাত্র, মোল্লা দের হত্যা করেছে। পরবর্তিতে মৃত ব্যক্তিদের জীবিত নানা মাদ্রাসা থেকে ৭১ টেলিভিশনের প্রতিবেদক ফারজানা রূপা সমীকরণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তুলে আনলে সরকার বা প্রশাসন এসবের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি। অথচ একি অপরাধে এনজিও কর্মী আদিলুর রহমান খান এখনো কারাগারে আটক।

আদিলুর রহমান গ্রেফতার হলেও একি অপরাধে হেফাজতের কেউ গ্রেফতার হলনা কেন? আপানদের কাছে আমার জিজ্ঞাসা।
মূলত হেফজতের সাথে এটাই ছিল আওয়ামী লীগের চুক্তি। যার বিনিময়ে চট্টগ্রামে ২৭ কাঠা রেলওয়ের জমি তেঁতুল শফির ছেলে আনাস মাদানির নামে বন্দোবস্ত দেয় রাষ্ট্র। হেফাজতের সবাবেশ ঘটিয়ে এবং লাল পানি মেরে আওয়ামী লীগের লাভ কি হল?

হুম অবশ্যয় লাভ হয়েছে। হেফাজতকে দিয়ে এই ভেলকি বাজীর নাটক করিয়ে পরের বছর ৫ জানুয়ারি মার্কা একখান একতরফা নির্বাচনের আয়োজন করেছিল।
সম্প্রতি ৩০ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগরে ইসলাম অবমাননার অভিযোগ তুলে সমাবেশ করে হেফাজতে ইসলাম সহ কিছু জঙ্গিবাদী সংগঠন। আর এসব সমাবেশে প্রশাসনের কর্তা ব্যাক্তি সহ ক্ষমতাসীন আওইয়ামী লীগের নেতাদের দেখা গেছে। তারা এইসব জঙ্গি গোষ্ঠীর দাবির পক্ষে জ্বালাময়ী বক্তৃতাও দিয়েছে। যার ফল হিসেবে নাসিরনগরে ৪ শ বাড়ি ঘরে ভাংচুর, হামলা, লুটপাট, অগ্নি সংযোগ , মন্দির ও প্রতিমা ভাঙা হয়েছে ৭১ এর পাকিস্তানি কায়দায়। এই বর্বরতার আশ্রয় প্রশ্রয় আর মদদ দাতাও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা।

নাসির নগরে হামলায় বাংলাদেশের সর্বস্তরের বিবেকবান মানুষের বিবেক নাড়া দিলেও স্থানীয় সাংসদ ও মৎস্য পশু সম্পদ মন্ত্রী ছায়দুর রহমানের ঘুম তখনো বাঙ্গেনি। আর যখন ঘুম ভাঙল তখন তিনি ৭১ এর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সর্দার হয়ে বললেন – ” নাসিরনগরে কিছুই হয়নি সব মালাউনের বাচ্চা আর সাংবাদিকদের বাড়াবাড়ি” । এর আগে প্রকাশ্যে সনাতন ধর্মাবলম্বি দের মালাউন বলে গালি দিয়েছিলেন যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসি হওয়া বিএনপি নেতা ও রাজাকার সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। আর এবার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দল আওয়ামী লীগের মন্ত্রী সাহেব মালউন বলে হিন্দুদের অফিশিয়ালি স্বীকৃতি দিলেন। সেই সাথে স্থানীয় উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তাও এক হাত নিলেন সাংবাদিকদের।

আর আমাদের মহারানীর ত এখনো ঘুমও ভাংগেনি। কখন ভাঙবে সেটও কেউ জানে না। অনুভূতির নব্য ইজারাদার আওয়ামী লীগ এখনো কোন দলীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। আর প্রশাসনতো এখানে মডারেটরের ভূমিকা পালন করে আসছে সেই উস্কানির দিন থেকে।

এই রেশ কাটতে না কাটতে গত রাতে অর্থাৎ ৪ নভেম্বর আবারো নাসিরনগরে ৫ টি হিন্দু বাড়িতে আগুন দেয়া হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে হিন্দুদের উপর অত্যাচার করে আওয়ামী লীগের লাভ কি ? সবাই ত জানে হিন্দুরা আওয়ামী লীগ করে আর নৌকায় ভোট দেয় আদিকাল থেকে। তাহলে কেন আওয়ামী লীগ অত্যাচার করবে?

৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের পর মূলত দেশে বিরোধী দল বলে আর কিছু থাকল না। গৃহপালিত যে বিরোধীদল আছে বিশ্ব বেহায়া এরশাদের জাতীয় পার্টি সেটা তো সরকারের চাইতেও বড় সরকারি পার্টি। বিএনপির একাধিক ব্যর্থ আন্দোলন, জ্বালা, পড়াও, এসব করে প্রায় নিঃশ্বষ অবস্থা। আওয়ামী লীগ ভবতে শুরু করেছে আগামীতে নিকট ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগ কে কেউ ক্ষমতা থেকে সরাতে পারবেনা। তারা আগামী ত্রিশ বছর ক্ষমতায় থাকবে। আর তার জন্য রূপকল্প ৪১ তারা প্রণয়নও করে রেখেছে। তাই তাদের আর হিন্দু ভোটের দরকার নাই। এখন দরকার হিন্দুদের সম্পত্তি।

এই দেশে হিন্দু থাকলেও আওয়ামী লীগের লাভ, চলে গেলে আওয়ামী লীগের লাভ। থাকলে ভোট পাবে, চলে গেলে সম্পত্তি পাবে। তারা এখন দ্বিতীয় নীতি অবলম্বন করছে। হিন্দু উচ্ছেদ করে জায়গা জমি দখলের নীতি। আপনি যদি বাড়ির আশপাশ থেকে ভারতে চলে যাওয়া হিন্দু সম্পত্তির খোঁজ নেন দেখবেন সেগুলো সরকারি দোলের নেতাদের কাছে আছে। কাগজ পত্রে কেনা সম্পত্তি দেখালেও আসলে প্রাণ ভয়ে হিন্দুরা এসব সম্পত্তি বিনে পয়সায় নেতাদের নামে দিয়ে চলে গেছে।

এইযে ধর্মের নামে হিন্দু নিধনের রাজনীতি চলছে তার আমদানি কারক ছিল জামায়াতে ইসলামী। আর সেটার সুফল ভোগ করছে বর্তমান ক্ষমতাসীন দোল আওয়ামী লীগ । অনুভূতির ইজারা নিয়ে একটা আইন বানাইল ৫৭ ধারা। এই ধারায় শুধু মুসলমান আর প্রধানমন্ত্রী পরিবারের অনুভূতি রক্ষা করা হয়।
বাকি সব অনুভূতি মুড়ি খায়।
৭২ এর সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক এই ৫৭ ধারা আইনটি ব্যবহার কিংবা অপব্যবহার করে মূলত ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের মত দেশে একতরফা ধর্মের চাষাবাদের ব্যবস্থা চলছে। ইসলামী টেরোরিসট দের এক প্রকার প্রণোদনা হিসেবে কাজ করছে এই ৫৭ ধারা। কাউকে নাজেহাল করতে হলে, কিংবা কোন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর সংগঠিত হামলা চালাতে হলে কেবল এই অনুভূতি অস্রই চালিয়ে দেয়া হচ্ছে।
একি কায়দায় রামুতে ৩০০ বছরের পুরানো বৌদ্ধ মূর্তি বেঙ্গে দেয়া হইছে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

69 + = 73