আমি আলফ্রেড সরেন বলছি….

ছবিঃ সংগৃহীত

মনে আছে আপনাদের সেই ভীমপুরের কথা ? আজ থেকে ১৬ বছর আগে যে ভীমপুরে দাও দাও করে আগুন জ্বলেছিল। মধ্যযুগের বর্বরতাকে হার মানানো যে নারকীয় হত্যাকাণ্ড ও তাণ্ডবলীলা চালিয়েছিল ১৩ টি আদিবাসী পরিবারের উপর। ভীমপুর গ্রাম ও মৌজার ১৬৬ ও ১৬৮ দাগের এক একর জমির উপর তখন ১৩টি আদিবাসী সাঁওতাল পরিবার বসবাস ছিল। গ্রামের অল্প দুরেই ৯০/৯৫ বিঘার মত খাস জমি ছিল। আর সেই জমি দরিদ্র আদিবাসী ও এলাকার ভূমিহীনদের কাছে বন্দোবস্তো দেবার জন্য চেষ্টা করেছিলাম। আর এটাই ছিল জীবনের কাল!

২০০০ সালের ১৮ আগস্ট, ঘড়ির কাটায় ঠিক সকাল এগারটা। ভূমিদস্যু হাতেম আলী ও সীতেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য ওরফে গদাই তার দলবল নিয়ে মহাদেবপুরের ভীমপুর গ্রামে আগুন দিল। চারিদেকে যখন আদিবাসীদের আত্ম-চিৎকার আর আগুনের লেলিহান শিখায় আকাশ বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে, তখন তাদের উন্মত্ত খুনের নেশা আমাকে খুঁজে চলেছে। অতর্কিত আক্রমণে আদিবাসীরা যখন হত বিহ্বল, হাতেম আর গদাই চিৎকার করে ডাকছে আলফ্রেড সরেন। একেরপর এক বাড়ী আগুনে জ্বালিয়ে দিচ্ছে আর সামনে এগিয়ে আসছে। সামনে যাকে পেয়েছে তার উপর চালিয়েছে পৈশাচিক নির্যাতন। শিশুদের হাত পা ধরে পুকুরে ছুড়ে মারছে। আদিবাসী পরিষদের নেতা বৃদ্ধ জগন্নাথ সরেণ ও যতীন সরেণকে জলজ্যান্ত আগুনে নিক্ষেপ করা হলো। বড় দাদার স্ত্রী পানসিরির পেটে লাথি মেরে তারা গর্ভচ্যুতি করলো। ভাইয়ের মৃত্যুর দোয়ার দেখে বোন রেবেকা সরেন ভাইকে নিয়ে বাঁচার জন্য পাশের বাড়ীতে ঘরের মধ্যে রাখা ধানের বস্তার ফাঁকে আশ্রয় নিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই ঘরেও আগুন দেওয়া হলো। আগুনের উত্তাপে আর কালো ধোঁয়ায় টিকতে না পেরে বোন রেবেকা সরেন ঘরের জানালা ভেঙ্গে পালানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু পিশাচরা যে উন্মত্ত খুনের নেশায় অপেক্ষায় ছিল, ঘর থেকে বের হওয়া মাত্রই তাদের হাতে ধরা পড়ে গেলো। শুরু হল পিশাচদের অমানবিক আঘাত। রামদা, কুড়াল, বল্লম দিয়ে একেরপর এক খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আঘাত করতে থাকে। রামদায়ের প্রতিটি ধারালো কোপ আমি অনুভব করেছি, বল্লম দিয়ে যখন আমার শরীর খোঁচানো হচ্ছিল মনেহচ্ছিল পাকিস্তানি আলবদররা বুঝি আবার ফিরে এলো। দখলের নেশায় আবার মেতে উঠেছে। একসময় অসহ্য যন্ত্রণায় মাটিতেই লুটিয়ে পরলাম। বোন রেবেকা সরেন মূর্তিরমত দাঁড়িয়ে আছে, একমাত্র কন্যা ঝরনা সরেন এর মুখ চোখের সামনেই ভাসতে লাগলো। বাঁচার আকুতি নিয়ে অনুরোধ করেছিলাম আমার হাত পা কেটে ফেলো কিন্তু প্রাণে মেরো না আমি কি দোষ করেছি তোমাদের কাছে ? কিন্তু খুনের নেশায় উন্মত্ত পিশাচদের কাছে শেষ রক্ষেতাও হলোনা।

হে আমি সেই আলফ্রেড সরেন বলছি, যে আলফ্রেড সরেন ভূমি অধিকারের কথা বলায়, ভূমি রক্ষা করতে গিয়ে সেই ভূমিতেই যাকে হত্যা করা হয়েছে। আর আজ আবার জ্বলছে মহিমাগঞ্জ, সাহেবগঞ্জের সাঁওতাল অধ্যুষিত মাদারপুর। আবারো সেই ভূমি দখলের জন্যই আদিবাসীদের ঘরে ঘরে আগুন দেওয়া হচ্ছে। গ্রামে পুরুষশূন্য করে নারীদের করা হচ্ছে সন্ত্রস্ত। আর্তচিৎকারে ক্রন্দিত হচ্ছে ভুমিদস্যুর লুটপাটের। ভূমিদস্যুর ছোড়া গুলিতে আবার প্রাণ দিয়েছে শ্যামল হেমব্রম। চিনিকলসংলগ্ন পাশের ধানক্ষেতে পরে আছে আলফ্রেড সরেনের মত আরেক নাম না জানা লাশ। চোখে গুলি নিয়ে আহত দ্বিজেন টুডুকে হাসপাতালের পরিবর্তে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বিচারকের কাঠগড়ায়। ঘর পোড়া কালো ধোঁয়া বাতাসে সাথে মিশে যাচ্ছে ৬০০ পরিবারের পোড়া গন্ধ।

১৮৫৫ সালে সাঁওতালরা সশস্ত্র সংগ্রাম করেছিল তাদের অধিকার আদায়ের জন্য। নিপীড়নকারী জমিদার, মহাজন, পুলিশ, রেলওয়ে ঠিকাদারসহ অন্য যারা তাদের এলাকায় গিয়ে বিত্তশালী হবার চেষ্টা করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে এক সুসংগঠিত সশস্ত্র বিদ্রোহ করেছিল। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা তাদের অবৈধ মালিকানার দাবি নিয়ে হাজির হলে সাঁওতালরা এই ঔপনিবেশিক অনুপ্রবেশ ঠেকাতে এবং নিজেদের প্রাকৃতিক অধিকার বজায় রাখার জন্য প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। আর এভাবেই সেই ঔপনিবেশিকদের প্রতিরোধ করে যাবে। যুগে যুগে আলফ্রেড সরেনরা জন্ম নিবে তাদের ভূমি রক্ষার জন্য। আর মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেই অমরত্ব নিবে। দীর্ঘ ১৬ বছরেও আলফ্রেড সরেনের মত আলোচিত, আলোড়িত হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া শেষ করতে না পারলেও সিধু, কানু, চাঁদ, ভৈরব নামের সাথে স্মরণীয় হয়ে থাকবে আলফ্রেড সরেনরা।

ছবিঃ আদিবাসী বিপ্লবী কণ্ঠ আলফ্রেড সরেন

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 7