মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফলের মানে কি?


“… বিভিন্ন জরিপকারী সংস্থা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা নির্বাচনে হিলারির জয়ের সম্ভাবনা দেখছেন ৯০ শতাংশ।” – দৈনিক বণিক বার্তা, নভেম্বর ৯ ২০১৬, বুধবার

এইসব জরিপকারী সংস্থা এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সমস্ত পূর্বানুমানে পানি ঢেলে দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউএস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। ইতিহাস আবহাওয়াবার্তা নয়। মানুষের জটিল সামাজিক সম্পর্ক ইতিহাস তৈরি করে, সেই সম্পর্ক ক্যাওটিক, তাই ইতিহাসের ক্ষেত্রে সুনিশ্চিতভাবে অনুমান করা অসম্ভব।

এই ফলাফলের মানে কি সেটা বোঝা দরকার। সব বুঝই অপূর্ণাঙ্গ। সেই সীমাবদ্ধতা নিয়েই কিছু কথা বলা যাক।

আমার মতে এই ফলাফলের মানে হচ্ছে এগুলোঃ

১। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবাদী, উগ্রজাতীয়তাবাদী, সাম্প্রদায়িক প্রবণতা বাড়বে। এবং এই প্রতিক্রিয়াশীলরা সামাজিকভাবে অধিকতর শক্তিশালী হবে। কৃষনাঙ্গ-আদিবাসী, অভিবাসী, আর মুসলিমদের কপালে দুঃখ আছে।

২। ৯/১১র পর থেকেই নিরাপত্তার নামে সারভেইলেন্স বেড়েছে, সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধের নামে, সন্দেহভাজন সন্ত্রাসবাদীদের ওপর সেন্ট্রাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির টর্চারও। বুশ জামানায় এটা চরমপন্থার চূড়ান্ত সীমায় গেছিলো। ওবামা জামানায় এটা কিছুটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ছিলো, ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ায়, সর্বব্যাপক সারভেইলেন্স-টর্চারের যুগ আবার ফিরে আসবে আমেরিকায়।

৩। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন পররাষ্ট্র নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আসবে না, ইজরায়েলের প্রতি সমর্থন অব্যাহত থাকবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্য বিস্তারের প্রশ্নে কিছু কৌশলগত বিষয়ে রাশিয়া, চীন, আর ইরানের সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটতে পারে। সিরিয়ায় রেজিম চেইঞ্জের ধান্দা বাদ যেতে পারে, গালফের রাজতন্ত্রগুলোর প্রতি মার্কিন সমর্থন কমতে পারে, আর কিছু না।

৪। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ অর্থনীতির ভিত্তি মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স। যুদ্ধ ছাড়া মার্কিন অর্থনীতি টিকতে পারে না। ২০০১ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যেই অনন্তকালীন যুদ্ধ শুরু হয়েছে তা খুব সম্ভবত অচিরেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় শিফট করা হবে। এশিয়া-প্যাসিফিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক অবজেকটিভ চীনকে ঠেকানো। ২০১২তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন সেক্রেটারি অফ ডিফেন্স লিওন পেনেট্টা জানিয়েছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার অধিকাংশ যুদ্ধজাহাজ এশিয়া-প্যাসিফিকে নিয়ে আসতে চায় ২০২০এর মধ্যে। এই সময়ের মধ্যে সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌ শক্তির মোট ৬০% মোতায়েন করা হবে। যদিও তিনি বলেছেন এই সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে চীন কোনো ফ্যাক্টর না, কিন্তু, তাঁর এই কথা খুব বেশী লোকের বিশ্বাস করার কথা না (http://www.bbc.com/news/world-us-canada-18305750)।

৫। এই আসন্ন যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পূর্ব এশিয়ায় জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া আর দক্ষিণ এশিয়ায় ইন্ডিয়াকে প্রধান আঞ্চলিক মিত্র হিসেবে গণ্য করবে।

৬। সম্প্রতি সেই কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর ইন্ডিয়া যৌথ স্বার্থে লজিস্টিকস এক্সচেইঞ্জ মোমোরাণ্ডাম অফ এগ্রিমেন্ট (লেমোয়া) সই করেছে। টাইমস অফ ইণ্ডিয়ার একটি প্রতিবেদন যাকে বলছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর ইন্ডিয়ার ‘সামরিক কোলাকুলি।’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সেক্রেটারি অফ ডিফেন্স অ্যাশটন কার্টার এবং ইন্ডিয়ার পক্ষে ডিফেন্স মিনিস্টার মনোহর পারিকার সাক্ষর করেন (http://timesofindia.indiatimes.com/india/India-and-US-in-military-hug-will-share-logistics-bases/articleshow/53937467.cms)।

৭। উল্লিখিত ৪, ৫, ও ৬ নম্বর পয়েন্ট হিলারি ক্লিনটন নির্বাচিত হলেও অপরিবর্তিত থাকতো। ইউএস প্রেসিডেনশল ইলেকশনে কোনোদিন ওয়ালস্ট্রিট হারে না। পেন্টাগনও হারে না।

বাংলাদেশের ওপর এই নির্বাচনের ফলাফলের প্রভাব কি? দৈনিক প্রথম আলো আর দি ডেইলি স্টার পত্রিকা মিলে নির্বাচনপূর্ব সময়ে অনেক হাইপ তৈরি করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আমার ধারণা প্রভাব শুণ্য অথবা সামান্য!

বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর্থসামরিক স্বার্থে বাংলাদেশের শিল্প বাণিজ্য স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে টিকফার মতো ভয়াবহ চুক্তি সাক্ষর করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দক্ষিণ এশীয় মিত্র ইন্ডিয়ার সাথে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সুসম্পর্ক সর্বজনবিদিত। ফলে বাংলাদেশে কোনো রেজিম চেইঞ্জ ঘটছে না, কেননা শেখ হাসিনা কোনো সাদ্দাম হোসেন বা মোয়াম্মার কাদ্দাফি না, বাশার আল-আসাদও না।

তার মানে এই না গণতান্ত্রিক পরিবর্তন অসম্ভব, জনগণ চাইলে সম্ভব, কিন্তু সে জন্য হাঁ করে হোয়াইট হাউজের দিকে তাকিয়ে থাকলে কোনো লাভ হবে বলে মনে হয় না।

আওয়ামি লিগের নেতাকর্মীরা অনেক বড়ো ভুল করবেন, যদি ‘ডক্টর ইউনূসের দোস্ত হিলারি ক্লিনটন নির্বাচনে না জেতায়’, তাঁরা নিশ্চিন্ত হয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমান।

২০১৪র ৫ জানুয়ারির পর থেকে আওয়ামি লিগ সরকার জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়াই ক্ষমতায় আছে। সম্প্রতি নাসিরনগর আর গোবিন্দগঞ্জে যে ভয়ানক সাম্প্রদায়িক-উগ্রজাতীয়বাদী আক্রমণগুলো ঘটলো, তাতে এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে আওয়ামি লিগ খুব দ্রুত তার সাপোর্টার বেজেরও একটা বড়ো অংশকে হারিয়ে ফেলছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর উন্নয়নের আফিম গিলিয়ে গিলিয়ে শহুরে মধ্যবিত্তের একটা উল্লেখযোগ্য অংশকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা সম্ভব হলেও সারা দেশে সরকার জনগনের ঘৃণা ছাড়া আর কিছুই কুড়াচ্ছে না।

আর জনসমর্থনহীন জোরজবরদস্তিসর্বস্ব সরকার যে খুব বেশিদিন বৈদেশিক সমর্থনও পায় না এটা আওয়ামি লিগের মনে রাখা উচিত। মনে না রাখলে মূল্য দিতে হতে পারে। অনেক বড়ো মূল্য।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

2 + 7 =