প্রসঙ্গ: অর্থনীতিতে বাংলাদেশের নারীদের অবদান ও হেফাজত এ জামাত।

লেখটা লেখার ইচ্ছে ছিল হেফাজতের ১৩ দফা ঘোষণার পরপর, কিন্তু সময়ের অভাবে লিখতে পারিনি। এর মধ্যেই তৈরী পোষাকশিল্প তথা বাংলাদেশের ইতিহাসে ভয়াবহতম বিপর্যয় ঘটে গেল। কয়েকজনের লোভ আর ঔদাসীন্যের কারণেই বলী হল পাঁচ শতাধিক তাজা প্রান, আহত প্রায় আড়াই হাজার এবং এখনো নিখোজ প্রায় চারশতাধিক (১)! হতাহত এবং ক্ষতিগ্রস্ত সকল শ্রমিকের প্রতি সম্মান ও সহমর্মিতা, এবং নিহতদের স্বজনদের প্রতি শোক জানিয়ে লেখা শুরু করছি। এই লেখাকে বাংলাদেশের তৈরী পোষাক শিল্পের মালিকদের অনুকূলে ভাবার কোন কারণ নেই, বরঞ্চ সেই লোভীদের প্রতি আমার ঘৃণা সবসময়ই ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও অক্ষুন্ন থাকবে।

লেখাটা মূলত হেফাজতের ১৩ দফার মধ্যে সন্নিবিষ্ট একটা দফা নিয়ে, দফাটা হলো সাবেক চার নাম্বার দফা। সাবেক বলার কারণ হলো সেটা অনেকটা পরিবর্তন, সংশোধন ও সংযোজনের ফলে প্রায় পুরোটাই বিকৃত হয়ে নতুন মানে নিয়েছে (২)। তবে তাদের (হেফাজতের) নারীর প্রতি যে দৃষ্টিভঙ্গী ও মনোভাব সেটা খুব একটা বদলেছে বলে জানি না। ঢাকার সমাবেশে একজন নারী সাংবাদিকের উপর নির্লজ্জ হামলার পরে লোকদেখানো দু:খপ্রকাশ করে পরবর্তী সমাবেশে নারী সাংবাদিকদের আসতে মানা করে আগাম সতর্কতা জারী করে তার প্রমানও রেখেছে সংগঠনটি (৩)।

বাংলাদেশের রপ্তানী আয়ের গত প্রায় তিন দশকের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এই সময়ের মধ্যে অন্যান্য সকল শিল্পকে ক্রমান্বয়ে পেছনে ফেলে বর্তমানে বাংলাদেশের মোট রপ্তানী আয়ের সিংহভাগের যোগান দিচ্ছে তৈরী পোষাক শিল্প একাই এবং বিগত ২০০৯-২০১০ অর্থবছরে সেটা শতকরা ৭১ ভাগ ছিল (৪)। এবং এই পোষাক শিল্পের মোট ৪০ লক্ষ্যাধিক শ্রমিকের প্রায় ৯০ শতাংশ নারী শ্রমিক বা প্রায় ৩৫ লক্ষ্য‍ নারী শুধু তৈরি পোষাক শিল্পেই কাজ করে। নিচের তুলনামূলক টেবিলটাতে দেখানো হয়েছে গত তিন দশকের রপ্তানী আয়, মোট তৈরী পোষাক শিল্পের সংখ্যা ও তাতে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা (৫)।

Overview of RMG in Bangladesh

SI No. Item Amount/Number Remarks
1984-1985 2011-2012
1 Total Export (Million $) 934.43 24287.66 Footnote 5
2 RMG Export (Million $) 116.2 19089.69 Footnote 5
3 Total Garment Factories 384 5400 Footnote 5
4 Total Number of Workers 120000 4000000 Footnote 5

অন্যান্য শিল্প ও পেশায় কর্মরত নারীর সংখ্যা ২০০৫-২০০৬ সালে ছিল ১ কোটি ২১ লক্ষ (৬) এবং আগের বছরের সংখ্যার সাথে প্রবৃদ্ধির হার যোগ করলে বর্তমানে এই সংখ্যা প্রায় ১.৫ কোটি হওয়া স্বাভাবিক, পাশাপাশি এখানে শুধুমাত্র ১৫ বছর বা তার অধিক নারীদের অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। ১৫ বছরের নিচের নারীরাও অর্থকরী কাজ করে এবং সে সংখ্যাও নগন্য নয়। মজুরীভিত্তিক কৃষিকাজে ২০০৫ সালের হিসাব অনুযায়ী মোট শ্রমিকের শতকরা ৬৬.৫৪ জন নারী, এবং মজুরীভিত্তিক কৃষিবহি:র্ভূত অন্যান্য কাজে মোট শ্রমিকের শতকরা ১৪.৬ জন নারী (৭)।

এখন প্রশ্ন হলো এই বিপুল সংখ্যক কর্মজীবি নারীর অবদান কতটুকু বাংলাদেশের অর্থনীতিতে? মোট ‘জিডিপি’র পরিমান ২০১২ সালে প্রাক্কলন করা হয়েছিল ৩০৫.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (৮) যার অর্ধেকের বেশী অবদান নারীর সেটা আমাদের স্বীকার করতেই হবে (৯)। ঘরে আমাদের মা, বোন, স্ত্রী বা অন্যান্য অত্মীয়ারা যে শ্রম দেন বা সন্তান লালন পালনে মায়েদের যেই শ্রম সেটার বিনিময়ে কোন অর্থের লেনদেন হয় না, হলে সেটাও ‘জিডিপি’তে অন্তর্ভুক্ত হতো এবং ‘জিডিপি’র আকার এবং তাতে নারীর অবদান কয়েকগুন বেড়ে যেত নি:সন্দেহে। এটা শুধুই অংকের বা অর্থেনীতির হিসাব। এর বাইরে একজন নারীর সামাজিক অন্যান্য অবদান, সমাজ গঠনে, শিক্ষা বিস্তার সহ অন্যান্য ক্ষেত্রে নারীর ভূমিকা কখনোই খাটো করা যাবে না। নারীরা এখন দুমুঠো খাবার পেটে দেওয়ার আশায় পিঠ পেতে দেয় না স্বামীর কিল খাওয়ার জন্য।

নারীদের অর্থোপার্জনই বা কেন চক্ষুশূল এই গুষ্ঠিটার কাছে? বাংলাদেশের কৃষি কাজ থেকে শুরু করে এমন কোন শিল্প নেই যেখানে নারীরা কাজ করে না। তাদের অবদান অস্বীকার করা বা তাদের কর্মহীন করে ঘরে বসিয়ে রাখার দাবী কতটুকু যৌক্তিক? এই নারীরা ঘরে বসে থাকলে খাবার যোগান হবে কোত্থেকে? এই নারীদের উপর নির্ভরশীল আরো প্রায় ২ থেকে ২.৫ কোটি লোকের ভরণপোষণ কিভাবে হবে? আসল প্রশ্ন হলো নারী ঘরের বাইরে বের হলে, নারীরা কাজ করলে, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হলে, নারীর ক্ষমতায়ন হলে সমস্যা কার এবং কেন?

নারীদের এইসব হুজুরেরা শুধুই ‘শস্যক্ষেত্র’ ভাবতেই অভ্যস্ত, ধর্মীয় ভাবে তাদের কাছে নারীকে চিত্রায়িত করাও হয়েছে ঠিক সেভাবেই। নারী একটা বস্তু, যেটার মালিকানা পুরুষেরা পাবে দাসত্ব, বিয়ের মাধ্যমে বা যুদ্ধ জয়ের পুরস্কার স্বরুপ যুদ্ধবন্দীনি হিসেবে। কল্পিত স্বর্গের লোভ দেখানোতেও ব্যাবহার করা হয়েছে অফুরন্ত নারীভোগের। নারী’র উপযোগীতা তাই এই শ্রেনীটার কাছে শুধুই যৌনতার প্রয়োজনে এবং সন্তান উৎপাদনে। এবং এই রকমভাবে একটা নারীকে কার্য্যত গৃহবন্দী করে রাখার সবচেয়ে মোক্ষম উপায় হলো তাকে নিরক্ষর, পরনির্ভর ও বাকহীন করে রাখা! অর্থনৈতিক সক্ষমতাহীন একজন নারী তার বাবা, ভাই ও পরে স্বামী, ছেলের দাসত্ব মেনে নিতে বাধ্য হয় শুধুমাত্র খাবার ও আশ্রয়ের জন্য। একজন স্বাবলম্বী নারী এই শৃঙ্খল, দাসত্ব ও পরনির্ভরশীলতা মানতে নারাজ, শুধু মাত্র ‘শস্যক্ষেত্র’ হয়ে বাঁচতে তাদের প্রবল আপত্তি এবং সেখানেই মূলত লুকিয়ে আছে হুজুরদের নারীবিদ্বেষ। সমাজের যে কোন সমস্যায়, যে কোন ধর্ষণের ঘটনায় বা নির্যাতনের ঘটনায় ঠিক সেই কারণেই হুজুরেরা নারীর দোষ খুজে পান। আজকের নারীদের কর্মক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি কাজ করা, ছাত্রদের সাথে এক কক্ষে শিক্ষাগ্রহন বা বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া কে হুজুরেরা ‘বেহায়াপনা ও নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ’ বলে উল্ল্যেখ করলেও আসলে তাদের মর্মজ্বালা অন্যখানে, ঠিক যে কারণে তারা ‘নারীনীতি’ ও ‘শিক্ষানীতি’র বিরোধীতা করে। ধর্ষকের সমালোচনা না করে তাই ধর্ষণরোধে এরা প্রস্তাব করে নারীদের বস্তাবন্দী করে রাখতে। যে কোন মূল্যেই এরা নারীকে শুধুই একটা শস্যক্ষেত্রের চেয়ে বেশী মর্যাদা দিতে নারাজ, এদের ধর্মানুসারেই প্রথম নারী হাওয়া’কে তৈরী করা হয়েছে আদমের সঙ্গ দেওয়ার জন্য, আদমেরই পাজরের হাড় থেকে। সৃষ্টিতত্ত্ব মেনেই তাই এদের দৃষ্টিতে নারী পরিপূর্ণ নয়, স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, আত্মনির্ভরশীল হতে পারে না, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সামাজিক অবস্থানও স্বীকৃত নয় এদের কাছে। সেই অপূর্ণ নারীকে আবার বড় দুটো রাজনৈতিক দলের প্রধান ও গত দুই দশকের অধিক নারী প্রধানমন্ত্রী দেশের ক্ষমতায় সেটা মানাও এদের কাছে সমান কষ্টকর, কিন্তু ঠেলায় পরে এরা শক্তের ভক্ত সেজে কর্মজীবি নারী তথা নরমের যম হতে চায়। কিন্তু এদের কারোরই ধারণা নেই তাদের নিজের বাড়িতেই যদি নারী একবেলা হেসেল ঠেলা বন্ধ করে দেয় তবে গুষ্ঠিসুদ্ধ উপোস করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। একজন নারীর উদরে জন্ম নিয়েও এরা প্রাচিন ধর্মগ্রন্থ হাতড়ায় নারীর অবদান খুজতে।

অর্থনীতিতে নারীদের অবদানের বা সামাজিক জীবনে নারীর ভুমিকার কথা বললে হুজুরেরা সবসময়ই ঠোট বেকিয়ে যুক্তি অগ্রাহ্য করে থাকেন। কারণ তাদেরও যুক্তি আছে, তবে তাদের যুক্তিতে আছে একমাত্র সৌদি আরব, যেখানে নারীর ন্যুনতম অধিকার নেই তারপরও তারা উন্নতি করছে। তাদের মতে নারী ঘরে থাকলেও দেশের অর্থনীতি উন্নত হতে পারে। কিন্তু আফসোস, অর্থনীতি বোঝার মত জ্ঞাণ বা যুক্তি বুঝতে যতটুকু ঘিলুর দরকার সেটুকু তাদের মাথায় নেই, কখনো ছিলওনা। সৌদির রাজস্ব আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ নির্ভর করে খনিজ তেলের উপর, সৌদির ‘জিডিপি’র প্রায় ৪৫ শতাংশ এবং রপ্তানী আয়ের ৯০ শতাংশ এই তেল রপ্তানী থেকে আসে (১০)। আরেকটা ব্যাপার প্রায় কোন পরিসংখ্যানে নেই, সেটা হলো প্রতিবছর সৌদি আরবের ‘হ্বজ্জ’ ও ‘ওমরাহ হ্বজ্জ’ থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব। এই বিপুল পরিমান খনিজ সম্পদ যদি কারো থাকে এবং সারা পৃথিবীর সক্ষম মুসলমানদের বাধ্যতামূলক হ্বজ্জের কারণে সৌদির মক্কা মদিনা প্রতিবছর ভ্রমন করতে হয় তবে বৈদেশিক মূদ্রার আয় কতখানি হয় সেটা আন্দাজ করা কষ্টকর নয়।

হুজুরদের এই বালখিল্য দাবী যে কতটা হাস্যকর ও অমূলক তা জানা যায় শুধু একটা প্রশ্নে, ‘হুজুররা কি এইসব মহিলাদের খাওয়া ঘরে ঘরে পৌছে দিবেন’ (১১)? ক্রমবিকাশমান অর্থনীতির ধারা অব্যাহত ও উত্তরোত্তর প্রবৃদ্ধির জন্য দরকার বাংলাদেশের নারীর সুশিক্ষা নিশ্চিত করা, সমাজের সর্বস্তরে কার্য্যকর অংশগ্রহন নিশ্চিত করা, নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা, নারীর প্রতি সমাজের তথা পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তনের জন্য প্রচারণা ও আইনের শাসণ নিশ্চিত করা। সভ্যতা সামনের দিকেই এগোয়, সেটাকে পিছনে নিয়ে যাবার প্রয়াস শুধুমাত্র মাথামোটা হুজুর ছাড়া অন্যকারো নেই, হেফাজতের ঘোষিত ১৩ দফা‌ই তার উৎকৃষ্ট প্রমান। এই ১৩ দফার (পূর্বের) একটাও মানা দূরের কথা, সেটা নিয়ে আলোচনা করারও কোন সুযোগ নেই। তবে ঠেলায় পরে তারা অনেকটা সরে এসেছে পূর্বের অবস্থান থেকে, আপত্তিকর শব্দ, বাক্য ও দফা বিলোপ করে নতুন নতুন শব্দ, বাক্য ও দফা সংযোজন করে আপাতত নিজেদের লুঙ্গীর হেফাজত করেছে। নতুন সাজানো দফাগুলতেও এমন কিছু নেই যেটা বাংলাদেশের সামগ্রিক অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য্য বা অন্যকেউ আগে বলেনি। বরং বালাদেশকে একটা তালেবানি, সাম্প্রদায়িক ও মধ্যযুগে ঠেলে দেবার চেষ্টাই করা হয়েছে দফাগুলতে।

তথ্যসূত্র (ক্রমান্বয়ে):

১. http://prothom-alo.com/detail/date/2013-05-03/news/349395
http://bangla.bdnews24.com/bangladesh/article620793.bdnews

২. http://www.istishon.com/node/1470
http://www.amarblog.com/freethinking/posts/166003

৩. http://www.samakal.net/whole-country/2013/04/24/2092

৪. http://www.bgmea.com.bd/chart/product_export#.UYO9OkqqXhg
৫. http://www.bgmea.com.bd/chart/factory_growth_in_bangladesh#.UYO-BEqqXhg
http://www.bgmea.com.bd/chart/number_of_employment_in_garment#.UYO-FEqqXhg

৬. Gender Statistics of Bangladesh-2008, P-85
http://www.bbs.gov.bd/WebTestApplication/userfiles/Image/SubjectMatterDataIndex/statisticsbook.pdf

৭. Gender Compendium of Bangladesh-2009, P-6
http://www.bbs.gov.bd/WebTestApplication/userfiles/Image/SubjectMatterDataIndex/GSCompend_09.pdf

৮. https://www.cia.gov/library/publications/the-world-factbook/geos/bg.html

৯. http://www.bgmea.com.bd/chart/total_product_export#.UYOlHEqqXhg

১০. https://www.cia.gov/library/publications/the-world-factbook/geos/sa.html

১১. http://bangla.bdnews24.com/economy/article611404.bdnews

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “প্রসঙ্গ: অর্থনীতিতে বাংলাদেশের নারীদের অবদান ও হেফাজত এ জামাত।

  1. হেফাজতী হুজুরেরা সবচেয়ে বেশী
    হেফাজতী হুজুরেরা সবচেয়ে বেশী বাটে পড়েছে; নারীনীতিতে হাত দিতে গিয়ে। কেউ বুঝুক বা না বুঝক; এটি কিন্তু একটি আমেরিকান চাল। বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টরের মূল চালিকা শক্তি রহিত করার মাধ্যমে; দেশের অর্থনীতি ধ্বংস এবং; সেই সাথে নৈরাজ্য সৃষ্টিই এর মূল উদ্দেশ্য।

  2. হতে পারে, তবে আমাদের অর্থনীতি
    হতে পারে, তবে আমাদের অর্থনীতি ধ্বংস করতে ইউএসএ’র এত তৎপরতার উদ্দেশ্য কি সেটা ঠিক বোধগম্য হলো না! সেটা যদি সামরিক আগ্রাসন চালানোর জন্য হয়ে থাকে, তবে তো যে কোন সময় সেটা করা যেতে পারে, অর্থনীতি দূর্বল করার কি দরকার?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

64 − = 61