আন্ডারস্ট্যান্ডিং মুহাম্মদ, মূল – আলি সিনা , ভাষান্তর-দুরের পাখি ; পর্ব-১২

মওদুদি , কুতুব এবং আরো অনেক ইসলামি চিন্তাবিদ এ সম্পর্কে ভালো জানেন । তারা এই সুরাকে ধর্মীয় সহিষ্ণুতার প্রচার হিসাবে দেখেন না । মওদুদি তার তাফসিরে এই সুরা নিয়ে লিখেন ,

“এই সুরাকে যদি এর নাযিলের পটভূমির সাথে মিলিয়ে দেখা হয় তাহলে দেখা যাবে এটা কোনভাবেই ধর্মীয় সহনশীলতার শিক্ষা দিচ্ছে না , যেমনটি আজকের দুনিয়ার অনেকে মনে করে থাকে । এতে বরং পোত্তলিকদের ধর্ম, ধর্মীয় আচার, তাদের দেবতা থেকে মুসলিমদের অবস্থানকে পরিষ্কারভাবে আলাদা করে দেখানো হয়েছে । এবং পৌত্তলিকদের ধর্ম ও ধর্মীয় আচার নিয়ে মুসলিমদের ঘৃণা এবং সম্পূর্ণ অসম্পৃক্ততা বর্ণনা করা হয়েছে এবং পরিষ্কার ভাবে অবিশ্বাসীদের বলে দেয়া হয়েছে কাফির এবং মুসলিমরা কখনোই কোন অবস্থাতেই এক হতে পারে না । মক্কার পৌত্তলিকরা মুসলিমদের প্রস্তাব দিয়েছিলো মোহাম্মদ যদি তাদের দেব দেবীদের স্বীকার করে নেয় তাহলে তারাও মোহাম্মদের আল্লাহকে স্বীকার করে নেবে । তাদের এই প্রস্তাবের জবাবে সুরাটি নাযিল হলেও, যেহেতু এটা কোরানের অংশ এবং সেহেতু এর মাধ্যমে কেয়ামত পর্যন্ত মুসলিমদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে অবিশ্বাসীদের সাথে কোনপ্রকার সমঝোতায় না আসার জন্য । এর মাধ্যমে আল্লাহ মুসলিমদের নির্দেশ দিচ্ছেন মুসলিমরা কখনোই কথা বা কাজে অবিশ্বাসীদের সাথে মিলতে পারবে না এবং বিশ্বাসের ব্যাপারে বিন্দুমাত্র ছাড় বা সমঝোতা করতে পারবে না অবিশ্বাসীদের সাথে । এই কারণেই মূল প্রস্তাবণাকারী পৌত্তলিক এবং যাদের উদ্দেশ্যে এই সুরা নাযিল হয়েছে তাদের মৃত্যুর পরেও এই সুরা পঠিত হয়ে আসছে এবং এই সুরা নাযিলের সময় যেসব লোক অমুসলিম ছিলো কিন্তু পরে মুসলিম হয়েছে তারাও এই সুরা পাঠা করে আসছে । শতাব্দীর পর শতাব্দী পার হয়ে যাবার পরেও মুসলিমরা এই সুরা পাঠ করে আসছে কাফেরদের বিশ্বাস নিয়ে তাদের ঘৃণা প্রকাশে, এবং কাফেরদের সাথে তাদের যে কোন সম্পর্ক হতে পারে না এটা ইসলামিক বিশ্বাসের একটি নিরন্তর দাবী । “

মদীনায় হিজরত

অনেকগুলো সন্তান সন্ততির দেখাশোনাতে এবং নিজ ধ্যানে মগ্ন স্বামীর সেবা করতে গিয়ে খাদিজা তার ব্যাবসায় মনোযোগ দিতে ব্যার্থ হয় । ফলস্বরুপ খাদিজার মৃত্যুর পর পরিবারটি দরিদ্র হয়ে পড়ে । খাদিজার মৃত্যুর কিছুদিন পরেই মোহাম্মদের অন্য ভরসাস্থল তার চাচা আবু তালিবও মারা যান । এই দুই শক্তিমান ভরসাস্থল হারিয়ে , এবং মক্কার মানুষের কাছ থেকে পাত্তা না পেয়ে এবং মদীনার কিছু লোকের কাছে সহায়তার আশ্বাস পেয়ে মোহাম্মদ মদীনা চলে যাবার স্বিদ্ধান্ত নেয় । সে তার অনুসারীদের আগে চলে যাবার নির্দেশ দেয় । অনুসারীদের কেউ কেউ অতটা আগ্রহ দেখাচ্ছিলো না । মোহাম্মদ তাদের বলে যে, তারা যদি না যায় তাহলে তারা, “জাহান্নামবাসী হবে” ।

মোহাম্মদ নিজে রয়ে গিয়েছিলো । তারপর এক রাতে সে দাবী করে আল্লাহ তার কাছে প্রকাশ করেছেন যে মক্কাবাসীরা তাকে আক্রমণ করতে চাইছে । সে তখন তার ঘনিষ্ঠ সঙ্গী আবু বকরকে বলে তার সাথে গোপনে সওয়ারি হওয়ার জন্য । নিচের আয়াতটিতে সেই বর্ণনা আছে ,

“আর কাফেরেরা যখন প্রতারণা করত আপনাকে বন্দী অথবা হত্যা করার উদ্দেশ্যে কিংবা আপনাকে বের করে দেয়ার জন্য তখন তারা যেমন ছলনা করত তেমনি, আল্লাহও ছলনা করতেন। বস্তুতঃ আল্লাহর ছলনা সবচেয়ে উত্তম।” কোরান (৮-৩০)

এই আয়াত পড়লে দেখা যাচ্ছে আল্লাহ অনুমান করছেন মক্কাবাসীরা কি করতে চাচ্ছে (বন্দী করা, হত্যা করা, বের করে দেয়া), তিনি নিশ্চিত নন । সর্বজ্ঞানী আল্লাহ নিশ্চিতভাবে জানেন না ?! এই আয়াত কি আসলে প্যারানয়েড কোন মানুষের মানসিক অবস্থার পরিচায়ক না ? মোহাম্মদ মক্কায় তের বছর কাটিয়েছে মক্কার লোকজনকে বিরক্ত করে, তাদের ধর্ম এবং দেব দেবী নিয়ে উপহাস করে , ঠিক যেভাবে এখনকার মুসলিমরা অন্য ধর্ম নিয়ে করে । তবু তারা মোহাম্মদকে সহ্য করে গেছে । মোহাম্মদের নিজের দাবী ছাড়া অন্য কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই যে মক্কার লোকজন তার ক্ষতি করার চেষ্টা করেছে ।

মুসলিমদের নিজেদের রচিত ইতিহাসেই মোহাম্মদের উপর নির্যাতনের কোন শক্ত প্রমাণ নেই । কুরাইশদের বর্ষীয়ানরা মোহাম্মদের অপমানে ত্যাক্ত বিরক্ত হয়ে তার চাচা আবু তালেবের কাছে গিয়ে বলে , “তোমার ভাতিজা আমাদের দেব দেবী এবং ধর্ম নিয়ে খারাপ কথা বলে, আমাদের অপমান করে, হাঁদা বলে , আরো বলে যে আমরা এবং আমাদের পূর্বপুরুষরা সবাই জাহান্নামি । হয় তুমি এর বিচার কর (যেহেতু তুমি আমাদের পক্ষেরই লোক), অথবা ওর বিচারের ভার আমাদের উপর ছেড়ে দাও । (টীকা-৩০)

এইধরণের ভাষা এবং ভঙী নির্যাতনকারীর হতে পারে না । এটা বরং অনেকটা অনুরোধের মত এবং মোহাম্মদকে সতর্ক করে দেয়া যে সে যাতে আর তাদের দেব দেবীদের অপমান না করে । এর সাথে মোহাম্মদের কিছু কার্টুন নিয়ে বর্তমান যুগের মুসলমানদের প্রতিক্রিয়াকে মিলিয়ে দেখুন । মুসলিমরা নৈরাজ্য করে, এবং অনেক দূরের দেশ যেমন নাইজেরিয়া, তুরস্ক এসব জায়গায় শত শত মানুষকে হত্যা করে, যাদের সাথে এইসব কার্টুনের কোন সম্পর্ক নাই । সেখানে মক্কার লোকজন তের বছর ধরে তাদের দেব-দেবী নিয়ে মোহাম্মদের নিরন্তর অপমানকে সহ্য করে গেছে ।

যেই রাতে মোহাম্মদ তার বিশ্বস্ত সংগী আবু বকরকে নিয়ে মদীনার উদ্দেশ্যে রওনা হয়, সেই রাত থেকে ইসলামিক ক্যালেন্ডারের শুরু । মদীনার আরবরা মক্কার লোকজনের চাইতে কম সম্ভ্রান্ত ছিলো । আর মোহাম্মদের জন্য আরো ভালো ছিলো যে, তারা মোহাম্মদের চরিত্র এবং ইতিহাস নিয়ে কিছু জানতো না যা মক্কার লোকজন শিরায় শিরায় জানতো । এইসমস্ত কারণে মদীনার লোকজন মোহাম্মদের বাণী বিষয়ে একটু বেশি আগ্রহী ছিলো ।

তখনকার আরবে মোহাম্মদই একমাত্র নবী দাবীকারী ছিলো না । তার সমসাময়িক আরো আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে আরো কয়েকজন নবী দাবীকারীর কথা জানা যায় । সবচে বিখ্যাত ছিলো মুসাইলামা, যে মোহাম্মদেরও কয়েক বছর আগে থেকে তার নবী জীবনের শুরু করে । কিন্তু ইসলামের নবীর তুলনায় নিজ গোত্রের এবং নিজ শহরের লোকজনের কাছে সে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিলো । কৌতুহল-উদ্রেককরভাবে একজন নারী নবী দাবীদারের কথাও জানা যায় । সিজাহ নামের এক নারী নবীদার ছিলো যার মোটামুটি ভালোসংখ্যক অনুসারী ছিলো নিজ শহরে এবং নিজ গোত্রে । এই দুই নবীই একেশ্বরবাদের প্রচারক ছিলো । ইসলামপূর্ব আরবে নারীরা অনেকখানি সম্মানিত ছিলেন এবং তাদের অধিকারও আরো বেশি ছিলো, যা ইসলামের আগমনের পরে তারা আর কখনো পাননি আজ পর্যন্ত । এইসব নবীদের কেউই নিজ বাণী প্রচারের জন্য অথবা ডাকাতি করার জন্য সহিংসতার আশ্রয় নেয়নি । এদের কেউই ভূমি দখল করে সাম্রাজ্য তৈরী করতে চায়নি বরং বাইবেলের নবীদের ঐতিহ্য অনুসারে তাদের আশেপাশের লোকজনকে ঈশ্বরের উপাসনার জন্য ডাকতো । মোহাম্মদ ছিলো আরবের একমাত্র যোদ্ধা-নবী । উপরে বর্ণীত নবীরা কেউই একজন আরেকজনের শত্রু ছিলো না । তারা আধিপত্য বিস্তার নিয়ে কলহে জড়াতো না ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “আন্ডারস্ট্যান্ডিং মুহাম্মদ, মূল – আলি সিনা , ভাষান্তর-দুরের পাখি ; পর্ব-১২

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

39 + = 44