গল্প: কেউ নেই কোথাও

দীর্ঘদিন শয্যায় থাকার পর মধ্যবয়স্ক রহমত গত পরশু পরপারে ঠাই জমিয়েছে। দেহটা সৎকারের অভাবে পড়ে রয়েছে নড়বড়ে কাঠের ছোট্ট একটা খাটের কোণে। তেলচিটচিটে চাদর দিয়ে মুড়ানো। বেশ কড়া গন্ধই ছড়ানো শুরু করেছে তার দেহ থেকে। রহমতের জানার কথা নয় তার মরন ব্যাধি ক্যান্সার হয়েছিল। রহমতের বউ রহিমা বিবি মাতব্বরের পা ধরে অনেক কান্নাকাটি করেছে তার স্বামীটার চিকিৎসার জন্য কিছু টাকা দিতে। মাতব্বর অনেক চাতুরে টাইপের মানুষ। রহমতের প্রতি তার অনেক ক্ষোভ। রহমতকে কত টাকা সেধেছে তার বউটাকে তার দাসী হিসেবে কাজ করতে অনুমতি দেওয়ার জন্য। রহমত রাজি হয় নি। রহমত মরার পর তার ক্ষোভটা যেন উতলে উঠেছে ঢেউয়ের মত। সে উপায় খুজতে থাকে কিভাবে রহমতকে মৃত্যুর পরেও জব্দ করা যায়। কিছুক্ষণ চিন্তা করে সে উপায়টাও মিলে যায়।
-মাদবর সাব আমার স্বামীডারে আপনে বাঁচান।
-তোর স্বামীরে আমি কেমনে বাচামু? তোর স্বামী তো কাফের! আমি জেনে শুনে কোন কাফেরকে সাহায্য করতে পারিনা।
রহমত সত্যিই কাফের! ছোট ছোট দুইটা ছেলে মেয়ের মুখে দুটো অন্ন তুলে দিতে যার সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনি করতে হয় সে তো কাফের হবেই! দুইদিন পর পর এক মুঠো ভাত মিলে যার! তার নামাজ, রোযা রাখার সময় কই? যে লোক কখনো নামাজ, কালাম করে না তাকে কাফের সাবাস্ত্য না করে উপায়ন্তর কি? অবশ্য কাফের শব্দের সঙ্গা যদি ভিন্ন হয় তবেও! বউটা আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করত অনেক। রহমত নিজেও যে আল্লাহরে ডাকতো না তা নয়। আল্লাহতায়ালা তার অন্যসব আর্জি না শুনলেও মৃত্যুর চাওয়াটা মিলিয়ে দিয়েছে। রহমত সারাদিন খাটে শুয়ে শুয়ে নিজের মরন চাইতো আল্লাহর কাছে!

মরার দুইদিন পরেও তাকে কবর দেয়া হয় নি। ফজরের আযান শেষে রহমতের মৃত্যু হয়। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয় কেউ রাজি হয় না মাটি দিতে। মাতব্বর স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে, যে রহমতের লাশ মাটি দিবে তাকে একঘরে করা হবে নয়ত গ্রাম ছাড়া করা হবে। কার এত সাহস মাতব্বরের কথার অন্যথা করে? উপান্তর না দেখে অবশেষে রহিমা বিবি আবারো মাতব্বরের শরানাপন্ন হয়।
-মাদবর সাব! আমার স্বামীরে মাটি দেওনের ব্যবস্থা করেন।
-তোর স্বামী তো কোনদিন নামাজ পড়ে নাই! তোর স্বামী কাফের!
-তাই বইলা আমার স্বামীরে মাটি দিবেন না?
-দেওয়া যায় শর্ত আছে একটা!
-কি শর্ত!
-কাফের আঁনা দেওন লাগবো!
-আমি টেকা কই পাইমু?
-তা জানি না বাপু! টাকা নিয়া আসো তাইলে তোমার স্বামীরে কেউ মাটি দিতে যাইবো না।
-একটু দয়া করেন মাদবর সাব! আমি আর আমার সন্তান দুইডা দুইদিন ধইরা অনাহারে। ঘরে একমুঠো চালও নাই।
আমি টেকা কইত্থোন দিমু?
-না দিতে পারলে! স্বামীর পাশে বইসা বইসা গন্ধ শোক! পেট ভরবো!

রহিমা বিবি শেষ বারের মত ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চা দুইটিকে প্রাণ ভরে দেখে নিল। ক্ষুধার জ্বালা সহ্য না করতে পেরে কান্নাকাটি করে ঘুমিয়ে আছে মেঝেতে। দরজার শিকলখানা আস্তে করে টেনে দিল যাতে বাচ্চাদুটির ঘুমে ব্যাঘাত না ঘটে। অদুরেই পদ্মার বাস। অন্ধকার রাত্রি! স্তব্ধ চারিপাশ। কেউ নেই কোথাও। পদ্মার দিকে পাগলের মত ছুটে চলে রহিমা বিবি। যত শো শো গর্জনে নাঁকি সুরে ডেকে চলেছে যেন বিশাল বক্ষা পদ্মা নদী! আয়! আয়! শো শো গর্জনের শব্দ ভেদ করে ঝুঁপ করে একটিমাত্র শব্দ বাতাসে মিলিয়ে যায় নিমিষেই।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

36 − = 31