ফাইলেরিয়া ভয়াবহতা এবং বাংলাদেশ পরিস্থিতি

ফাইলেরিয়াসিস বা গোদ রোগ বিশ্বের ভয়ংকর রোগগুলির মধ্যে একটি এবং বাংলাদেশের অন্যতম জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বর্তমানে বাংলাদেশের সব কয়টি জেলায় ফাইলেরিয়াসিস বিদ্যমান। তবে দেশের উত্তরাঞ্ছলে বিশেষ করে পঞ্ছগড়, ঠাকুরগাও, দিনাজপুর, চাপাইনবাবগঞ্জ, নীলফামারী, রংপুর, রাজশাহী, লালমনিরহাট, এলাকায় এই রোগের প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি। তবে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, চীন, শ্রীলঙ্কা, ব্রাজিল, আফ্রিকা, মধ্য ও দক্ষিন আমেরিকাতে এই রোগের প্রাদুর্ভাব রয়েছে।


ফাইলেরিয়া/গোদ রোগ কি?

ফাইলেরিয়াসিস একটা মশাবাহিত সংক্রামক ব্যাধি। বাংলাদেশে কিউলেক্স জাতীয় স্ত্রী মশা দ্বারা এ রোগ সংক্রমিত হয়। সংক্রমিত রোগী হতে এ রোগ আবার কয়েক প্রজাতির স্ত্রী মশার কামড়ের মাধ্যমে সুস্থ্য মানুষের দেহে ছড়িয়ে পড়ে। এই জীবানু মানুষের দেহে প্রবেশের পর ক্রিমির মাধ্যমে তা মানুষের রক্তে ছড়িয়ে পড়ে। কারন ক্রিমি মাইক্রো ফাইলেরিয়ার জন্ম দেয় এবং ক্রমাগত লসিকা নালী ক্ষতিগ্রস্থ করতে থাকে। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আক্রান্ত রোগীর হাটুর নিচের অংশ, হাত, স্তন, যৌনাঙ্গ মোটা হয়ে ফুলে যেতে থাকে।

কিভাবে প্রকাশ পায়?
এই রোগ মানুষের দেহে চারভাবে প্রকাশ পায়।
১. লক্ষনহীনঃ জীবানু দেহে প্রবেশের পর কয়েক বছর কোন লক্ষন দেখা যায় না। তবে জীবানুটি কিডনী ও ফুসফুসের লসিকা নালীর ক্রমাগত ক্ষতি করতে থাকে।
২. তাৎক্ষণিকঃ অনেকের তাৎক্ষণিক লক্ষন দেখা দেয় যেমন চর্মরোগ, গা চুলকানো, লাল হওয়া, চাকা চাকা হওয়া, lymph ফুলে যাওয়া, মাঝে মাঝে জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট হওয়া ইত্যাদি।
৩. দীর্ঘসুত্রীঃ এ ধরনের রোগীরা সবচেয়ে বেশী ভুক্তভুগী। এসব রোগীর রক্ত পরিক্ষাতে প্রায়ই এ রোগ ধরা পড়ে না। মশার কামড়ের পর আক্রান্ত অঙ্গ ফুলে যেতে কয়েক বছর সময় লাগে।
৪. দীর্ঘসুত্রিতার মধ্যে তাৎক্ষণিকঃ বিকালাঙ্গ রোগীদের অনেকের পায়ের বা হাতের আঙ্গুলের মাঝখান দিয়ে প্রদাহ হয়। রোগীর প্রচন্ড জ্বর মাথা ব্যথা হয়।

রোগ নির্ণয়ে পরীক্ষাঃ
বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে এ রোগ নির্ণয় করা যায়।
১. এলার্জি পরীক্ষাঃ
ক. রক্ত পরীক্ষাঃ রক্তে স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে esonophil অনেক বেশি ধরা পড়ে।
খ. ত্বকীয় পরীক্ষাঃ পজিটিভ ক্ষেত্রে ত্বকের পরীক্ষিত অংশ ফুলে যায়।
২. ICT(Immuno Chromatographic test): এই পরীক্ষাতে মাত্র দুই ফোটা রক্ত ICT/Spot Test কার্ডে দিলে দশ মিনিটের মাথায় রোগ ধরা পরে।
৩. lymphoscintigraphy test: যাদের রক্ত পরীক্ষায় ফাইলেরিয়া ধরা পড়ে না তাদের জন্য এই পরীক্ষা কার্যকরী।
পরীক্ষা শুধুমাত্র ডাক্তারের পরামর্শ মত করতে হবে।

ফাইলেরিয়ার চিকিৎসাঃ
শরীরে সন্দেহজনক লক্ষন দেখা দিলে যেমন- নির্দিষ্ট সময়ে জ্বর আসা, শরীর চুলকানো, অণ্ডকোষ, স্তন, হাত, পা ইত্যাদি অঙ্গ ফুলে গেলে অবশ্যই ডাক্তারের শরনাপন্ন হতে হবে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষার পর রোগ ধরা পড়লে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহন করতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদেরকেও প্রতিষেধক গ্রহন করতে হবে। অন্যথায় তাদেরও আক্রান্ত হবার ঝুকি থেকে যাবে। এছাড়া আক্রান্ত রোগীদের আরও কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবে।
১. প্রত্যেকদিন রাতে সাবান দ্বারা আক্রান্ত অঙ্গ পরিষ্কার করতে হবে।
২. দিনে তিন বার চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক হালকা ব্যায়াম করতে হবে।
৩. রাতে ঘুমাবার সময় পায়ের নিচে বালিশ দিয়ে ঘুমাতে হবে এবং দিনের বেলায় পা যথাসম্ভব উচু করে রাখতে হবে।
৪. আক্রান্ত অঙ্গ সবসময় শুকনা রাখতে হবে।
৫.প্রয়েজনে চিকিৎসকের পরামর্শক্রমে আক্রান্ত স্থানে মেডিকেটেড মলম লাগাতে হবে।
এছাড়া আপনার কোনো তথ্য বা পরামর্শের প্রয়োজন হলে অথবা কোন কিছু জানবার বা জানাবার থাকলে www.facebook.com/filaria.hospital এই page এ যোগাযোগ করতে পারেন। আপনার প্রশ্নের উত্তর দিবেন ফাইলেরিয়া গবেষক প্রফেঃ ডাঃ মোয়াজ্জেম হোসেন স্যার।

ফাইলেরিয়ার প্রতিষেধকঃ
ফাইলেরিয়া ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় যারা বসবাস করেন অথবা যাদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ফাইলেরিয়া আছে তাদের প্রতিষেধক ওষুধ খাওয়াটা জরুরী। প্রতিষেধক ডোজ নিম্নরুপঃ
২-৮ বৎসরঃ
Banocide 50 mg – ২টি
Alatrol- ১টি
Albendazole- ১টি
৮-১২ বৎসরঃ
Banocide 50 mg – ৪টি
Alatrol- ১টি
Albendazole- ১টি
১২ বৎসরের ঊর্ধ্বেঃ
Banocide 50 mg – ৬টি
Alatrol- ১টি
Albendazole- ১টি

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াঃ
এই ওষুধে কোন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নেই। তবে কারো কারো বেলায় সামান্য মাথা ঘুরানো, বমি বমি ভাব ও পাতলা পায়খানা হতে পারে। তবে যার শরীরে ফাইলেরিয়াসিসের জীবানু বেশী শুধু তার ক্ষেত্রেই এই প্রতিক্রিয়া হতে পারে।
যারা খাবে নাঃ
১. গর্ভবতী মা
২. গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তি
৩. ২ বছরের কম বয়েসের শিশুরা এই ওষুধ খাবে না।

বিশ্বের প্রথম ফাইলেরিয়া হাসপাতালঃ

এ তথ্য আমাদের অনেকের অজানা যে বাংলাদেশে ফাইলেরিয়া চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল রয়েছে এবং সেটি বিশ্বের প্রথম ফাইলেরিয়া হাসপাতাল। বন্ধুদেশ জাপানীদের সহযোগিতায় নীলফামারী জেলার সৈয়দপুরে বিশ্বের প্রথম ফাইলেরিয়া হাসপাতালটি প্রথিষ্ঠিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালের জুলাইয়ে সাভারে একটি ৫০ শয্যা বিশিষ্ট অত্যাধুনিক ফাইলেরিয়া হাসপাতাল চালু করা হয়। যেখনে শুধু চিকিৎসাই নয় রয়েছে ফাইলেরিয়া নিয়ে গবেষণার জন্য অত্যাধুনিক গবেষণাগার। হাসপাতাল দুটির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক প্রফেঃ ডাঃ মোয়াজ্জেম হোসেন।
১. ফাইলেরিয়া অ্যান্ড জেনারেল হসপিটাল
জিঞ্জিরা, সাভার, ঢাকা।
মোবাঃ ০১৭৭২৫৪৪৪৬৯
আম্বুলেন্সঃ ০১৭৭২৩৭১৮৬৯
২. ফাইলেরিয়া হাসপাতাল
ধলাগাছ, সৈয়দপুর, নীলফামারী।
(সৈয়দপুর রেল স্টেশনের পুর্ব পার্শ্বে)
মোবাঃ ০১৭১৫০৪০৩৪৬, ০৫৫২৬৭৩২৫৫২০
৩. প্রফেঃ ডাঃ মোয়াজ্জেম হোসেন
www.iacib.org
[email protected]

ফাইলেরিয়া নিয়ন্ত্রণে চাই সচেতনতাঃ
একমাত্র সচেতনতাই পারে বাংলাদেশ থেকে চিরতরে ফাইলেরিয়া নির্মূল করতে। এজন্য নিজেও সচেতন হোন এবং অন্যকেও সচেতন করুন এবং ক্রিমি মুক্ত থাকুন। এছাড়া আমাদের বসতবাড়ির আশে পাশের ঝোপ ঝাড়, গর্ত, ডোবা, খাল, মাজা পুকুর ইত্যাদি বন্ধ করতে হবে। রাতে ঘুমানোর সময় মশারী টাঙ্গিয়ে ঘুমাতে হবে। প্রয়োজনে ঘরের ভিতর কীটনাশক ওষুধ ছিটিয়ে মশাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এতে করে শুধু ফাইলেরিয়াই নয় মশাবাহিত অন্যান্য রোগও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “ফাইলেরিয়া ভয়াবহতা এবং বাংলাদেশ পরিস্থিতি

    1. আপনাকেও অসঙ্খ ধন্যবাদ কষ্ট
      আপনাকেও অসঙ্খ ধন্যবাদ কষ্ট করে পড়ার জন্য। আশা করি কখনো কোনো ফাইলেরিয়া রোগীর দেখা পেলে অবশ্যই তাকে তথ্য দিয়ে এই ব্যাপারে সহোযোগীতা করবেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 2