প্রসঙ্গ আমেরিকার নির্বাচন ।

প্রথমেই বলে রাখি আপনারা অনেকেই এই লেখা পছন্দ করবেন না , এক মত হবেন না। আর আপনাকে একমত হতে হবে এমন কোন কারণও নেই। দ্বিমত থাকাটাই স্বাভাবিক। আমেরিকার নির্বাচন নিয়ে কথা বলা যারা অপছন্দ করেন তারাও দূরে থাকতে পারেন। আমরা সবাই বিশ্ব রাজনীতির অংশ। তাই আমি কথা বলব।

১। ২০১০ সালের দিকে গুগোল বাংলা ভাষা কে গুগোল ট্রান্সলেটে যোগ করে। এটা যে কোন দেশের জন্য, ভাষার জন্য বিশাল একটা ব্যাপার। গ্লোবালাইজেশনের যুগে এর বিশাল প্রভাব আছে। গুগোল ট্রান্সলেট মূলত একটি ভলেন্টারি কন্ট্রিভিউটেড ওয়ার্ক। অর্থাৎ গুগোল কোন ভাষা নতুন যোগ করলে সেটা ট্রান্সলেশন যোগ করার জন্য ওই ভাষাভাষী মানুষের জন্য সেটা উন্মুক্ত করে দেয়। যেমন আপনি যেই ইংরেজির বাংলা জানেন সেগুলো আপনি লিখে গুগোলে শেভ করলে পরবর্তিতে আপনার এই সবগুলো ট্রান্সলেশনের কাজ করবে।

আমরা বাঙ্গালীরা কি করলাম সেই ট্রান্সলেট সুবিধা নিয়ে ?
আমরা বাঙ্গালীরা যথারীতি এই সুবিধাটাকে একদম যাচ্ছেতাই করে ফেলাম । সবাই গুগোলে মিস ট্রান্সলেশন বা ভুল ট্রান্সলেশন সংরক্ষণ করে দিলাম। যেমন একটা উদাহরণ দেই, তাহলে বিষয়টা বুঝতে সহজ হবে। কেউ একজনের নাম ইংরেজিতে যা বাংলায়ও তাই। কিন্তু আমাদের ভাইয়েরা কি করল – ইংরেজিতে সাকিব খান লিখে বাংলা ট্রান্সলেশন দিল “হিজড়া” । এইভাবে হাজার হাজার ভুল অনুবাদ দিতে থাকল। কেউ যেন এই সুযোগটার অপব্যাবহার না করে সেই জন্য প্রফেসর মুহম্মদ জাফর ইকবাল সেই সময় একটা কলাম লিখেছিলেন প্রথম আলো তে। আমাদের ভুল অনুবাদ , ইচ্ছাকৃত বাজে অনুবাদ দেখে তিনি মর্মাহত হয়েছিলেন। গুগোল বিষয়টা বুঝতে পেরে পরবর্তিতে সেই ভলেন্টিয়ারি অপশনটা বন্ধ করে দেয়। কি অপমানের সেটা আমাদের জন্য এবার বলুন ?

২। সম্প্রতি মার্কিন নির্বাচন কে ঘিরে আমাদের দেশেও বেশ আগ্রহ, উদ্বেগ, উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। মার্কিন রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্ভবত শুধু আমেরিকা নয় সারা বিশ্বে সবচাইতে ঘৃণিত প্রার্থী ছিলেন। অন্তত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সেই ভাবেই প্রকাশ করেছে। এটা বিশ্বরাজনীতির অংশ, মিডিয়ার স্বার্থ ছিল তারা করেছে। কথা হল আমার বাঙ্গালীদের নিয়ে। আমরা দেখলাম আমাদের শিক্ষিত, ভদ্র রুচি, ফেসবুকে সেলিব্রেটি , তারা সবাই কি করল ? ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনি ক্যাম্পেইন ফেসবুক পেইজে বাংলায়, ইংরেজিতে , অসভ্য ভাষায়া, অশালীন ভঙ্গিতে, অপমান মূলক নানান কথা ইনবক্স করতে লাগলো। যেহেতু এই ফেইজটা ক্যাম্পেইনের জন্য সেখান থেকে কেবল নির্বাচনি প্রচারণা চলবে সেটাই স্বাভাবিক? পেইজ থেকে অটো জেনারেট করা ম্যাসেজ সবার কাছে উত্তর হিসেবে যেতে লাগল। আর সবাই মহা আনন্দে সেই ম্যাসেজের স্ক্রিনশট নিয়ে ফেসবুকে আর বেশী বেহায়া মজা নিতে শুরু করল। অনেকে ট্রাম্পকে বলদ প্রমাণ করতে এই কাজ অতি উৎসাহে করতে শুরু করল। আচ্ছা বলেনতো বলদ কে? ট্রাম্প না আপনি?
আপনি বলদ, কারণ আপনি প্রথমত অনধিকার চর্চা করেছেন । তারপর আপনি বিদ্বেষপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করেছেন, জাতিগত অশালীনতার পরিচয় দিয়েছেন। আপনি যেহেতু এই নির্বাচনের অংশ নয়, তাকে ইনবক্স করা কোন ভদ্র লোকের কাজের মধ্য পরে না।

৩। এখন ধরা যাক আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার সেই ইনবক্সগুলো দেখতে শুরু করল। কে কি লিখেছে সেগুলো দেখল। আপনাদের লেখা গুলো ট্রান্সলেট করে পড়ল। এর পর যদি সে সিদ্ধান্ত নেয় সকল বাঙ্গালীকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিবে আমেরিকা থেকে তারপরও আপনি তাকে জাতি বিদ্ধেষী বলবেন? ( যদিও এটা ট্রাম্প কোন দিন করবে না) । আপনাদের অপকর্মের জবাব যদি কেউ তার ক্ষমতা দিয়ে দেয় তখনো আপনি তাকে রেসিস্ট বলবেন? ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে দেখুনতো, কে রেসিস্ট – আপনি? না ডনাল্ড ট্রাম্প?

৪। ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়াই অনেকে ভয় পাচ্ছেন। সবাই কিন্তু ভয় পাচ্ছে না। কারা ভয় পাচ্ছেন- আমি একজন বাঙ্গালী হিসেবে বাঙ্গালীদের কথা বলতে পারি। আমার পরিচিত অনেক শিক্ষিত, সৎজন বাঙ্গালী আমেরিকান যারা নিউইয়র্কে থাকেন তারা ট্রাম্প কে ভোট দিয়েছেন। যারা ট্রাম্পকে ভয় পায় তারা মূলত দুই শ্রেণীর বাঙ্গালী। ১। সে ইসলামী জঙ্গিবাদকে সমর্থন করে। ২। সে অবৈধ ভাবে আমেরিকায় অভিবাসী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। কেন এই কথা বলছি শুনেন।
ট্রাম্প কোন বৈধ নাগরিককে এই দেশ থেকে বের করে দিবে এই কথা বলেনি। আর এটা একজন প্রেসিডেন্টের পক্ষে সম্ভবও নয়। এই রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রায় অভিবাসীদের অবদান সবচাইতে বেশী। আমেরিকার ৯৫ ভাগ মানুষ কোন না কোন ভাবে অভিবাসী। ভারত বর্ষ থেকে যেমন এসেছে , তেমনি এসেছে ইউরোপ, ল্যাটিন আমেরিকা, ক্যারেবিয়ান অঞ্চল এবং আফ্রিকা থেকে। এদের সবাই মিলেই আজকের আমেরিকা। সুতরাং এই বিশাল জনগোষ্ঠী কে এই দেশ থকে বের করে দেয়ার প্রশ্নই আসে না।

ইসলামী জঙ্গিবাদের সাথে হিলারি ক্লিনটনের সংস্রবের কথা সবাই জানে। তারপরও বাঙ্গালী মুসলমান হিলারিকে সমর্থ করে একটাই অর্থে সেও জঙ্গিবাদের সমর্থক। একটা সাধারণ কথা চিন্তা করুন, আমাদের দেশে একটা পটকা ফুটলেও আমারা সেখানে আমেরিকার দোষ খুঁজি । তাহলে আইসিস দ্বারা গুলশান হামলার পরেও আমরা আইসিসের সৃষ্টিকর্তা হিলারি ক্লিনটনের পক্ষে নির্লজ্জ সমর্থন দেই কি করে? আজকের দিনে আপনি বিশ্বাস করেন আর নাই করেন বাংলাদেশের বেশীর ভাগ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে জঙ্গিবাদকে সমর্থন করে।

আমার সাথে ব্যক্তিগত পর্যায়ে যারা মার্কিন নির্বাচন নিয়ে কথা বলেছে তাদের বেশীর ভাগের মনে শঙ্কা ছিল এই দুইটা । যে অবৈধদের নাগরিকত্ব না দিলে আমার আমেরিকা যাওয়ার স্বপ্নতো মাটি হয়ে যাবে। আর যেহেতু ট্রাম্প বলেছে আমেরিকা থেকে মুসলমান দের বের করে দিবে, তাহলে কি হবে? আসল কথা হল চোরের মনে চুরি বিলাইর মনে হুড়ি। ট্রাম্প কোন বৈধ মুসলমানকে বের করে দিবে এই কথা বলেনি। সে যাদের কে বুঝিয়েছে তারা হল কিছু মধ্যপ্রাচ্যের জানোয়ার মুসলমান । এরা এই দেশে আসছে রেফিউজি হিসেবে । আমেরিকা এদের আশ্রয় দিয়েছে মানবিক কারণে। কিন্তু কিছু কিছু রাজ্যে এই রেফিউজি আরব্য মুসলমানকে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে। তারা এখন স্থানীয় কমিউনিটির জন্য হুমকি । ট্রাম্প মূলত এই মুসলমানদের কোথায় বলেছে।

আমি যে এলাকায় থাকি তার থেকে ২০ মাইল দূরেও এমন একটা রেফিউজি এলাকা আছে। আমরা প্রায় আমাদের অতিরিক্ত কাপড়, খাবার, টাকা সেই ক্যাম্পে দিয়ে আসি। সব খ্রিস্টানরা কম বশী তাদের সাহায্য করে।

নিচের ঘটনা থেকে খুব সহজে অনুমান করা যায় এই রেফিউজি মুসলমানেরা কি পরিমাণ অসহ্য হয়ে উঠেছে এখানে। স্থানীয় কমিউনিটি এখন আতংকে থেকে এদের ভয়ে।

একটা ঘটনা বলিঃ আমি একদিন সল্টলেক গেছি আমার ব্যক্তিগত একটা কাজে । সেখানে তখন খ্রিস্টানদের একটা বিশাল সম্মেলন চলছে। সম্মেলন কেন্দ্রের বাহিরে দেখি লাইন ধরে সব রেফিউজি সিরিয়ান। তাদের হাতে কোরআন আর হাত মাইকে বলছে- কোরআন সত্য আর বাকী সব বই মিথ্যে। তোমরা বাইবেল ছেড়ে কোরআন পড়। আল্লাহরপথে আস। ইসলাম প্রতিষ্ঠা কর। শরিয়া আইন চালু কর।

এইবার বুঝুন কাণ্ড ! এদের এখানে আশ্রয় দিল যারা তাদেরকে এখন এই রেফিউজিরা জ্বালাচ্ছে। রেফিউজিরা বলছে এখনে শরিয়া আইন চালু করতে হবে। আপনি যাকে আশ্রয় দিলেন তার এমন স্পর্ধা মেনে নিবেন?

ট্রাম্প এসব মুসলমানের কথা বলেছে। অথচ সেটাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে পুরা মুসলমানদের উপর ছড়িয়ে দিল হিলারি শিবির। আর বাঙ্গালী জঙ্গিবাদের সমর্থনাকীরা লেগে গেল ট্রাম্প কে ইনবক্স করার কাজে।

শেষ পর্যন্ত কি হল ? পারছে সারা দুনিয়ার গণমাধ্যম ট্রাম্প কে ঠেকায় রাখতে? সে গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট।

আপনার মনে যদি অবৈধ অভিবাসী হওয়ার মত নিন্ম মানের ইন্টিউশন না থাকে , আপনি যদি জঙ্গি মৌলবাদী না হন ট্রাম্প কে আপনার ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তার বিরোধিতা করারও কিছু নেই। সে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আপনার না। তার কোন সিদ্ধান্তে যদি ক্ষতি হয় আমেরিকার হবে আপনার আমার হবে না। তাহলে আপনার আমার এত চিন্তা কেন ? ঐযে বললাম চিন্তার কারণ দুইটা- হয়ত আপনি অবৈধ অভিবাসী সমর্থন করেন, না হয় আপনি মৌলবাদী জঙ্গি। এর বাহিরে চিন্তিত হওয়ার আর কোন কারণ নাই।

আশা করি ট্রাম্পের ইনবক্স থেকে পাওয়া উত্তরগুলোর স্ক্রিনশট তাবিজ বানিয়ে আপনার গলায় ঝুলিয়ে রাখবেন। ইহকালে আপনি জঙ্গির শান্তি অন্তত সেই তাবিজে পাবেন।

সবার মঙ্গল হোক।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

80 − = 77