নিজের পিতৃভূমির পবিত্র মাটিতে পরবাসী হয়ে সুধাংশুরা থাকবে না

বাংলা সাহিত্যের আধুনিক কবি শামসুর রাহমান তার কবিতায় আশা করে বলেছেন, যতো অত্যাচারই নেমে আসুক, পিতার বাস্তুভিটা ছেড়ে, এই পবিত্র মাটি ছেড়ে পরাজিত সৈনিকের মতো সুধাংশু যাবে না। কবির সেই আশা মিথ্যা করে দিয়ে পরাজিত হয়ে সুধাংশুরা এই পবিত্র মাটি ছেড়ে দেশান্তরিত হচ্ছে। রক্তে কেনা পবিত্র মাটিতে তারা আর অত্যাচার সইতে পারছে না।

সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ফল হিসেবে ১৯৪৭ সালে জন্ম নিয়েছিলো ভারত এবং পাকিস্তান রাষ্ট্র। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জন্ম নিয়েছিলো বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে হিন্দু – মুসলিম কোন ভেদ ছিলো না। সবার চোখেই নতুন অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের স্বপ্ন ছিলো। কিন্তু সেই অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দুঃস্বপ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। আদতে স্বাধীনতা পাওয়ার পর থেকে ৪৫ বছরেও একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠন করা সম্ভব হয়নি। বরং প্রায় প্রতি বছরই সাম্প্রদায়িক হামলা সুধাংশুদের পরাজিত করেছে, তাদের ভিটে মাটি কেড়ে নিয়ে দেশত্যাগে বাধ্য করছে। পাকিস্তান তার ২৪ বছরে যা পারেনি, বাংলাদেশে তা ঘটতে চলেছে! এদেশ এই বিশ্বের একমাত্র শতভাগ ইসলাম ধর্মের অনুসারিদের দেশ হতে চলেছে!

১৯৪৭ সালে মুসলিম দেশ হিসেবে জন্ম নিয়েছিলো পাকিস্তান রাষ্ট্র। দেশ ভাগের সময় পাকিস্তান থেকে অনেক হিন্দু ভারতে পাড়ি জামালেও পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৩১% ছিলো হিন্দু ধর্মাবলম্বী। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রথম আদম শুমারির (১৯৭৪) তথ্য অনুযায়ী এদেশের হিন্দু ধর্মবলম্বীর সংখ্যা ছিলো ১৩.৫%। এরপর প্রতি আদম শুমারিতেই এই হার কমেছে। সর্বশেষ ২০১১ সালের আদম শুমারির পরিসংখ্যান হিসেবে এদেশের মোট জনসংখ্যার ৮.৫%। ২০০১ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৯ লাখ হিন্দু দেশ ত্যাগ করেছে। বর্তমানে এই চিত্র আরও করুন। বিভিন্ন সংস্থার হিসেব অনুযায়ী বর্তমানে দেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের সংখ্যা ৬ থেকে ৭ শতাংশ! হিন্দুদের দেশ ত্যাগের এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০ বছরের মধ্যে এদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের সংখ্যা ১% -এ নেমে আসবে!

হিন্দু সম্প্রদায়ের দেশ ত্যাগের অন্যতম কারণ তাদের নিরাপত্তা ঝুঁকি। প্রায় প্রতিটি নির্বাচনের পরেই হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর অবধারিতভাবে সাম্প্রদায়িক হামলা নেমে আসে। ২০০১ সালের নির্বাচনে সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতায় এলে এদেশের হিন্দুদের ‘৭১-এর বিভেষিকাময় পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় হিন্দুদের মন্দির ভাংচুর, বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং হিন্দু নারীদের গণিয়তের মাল হিসবে ভোগ করা হয়। পাবনার সাথিয়া উপজেলার পূর্ণিমা রাণীর কথা সকলেই জানে। কিন্তু সেই সময়ের সাম্প্রদায়িক হামলায় পূর্ণিমা রাণীর মতো অসংখ্য নারীকে করুণ পরিনতি বরন করতে হয়। সাঈদীর চাঁদে যাওয়ার গুজব ছড়িয়ে এবং ২০১৩ সালের নির্বাচনের আগে পরে হিন্দু সম্প্রদায়কে অনেকগুলো সাম্প্রদায়িক হামলা মোকাবেলা করতে হয়েছে। যশোরের মালোপাড়া, গাইবান্ধার সাদুল্যাপুরে হিন্দুরা ২০১৩-১৪ তে এসে ‘৭১ এর ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেছে। দুঃখের এবং আশ্চার্যের বিষয় হলো এসকল সাম্প্রদায়িক হামলার বিচার এদেশে আজ পর্যন্ত হয়নি। বরঞ্চ এসকল ঘৃণ্য হামলার ঘটনাকে ‘নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা’ বলে বৈধতা দেয়া হয়েছে।

১৯৪৬ সালে এদেশের সবচেয়ে বড় সাম্প্রদায়িক হামলা সংগঠিত হয় নোয়াখালীতে। নোয়াখালী দাঙ্গায় প্রাণ দিয়েছিলো কমপক্ষে ৫০,০০০ হিন্দু ধর্মাবলম্বী। ভিটামাটি হারিয়ে নিংস্ব হয়ে দেশ ত্যাগ করেছিলো প্রায় ১ লাখ হিন্দু পরিবার। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এদেশের সংগঠিত সাম্প্রদায়িক হামলা ‘৪৬-এর নোয়াখলী দাঙ্গার ভয়াবহতাকেও হার মানিয়েছে। বাংলাদেশে ১৯৯২ সালে ভারতের বাবরি মসজিদ ভাঙ্গাকে কেন্দ্র করে হিন্দুরা যে বীভৎস পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে, তা এখনও বিদ্যমান। সর্বশেষ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের ঘটনা তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলেছে। নাসিরনগরের সাম্প্রদায়িক হামলা ঘটেছে প্রশাসনের চত্র ছায়ায়। দেশের হিন্দু সম্প্রদায় যে দলকে বন্ধু ভাবতো, সে দলের স্থানীয় নেতারা এই হামলার উষ্কানী এবং নেতৃত্ব দিয়েছে। শুধু তাই নয়, ক্ষমতাসীন দলের দায়িত্ববান একজন মন্ত্রী এই ঘটনাকে তুচ্ছ ঘটনা উল্লেখ্য করে বলেছেন, ‘মালাউনের বাচ্চারা বেশি বাড়াবাড়ি করছে’! ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রীর এমন বক্তব্য হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি তাদের মানসীকতার চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাম্প্রদায়িক হামলার শিকার ৬ টি হিন্দু পরিবার এরমধ্যেই ভারতে পাড়ি দিয়েছে বলে জানা গেছে। (সূত্রঃ অনলাইন নিউজ পোর্টাল)। হামলায় আক্রান্ত আরও কয়েকটি পরিবার এদেশে টিকতে পারবেনা বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে (সূত্রঃ বিবিসি অনলাইন)। হয়তো পরাজিত সৈনিকের মতো শীঘ্রই তারা ভারতে দেশান্তরিত হবে। তাদের ফেলে যাওয়া পবিত্র মাটি, বাস্তুভিটা লুটেপুটে খাবে ক্ষমতার উচ্ছেষ্টভোগীরা।

নিজের জীবন রক্ষা করতে, কবির আশা পূরণ করা সুধাংশুদের পক্ষে সম্ভব নয়। নিজের পিতৃভূমির পবিত্র মাটিতে পরবাসী হয়ে সুধাংশুরা থাকবেনা।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “নিজের পিতৃভূমির পবিত্র মাটিতে পরবাসী হয়ে সুধাংশুরা থাকবে না

  1. উল্লেখিত হামলাগুলোর কোন বিচার
    উল্লেখিত হামলাগুলোর কোন বিচার হতে আমরা দেখলাম না,তাই ধরে নিতে পারি এই ঘটনাগুলির প্রতি সমর্থন রয়েছে রাষ্ট্রের।তাইতো বারবার এমন সাম্প্রদায়িক হামলা ঘটেই চলেছে।

    1. সুধাংশুরা বাঁচার তাগিদেই দেশ
      সুধাংশুরা বাঁচার তাগিদেই দেশ ছাড়ছে। দেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির যে ধারা বহমান, তা বিরজমান থাকলে সুধাংশুরা এদেশে থাকলে বাঁচতে পারবে না।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 59 = 63