সাঁওতালদের সাথে দিকুদের লড়াই

অরণ্যের অধিকার নিয়ে সাঁওতাল, ওঁরাও, মুন্ডাদের সংগ্রাম আক্ষরিক অর্থেই হাজার বছরের, এই উপমহাদেশে। জল, জমিন, জঙ্গল এর অধিকার নিয়ে আদিবাসীদের সংগ্রাম চলে এসেছে বংশপরাম্পরায়। দিকুদের বিরুদ্ধে। দিকুরা এসেছে নানা চেহারায়, বৃটিশ কিংবা বাঙ্গালী, ব্রাক্ষন কিংবা খৃস্টান। দিকুদের পেছনে ছিল রাষ্ট্র।

সব দিকুদের সাথেই আদিবাসীদের পার্থক্য কেবল চেহারায় নয়, বিশ্বাসে ও জীবনাচারে। দিকুরা শোষণ করে, সম্পদ লুঠ করে, জল জমিন জঙ্গল থেকে উচ্ছেদ করে মানুষ। সম্পদ আর মুনাফার জন্য। বিপরীতে আদিবাসীরা বিশ্বাস করে সাম্যবাদে, শান্তিতে, প্রকৃতির পরিচর্যায়।

সিধু, কানু, তাদের বোন ফুলমনির ইতিহাস আমাদের জানা। তার পরের ইতিহাস নকশালবাড়ির জঙ্গল সাঁওতালদের। এদের নামের সাথে নতুন করে যুক্ত হল গোবিন্দগঞ্জের শ্যামল হেমব্রম এর নাম। সেই পুরাতন সংগ্রাম জল জমিন জঙ্গলের। সেই পুরাতন দিকুরা এসেছে, পেছনে রাষ্ট্রকে নিয়ে, রাষ্ট্রের পুলিশ নিয়ে।

সেই পুরাতন দৃশ্য, আদিবাসীদের তীর ধনুকের সাথে দিকু ও পুলিশের বন্ধুক যুদ্ধ। দিকুদের দখলে আবারও চলে যাওয়া আদিবাসীদের জল, জমিন, জঙ্গলের অধিকার। পেছনে রেখে যাওয়া আদিবাসীদের লাশ।

দ্বন্দ্বটা কোথায়? দ্বন্দ্বটা অরণ্যের অধিকার নিয়ে নয় কেবল। আপাতভাবে যে জল জমিন জঙ্গলের কথা বলছি সেটা নিয়েও নয়। আসল দ্বন্দ্বটা মূল্যবোধের, মতাদর্শের, জীবনাচারের। মুল দ্বন্দ্বটা দেখতে হলে আদিবাসীদের বুঝতে হবে। বুঝতে হবে শ্রেণী ও পিতৃতন্ত্রকেও।

আদিবাসীদের “পশ্চাৎপদতা” ও দারিদ্র্য নিয়ে, আদিবাসীদের “উন্নয়নের” প্রতিবন্ধকতা নিয়ে যারা প্রশ্ন করেন, তারা কি অন্যভাবে ভাবতে পারেন? এই উপমহাদেশে বর্নবাদ এসেছে, শ্রেণীভেদ এসেছে, পিতৃতন্ত্র এসেছে, বহু বহু মানুষ সেই শ্রেণীবিবর্তন প্রক্রিয়ায় হারিয়ে গিয়েছে, কিংবা দাস ও সামন্ত সমাজে তারা আত্মবিলোপ করেছে। কিন্তু আদিবাসীরা কেন হারিয়ে যায়নি? কি সেই আত্মশক্তি যা প্রায় আড়াই হাজার বছর ধরে এই মানুষদের নিজেদের সমাজ সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করেছে? কি সেই শক্তি বা প্রেরণা যা অস্বীকার ও প্রতিরোধ করতে পেরেছে শ্রেণী ও পিতৃতন্ত্রের “সভ্যতাকে”?

এই শক্তি বা প্রেরণাটা সাম্যবাদের মূল্যবোধের, সাম্যবাদী জীবন চর্চার। এই মানুষেরা আদি ও সহজাত সাম্যবাদী। ন্যাচারাল কমিউনিস্ট। কারণ এদের বিশ্বাস যৌথ মালিকানার, সহভাগিতার, স্বশাসনের, স্বাধীনতার ও সহযোগিতার। যে মূল্যবোধে বিশ্বাস একজন মানুষকে সাম্যবাদী করে। এই মূল্যবোধ ও বিশ্বাস এদের বংশানুক্রমের, মার্কসবাদ পড়ে তৈরি হয়নি। সাম্যবাদী সমাজ এরা অব্যাহত রেখেছে। সাম্যবাদী মালিকানা সম্পর্ক ও যৌথ সাংস্কৃতিক চর্চার প্রক্রিয়ায়।

বিপরীতে, শ্রেণী ও পিতৃতন্ত্রের বিকাশের ফলে, রাষ্ট্রের বিকাশের ফলে, আদিবাসীদের জল জমি জঙ্গলের উপর, উপনিবেশের, শ্রেণীর, ব্যাক্তি মালিকানা প্রতিষ্ঠার আক্রমণ হয়েছে। আমাদের অঞ্চলে, বড় আক্রমণটি হয়েছে সেই ১৭৯৩ সালে, বৃটিশ সামন্ত ভূমি সম্পর্কের প্রচলনের মাধ্যমে। ছোটনাগপুরের আদিবাসী বাসিন্দারা তাদের যৌথ মালিকানা অব্যাহত রাখতে পেরেছে, কিন্তু অন্য অনেক অঞ্চলেই তা হয়নি।

আপাতভাবে শ্যামল হেমব্রমের সাথে আখচাষের জমি নিয়ে বিরোধ হলেও, মূলত এই বিরোধ দুই মতাদর্শের, দুই ব্যাবস্থার, দুই সংস্কৃতির। একটি সাম্যবাদ অন্যটি পুঁজিবাদ।

পুঁজিবাদ আজ “উন্নয়নের” নামে তার পুঁজি বিনিয়োগ করছে। আজকে আমলা-কর্পোরেট পুঁজি সব কিছুই দখলে নিতে চায়। জল জমিন আর জঙ্গল। আর এই “উন্নয়নের” বিরুদ্ধে আদিবাসীরা। কারণ তারা প্রাকৃতিক ভাবেই সাম্যবাদী। এই সংগ্রামটাই সত্যিকারের শ্রেণীসংগ্রাম, জীবন্ত, কাগুজে নয়।
দিকুরা নানাভাবে এই সংগ্রামকে বিভক্ত করে, বিভ্রান্ত করে, পথভ্রষ্ট করে। একদল যায় “উন্নয়নের” নামে, আরেকদল যায় অধিকারের নামেও। বাইরের দিকু প্রভাবে আদিবাসীরা ভ্রাতৃঘাতিও হয়। পুঁজিবাদী শিক্ষা অনেক ব্যাক্তি আদিবাসীকেই তাদের সংস্কৃতি থেকে সরিয়ে দিকু সংস্কৃতির দিকে নিয়ে যায়, শ্রেণী ও পিতৃতন্ত্রের পক্ষে, নিজের অজান্তেই।

সাঁওতাল শ্যামল হেমব্রমরা তাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য, সংস্কৃতিকে রক্ষার জন্য সংগ্রাম করছে। জল জমি জঙ্গলের জন্য জীবন দিচ্ছে। চূড়ান্ত বিচারে সাম্যবাদী মূল্যবোধ ও জীবনাচারকে, আদিবাসীত্বকে রক্ষার জন্যও। সেটাই আমাদের, যারা আদিবাসী নই, আমাদেরও ভবিষ্যৎ। ইতিহাদের ভবিষ্যৎ।

আমরা যারা দিকুদের ঘরে জন্মেছি, একই সাথে আমরা যারা একটি সাম্যের ও শান্তির সমাজ চাই, আমাদের দায় কেবল শ্যামল হেমব্রমের হত্যার বিচারের দাবী তোলাই নয়। আমাদের দায়, আমাদের অতীত আদিবাসী ঐতিহ্যের সাথে যুক্ত হওয়া। সেই আদি মূল্যবোধে ফিরে যাওয়া, যে মূল্যবোধ সমতার, সহভাগিতার, যৌথতার, স্বশাসনের ও স্বাধীনতার। আমাদের ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের জনচেতনার সাথে এই মূল্যবোধের কোন বিরোধ আছে বলে আমার মনে হয়না।

দিকুদের পরাভূত করতে হলে, তাদের মতাদর্শের বিরুদ্ধে দাড়াতে হবে, তাদের পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী “উন্নয়ন” নীতির বিরুদ্ধে দাড়াতে হবে, তাদের ব্যাবস্থাটার পতন ঘটাতে হবে। নতুন সাম্যবাদী ব্যাবস্থা প্রতিষ্ঠাপিত করতে হবে। সেজন্য আমাদের মার্ক্সের কাছে যাওয়ারও দরকার নেই, ঘরের কাছের আদিবাসী ব্যাবস্থা বুঝলেই “সাম্যবাদ” ও “নারী-পুরুষ” সমতা সম্পর্ক যে কি তা জানা যায়।

সিধু, কানু, জঙ্গল সাঁওতাল ও শ্যামল হেমব্রমদের সংগ্রামের বিজয় ইতিহাসের অনিবার্যতা। আসুন, এই সাম্যের সংগ্রামে শ্যামল হেমব্রমদের পাঁশে দাড়াই।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 6 = 1