নাসিরনগরের হামলাকারীরা কেউ নেপচুন গ্রহ থেকে আসেনি

নাসিরনগর ট্র্যাজেডি ছোটখাট মানুষের ঘর হারানোর কষ্ট; মাথার ওপর অনিশ্চয়তার আকাশ নেমে আসার বেদনা। এই যে রসরাজ নামের একজন ক্ষুদ্র মানুষ; যে লেখাপড়া জানেনা; ফেসবুক চালানোই প্রায় অসম্ভব যেখানে তার জন্য; সেখানে সে একটি ফটোশপ ফেসবুকে আপলোড করেছে; এটা বিশ্বাস করা কঠিন। তবুও সে গ্রেফতার হয়েছিলো। তার একটি ছবি দেখলাম; পা দুটো মুড়ে মেঝের ওপর বসে আছে গ্রেফতার হবার পরে। নাসিরনগর তাণ্ডবের আরো কিছু ভিডিও ফুটেজ দেখলাম; স্থির চিত্রে আটকে গেলো চোখ। বোঝা কঠিন এটা ১৯৪৭ সালের ছবি নাকি ১৯৭১ সালের ছবি নাকি ২০১৬ সালের ছবি। বেহুলা বাংলার নিয়তি বুঝি বদলাবার নয়।

?itok=aRq9r_vO” width=”500″ />

আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম, শুধু নাসিরনগর নয় গোটা দেশেই হিন্দু ধর্মের ছোটখাট মানুষদের ওপর চলমান নির্যাতন অবসানে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে গড়ে উঠবে জন-আন্দোলন। কিন্তু সে যে হবার নয়। নাসির নগরের হিন্দুপল্লীতে তাণ্ডবের সংবাদ শিরোনামটিকে সরিয়ে দিলো পশুসম্পদমন্ত্রীর ব্যবহৃত একটি অনভিপ্রেত শব্দ “মালাউন”। যে শব্দটি ১৯৪৭-এর আগের “আশরাফ মুসলমান”-দের ব্যবহৃত। ১৯৪৭-এর আগে থেকে “বর্ণ হিন্দু কতিপয়” নিম্নবর্গের মুসলমানদের “ম্লেচ্ছ”/”নেড়ে” ইত্যাদি শব্দ বলতেন অজানা আত্মম্ভরিতায়। একই রকম আত্মম্ভরিতায় আশরাফ মুসলমানরা নিম্নবর্গের হিন্দুদের “মালাউন” বা “মালু” বলে অপমান করতেন। সমাজের মাঝে এই শব্দগুলো হিন্দু ও মুসলমানদের পরস্পরকে অপমান করার জন্য ক্রমাগত ব্যবহৃত হতে থাকে। রোমান মব থেকে বাংলার মবের মনোজগত যেহেতু একই; মুহূর্তে তেতে ওঠা; তাই আশরাফ মুসলমান ও উচ্চবর্ণের হিন্দুরা এই বিদ্বেষের শব্দাবলী প্রান্তজনের মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে একসঙ্গে বসে মুজরা দেখেছে লাখনাউ থেকে বাঈ আনিয়ে। বাঈ যখন নাচতো তখন আমোদে চোখ মুদে আসতো অভিজাত হিন্দু-মুসলমান ভাতৃদ্বয়ের। আর তাদের জ্বেলে দেয়া ঘৃণা-বিদ্বেষের আগুণে ছারখার হতো নিম্নবর্গের হিন্দু-মুসলমানের ছোট ছোট কুঁড়েঘর।

নাসিরনগরের ঘটনাতেও তার অন্যথা হয়নি। পুড়ে যাওয়া বাড়ির খুঁটি ধরে অশ্রু শুকিয়ে যাওয়া চোখে তাকিয়ে থাকা বেহুলার কষ্টের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ালো সুখে চর্বি জমে যাওয়া হিন্দু-মুসলমানের পলিটিক্যালি ইনকারেক্ট মালাউন শব্দে “অনুভূতি”-তে আঘাত পাবার ঘটনাটি। এমপ্যাথি বা সমানুভূতি বোধের অনুপস্থিতির কারণেই এমনটা ঘটে। পাকাবাড়িতে শুয়ে পুড়ে যাওয়া কুঁড়ে ঘরের মানুষের ছোট-খাট হিন্দুর কষ্ট বুঝতে যে এমপ্যাথি বা সমানুভূতি দরকার; তা যে নেই কারো। কিছু কথিত সেক্যুলার মুসলমানেরও একই অবস্থা; সংকটের সমাধান না করে; যা কিছু ফ্যাশানেবল তাই করে ছদ্ম উত্তেজনা লাভের বাতিক তাদের।

নাসিরনগরের ঘটনাটি যারা ঘটিয়েছে; তারা কেউ নেপচুন গ্রহ থেকে আসেনি। এই হামলার প্রতিটি ধাপে অপরাধীদের ভূমিকা দৃশ্যমান। মূল অপরাধীরা যেখানে চিহ্নিত; সেখানে হাজার হাজার “অজ্ঞাতনামা ছোটখাট” মুসলমানের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। নিরাপরাধ ছোটখাট হিন্দুদের মতই নিরাপরাধ ছোটখাট মুসলমানের ওপর খড়গ নামিয়ে এ বিচারহীনতার সংস্কৃতি অব্যাহত থাকবে। তাদের প্রতি কোন সহানুভুতি চর্বিজমা মুসলমান-হিন্দু কারোরই নেই।

এরপর আছে আওয়ামী লীগ-ওলামা লীগ বনাম বিএনপি-জামাতের পরস্পর দোষারোপ করার পুনরাবৃত্তিকর খেলা। আওয়ামী ধামাচাপাজীবীদের কাজই হচ্ছে নানান অঙ্গভঙ্গিতে দোষটি বিএনপি-জামাতের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া; বিএনপির ধামাচাপাজীবীদের কাজও একই, এই সরকার ব্যর্থ বলে ভেংচি কাটা। যেন তারা জানে সফল রাষ্ট্র চালানোর পদ্ধতি। এরা সেই ১৯৪৭ আগের মুসলমান সাহেব-হিন্দু বাবুদের মতো; অনুভূতি ও ধামাচাপার রাজনীতি করে। আওয়ামী লীগ-বিএনপির বেয়াই যুগল যখন ব্যাংককে হেলথ টুরিজমে; তাদেরই সৃষ্ট বিভাজনের আগুণে পুড়তে থাকে প্রান্তজন। দরিদ্র হিন্দু-মুসলমান ঘুরতে থাকে নিয়তির দুর্লঙ্ঘ চক্রে।

সেই কোনকালের কিছু পচা মুসলমান ও পচা হিন্দুর ঘৃণার আদিমতা খুব গোপনে লালন করে চলেছে চর্বিযুক্ত “হ্যাভেরা”। আর “হ্যাভস-নট”-দের জন্মই যেন আজন্ম পাপ। অসাম্প্রদায়িকতা শব্দটি তোতা-পাখির মত আউড়ে লাভ হয়না। ধর্ম-বর্ণ-জাত-পাতের ওপরে মানুষ আত্মপরিচয়কে জায়গা দেবার জন্য সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি লাগে; যাপিত জীবনে এর অনুশীলন প্রয়োজন হয়। চিন্তার সীমাবদ্ধতার মাঝে আটকে থাকা ঠারে-ঠুরে সাম্প্রদায়িকতা তথা ঈর্ষা লালন করা নিওএলিট সমাজটি যতই রবীন্দ্র সংগীত শুনুক বা জালালউদ্দীন রুমি পড়ুক; আমরা বুঝতে পারি দিনশেষে এরা আত্মকেন্দ্রিক মানুষ; উঞ্ছমানুষ।

নইলে সংকটের ফোকাস বদলে একটি শব্দকে নিয়ে উঠে পড়ে লাগার সময় কেউ পেতো না।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 11 = 14