তীর ধনুকে আমাদের যত ভয়

গত রোববার একটা জরুরী কাজে রংপুর থেকে রাজশাহী যেতে হয়েছিলো। সকাল সাড়ে সাতটার সময় বাসে উঠে ঘুম ঘুম চোখে এক বিরক্তিকর যাত্রা শুরু হয়েছিলো। গাইবান্ধা পৌছতেই পিছনের সিটে উঠে বসলো আঠাশ-ত্রিশ বছরের একজন লোক। কিছুদূর যাওয়ার পর লোকটির মোবাইল ফোন ক্রমাগত বাজতে লাগলো আর সে উৎকণ্ঠা নিয়ে অপর প্রান্তে জিজ্ঞেস করছিলো যে এখন কি অবস্থা? গ্রামের কতজন মানুষ গেছে, চড় থেকে ছেলেপেলে আসছে কি না, চেয়ারম্যান আসছে কিনা, পুলিশ আসছে কিনা? কতজন পুলিশ? বারবার এসব শোনার পর তার পাশের লোকটি জানতে চাইলো ঘটনা কি ভাই? উত্তরে সে বললো গাইবান্ধায় সাঁওতালদের সাথে স্থানীয় লোকজনের মারামারি লেগেছে।

এই কথা শোনার পর আমি কিছুটা আশ্চার্য হই কারন কিছু দিন আগেই আমি দিনাজপুরের একটি সাঁওতাল পল্লী ঘুরে এসেছি। ছিমছাম একটা গ্রাম এ গিয়েছিলাম আমরা কয়েকজন। সাঁওতাল, যারা শিকার করতে পছন্দ করে সবচেয়ে বেশি। কিন্তু বর্তমানে বন জংগল কমে যাওয়ায় তারা কৃষি কাজে থিতু হয়েছে। কিন্তু শিকারের নেশা এখনো তদের আগের মতোই আছে, এখনো তারা সময় পেলে তির ধনুক নিয়ে শিকারে বের হয়। যতদূর জানি এবং তাদের সাথে কথা বলে মনে হয়েছে তারা অত্যান্ত বন্ধুসুলভ এবং নিরীহ জনগোষ্ঠী। সেদিন অনেকের সাথে কথা হয়েছিলো এবং দেখেছিলাম তারা দলবেধে মাঠে পুরুষ ও মহিলা একসাথে কাজ করছে । আমরা রাস্তা হারিয়ে ফেললেও তারা সানন্দে আমাদের রাস্তা চিনিয়ে দিইয়েছিলো।

কিছুক্ষন পর আমার পেছনের সিটের লোকটির মোবাইল ফোন আবার বেজে উঠলো এবং তার কথায় বুঝতে পারলাম যে পুলিশ, স্থানীয় মাস্তান, চেয়ারম্যান এর লোকজন মিলে সাঁওতালদের সাথে মারামারি লেগেছে এবং সাঁওতালরা তির, ধনুক দিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করছে। ইতিমধ্যে একজন সাঁওতাল মারা গেছে। আমি লোকটিকে জিজ্ঞেস করি ভাই কি নিয়ে মারামারি। উত্তরে সে জানায় স্থানীয় চিনি কলের লোকজনের সাথে সাঁওতালদের মারামারি লেগেছে আঁখ কাটা নিয়ে। সেখানে চিনি কলের লোকজন এর সাথে যোগ দিয়েছে চেয়ারম্যান এর লোকজন ও পুলিশ।

পরেরদিন বিভিন্ন পত্রপত্রিকার খবর পড়ে যা জানতে পারি তা সবাই জানে এখন। কিন্তু একটা খবর দেখে চোখ কপালে উঠে গেলো, স্থানীয় থানার ওসি বলেছেন সাঁওতালদের ঘর বাড়ি কে জ্বালিয়ে দিওয়েছে তা তিনি জানেন না, অথচ তার আগের দিন খবরের কাগজের ছবিতে স্পষ্ট দেখা গেছে যে পুলিশের সেল্টারে হামলাকারীরা এগিয়ে যাচ্ছে সাঁওতালদের গ্রামে। সাঁওতালদের একজন মরে মাঠে সারারাত পড়ে ছিলো, সাঁওতালরা পুলিশ ও স্থানীয়দের ভয় এ লাশ আনতে পারে নাই। এই লাশ সম্পর্কেও পুলিশ কিছু জানে না।

এবার আমার পেছনে বসা লোকটি নিজ থেকে তার বাড়িতে ফোন করলো এবং বাড়িতে সবাইকে সাবধানে থাকতে বললো। প্রয়োজনে বাড়ি থেকে সরে অন্য গ্রামে যেতে বললো।

হুমম আমদের সাবধানে থাকতে হবে, কারন সাঁওতালদের তির ধনুক এর চেয়ে আর কোন ভয়ংকর অস্ত্র আর এই দুনিয়ায় আবিষ্কার হয় নাই। আমদের আরও সাবধান হতে হবে যাতে তারা সবসময় শ্রম দিয়ে ফসল ফলায় এবং আমরা তাতে ভাগ বসাতে পারি। আরও সাবধানে তাদের ঘর বাড়ি লুট করে জ্বালিয়ে দিতে হবে যাতে কেউ টের না পায়।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 6