ইতিহাস পাতিহাঁস

ইতিহাস জিনিসটা বাংলা সিনেমার মতো সরলরৈখিক কোন গল্প নয়। পৃথিবীর ইতিহাস সোজা পথে হাটেনা। একই সময়ে অনেকগুলো প্রভাবক উপাদান কাজ করে নির্মাণ করে জটিল বাস্তবতা। ঘটনার বহুকাল পরে প্রত্নতাত্ত্বিক বা ঐতিহাসিক সেই ঘটনা সম্বন্ধে অনুসন্ধান করে একটা বিজ্ঞানসম্মত আখ্যান তৈরির চেষ্টা করে। একই বিষয়ে বিভিন্ন জনের আখ্যান তাই বিভিন্ন হয়। তেমনি ঘটেছে আমাদের ভারতবর্ষেও।

ব্রিটিশ ঐতিহাসিক ভিনসেন্ট স্মিথ বিশ শতকের গোড়ার দিকে Early History of India তে লিখেছেন যে ভারতবর্ষে ১০০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে আক্রমনকারীর বেশে আসা বহিরাগত মুসলমানেরা জবরদস্তি এবং ধর্মান্তকরণের মাধ্যমে ভারতে ইসলাম প্রচার করেছে। আর মার্কিন ঐতিহাসিক রিচার্ড ইটন তাঁর Religious Conversion in India এবং Temple Desecration and Indo-Muslim states প্রবন্ধদ্বয়ে এই শতকের শুরুতে একই বিষয়ে লিখেছেন যে বিজয়ী বহিরাগত মুসলমানেরা অস্ত্র দিয়ে কিংবা জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেনি। হিন্দুত্ববাদীদের উত্থাপিত দিল্লি সালতানাত এবং মুঘল শাসনামলে মুসলমান কতৃক ৬০০০০ মন্দির ধ্বংসের ইতিহাসের জবাবে তিনি ভারতবর্ষে মাত্র আশিটি মন্দির ভাঙার ঘটনা খুঁজে পেয়েছেন। বলেছেন ইসলামকে জনপ্রিয় করেছে সুফীরা, তবে ধর্মান্তরিত করেনি তারা। ইসলাম অনুসারীদের সংখ্যা বেড়েছে পুরো মধ্যযুগ ধরে খুবই নগন্য হারে। হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদের অত্যাচার থেকে মুক্তি পাবার জন্য প্রচুর নিম্নবর্গের এবং বর্ণের হিন্দু মুসলমান হয়েছে এই ইতিহাসকেও তিনি মিথ্যা বলেছেন। মিথ্যা বলেছেন এই শর্তে যে ওই ৬০০০০ মন্দির ধ্বংস এবং হিন্দুদের ব্যাপক ধর্মান্তরের কোন আর্কিওলজিক্যাল এভিডেন্স তিনি পাননি। তিনি অবশ্য স্বীকারও করেছেন যে ৮০ টির চাইতে বেশী মন্দির হয়তো ধ্বংস করা হয়েছে, এবং ধর্মান্তরিত করারও কিছু ঘটনার উদাহরণ আছে। তবে সেটা ইতিহাসের মূলধারা নয়। ভিনসেন্ট স্মিথের দুর্বলতা মানছি। তবে আচার্য যদুনাথ সরকার যে চল্লিশ বছরের গবেষণায় আওরঙ্গজেবের বিশালাকার জীবনে লিখলেন সেসব তো একেবারে ফেলে দেওয়া যায়না। রমেশ চন্দ্র মজুমদারকে সাম্প্রদায়িক আখ্যা দিয়ে তাকে বাতিল করে দেওয়া যায়না। ভারতবর্ষের মোঘল আমলের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ইতিহাস লিখেছেন ইরফান হাবিব, ডি ডি কোশাম্বি, রমিলা থাপার এবং সুমিত সরকার। রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে এদের ঝোক নেই। আমার কাছে মনে হয় এইখানে আমাদের জন্য একটা শিক্ষনীয় বিষয় আছে। কে কবে মন্দির ভেঙেছে, কে কোনদিক থেকে বারো জন অশ্বারোহী নিয়ে আক্রমণ করেছে আর কে পেছনের দরজা দিয়ে পরনের কাপড় মাথায় তুলে ভো দোড় দিয়েছে, সেন বংশের কোন হিন্দুর শাসনামলে ব্রাহ্মণ্যবাদ জেঁকে বসেছে এইসব সাম্প্রদায়িক পাঁচালি পড়া বাদ দিয়ে জাতির নতুন ইতিহাস সৃষ্টির দিকে নজর দেওয়া উচিত। কারণ আমাদের নিকট ইতিহাসের কোন পর্যায়েই আমরা শাসক ছিলাম না, নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে ছিলোনা, আমাদের ইতিহাস আমরা লিখিনি, এমনকি ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারনী ভূমিকাতেও ছিলাম না আমরা। আমরা ছিলাম শুধুই প্রজা,কেবল শাসিত এবং শোষিত।ব্রিটিশ উপনিবেশের হাত থেকে মুক্তি এবং আরো স্পষ্ট করে বললে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ, আমাদের নিজেদেরকে নিজেরাই শাসন করার, নিজেদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের এবং ইতিহাস নির্মানের সেই এতোকালের অধরা সুযোগটা করে দিয়েছে। এখন ওসব রাজনৈতিক সাম্প্রদায়িক ইতিহাসের পাঠ বাদ দিয়ে নতুন করে জাতীয় ইতিহাস সৃষ্টির জন্য মনোনিবেশ করা উচিত। তার মানে এই নয় যে ইতিহাসকে অচ্ছ্যুৎ করে রাখবো। ইতিহাস পাঠের ক্ষেত্রে শুধু মনে রাখবো যে এই ইতিহাসই চূড়ান্ত নয়। নেপোলিয়নের কথাটা স্মরণ করা যেতে পারে -History is a myth agreed upon. আমি যে এই সাম্প্রদায়িক ইতিহাস পাঠ বাদ দিতে বলছি সেটাই আমার ইতিহাস পাঠের শিক্ষা।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 20 = 23