আন্ডারস্ট্যান্ডিং মুহাম্মদ, মূল – আলি সিনা , ভাষান্তর-দুরের পাখি ; পর্ব-১৩

মদীনার আরবরা খুব দ্রুত মোহাম্মদকে গ্রহন করে নেয় । তার বাণীর গভীরতার জন্য নয় , যা মূলত উপরে যেমন বলে হয়েছে, এই ছিলো যে সবাই যেন তাকে আল্লাহর মনোনীত নবী হিসাবে স্বীকার করে নেয় এবং তার আদেশ নিষেধ মেনে ছিলো, বরং মদীনার ইহুদিদের সাথে তাদের শত্রুতার জন্য । মদীনা পারতপক্ষে একটা ইহুদি শহর ছিলো । ইহুদিরা তাদের ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী নিজেদের ঈশ্বরের বাছাই করা গোষ্ঠী বলে মনে করতো । তারা আরবদের তুলনায় শিক্ষিত এবং সম্পদশালী হবার কারণে হিংসার পাত্র ছিলো । মদীনার প্রায় পুরোটাই ছিলো ইহুদিদের মালিকানায় । কিতাব আল আগানি (টীকা-৩২) অনুযায়ী মদীনায় প্রথম ইহুদি বসতি গড়ে উঠে বাইবেলের মোসেসের সময়ে । কিন্তু দশম শতাব্দীর একটি বই ফাতাহ আল বুলদান (the conquest of the towns) এ আল বালাদুরি লিখেন যে , ইহুদিদের মতে, ৫৮৭ সালের দিকে ব্যাবিলনের রাজা নেবুকাদনেজার যখন জেরুজালেম ধ্বংস করে ইহুদিদের বিশ্বময় ছড়িয়ে দেয় তখন মদীনাতে ইহুদিদের একটি দ্বিতীয় স্রোত এসে জমায়েত হয় । মদীনার ইহুদিরা ছিলো ব্যাবসায়ী, স্বর্ণকার, কামার, ক্ষুদ্রশিল্পী এবং চাষা আর আরবরা ছিলো মূলত শ্রমিক যারা ইহুদিদের বিভিন্ন ব্যাবসায় চাকুরি করতো । আরবরা মদীনায় অর্থনৈতিক উদ্বাস্তু হিসাবে আসে চতুর্থ শতাব্দীতে । ইসলামে দীক্ষা নেয়ার পরে তারা তাদের পালনকারী ইহুদিদের হত্যা করে এবং তাদের অর্থসম্পদ লুটে নেয় নিজেদের জন্য ।

ইয়াথরিব, যা পরে মদীনা নামে পরিচিত হয় , সেখানে শক্ত অবস্থান গড়ে তোলার পরে আরবরা ইহুদিদের বসতিগুলোতে ডাকাতি এবং লুটপাট চালানো শুরু করে । যেকোন নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর মত ইহুদিরাও বলতো যে যখন তাদের মসীহ (উদ্ধারকর্তা) উদয় হবেন তিনি তখন এইসবের প্রতিশোধ নিবেন । এই আরবরা যখন জানতে পারে যে মোহাম্মদ নিজেকে মোসেসে ভবিষ্যতবাণীর সেই মসীহ বলে দাবী করছে , তারা ভেবেছিলো মোহাম্মদকে মেনে নিয়ে এবং ইসলামে দীক্ষা নিয়ে তারা ইহুদিদের হারিয়ে দিতে পারবে ।

ইবনে ইসহাক লিখেন,

“আল্লাহ তখন ইসলামের সামনের পথ পরিষ্কার করলেন এইভাবে যে এই লোকেরা ইহুদিদের সাথে পাশাপাশি বাস করতো যারা (ইহুদিরা) ছিলো কিতাবের অনুসরণকারী এবং জ্ঞানী , অন্য দিকে তারা নিজেরা (আরবরা) ছিলো মূর্তিপূজারী এবং বহুঈশ্বরবাদী । আরবরা প্রায়ই ইহুদি এলাকাগুলোতে লুটপাটের চেষ্টা করতো এবং যখনি দুই দলের মধ্যে ঝামেলার তৈরী হতো তখন ইহুদিরা বলতো যে শীঘ্রই তাদের উদ্ধারকর্তা দুনিয়াতে আবির্ভুত হবেন এবং আমরা তার অনুসরণ করে তোমাদের হত্যা করবো । ফলত যখন আরবরা মোহাম্মদের কথা জানতে পারে তখন তারা ভেবে নিয়েছিলো এই নবীই নিশ্চয়ই সেই নবী যাদের ভয় ইহুদিরা তাদের এতদিন দেখিয়ে আসছে । আরবরা তাই ইহুদিদের আগেই ই নবীর সাথে জোট বাঁধতে চাচ্ছিলো । “

হাস্যকর হচ্ছে ইহুদি ধর্ম এবং তাদের ত্রাণকর্তার আবির্ভাব সংক্রান্ত বিশ্বাসের কারণেই ইসলাম আরবে শক্তি অর্জন করে । আরবের ইহুদিদের গণহত্যার সূত্রপাত হয় তাদের নিজেদের বিশ্বাস থেকেই । এই বিশ্বাস না থাকলে যেকোন ছোটখাট কাল্টের মতই ইসলাম হয়ত খুব দ্রুতই নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতো ।

আবারো, মক্কাবাসীরা মুসলিমদের উপর নির্যাতন চালিয়েছে , মোহাম্মদের এই দাবীর স্বপক্ষে খুব জোরালো কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই । প্রশ্নাতীতভাবে মুসলিম এবং অনেক অমুসলিম ঐতিহাসিকও এই দাবীর প্রতিধ্বনি করে গেছেন । মুসলিমদের উপর রাগ এবং শত্রুতার কারণ ছিলো তাদের দেব দেবী নিয়ে মোহাম্মদের অপমানমূলক কথাবার্তার প্রতিক্রিয়া । মুসলিমরা অন্য ধর্মের লোকদের উপর যে রকমের নির্যাতন চালায় তার তুলনায় মক্কাবাসীর এই প্রতিক্রিয়া তেমন কিছুই না । মোহাম্মদই মুসলিমদের মক্কা ত্যাগের নির্দেশ দেয়, মক্কাবাসীরা নয় । সে মুসলিমদের লোভ দেখায় এইভাবে

“যারা নির্যাতিত হওয়ার পর আল্লাহর জন্যে গৃহত্যাগ করেছে, আমি অবশ্যই তাদেরকে দুনিয়াতে উত্তম আবাস দেব এবং পরকালের পুরস্কার তো সর্বাধিক; হায়! যদি তারা জানত। “ (কোরান-১৬:৪১)
মদীনায় হিজরতকারীদের কোন আয় উপার্জন ছিলো না । মোহাম্মদ কিভাবে তাদেরকে প্রতিশ্রুত উত্তম আবাস দিবে , যারা তার আদেশে নিজেদের ঘর ছেড়ে এসেছে ? জীবনধারণের জন্য তারা মদীনার লোকজনের দয়া দাক্ষিন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে । মোহাম্মদের প্রতিশ্রুতি পূরণের কোন সম্ভাবণা দেখা না যাওয়ায় তার বিশ্বাসযোগ্যতা কমতে থাকে । অনুসারীরা এই নিয়ে নিজেদের মধ্যে কানা-ঘুষা শুরু করে । কেউ কেউ দলত্যাগও করে । এসবের উত্তরে মোহাম্মদ আরেকটি হুমকিমূলক আয়াত নিয়ে আসে ।

“তারা চায় যে, তারা যেমন কাফের, তোমরাও তেমনি কাফের হয়ে যাও, যাতে তোমরা এবং তারা সব সমান হয়ে যাও। অতএব, তাদের মধ্যে কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না, যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর পথে হিজরত করে চলে আসে। অতঃপর যদি তারা বিমুখ হয়, তবে তাদেরকে পাকড়াও কর এবং যেখানে পাও হত্যা কর। তাদের মধ্যে কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না এবং সাহায্যকারী বানিও না। “(কোরান – ৪: ৮৯)

এই আয়াতে যেমন দেখা যাচ্ছে পৌত্তলিকদের সাথে কোনপ্রকার বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করা হচ্ছে মুসলিমদের , এবং হুমকি দেয়া হচ্ছে যারা হিজরত করবেনা তাদেরকে ; এর সাথে মোহাম্মদের যে দাবী যে মক্কাবাসীরা মুসলিমদের তাড়িয়ে দিয়েছে তার সমন্বয় কিভাবে করা যায় ? এই আয়াতে দেখা যাচ্ছে যেসব মুসলিম দলত্যাগ করে মক্কা ফিরে যেতে চায় তাদেরকে হত্যার নির্দেশ দিচ্ছে মোহাম্মদ । গায়ানার জোন্সটাউনে বদ্ধ উম্মাদ যাজক ‘জিম জোন্স’ তার অনুসারীদের নির্দেশ দিয়েছিলো যারাই পালানোর চেষ্টা করবে তাদের গুলি করে মারার । মোহাম্মদের উপরোক্ত আয়াতের সাথে এই ঘটনা হুবহু মিলে যায় । এর সবই ছিলো তার অনুসারীদের মধ্যে বিভক্তি তৈরী করে তাদেরকে আরো ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ এবং মগজধোলাই এর জন্য । নিজ আত্নীয় বন্ধুবান্ধব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোন কাল্টে যে যোগ দেয় যেখানে সবাই মগজধোলাইকৃত, তার পক্ষে নেতার কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায় । (টীকা-৩৪)
************************************************************************************************
টীকা – ৩২ – ইস্পাহানের Abu al-FarajAli কতৃক সংকলিত কয়েক খন্ডের কিছু কবিতার সমষ্টি । প্রাচীনযুগের আরব থেকে শুরু করে নবম শতাব্দী পর্যন্ত রচিত অনেক কবিতা আছে এতে । মধ্যযুগের ইসলামিক ইতিহাস সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে এই কবিতাগুলোতে ।
টীকা -৩৩ – সিরাত ইবনে ইসহাক পৃষ্টা ১৯৭

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “আন্ডারস্ট্যান্ডিং মুহাম্মদ, মূল – আলি সিনা , ভাষান্তর-দুরের পাখি ; পর্ব-১৩

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

9 + 1 =