যে রাতে মোর ভাঙলো দুয়ারগুলি…!

প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টির রাত ছিলো সে রাতে। ঘরের ভেতর থেকেই বাড়ির ঘাটের ভাসান পানির শব্দ পাওয়া যাচ্ছিলো। ছলাৎছলাৎ শব্দ করে ঢেউয়ের পানি এসে ছিটকে পড়ছিলো উঠোনে। সে কি ঝড়-তুফান। মনে হচ্ছিলো আজ আর রেহাই নেই। সব ভেসে যাবে হাওড়ে। হাওরপাড়ে এরকম চিত্র হরহামেশাই হয়। আবার ঝড়জল শেষে সব শান্ত-সুনশান।

সেই রাত আজও ভুলতে পারেনা লক্ষীরানি। এই রকম ঝড়জল ছাপিয়ে হঠাৎ শোরগোল উঠলো ডাকাত পরেছে রে, কে কোথায় আছো বের হও! এইরকম বার কয়েক ঝড়জল ছাপিয়ে কোরাস শব্দ ভেসে আসে। কিন্ত যা হওয়ার হয়ে গেছে। এতক্ষণে ডাকাতদের নিয়ন্ত্রণে পুরো পাড়াটা। ভাটির বিস্তির্ন এই ছোট্ট কয়েকটি পাড়া মিলিয়ে ঘিঞ্জি গ্রামটির এক পাড়া ডাকতদের কব্জায় তখন। কয়েকটা ইঞ্জিনচালিত বড় বড় নৌকা করে এই ডাকাতরা পুরো পাড়াটায় নৌকা ভিড়িয়ে উঠে নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে এসেছে। বর্ষাকালে এইসব ভাটির গ্রামগুলি যেনো গভীর সমুদ্রের মধ্যে একেকটা নির্জন দ্বীপ। দূর থেকে হঠাৎ কেউ দেখলে তাই ভাববে।

রাত আসলে পরে এইসব অঞ্চলে যেনো ভীতি-
সন্ত্রস্ততা ফেরি করে। অজানা শংকায় মন আকুলি-বিকুলি করে সবার। ছেলে-বুড়ো সবার মন কু-ডাক ডাকে। অমঙ্গলের আশংকায় শরীরমন শিউরে উঠে সবার। ডাকাতদের গল্প, ডাকাতের গল্প এইসব ভাটির জনপদগুলি ভগবান ইশ্বরের পরেই বেশি উচ্চারিত হয়।এইসব ভাসান জনপদগুলিতে রাতে পুরুষদের পালাক্রমে করে পুরো পাড়াটা পাহারা দিয়ে যেতে হয়। এমনি এক অভিশপ্ত রাতে সেদিন ডাকাত পরলো। চারদিকে চিৎকার চেঁচামেচি হইচইয়ের মধ্যেই আবার সব চাপা আর্তনাদে সব কেমন থেমেও গেলো। সব কেমন আবার ঝড়জলের মতো হঠাৎ নিমিষেই উদাও হয়ে গেলো। চারদিকে কেমন যেনো থম মেরে গেছে। ঝড়বৃষ্টি ছাপিয়ে ঘরের ভেতর কেমন বড়বড় দীর্ঘশ্বাসের শব্দই শোনা যাচ্ছে। বাইরে তখনো ঢেই আছড়ে পড়ছে। কখনো ঘরের টিনের বেড়ায় তা ছিটছে পড়ছে, ঢেউয়ের ছলাৎছলাৎ শব্দ ক্ষণে ক্ষণে শোনা যাচ্ছে। টিনের চালে গাছের ডালপালা বাড়ি খাচ্ছে।

এতোসবের মধ্যেও সব কেমন জানি থমকে গেছে, আটকে হাসফাস করছে। লক্ষীরানী ঘরের এক কোণে মায়ের আচল ধরে ভয়ে টকটক করে কাঁপছে। বড়ভাই সুশান্ত, প্রতিবন্ধী। সেও ঘোঁৎঘোঁৎ করে করে কেমন যেনো থম মেরে বসে আছে। ভয় তাকেও গ্রাস করেছে। যার কীনা ভয়ডর কি জানা নেই, সেও থ মেরে আছে। বছর দেড়েকের বসন্তুও প্রথমে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে কান্নাকাটি করছিলো এখন সেও সব বুঝতে পেরে সুবোধ বালকের ন্যায় গুম হয়ে মায়ের কোলে আঁচলে মুখ গুঁজে আছে।

ঘরের এককোণে সবাইকে দাঁড় করিয়ে রেখেছে ডাকাতেরা। ততক্ষণে সবাই বুঝে গিয়েছে আর কোনো লাভ নাই। শান্ত থেকে বরং এদের কথা মতো সব করলে অন্তত মারধর থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। বা প্রাণ বাঁচানো যাবে। একে একে সবগুলো চাবি এদের হাতে তুলে দেওয়া হলো। ট্রাংকের চাবি, সিন্দুকের চাবি সব।ভেতরের সবকিছু এরা তন্ন তন্ন করে দেখে বেছেবেছে প্রায় সবই নিচ্ছে। নগদ টাকাকড়ি সহ যাবতীয় গয়নাগাটি। তারপর এরা রুপো-পেতল-কাঁসার বাসন কোসনগুলো একে একে নৌকায় তুলে নিচ্ছে। কাপড়চোপড়ও বাদ যাচ্ছে না। তীক্ষ্ণ চোখে ঘরের সবকিছু দেখছে এরা। কোনো কিছুই বাদ যাচ্ছে না। তাদের ঘরে মোট চারজন ঢুকেছে। সবারই চোখ-মুখে কালোপট্টি বাধা। সবাই কেমন যন্ত্রের মতো কাজ করে যাচ্ছে। শুধু একজন ছাড়া। সে মাঝেমধ্যে এটাসেটা বলে নির্দেশ দিচ্ছে, হুকুম করে যাচ্ছে।

আজ এবেলায় সব মনে পড়ছে লক্ষীরানীর, সব। সব আজও কেমন স্পষ্ট মনে আছে। এই এতোকাল পরেও সব কেমন আজও চোখে স্পষ্ট চোখে ভাসে। স্পষ্ট। আজও এইসব স্মৃতি তাকে তাড়া করে। মনে পড়ে সেই ঘন কালো ঘুটঘুটে অন্ধকার রাতের কথা। ঝড়জলের রাতের কথা। সেই রাতের সেই হাওরের কান্নার কথা। উপছে পড়া ঢেউয়ের কথা। মা-বাবা, ভাই-বোনদের কথা।

হঠাৎ যেনো সেই সরদার গোছের লোকটি বলে উঠে- যা করার তাড়াতাড়ি কর। বেশি বিলম্ব করলে সব ভেস্তে যাবে। অন্য ডাকাতগুলোর কর্ম তৎপরতা তখন বেড়ে যায়। লোকটি আবার বলে- শেষ হলে পরে এই মহিলার কাছ থেকে গয়নাঘাটি সব খুলে নে। খুলতে হয়না। লক্ষীর মা সুনন্দারানী নিজ থেকেই ভয়ের চোটে সব ডাকাতদের হাতে তুলে দেন। মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন সুনন্দা। অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা লক্ষীর বাবা সমর দাশও যেনো কিছুটা হাফ ছেড়ে বাঁচেন। যাক এইবার তাহলে….

কিন্তু না সব নিয়েও তারা সেদিন যায় নি। তৃপ্ত হয়নি। অতৃপ্তির খেদ থেকেই তারা সেদিন দ্বারের দিকে যেতে যেতেই আবার ফিরে তাকায়। শিকারি যেমন শিকারের আনন্দে চোখ ঝলসে উঠে, চোখেমুখে খেলা করে শিকারের আনন্দে ঠিক তেমনি তাদের চোখমুখ। বিশেষ করে ডাকাতের সরদারের চোখমুখে সেই খেলাই দেখতে পান সুনন্দারানী। সে তার জায়গা থেকে একটুও নড়েনি। অন্যরা চলে যাচ্ছিলো ঠিকই কিন্তু এ লোক যায় নি, সরেনি এএক ইঞ্চিও। লক্ষীরানী তখন, সেদিন একটু কি বুঝতে পেরেছিলো? মনে হয়। কারণ ডাকাত সরদারের চাহনিটা যে তার উপর সরাসরি এসে পড়েছে তা বুঝতে পেরেছে লক্ষী। বুঝতে পেরেই সে ভয়ে রক্ত ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিলো তার। পাথরের মতো ভারী হয়ে গিয়েছিলো পা দু’টো। শরীর যেনো অবশ হয়ে গিয়েছিলো। তখন কতোই বা বয়স লক্ষীর? ষোল হবে বৈকি। কিংবা কমও হতে পারে। ও বয়সে বেশিরভাগ মেয়েরই বিয়ে হয়ে যায়। লক্ষীরও হবে হবে করছিলো। নানান জায়গা থেকে সমন্ধ আসছিলো। দেনাপাওনা নিয়ে একটু কষাকষি হচ্ছিলো। এসব শেষ হলে পরে দিনপঞ্জি দেখে একদিন হয়েও যেতো। কিন্তু হয়নি। সব কেমন উলটপালট হয়ে গিয়েছিলো। লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিলো নিমিষেই সব।

অপণা মাংসেঁ হরিণা বৈরী। কথাটা লক্ষী বোধহয় সেদিন উপলব্ধি করেছিলো। আজ এই বেলায় তার সব কেমন জানি মনে পড়ছে।
পাড়াগায়ে লক্ষীর মতো মেয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। রুপেগুণে সব দিক দিয়েই। চণ্ডীপাঠ, পুজোআচ্ছা সব মিলিয়েই লক্ষী যেনো সত্যি সত্যি লক্ষী। সেই লক্ষীর রুপগুণে মুগ্ধ হয়েই নানা জায়গা থেকে বিয়ের সম্বন্ধ আলাপ আসছিলো। বরপক্ষ মেয়ে দেখে গাঁইগুঁই করার জো ছিলো না। শুধু দেনাপাওনাতেই যতো গণ্ডগোল। ওই দেনাপাওনাই আজ তার কাল হলো। এতক্ষণে ডাকাতের সরদার সুনন্দারানীর হাত থেকে মেয়েকে হ্যাছকা মেরে টান দিয়ে লক্ষীকে নিজের কব্জায় নিয়ে নিয়েছে। সুনন্দা, সমর দু’জনেই ডাকাতের পা ধরে পায়ের কাছে কেঁদে কেঁদে চোখের জল, নাকের জলে ভিজিয়ে মাথা ঠুকছেন। ভিক্ষে চাইছেন। প্রতিবন্ধী ভাইটিও হাতজোড় করে ডাকাতের দিকে করুণার দিকে চেয়ে আছে। ছোট্ট ভাইটি ভয়ে আতংকে রা-হীন চুপচাপ হয়ে আছে। না। সেদিন রেহাই হয়নি। ডাকাতের মন গলেনি। ডাকাতির ছলে সেদিন লক্ষী সত্যি সত্যি লক্ষীছাড়া হয়ে যায়। দেবী লক্ষী সেদিন প্রতীমা লক্ষীর দিকে মুখ তুলে তাকাননি। বরং উপহাস ঘৃনায় কি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। ডাকাত সরদার গমগমে ভারী শক্ত গলায় শুধু এই বললো- এ কে আমার মনে ধরেছে। এ কে আমি বিয়ে করে বউ করবো! ব্যস, এ ক’টি শব্দেই সব শেষ হয়ে গেলো। সব!

ঝড়জলের সেই রাতে লক্ষী আকাশবাতাস কাপিয়ে কেঁদেছিলো। গগনবিদারী চিৎকারে হাওরপাড় সেদিন উত্তাল হয়ে পরেছিলো। ঢেউও থমকে গিয়েছিল একসময়। ঝড়ও থেমে গিয়েছিলো। কালোরাত ভেদ করে একসময় টকটকে লাল প্রভাতও হয়েছিলো। কিছুই থেমে থাকেনি। সেই রাত সেই সময়ের হাহাকার আজও কান পাতলে শোনা যায়। সেই সে দিন লক্ষীদের বাড়িতে ডাকাতি, লক্ষী ডাকাতি হয়েছিলো এ সবাই একে একে জেনে যায়। ডাকাতির ছলে লক্ষীকে ডাকাত সরদার জোর করে নিয়ে যায়। কিন্তু লক্ষী পরে জানে এই ডাকাতদের নিয়ে তার স্বামী পরিকল্পিতভাবে তাকে ডাকাতি করে দখল করার জন্যই এই ডাকাতির ঘটনা ঘটায়। স্বামী নামক ডাকাত লোকটি আজ আর জীবিত নাই। সে আজ গত। তার সেই জবরদখলকারী ডাকাত স্বামী নাকি এককালে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলো! সে আরেক গল্প। অন্যদিন করা যাবে।

আজ লক্ষী আয়েশা চৌধুরী। দুই সন্তানের মা। এই ঘটনার বছর দেড়েকের মধ্যেই লক্ষীর পরিবার দেশ ছাড়েন। শিলংয়ে চলে যান। এর বছর চারেকের মধ্যে বাবা সমর দাশ গতো হোন। প্রতিবন্ধী ভাইটিও সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। বসন্ত দাশ। লক্ষীর আদরের ছোটো ভাইটি আর সেই ছোট্টটি নেই। এখন সে একটা স্কুলে মাস্টারি করে। বিয়েথা করেনি, তবে করবে। মা নাকি ক্রমশ স্মৃতিহীন হয়ে যাচ্ছেন। আজকাল প্রায়ই নাকি ভুলভাল বকেন। হাওর, ঝড়জল, নৌকা, ঘাটপাড়, গরুবাছুড় এইসব আপন মনে বকেন। লক্ষীকে নাকি ক্ষণে ক্ষণে ডাকেন। লক্ষী নাকি ডাকে সাড়া দেয় না। মেয়ের নাকি বড্ড বাড় বেড়েছে। নাহ, লক্ষীর সাথে আর তাদের দেখা হয়নি। সে রাতের পর আর কক্ষনো দেখা হয়নি, হয় নাই। লক্ষীছাড়া লক্ষী আজ আয়েশা। আজ লক্ষী অন্য একজন। আয়েশা চৌধুরী। এই আয়েশা চৌধুরীকে লক্ষী চিনে না। জানে না।হাওরপাড়ের লক্ষী সেই ঝড়জলের রাতেই ঝড়জলে ভেসে গেছে, মরে গেছে। হাওরের জলে লক্ষীরুপী স্বরসতীর প্রতীমার বিসর্জনে সেদিন সমস্ত হাওর কেঁদেছিলো। কলকল জল শব্দ করে কেঁদেছিলো। ঝড়জলে সেদিন কিছু মাছও মরে ভেসে উঠেছিলো। শাদা শাদা চোখ। মরা মাছেদের চোখে ছিলো ভয়-বিস্ময়, ক্ষোভ-ঘৃনা ও লজ্জা। মাছেরা কি আত্মহত্যা করেছিলো সেদিন?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “যে রাতে মোর ভাঙলো দুয়ারগুলি…!

  1. লক্ষীর ভাগ্য বেশ ভালোই বলতে
    লক্ষীর ভাগ্য বেশ ভালোই বলতে হচ্ছে,সে আয়েশা চৌধুরী হয়ে তবু বেঁচে থাকতে পেরেছিল।অগণিত লক্ষীকে ধর্ষিত হয়ে মরতে হচ্ছে ডাকাত দের হাতে।

    বিষাদ ছুঁয়ে গেল যেন মনে…

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 5