নিজ ভূমে পরবাস ভূমিহীন আদিবাসী ভূমিপুত্ররা!

জাতিসংঘ সনদে আদিবাসীরা —-
(ক) ১৯৮২ সালে জাতিসংঘে প্রথম আদিবাসী বিষয়ক আলোচনা শুরু করার পর তারা একই বছর ৯ আগস্ট জাতিসংঘ সর্বপ্রথম আদিবাসীদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয়।

(খ) ২০০৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে আদিবাসী অধিকার সনদ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে পাস হয়। আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড বিরোধিতা করে ভেটো দেয়। এর সাথে যোগ দেয় ১১টি দেশ। এরা ঠিক ভেটো নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের বিরত রাখে। দুঃখজনক সত্য হচ্ছে যে, এই ১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশও একটি।

বাংলাদেশের সংবিধানে আদিবাসীরা—-
(ক) ‘বাংলাদেশের জনগণ জাতিতে বাঙালি বলিয়া পরিচিত হইবে।’ সংবিধানের ৬(২) অনুচ্ছেদ, পঞ্চদশ সংশোধনী-২০১১।

(খ) আর পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ২৩ (ক) অনুচ্ছেদে চিত্রকাররা চিত্রিত করেছেন ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’ প্রভৃতি শব্দ দিয়ে।

অথবা,

(গ) ২০১১ সালের গণশুমারিতে বাংলাদেশের আদিবাসীদের বলা হয়েছে ‘এথনিক পপুলেশন’।

এক. আদিবাসীদের জাতিসংঘ স্বীকৃতির পরে নৃতাত্ত্বিক-রাজনৈতিক-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে বিচার করলে দেখা যায় তাঁরা মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন, বা আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন, তাঁদের নিয়ে বিস্তর তর্কাতর্কি হচ্ছে, অনুসন্ধানী কাজ হচ্ছে, আলোচনা জারি আছে। বা রুটিন করে এক ধরণের ফ্রেমওয়ার্ক হচ্ছে! বিশেষ করে, জাতিসংঘের স্বীকৃতির পর থেকে ধরলে দেখা যাবে যে, বিগত প্রায় চার দশকওয়ারী কাজ বলতে বাগাড়ম্বরই সার। বাস্তবতা হলো সারা বিশ্বেই আদিবাসী জাতিসত্তা সমূহের সমস্যাকে জিইয়ে রাখা হচ্ছে, নানাভাবে নিপীড়ন করে তিলে তিলে ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে তাঁদের। বৈশ্বিকভাবে আদিবাসীদের রাজনৈতিক স্বীকৃতির ব্যাপারটা দেশভিত্তিক এখনো হতাশার চিত্র বহন করে।

দুই. ২০০৭ সালের তথাকথিত সেনাশাসন/শাসকরা নির্বাচিত সরকার নেই এই অযুহাতে জাতিসংঘের আনীত ‘আদিবাসী অধিকার সনদে’ সই করেনি। ২০০৭ সালের জের ধরে বর্তমান সরকার কিন্তু পরবর্তীতে জাতিসংঘের সেই ‘আদিবাসী অধিকার’ বিলে এখনো মতামত থেকে বিরত রেখেছে। হ্যা/না এখনো বলেনি। অবস্থান স্পষ্ট করেনি। স্বাক্ষর করেনি। আজতক বাংলাদেশের অবস্থান জাতিসংঘের আদিবাসী অধিকার সনদে বিষয়টা এখনো অমিমাংশিত, ত্রুটিপূর্ণই রয়ে গেছে।

তিন. ২০০৮ সালের বাংলাদেশ আওয়ামিলীগের নির্বাচনী মেনোফেস্টোতেও বাংলাদেশের আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। এরই ছলছুতোয় ২০০৯, ২০১০ এই দুই বছর অবধি নির্বাচিত আওয়ামিলীগ সরকার ৯ আগস্ট ‘আদিবাসী দিবস’ পালন করেছেন বা পালনে উৎসাহ দেখিয়েছেন। কিন্তু লক্ষ্যনীয় যে, তা কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে নয়। স্পষ্টত তা ছিলো উৎসাহ-উদ্দীপনামূলক। এখানে জাতিসংঘের সনদে স্বাক্ষর না করার ব্যাপারটা কি স্পষ্ট হয়ে উঠে না?

চার. বাংলাদেশের আদিবাসীদের জন্য বাংলাদেশের সরকারের তরফে প্রথম বড় আকারে আঘাতটা আসে জাতিসংঘের শুভেচ্ছামূলক ভাষণের মধ্য দিয়ে। বক্তা তৎকালীন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপুমনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই।’ এ নিয়ে তখন বিস্তর জল ঘোলা হয়েছিলো। এরই প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রের তরফে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপুমনি এক প্রেস কনফারেন্স করেন। তাতে তিনি আবারও পরিষ্কার, স্পষ্ট এবং দ্ব্যর্থ ভাষায় বলেন ‘বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই। বাংলাদেশে যদি কোনো আদিবাসী থেকে থাকে তবে সেটা হচ্ছে বাঙালি’। আদিবাসীদের নির্বংশ করার খেলা মূলত এখান থেকেই শুরু!

পাঁচ. বাংলাদেশের সংবিধানে ‘বাংলাদেশের জনগণ জাতিতে বাঙালি বলিয়া পরিচিত হইবে।’ এই আপ্ত বাক্য বলে ২০১১ সালের পঞ্চম সংশোধনীতে রাষ্ট্র নিমিষেই তাঁদেরকে হজম করে ফেলে বা ইতিমধ্যে ফেলে দিয়েছে। এর পর কোনো কথাই চলে না। বাংলাদেশে এই সংশোধনীর পর সত্যিকার অর্থে আর কোনো আদিবাসী নাই। সবাই বাঙালি, বাংলাভাষী। জাতিসংঘে আদিবাসী সনদে ভোট না দেওয়া, স্বাক্ষর না করে ঝুলিয়ে রেখে সংবিধানের সংশোধন করে আদিবাসীদের সাংবিধানিকভাবে মেরে ফেলার কি রহস্য থাকতে পারে বলে আপনাদের মনে হয়?

ছয়. সংখ্যায় প্রায় ত্রিশ লাখ আদিবাসীরা সাংস্কৃতিকভাবেও ভিন্ন। যেমনঃ চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, খুমি, খেয়াং, মনিপুরি, সাঁওতাল, গারো, ওঁরাং প্রভৃতি মিলিয়ে বর্তমানে প্রায় ৫৪টি গোত্র, জাতির ক্ষয়িষ্ণু থেকে ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়া জনজাতিরা দেশের প্রায় ৪০ টি জেলা-উপজেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন। তাঁরা এই নীলনকশাজাত পঞ্চম সংশোধনীর ফলে বাঙালি জাতিগোষ্ঠী ও বাঙলা ভাষাভাষী হিসেবে পরিচয়ে পরিচিত হবেন বা হচ্ছেন। আদিবাসীরা মানেন কি মানেন না, সে অন্য কথা। সংবিধান তা শুনবে কেনো? তো, বস্তুত যা দাঁড়ালো, বাংলাদেশ এক জাতির রাষ্ট্র , এক ভাষার রাষ্ট্র! আদিবাসী বলে আর কোনো ‘ইন্ডিজেনাস’ রইলো না, না?

আদিবাসী ও আদি বাসিন্দা গুলিয়ে খেলে যা হয় তার ফল এই কী না এইভাবে ভাবলে পরে ব্যাপারটা অতি সরলীকরণ হয়ে যায়, খেলো হয়ে যায়। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত কিন্তু এতোটা সরল খেলো না। বরং ভয়ানক দূরভিপ্রায় নিয়েই তারা এই ভয়াবহ কাজ নিমিষেই সমাধা করে ফেলেছে। রাষ্ট্রের তরফে সরকার ঘোষণা দিয়ে, সংবিধান সংশোধন করে আদিবাসীদেরকে নাই বলে দিয়েছে, অস্বীকার করা হয়েছে বা গায়েব করে দেওয়া হয়েছে। তখন আজকের আদিবাসী সাঁওতালসহ অন্য অন্যান্য জাতি, জনগোষ্ঠীদের সমানুপাতিকহারে সব জন-জাতি আদিবাসীরা রাষ্টের সামনে, রাষ্ট্রীয় জনগণের চোখের সামনে হাটতে-চলতে, নিজেদের অস্তিত্ত্ব জানান দিতে, নিজেদের ভাষায় গাইতে-কইতে সর্বোপরি ভুখা-নাঙা, বাস্তুত্যাগী, দেশত্যাগী হতে যেয়ে হাড় জিরজিরে শরীরে নিজেদের আদিভূমি রাষ্ট্র তথা লুটেরা, বেনিয়া ও সেটেলারদের কবল থেকে ফিরে পেতে, অধিকারে রুখে দাঁড়ালে রাষ্ট্র ও তার তাবেদার বাহিনী, সুবিধাভোগী বেনিয়া ও সেটেলাররা নিজেরদের ক্ষমতা প্রতিপত্তি ও সংবিধানিক ক্ষমতাবলে পিলেপিষে, জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মারার জন্য সর্বস্ব নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে। জানা কথা।

সংবিধান কথা কয়। রাষ্ট্রের তরফে এই নীল নকশা প্রণয়ন করতে যা যা করার তা তারা সংবিধানকে আমলে নিয়ে করবেই, এমনি অবস্থায় এই ভয়াল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অসম লড়াইয়ে সহসা মুক্তি পাবেন কী সিধু-কানুদের আজকের উত্তরসূরীরা? নাকি রাষ্ট্রিক নিদান হাকানোর ফলে তিলেতিলেই একদিন ইতিহাসে ঠাঁই নিবেন, নাকি আদি ভূমিপুত্ররা নিজ ‘ভূমে পরবাসী হওয়া’ কথাটাই মিথ্যে করে দিয়ে সিধু-কানুদের আবার ফিরিয়ে আনবেন?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

99 − 92 =