যে ধর্মের দোহাই দিয়ে বাড়াবাড়ি করছেন, সে ধর্ম আপনাকে মানবতা শিখিয়েছে

আমার কাছে রাস্ট্রধর্ম রক্ষার তুলনায় অন্য ধর্মাবলম্বীদের গালাগাল করাই বোধ করি অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। আর যে জেহাদী ভাষা ওদিকে, আজ খবরটা অনেকের চোখে পড়েছে বোধহয়। ”মালাউন জ্বালাইয়া দে” – এ স্লোগান দিয়ে একটি হিন্দু পরিবারের উপর আক্রমণ চালিয়েছে তৌহিদী জনতা। এ ধরণের খবর কিন্তু নতুন নয়। সাম্প্রদায়িক উগ্রতা এখনকার মতো কখনও ছিলো না বাংলাদেশে। প্রতিটা ইস্যু কেন্দ্র করে নতুনভাবে এ বিষবাস্প ছড়িয়ে যায়। ভারতের হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার কথা কারো অজানা নয়। সেখানে কিন্তু আল্লাহ-ভগবান জেতে নি, হেরেছিলো মানুষ। তাই কূল রক্ষায় আমরা যদি দেশ ডুবিয়ে দেই, তবে কিন্তু তা মহা সমস্যা।

এটা গেল মানবীয় ব্যাখ্যা, এবার দেখা যাক ইসলামের আলোকে কোনটা ধর্মীয় বিষয় এবং কোনটা রাজনৈতিক বিষয় সেটা সহিফাতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল : মুসলমানেরা ছিল একটি ধর্মীয় জাতি (উম্মাহ) এবং ইহুদিরা ছিল আরেকটি ধর্মীয় জাতি। তবে এই দুই পক্ষ এবং পৌত্তলিকেরা মিলে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি জাতি গঠন করেছিল। এই জাতির সীমারেখা খুব বেশি স্পষ্ট না হলেও নবীজী সা:-এর বিভিন্ন কার্যক্রমে এই পার্থক্যটি দেখা যায়। ধর্মীয় পরিমণ্ডল ছিল পালন করা ও বাধ্যবাধকতাপূর্ণ এবং রাজনৈতিক পরিমণ্ডল ছিল বিচার বিবেচনাবোধ ও ইজতিহাদের বিষয়। নবীজী সা:-এর কোনো বক্তব্য সাহাবারাদের কাছে স্পষ্ট না হলে তারা নবীজী সা:কে জিজ্ঞাসা করতেন এটা ওহি নাকি শুধু অভিমত। ওহি হলে তারা তা নির্দ্বিধায় মেনে নিতেন, তবে অভিমত হলে তারা অনেক সময় ভিন্ন মত প্রকাশ করে বিকল্প কিছু প্রস্তাব করতেন। রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে নবীজী সা:-এর বিভিন্ন সিদ্ধান্তের একাধিকবার সাহাবারা ভিন্ন মত প্রকাশ করেছিলেন। শেখ তাহার বেন আশুর এ বিষয় নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেছেন এবং তিনি এর নাম দিয়েছেন ‘নবুয়ুতি মর্যাদা।’

একদিন নবীজী সা: মদিনায় এক দল লোককে খেজুরগাছের পরাগায়ণের কাজে নিয়োজিত দেখে বললেন : ‘আমি এতে কোনো ফায়দা দেখছি না।’ মদিনাবাসী মনে করল এটা ওহি, তারা ওই কাজ বন্ধ করে দিলো। কিন্তু ওই বছর ফসল হলো অনেক কম। তারা তাঁকে জিজ্ঞেস করল তিনি তাদেরকে কেন এমন আদেশ দিয়েছেন। তিনি জবাব দিলেন : তোমাদের জাগতিক ব্যাপারে কল্যাণকর বিষয়গুলোর ব্যাপারে তোমরাই ভালো জানো। ফলে ধর্মের কাজ নয় কৃষি, শিল্প বা এমনকি সরকার পরিচালনার পদ্ধতি সম্পর্কে আমাদের শিক্ষা দেয়া। কারণ অভিজ্ঞতার আলোকে এসব কাজ করার যোগ্যতা অর্জিত হয়। ধর্মের ভূমিকা হলো আমাদের অস্তিত্ব, উৎস, গন্তব্য, সৃষ্টির উদ্দেশ্য ইত্যাদি সম্পর্কিত বড় বড় প্রশ্নের জবাব দেয়া এবং এমন কিছু মূল্যবোধ ও নীতিমালা প্রদান করা যা আমাদের চিন্তাধারা, আচরণ নিয়ন্ত্রণ করবে এবং আমরা যে রাষ্ট্রের আকাঙ্খা করি তার বিধিবিধান দেবে।

এমনকি ইসলামে সাম্প্রদায়িকতাকে চরম ঘৃন্য বস্তু হিসেবে দেখা হয়, আসাম্প্রদায়িকতা বিষয়ে ইসলামের শিক্ষাগুলোর দিকে নজর দিলেই বিষয়টি সহজেই স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

প্রথমেই দেখা যাক ইসলাম সাম্প্রদায়িকতাকে কীভাবে চিহ্নিত করেছে। একজন সাহাবী রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন ‘আসাবিয়্যাত’ (সাম্প্রদায়িকতা) কী? জবাবে তিনি ইরশাদ করলেন, অন্যায় কাজে স্বগোত্র-স্বজাতির পক্ষে দাঁড়ানো। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৫০৭৮)

অর্থাৎ অন্যায় ও জুলুমের কাজে কাউকে শুধু এ জন্য সমর্থন করা যে, সে তার নিজ দল, গোত্র, জাতি ও ধর্মের লোক-এটিই সাম্প্রদায়িকতা। আপনি কুরআনুল কারীমের সূরা নিসার শুরু থেকে পড়ুন, দেখবেন ইসলাম মানবতার বন্ধনকে কীভাবে দৃঢ় করেছে। আল্লাহ তাআলা কীভাবে সকল মানুষকে একই পিতা-মাতার সন্তান ঘোষণা দিয়ে তাদেরকে পরস্পরের আপন বানিয়েছেন।

হযরত হুযাইফা রা. বর্ণনা করেন যে, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, সকল জাতি যেন তাদের বাপ-দাদা তথা বংশ নিয়ে গর্ববোধ থেকে ফিরে আসে অন্যথায় তারা আল্লাহর কাছে নাপাকির পোকামাকড় থেকেও নিকৃষ্ট গণ্য হবে। (মুসনাদে বাযযার, হাদীস : ২৯৩৮)

সুনানে আবু দাউদের অন্য বর্ণনায় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি মানুষকে আসাবিয়্যাত (সাম্প্রদায়িকতা)-এর দিকে আহবান করবে (অর্থাৎ অন্যায় কাজে নিজ দল, গোত্র, জাতিকে সাহায্য করতে বলবে) সে আমাদের (মুসলমানদের) দলভুক্ত নয়। যে এমন সাম্প্রদায়িকতার কারণে মৃত্যুবরণ করবে সেও আমাদের দলভুক্ত নয়। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৫০৮০)

এ হাদীস এবং এ বিষয়ে আরো একাধিক সহীহ হাদীসের মর্ম এই যে, যে ব্যক্তি জাতীয়তা বা ভাষার ভিত্তিতে অন্যায় হওয়া সত্ত্বেও পরস্পর সহযোগিতা করে এবং (কওমিয়্যত) দল, গোত্র, বংশের ভিত্তিতে অন্যকে সাহায্য করতে গিয়ে মারা যায় সে জাহেলিয়াতের মৃত্যু বরণ করল। যে উম্মতের বিরুদ্ধে অস্ত্র উঠিয়ে ভালোমন্দ সকলকে হত্যা করতে থাকে সে মুসলিম উম্মাহর অন্তর্ভুক্ত নয়।

আর বিদায় হজ্বের বিখ্যাত ভাষণের কথা তো সকলেরই জানা। যেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছিলেন, ভাষা, বর্ণ ও গোত্রের ভিত্তিতে কারো উপর কারো প্রাধান্য নেই। তিনি বলেছেন, কোনো আরব অনারবের উপর (শুধু ভাষার কারণে) প্রাধান্য পাবে না। কোনো সাদা (তার বর্ণের কারণে) কালোর উপর প্রাধান্য দাবি করতে পারবে না। প্রাধান্যের একমাত্র ভিত্তি হবে তাকওয়া। (-মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ২৩৪৮৭)

উপরোক্ত হাদীসগুলো এবং কুরআন-সুন্নাহর সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আয়াত ও হাদীস-আসারগুলো অধ্যয়ন করলে যে কোনো বিবেকবান মানুষ সুস্পষ্টভাবে দেখতে পাবে ইসলামের ব্যাখ্যায় সাম্প্রদায়িকতার আওতা কত বিস্তৃত এবং কত কঠোরভাবে ইসলাম এর নিন্দা ও বিরোধিতা করে। ইসলামপূর্ব জাহিলিয়াত-যুগে মানুষ বিভিন্ন গোত্রে তাদের জাতীয়তাকে বিভক্ত করে ফেলেছিল। শুধু জাত-গোষ্ঠির নামে কথায় কথায় যুদ্ধ হত। হত্যা-লুণ্ঠন হত। ধনাঢ্য লোকজন, নেতা-সর্দারগণ থাকত সকল বিচারের ঊর্ধ্বে। বিচারের সম্মুখীন হত কেবল সাধারণ অসহায় মানুষ। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুরু থেকেই এসবের মূলে আঘাত করেছেন।

উপরের যে কয়টি উদাহরণ পেশ করা হল তার সবই ইসলামের দৃষ্টিতে সাম্প্রদায়িকতা এবং কঠোর নিন্দনীয় এবং ইহ ও পরকালীন শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অথচ বর্তমান সময়ের প্রচারমাধ্যমগুলো এখন এগুলোকে সাম্প্রদায়িকতা হিসেবে দেখতেই চায় না।

আর ইসলামী রাষ্ট্রে বসবাসকারী অমুসলিম সংখ্যালঘুদের জানমাল তো মুসলমানদের মতোই। কোনো মুসলমানের জন্য যেমন তার দেশের আইন মেনে বসবাসকারী অমুসলিমের উপর কোনো ধরনের নির্যাতনের সুযোগ নেই তেমনি অন্য কোনো মুসলিমকে এমনটি করতে দেখলে সাধ্যানুযায়ী এ অন্যায় কাজ থেকে তাকে নিবৃত্ত রাখার চেষ্টা করাও তার দায়িত্ব। তা না করে উল্টো জালেমকে সমর্থন করলে সেটি হবে চরম সাম্প্রদায়িকতা।

আমার মনে হয় এখন এই জেহাদী জোসটা মুর্তি,বাড়ি বা দালান না ভেঙ্গে মনের ভেতর যে কাফের শয়তান ভর করেছে সাটা ভাঙ্গুন,কাজে দেবে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

3 + 3 =