নাসিরনগর উপজেলায় সাম্প্রদায়িক নিপীড়ন: নাগরিক পর্যবেক্ষণ ও প্রতিক্রিয়া

গত ৩০ অক্টোবর ২০১৬ তারিখে নাসিরনগরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মন্দির ও বসতবাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগের প্রতিবাদে সারাদেশে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। ঘটনা পরবর্তী সময়ে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, পূর্ববর্তী সময়ে ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক নিপীড়নের ঘটনায় যেমন পরস্পরকে দোষারোপ করে ঘটনাকে আড়াল করা হয়েছে- তেমনি এবারও তার ব্যতিক্রম নেই। এমতাবস্থায় ঘটনার কারণ ও সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অনুসন্ধান এবং পর্যবেক্ষণ দেশবাসীর সামনে তুলে ধরার লক্ষ্যে নয় সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল (শেখ বাতেন, জাকিয়া শিশির, আকরামুল হক, অদিতি ফাল্গুনী, তৃষা বড়–য়া, জাহিদ জগৎ, ফিরোজ আহমেদ ও শামিম আরা নীপা ও জীবনানন্দ জয়ন্ত) আক্রান্ত এলাকা পরিদর্শন করে। পরিদর্শনকালে আক্রান্ত ব্যক্তি-পরিবার-প্রত্যক্ষদর্শী-সংবাদকর্মী ও থানা প্রশাসনের সাথে কথা বলে ঘটনা বিষয়ে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে একটি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন ও সুপারিশ প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ‘নাসিরনগর উপজেলায় সাম্প্রদায়িক নিপীড়ন : নাগরিক পর্যবেক্ষণ ও প্রতিক্রিয়া’ শীষক প্রতিবেদনটি সকলের সদয় অবগতির জন্য উপস্থাপন করা হলো।
?_nc_eui2=v1%3AAeEsASNL35liEJDOXNVuPNvrPT462n7f6upvto95brzAsuE0kDMAjlL2jkxaSqRuUYxzP4zfmylKxucE78v_5ZJ06ovwuDOWgs_vw5L4QeyMPw&oh=ea7237e18e30ca0e22156e98bb7984e1&oe=58906D9D” width=”512″ />

পরিদর্শনের তারিখ ও সময়: ৫ নভেম্বর ২০১৬ ইং সকাল ১০:৩০ থেকে বিকাল ৬:৩০ পর্যন্ত

ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালীন প্রেক্ষাপটে আমাদের পর্যবেক্ষণ ও প্রতিক্রিয়া:
১. রসরাজ দাসের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের
১.১নাসিরনগর থানার মামলা নং- ২১ তারিখ ২৯/১০/২০১৬ সময়: ২০:১৫
এজাহারের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা: গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা আনুমানিক ১৯:১৬ ঘটিকায় হরিপুর ইউনিয়নের হরিণবেড় গ্রামের জনৈক রসরাজ দাস তার ফেসবুক ওয়ালে পবিত্র কাবা শরীফের উপর হিন্দু ধর্মীয় দেবতা শীবের মূর্তী বসিয়ে একটি পোস্ট দেয় এবং ২৮ অক্টোবর রাত ০৯:১৬ মিনিটে একই এলাকার মুসলিম সম্প্রদায়ের কিছু লোক তা দেখতে পায় এবং স্থানীয় মুসলিম জনতার মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরে ২৯ অক্টোবর তারিখ দুপুর অনুমান ১৪:১৫ ঘটিকায় এ বিষয়ে নাসিরনগর থানা পুলিশ সংবাদ পেয়ে একজন উপ-পরিদর্শকের নেতৃত্বে পুলিশ সদস্যদের একটি দল হরিণবেড় এলাকায় যায় এবং হরিণবেড় বাজারের কাছাকাছি স্থান থেকে অভিযুক্ত রসরাজ দাসকে মারতে উদ্যত জনতার (৮/১০ জন) কাছ থেকে রসরাজকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে এবং কাউছার হুসাইন-উপপরিদর্শক (নিরস্ত্র), নাসিরনগর থানা তথ্য ও যোগযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা দায়ের করে।
১.২ রসরাজ মামলায় পর্যবেক্ষণ বিবৃতি:
১.২.১ হরিপুর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগ সভাপতি আলহাজ্ব মোঃ ফারুক (যিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির সৌদিআরব শাখার যুগ্মসম্পাদক বলে এলাকায় প্রচার রয়েছে) ও উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি জামাল মিয়ার প্রত্যক্ষ উসকানিতে তাদের অনুসারিরা রসরাজকে মারধর করে মারাত্মক আহত করে। এরপর নাসিরনগর থানার সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) আশরাফুল আলমকে বিষয়টি জানানো হলে তিনিসহ অন্যান্য পুলিশ সদস্যদের একটি দল আহত রসরাজকে থানায় নিয়ে আসে এবং তার বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা দায়ের করে।
১.২.২ রসরাজ দাস নামে পরিচালিত ফেসবুক আইডিতে অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, আইডিতে এ বছরের জুন মাসের ২৭ তারিখ থেকে অক্টোবর ২৭ তারিখ পর্যন্ত ৪টি ছবি পোস্ট করা হয়েছে, যেখানে কোনো বর্ণনামূলক কিছু লিখা হয়নি। পরবর্তীতে ২৯/১০/২০১৬ ইং তারিখ ভোর ৫:২৪ মিনিটে ‘নয় লাইনের’’ একটি গোছানো পোস্ট দিয়ে তথাকথিত আপত্তিকর (আসলেই সেটি এই আইডি থেকে পোস্ট করা হয়েছিলো কিনা তা এখনও নিশ্চিত নয়) পোস্টটির জন্য ক্ষমা চাওয়া হয়। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রসরাজ তার ফেসবুক ওয়ালে নিজে কোনো আপত্তিকর পোস্ট দেননি। এমনকি ক্ষমা চেয়ে যে পোস্টটি দেওয়া হয়েছে সেটিও রসরাজের নয়।
১.২.৩ ‘পবিত্র কাবা শরীফের উপর শীবের ছবি’ বসানোর জন্য যে প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও দক্ষতা থাকা দরকার তা রসরাজের নেই। এমনকি এ ধরনের প্রযুক্তিগত কাজের জন্য কম্পিউটার ব্যবহারের প্রয়োজন থাকলেও সেখানে মোবাইল ফোন ব্যবহার করা হয়েছে বলে বলা হচ্ছে, যা কোনো মতেই সত্য নয়। জানাগেছে রসরাজ কম্পিউটার চালাতে পারেন না এমনকি তার কম্পিউটারও নেই। ফলে এটি স্পষ্ট যে, এই পোস্টগুলো অন্য কোনো স্থানে অন্যকারো মাধ্যমে তৈরি করে প্রচার করা হয়েছে এবং সাম্প্রদায়িক সহিংসতা তৈরির জন্য রসরাজকে ভিক্টিম বানানো হয়েছে।
১.২.৪ মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ‘বর্ণিত আসামীকে জিজ্ঞাসাবাদ কালে জানায় যে, সে তার বাড়ীতে বসিয়া গত ২৭/১০/২০১৬ তারিখ সন্ধ্যা অনুমান ১৯.১৬ ঘটিকার সময় ফেসবুক আইডির টাইম লাইনে উক্ত পোষ্টটি করিয়াছে। এই ব্যাপারে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও ফেসবুকে পবিত্র কাবা শরীফের উপর হিন্দুদের শীবের ছবি সংযুক্ত স্ক্রীনশর্ট এর হার্ডকপি সংগ্রহ করা হয়।’ কিন্তু এ বিষয়ে যদি রসরাজ দাসের টাইম লাইনে ক্ষমা চাওয়া মর্মে দেওয়া পোস্টটি বিবেচনায় নিয়ে রসরাজ আপত্তিকর পোস্ট দিয়েছে ধরেও নেওয়া হয় তাহলেও দেখা যায়, এজাহারের সাথে সংযুক্ত স্ক্রিনশটটি পুলিশ নিজে স্ক্রিনশট নেয়নি, অর্থাৎ অন্যকোনো সোর্স থেকে তা সরবরাহ করা হয়। কেননা ২৯/১০/২০১৬ ভোর ৫:২৪ ঘটিকায় ক্ষমা চেয়ে দেওয়া পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘কাল রাতে আমি মামুন ভাই আশু ভাই আর বিপুল এর মাধ্যমে জানতে পারি ছবি পোষ্ট এর কথা তার আগ পর্যন্ত আমি কিছুই জানতাম না জেনে সাথে সাথেই ডুকে ডিলেট করি।’ তাহলে যেদিন রসরাজ গ্রেফতার হলো তখন তার মোবাইল ও ফেসবুক থেকে স্ক্রিনশট নেওয়া হলো কিভাবে। অর্থাৎ এজাহারের সাথে সংযুক্ত স্ক্রিনশটটি পুলিশ অন্যকোনো মাধ্যম থেকে সংগ্রহ করে তা মামলায় সংযুক্ত করেছে, যা আইনের ব্যত্যয় এবং কাউকে ফাঁসানোর চেষ্টায় অপরাধও। এছাড়াও মামলায় কোথা থেকে স্ক্রিনশটটির প্রিন্ট নেওয়া হয়েছে তার বর্ণনা নেই, এ ধরনের পোস্টেও জন্য ফটোশপ প্রযুক্তি ব্যবহারে ডেক্সটপ কম্পিউটার বা ল্যাপটপের প্রয়োজন হলেও কোথাও এসব ব্যবহার করা হয়েছে মর্মে বলা হয়নি কিংবা জব্দও করা হয়নি। এমনকি কোন ধরনের মোবাইল রসরাজ ব্যবহার করেছে তা যেমন এজাহারে উল্লেখ নেই, তেমনি নেই কোনো জব্দ তালিকা। যদিও এ বিষয়গুলো একটি মামলার বিচার্য ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
১.২.৫ রসরাজকে আদালতে হাজির করা হলে পুলিশের আবেদনের প্রেক্ষিতে ৭দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়। রিমান্ড মঞ্জুরকালে আদালতে রসরাজ দাসের পক্ষে কোনো আইনজীবি রসরাজের বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারেনি। অনেকটা তড়িঘড়ি করে রসরাজের বিরুদ্ধে রিমান্ড মঞ্জুর করে। আদালতের অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় শুরু থেকেই আদালত এমন একটি ঘটনায় করণীয় বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে ছিলো, ফলে কোনো শুনানীর প্রয়োজন হয়নি। আইনানুযায়ী আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না পাওয়া ব্যক্তির মৌলিক অধিকারের পরিপন্থি। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, রসরাজ দাসকে গ্রেফতার, মামলা দায়ের এবং আদালতের রিমান্ড মঞ্জুর-প্রত্যেকটি ধাপেই সন্দেহের অবকাশ রয়েছে এবং এগুলো ন্যায় বিচারেরও পরিপন্থি।
১.২.৬ হরিপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ্ব ফারুকের ঘনিষ্ঠজন ছিলেন রসরাজ দাস। তবে ব্যবসা সংক্রান্ত বিষয়ে দুইজনের বিরোধও চলছিলো বলে জানাগেছে।
১.২.৭ জানাগেছে, যুদ্ধাপরাধী তাইজ উদ্দীনের ছেলে আলহাজ্ব মোঃ ফারুক স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রী সায়েদুল হক ঘনিষ্ঠ হওয়ায় গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পায়। পরে যুদ্ধাপরাধীর সন্তান হওয়ায় কেন্দ্র থেকে তার মনোনয়ন বাতিল হলে সেখানে প্রার্থী করা হয় বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান দেওয়ান আতিকুর রহমান আঁখিকে। মনোনয়নকে কেন্দ্র করে হরিপুর আওয়ামী লীগ ফারুক ও আঁখির নেতৃত্বে দুইভাগে বিভক্ত হয়। এ সময় ফারুক হরিপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়াম্যান ও উপজেলা বিএনপি’র সহসভাপতি জামাল মিয়ার সাথে জোটবদ্ধ হয়ে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর বিরোধি প্রচারণা চালায়। তখন থেকেই চাপের মুখে ছিলো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়।
১.২.৮ ইউপি নির্বাচনকালেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটাররা আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের তোপের মুখে পড়ে, যাদের একপক্ষ নৌকা প্রতীকের প্রার্থীকে ভোট দিতে এবং অপরপক্ষ ভোট না দেওয়ার জন্য চাপ দেন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আঁখি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলে ফারুকসহ বিএনপির পক্ষ মনে করে সংখ্যালঘুরা আঁখিকে ভোট দিয়েছে এবং অপরদিকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের রসরাজসহ অন্যান্য কয়েকজনের সাথে জামাল মিয়া ও ফারুকের সম্পর্ক থাকায় আঁখিপক্ষ ধরে নেয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তাকে ভোট দেয়নি। ফলে নির্বাচনের পর থেকেই হরিপুর ইউনিয়নের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ আতঙ্কের মধ্য দিয়েই সময় পার করছিলো।
১.২.৯ কে বা কারা একটি আপত্তিকর ছবি পোস্ট করে সেই আতঙ্কের বাস্তবায়ন করেছে তা এখনও নিশ্চিত হওয়া না গেলেও, এটি জানাগেছে, দেওয়ান আতিকুর রহমান আঁখি কিংবা আলহাজ্ব ফারুকের মধ্যে যে কোনো একপক্ষ অপরপক্ষকে শায়েস্তা করার জন্য আপত্তিকর ছবিটি প্রিন্ট করে প্রচার করে এবং এতে বিএনপি নেতা জামাল মিয়াও যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে এই ঘটনাটি সমগ্র নাসিরনগর উপজেলায় ছড়িয়ে পড়লে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জামাতসহ খাঁটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত, হেফাজতে ইসলাম, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, গাউছিয়া যুব সংগঠন ও উগ্রপন্থি লোকজন তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শের পক্ষে দেশের সংখ্যাগড়িষ্ঠ জনগণের সমর্থন আদায় করতে মড়িয়া হয়ে ওঠে এবং সংগঠনগুলো গত ৩০ অক্টোবরের ঘটনায় নিজেদের যুক্ত করে। এই পরিস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তি নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করে নেয়।
১.২.১০ এই ঘটনাটিকে নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে আওয়ামীলীগের মধ্যকার বিবদমান দুইটি উপদল জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি রবিউল মোক্তাদিন এমপি ও মৎস্য ও প্রাণীসম্পদ মন্ত্রী সায়েদুল হক এমপির অনুসারীরা নিজেদেরকে অপর উপদলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে কাজে লাগিয়েছে, যে কারণে ঘটনা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য আইনগত পদক্ষেপ নিতে উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের গাফিলতি লক্ষ্য করা গেছে।
১.২.১১ এ ঘটনায় জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতির নেতৃত্বাধীন উপদল মন্ত্রীকে কোনঠাসা করতে সক্ষম হলে মন্ত্রীও তার কার্যকলাপ দিয়ে জেলা আওয়ামী লীগের অতৎপরতাকে প্রমাণ করতে সচেষ্ট থেকেছেন এবং সরকারের আনুগত্য লাভে প্রশাসনের গাফিলতি সত্বেও তাদের পক্ষে কথা বলেছেন। ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়েছে নাসিরনগরের নিরীহ-দরিদ্র সংখ্যালঘুর, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সহাবস্থাননীতির।

২. সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয় ও বসতীতে হামলা-ভাঙচুর-মারধর-লুট: ২৯ অক্টোবর ২০১৬ ইং দুপুরে রসরাজ দাস গ্রেফতার হওয়ার পর রাত ৭:৩০ থেকে ৮:৩০ টার মধ্যে নাসিরনগরের প্রায় প্রতিটি মসজিদের মাইকে পবিত্র কাবা শরীফের অবমাননা ও ধর্মানুভুতিতে আঘাতের প্রতিবাদে এবং রসরাজ দাসের ফাঁসির দাবিতে ৩০ অক্টোবর সকালে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের ঘোষণা দিয়ে প্রচার করা হয়। একই দিন প্রশাসনের কাছ থেকে সমাবেশের অনুমতি নেওয়া হয়। পরে ৩০ অক্টোবর সকাল ৮টা থেকে ১১ টা পর্যন্ত সমগ্র নাসিরনগর উপজেলায় একই দাবিতে আবারও মাইকিং করে সকলকে আশুতোষ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ মোড়ে উপস্থিত হওয়ার আহবান জানানো হয়। পরবর্তীতে নির্ধারিত স্থানে বিক্ষোভ মিছিলসহ জনতা আসতে শুরু করে এবং নির্ধারিত স্থানে সমাবেশে জমায়েত হয়। পরে সেখান থেকেই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয় ও বসতীতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর, মারধর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট চালানো হয়। এরপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফায় ৪ ও ৫ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে যথাক্রমে ৫টি ও ১টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
২.১ নাসিরনগর থানার মামলা নং- ২২ তারিখ ৩০/১০/২০১৬ সময়: ২৩:০৫; দ-বিধির ধারা ১৪৩, ৪৪৮, ৩২৩, ৩৮০, ২৯৫ এবং ৪২৭; অভিযোগকারী নির্মল চৌধুরী, পিতা: মৃত বিমল চৌধুরী, নাসিরনগর কাশীপাড়া, নাসিরনগর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
এজাহারের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা: হরিপুর ইউনিয়নের হরিণবেড় গ্রামের রসরাজ দাস (৩০) নামের এক যুবক পবিত্র কাবা শরীফকে ব্যঙ্গ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পবিত্র কাবা শরীফের উপর হিন্দুদের শীবের ছবি সংযুক্ত করে তার ব্যবহৃত ফেসবুক আইডিতে পোস্ট করে। উক্ত ঘটনাকে কেন্দ্র করে অদ্য ৩০/১০/১৬ ইং তারিখ সকাল অনুমান ১০:০০ টা থেকে নাসিরনগর থানা এবং পার্শ্ববর্তী সরাইল থানার বিভিন্ন ইউপি ও গ্রাম থেকে আহলে সুন্নাতুল জামায়াত, বাংলাদেশী ইসলামী ফ্রন্ট এবং গাউছিয়া যুব সংগঠনসহ সর্বদলীয় মুসলিম জনতা নাসিরনগর কলেজ মোড় ও নাসিরনগর আশুতোষ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ১৪:৩০ টা পর্যন্ত প্রতিবাদ সমাবেশ করে। প্রতিটি সমাবেশ স্থলে প্রায় ২৫০০/৩০০০ লোকের উপস্থিতি ছিল। উক্ত সমাবেশ চলাকালে সমাবেশস্থলের আশপাশের কিছু লোকজনসহ স্থানীয় লোকজন আনুমানিক ১০০০/১২০০ উশৃঙ্খল জনতা লাঠিসোটা নিয়ে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে নাসিরনগর এলাকায় দুপুর ১২:৩০ টা থেকে ১৩:৩০ টার সময় নাসিরনগর গৌড় মন্দিরে বিচ্ছিন্নভাবে হামলা চালিয়ে ধর্মের প্রতি অবমাননা প্রদর্শন ও উপাসনালয়ের ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্যে গৌড়মন্দিরের ভিতরে ঢুকে থাকা প্রতিমা ভাঙচুর করে প্রায় ৩ লক্ষ টাকার ক্ষতিসাধন করে। যাবতীয় আসবাবপত্র, চেয়ার, টেবিল এবং পূজা উদযাপনের সরঞ্জামাদিসহ অনুমান ২লক্ষ টাকা লুট করে নিয়ে যায়। উক্ত সময় গৌড়মন্দিরের সেবায়েত শ্রী সন্তোষ সূত্রধর বাধা দিতে গেলে তাকে মারধর করে আহত করা হয়।
২.২ নাসিরনগর থানার মামলা নং- ২৩ তারিখ ৩০/১০/২০১৬ সময়: ২৩:১৫; দ-বিধির ধারা ১৪৩, ৪৪৮, ২৯৫, ৩৮০ এবং ৪২৭; অভিযোগকারী কাজল জ্যোতি দত্ত, পিতা: মৃত হিমাংশু কুমার দত্ত, নাসিরনগর দত্তবাড়ি, নাসিরনগর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
এজাহারের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা: হরিপুর ইউনিয়নের হরিণবেড় গ্রামের রসরাজ দাস (৩০) নামের এক যুবক পবিত্র কাবা শরীফকে ব্যঙ্গ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পবিত্র কাবা শরীফের উপর হিন্দুদের শীবের ছবি সংযুক্ত করে তার ব্যবহৃত ফেসবুক আইডিতে পোস্ট করে। উক্ত ঘটনাকে কেন্দ্র করে অদ্য ৩০/১০/১৬ ইং তারিখ সকাল অনুমান ১০:০০ টা থেকে নাসিরনগর থানা এবং পার্শ্ববর্তী সরাইল থানার বিভিন্ন ইউপি ও গ্রাম থেকে আহলে সুন্নাতুল জামায়াত, বাংলাদেশী ইসলামী ফ্রন্ট এবং গাউছিয়া যুব সংগঠনসহ সর্বদলীয় মুসলিম জনতা নাসিরনগর কলেজ মোড় ও নাসিরনগর আশুতোষ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ১৪:৩০ টা পর্যন্ত প্রতিবাদ সমাবেশ করে। প্রতিটি সমাবেশ স্থলে প্রায় ২৫০০/৩০০০ লোকের উপস্থিতি ছিল। উক্ত সমাবেশ চলাকালে সমাবেশস্থলের আশপাশের কিছু লোকজনসহ স্থানীয় লোকজন আনুমানিক ১০০০/১২০০ উশৃঙ্খল জনতা লাঠিসোটা নিয়ে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে নাসিরনগর সদর এলাকায় দুপুর ১২:০০ টা থেকে ১২:৩০ টার সময় দত্তবাড়ি দুর্গা মন্দিরে বিচ্ছিন্নভাবে হামলা চালিয়ে ধর্মের প্রতি অবমাননা প্রদর্শন ও উপাসনালয়ের ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্যে মন্দিরের ভিতরে থাকা বিভিন্ন মূর্তী ভাঙচুর করে প্রায় ৫০ হাজার টাকার ক্ষতিসাধনসহ পূজা উদযাপনের সরঞ্জামাদিসহ অনুমান ৩০ হাজার লুট করে নিয়ে যায়।
২.৩ হামলার ঘটনায় পর্যবেক্ষণ বিবৃতি:
২.৩.১ গত ৩০ অক্টোবর ৫১টি পরিবারের শতাধিক ঘরবাড়ি, ৪টি সার্বজনীন মন্দিরসহ কমপক্ষে ১০টি পারিবারিক মন্দিরে হামলা চালানো হয়েছে। হামলাকালে বাড়ির মানুষজনকে জিম্মি করে তাদের শরীর থেকে স্বর্ণালঙ্কার খুলে নেওয়া এবং ঘরে গচ্ছিত স্বর্ণালঙ্কার, নগদ অর্থ, মোবাইল ফোন ও টেলিভিশন লুটে নেওয়া হয়। হামলায় মন্দির, বসতঘর, বসত ঘরের লক্ষির আসন, গোয়ালঘর, রান্নাঘর, মাছ ধরার জাল, পায়খানা থেকে শুরু করে আসবাবপত্র কোনো কিছুই বাদ যায়নি। এ সময় নারী-শিশু-পুরুষ, বৃদ্ধা-বৃদ্ধকে মারধর করা হয় যাদের মধ্যে অনেকেই মারাত্মক আহত হয়েছেন। এছাড়া পরবর্তীতে আরও দুই দফায় ৬টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।
২.৩.২ সারাদেশে বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক হামলা ও পরবর্তী দুঃসহ পরিস্থিতির দৃষ্টান্ত থাকা সত্বেও এমনকি এ ধরনের উত্তেজনা সাম্প্রদায়িক সহাবস্থান ক্ষতি করতে পারে জেনে কিংবা ২৯ অক্টোবর দুপুরে এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছেÑমর্মে প্রশাসনের কাছে সংবাদ থাকলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে সাম্প্রদায়িক নিপীড়নকারীরা সংগঠিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট সময় পেয়েছে।
২.৩.৩ যশোর জেলার অভয়নগরের মালোপাড়া এবং ঠাকুরগাঁওসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক উস্কানি প্রদানে যেভাবে মসজিদের মাইক ব্যবহৃত হয়েছিলো, ঠিক সেভাবেই নাসিরনগরের মসজিদগুলোতে ২৯ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭:৩০ থেকে ৮:৩০ পর্যন্ত উস্কানিমূলক প্রচারণা চলে। ফলে এটি স্পষ্ট যে, ২৯ অক্টোবর তারিখ থেকেই নাসিরনগরে উত্তেজনামূলক পরিস্থিতি বিরাজ করছিলো, যা প্রকাশ্য। কিন্তু এ এঘটনায় জেলা ও জাতীয় পর্যায় থেকে কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এ থেকে ধরে নেওয়া স্বাভাবিক যে, এ ধরনের ঘটনা ঘটাতে রাষ্ট্রের অথবা রাষ্ট্রযন্ত্রের ভিতরের মানুষগুলোর ইচ্ছায় এমন ঘটনা ঘটেছে।
২.৩.৪ প্রশ্ন উঠেছে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নাসিরনগরের উত্তেজনার সংবাদ গোপণ করেছে? না কি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোই এমনএকই দিনে দুইটি সমাবেশের প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া এবং ৩০ অক্টোবর সকাল ৮ টা থেকে ১০ টা পর্যন্ত সমগ্র নাসিরনগরে খাঁটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত-এর নামে উস্কানিমূলক মাইকিং হওয়ার পরও প্রশাসনিক পদক্ষপ না নিয়ে প্রশাসন কেন নিরব ছিলো? কাজেই এটি সুস্পষ্ট যে, প্রশাসন এই হামলায় মদদ দেওয়ার দায় এড়াতে পারেনা। এমনকি সমাবেশস্থলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বক্তৃতা করার বিষয়টি সন্দেহের মাত্রাকে আরও তীব্র করেছে এবং এটি যে পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত হয়েছে, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।
২.৩.৫ দুইটি সমাবেশই স্থানীয় আওয়ামীলীগ, বিএনপি, জামাতসহ খাঁটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত, হেফাজতে ইসলাম, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, গাউছিয়া যুব সংগঠন, বিভিন্ন মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও উগ্রপন্থি লোকজন প্রত্যক্ষভাবে জনসমাগম ঘটিয়েছে এবং তাদের অংশগ্রহণে হামলা সম্পন্ন হয়েছে।
২.৩.৬ রাজনৈতিক বাস্তবতায় সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের ক্ষটমতার বিষয়টি সবারই জানা। একজন ক্ষমতাবান সাংসদ ও মন্ত্রী হওয়া সত্বেও এমনকি তার দলের রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের যুক্ততা থাকার পরও মন্ত্রী ছায়েদুল হক ঘটনা নিয়ন্ত্রণে কোনো পদক্ষেপ নেননি। উপরন্তু ঘটনার ৩দিন পর নিজ এলাকায় যাওয়া এবং পরবর্তীতে ঘটনাস্থলে গিয়ে আক্রান্ত মানুষের পাশে না দাঁড়িয়ে, ডাকবাংলোয় বসে প্রশাসনের দায়িত্বহীনতা অস্বীকার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশ্রয় দেওয়া এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি কুরুচিপূর্ণ গালিগালাজ করা বিষয়টি সাম্প্রদায়িক নিপীড়নে ঘটনায় মন্ত্রীর সম্পৃক্ততার পক্ষে সমর্থন দেয়।
২.৩.৭ জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি রবিউল মোক্তাদির এমপি-র সাথে মন্ত্রী ছায়েদুল হকের বিরোধের প্রকাশ্য বাস্তবতা এবং ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে ৩০ অক্টোবর পরবর্তী দুটি অগ্নিকা-ের ঘটনা জেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি কিংবা মন্ত্রীর অনুসারীরা ঘটিয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
২.৩.৮ নাসিরনগর কলেজ মোড় ও আশুতোষ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠের সমাবেশে নাসিরনগরের বিভিন্ন এলাকা ও পার্শ্ববর্তী সরাইল উপজেলা থেকে জনসমাগম ঘটানোর জন্য সমাবেশস্থলে ট্রাকে ট্রাকে মানুষ আনা হয়েছে। এ ধরনের তৎপরতায় আর্থিক যোগান ও ট্রাকের যোগান কারা দিয়েছেন সেটি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য রয়েছে। তথ্যানুযায়ী দেখা যায়, স্থানীয় আওয়ামীলীগ, বিএনপি, জামাতসহ উগ্র ধর্মভিত্তিক দলগুলো এবং বিভিন্ন ইউনিয়নের চেয়ারম্যনরা জনসমাগমের জন্য আর্থিক যোগনা দিয়েছে।
২.৩.৯ স্থানীয় সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী এবং তার অনুসারীরা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মন্দির ও বসতিতে হামলার ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে প্রচার করেছেন। ঘটনার দেশব্যাপী প্রচারণা ও প্রতিবাদকে মন্ত্রী সনাতন ধর্মবলম্বী ও মিডিয়ার বাড়াবাড়ি বলে বক্তব্য দিয়েছেন। অপরদিকে জেলা আওয়ামী লীগ ও মন্ত্রীর বিরোধের কারণে উত্তেজনার মাত্রা বেড়েছে, দুইপক্ষের লোকজন ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করেছেন-এমন প্রচারণা সত্বেও জেলা আওয়ামীলীগ সবসময়ই নিরবতা পালন করেছে। এমনকি অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোও এ বিষয়ে নিরব। কিন্তু স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের দায় এড়ানোর জন্য ধর্মাশ্রয়ী বিভিন্ন সংগঠনকে মাঠে নামিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন।
২.৩.১০ আক্রমণের পর হরিপুর ইউনিয়নের আক্রান্ত মানুষ স্থানীয় চেয়ারম্যান দেওয়ান আতিকুর রহমান আঁখিকে পাশে দাঁড়ানোর আহবান জানালে তিনি আক্রান্ত মানুষকে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য বলেন। এতে হামলাকারীরা আরও সাহসী হয়ে তাদের উদ্দেশ্য পুরণ করতে সক্ষম হয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও আক্রান্ত মানুষের বক্তব্য অনুযায়ী, দুপুর আনুমানিক ১২টা/১২:৩০টায় শুরু হয়ে আনুমানিক ২:৩০ টা পর্যন্ত ছিলো স্থায়ীত্বকাল।
২.৩.১১ ঘটনার দিন নাসিরনগর থানায় স্বল্প সংখ্যক পুলিশ সদস্য দায়িত্বরত ছিলেন, যাদের পক্ষে এরকম হামলা মোকাবেলা করা কখনওই সম্ভব নয়। আবার এই স্বল্পসংখ্যক পুলিশেরও কয়েকজন ভারপ্রাপ্তকর্মকর্তার সাথে সমাবেশস্থলে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু সমাবেশ ও হামলা যত সময় ধরে চলেছে এই সময়ের মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর থেকে বাড়তি সংখ্যক আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য সংগ্রহ করে মোতায়েন করা যেত। কিন্তু তা করা হয়নি। যখন বাড়তি ফোর্স নাসিরনগরে আসে ততক্ষণে অধিকাংশ হামলাকারী হামলা-লুণ্ঠন শেষ করে ফিরে গেছে। এরপরও কয়েকটি স্থানে যেখানে হামলাকারীরা ছিলো সেখান থেকে হামলাকারীদের কাউকে গ্রেফতার করার চেষ্টা করা হয়নি।
২.৩.১২ হামলায় আক্রান্ত হরিপুর ও নাসিরনগর সদর ইউনিয়নের বাইরে থেকে আসা লোকজন অংশ নিয়েছে, এবং আক্রান্ত পরিবারগুলো ভীতসন্ত্রস্ত হওয়ায় হামলাকারীদের নাম-পরিচয় সম্পর্কে কোনো কিছু জানেনা বলে জানিয়েছে। কিন্তু প্রত্যেকটি এলাকায় হামলার আগে আগে একদল বোরকাপড়া মানুষ (নারী-পুরুষ উভয়ই হতে পারে) হামলার স্থান রেকি করেছে, যা হামলাকারীদের প্রবেশ ও প্রস্থানের পথ চিনিয়ে দিয়েছে বলে জানা গেছে। প্রত্যেকটি বাড়িতেই একযোগে শতশত মানুষ ঢুকে তা-ব চালিয়েছে। এদের মধ্য থেকে কমপক্ষে ৪০/৫০ জনের একটি দল বাড়ির বসত ঘরে ঢুকে ভাঙচুর, মারধর ও লুণ্ঠন চালায়। এ থেকে এটি স্পষ্ট যে, আক্রমণ ছিলো সংগঠিত ও পরিকল্পিত।
২.৩.১৩ আক্রান্ত ঘরবাড়ি পরিদর্শনে দেখা গেছে, হামলাকারীদের লক্ষ্য ছিলো- ১) সার্বজনীন মন্দির ২) পারিবারিক মন্দির ৩) ঘরের ভিতরের ব্যক্তিগত উপাসনাস্থান লক্ষির আসন ৪) বাদ্য যন্ত্র (হারমোনিয়াম, খোল, কর্তাল ইত্যাদি) ৫) আর্থিক মূল্যমান সম্পন্ন সম্পদ যেমন- নগদ অর্থ, মোবাইল ফোন, টেলিভিশন ইত্যাদি। এ থেকে বোঝা যায়, ঘটনার উৎপত্তি যেভাবে বা যে কারণেই হোক না কেন, এটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সংস্কৃতি-জীবনাচার পালনে বাধা দিয়ে তাদের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সহাবস্থাননীতি ধ্বংস করে মৌলবাদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পিত প্রচেষ্টার অংশ।
২.৩.১৪ সারাদেশের প্রতিটি সাম্প্রদায়িক নিপীড়নের ঘটনায় এ পর্যন্ত অনেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। নাসিরনগরের ঘটনায়ও এমনটি লক্ষ্য করা গেছে এবং এই মানুষগুলোর অনেকেই যেমন আহত হয়েছেন, তেমনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় এগিয়ে আসার জন্য প্রতিক্রিয়াশীলদের রক্তচক্ষুর সম্মুখীন হয়েছেন, যা ভবিষ্যতে তাদের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
২.৩.১৫ গত ৪ নভেম্বর শুক্রবার নাসিরনগর এবং ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জুমার নামাজের বয়ানে নাসিরনগরের ঘটনাকে ইসলাম ধর্ম ও কাবা শরীফকে অবমাননার এক তরফা প্রচারণা করে সনাতন ধর্মাবলম্বী ও আক্রান্ত মানুষের পাশে যে সকল মিডিয়া ও ব্যক্তি-সংগঠন দাঁড়িয়েছে তাদের বিরুদ্ধে উত্তেজনাকর-বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের প্রবণতা এবারই প্রথম নয়। এর আগেও ব্লগার হত্যা, শিক্ষক লাঞ্ছনা কিংবা অন্যকোনো সাম্প্রদায়িক নিপীড়নের ঘটনা সংঘটনের পরবর্তী জুমার নামাজের বয়ানে যেভাবে বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য দেওয়া হয়, এ ঘটনায়ও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। এ ধরনের পরিস্থিতি সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের জানা থাকলেও কোনোবারই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়না। যদিও হলি আর্টিসান ঘটনা পরবর্তী সময়ে ইসলামী ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে সারাদেশের মসজিদ গুলোতে একই রকম বয়ান দেওয়ার একটি সাময়িক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিলো।
২.৩.১৬ মসজিদগুলোকে কতিপয় উগ্র রাজনৈতিক দল তাদের কর্মকাণ্ড ও বিদ্বেষ ছড়ানোর কাজে ব্যবহার করায় সাম্প্রদায়িক বিভেদের মাত্রা দিন দিন বাড়ছেই- এ বিষয়ে রাষ্ট্রীয় নিরবতা রাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িক চরিত্রকে প্রকট করে তুলছে।
২.৩.১৭ ভুক্তভুগী পরিবারের অবস্থা ও হামলা বিষয়ে সংবাদকর্মীরা নাসিরনগর ডাকবাংলোয় বসে উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং মন্ত্রীর বক্তব্য নিতে গেলে তাদেরকে জিম্মি করা হয়। এ সময় আক্রান্ত পরিবারের যারা সংবাদকর্মীদের তথ্য দিয়েছেন তাদের নাম জানতে চাইলে সংবাদকর্মীদের পক্ষ থেকে একজন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যের নাম বলে দিয়ে সাংবাদিকতার নৈতিকতা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

৩. হামলার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলা সম্পর্কিত পর্যবেক্ষণ বিবৃতি:
৩.১.১ মামলাগুলোতে অজ্ঞাত হাজার/বারোশত লোকের হামলায় অংশ নেওয়ার কথা বর্ণনা করায় সমগ্র নাসিরনগরে আতঙ্ক বিরাজ করছে। হামলার ঘটনায় নিরীহ ব্যক্তিরা গ্রেফতার হতে পারেন বলেও অনেকে মনেকরেন। এতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শত্রু আরও বেড়ে যাবে বলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো মনে করে।
৩.১.২ গত ৫ নভেম্বর ২০১৬ পর্যন্ত হামলার ঘটনায় দুটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় অভিযোগের ধরন দেখে এটি প্রতীয়মান হয় যে, এজাহার লেখার সময় কোনো স্থান থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ফলে-
– দুটি ঘটনাস্থল ভিন্ন হলেও মামলার বিষয়বস্তুর বর্ণনায় কোনো হেরফের নেই;
– দুটি মামলাতেই নজিরবিহীন ভাবে শুধু অজ্ঞাতদেরকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে; – নিরাপরাধী ব্যক্তিরা গ্রেফতার হতে পারে;
– এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে;
– এই মামলাটি প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে বিচার নিশ্চিতে ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে;
– এজাহার দুটিতেই রসরাজকে পুনর্বার ভিক্টিম করা হয়েছে এবং বর্ণনাদৃষ্টে মনে হয় হামলার দায় হামলাকারীদের নয়- রসরাজ দাসের!
– এজাহারে বিচ্ছিন্নভাবে হামলার কথা বলা হলেও প্রকৃত অর্থে মন্দির ও বসতিতে হামলা হয়েছে সংগঠিতভাবেই।
৩.১.৩ বসতিতে হামলা-ভাঙচুর-লুণ্ঠন বিষয়ে আক্রান্ত পরিবারের পক্ষ থেকে কিংবা পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো মামলা দায়ের হয়নি। যে দুটি মামলা দায়ের হয়েছে তা দুটি মন্দিরে হামলার ঘটনায় দায়ের করা হয়েছে। ফলে আক্রান্ত জনগোষ্ঠী বিচারিক ন্যায্যতা থেকেও বঞ্চিত হবে, যা প্রকারন্তরে ভবিষ্যতে এরকম আরও ঘটনার সৃষ্টিতে উৎসাহিত করবে।

ঘটনার দায়:
নানাবিধকারণে বিশেষ করে ১৯৯০ সাল থেকে শুরু করে পরবর্তী বছরগুলোতে ধারাবাহিকভাবে সারাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়ে আসছে। কিন্তু কখনওই রাষ্ট্র ও রাজনীতি এ ধরনের নিপীড়নের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে সংখ্যালঘুদের সামাজিক অবস্থান অধস্তনতার নি¤œতর স্তরে নেমেগেছে-সাম্প্রদাকিতা আর উগ্রমতাবলম্বনের সামাজিকীকরণ ঘটতে চলেছে। রাষ্ট্র ও রাজনীতির উদাসীনতায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাম্প্রদায়িক নিপীড়ন ও ভিন্নমতাবলম্বীদের হত্যার সংখ্যাও বেড়ে চলেছে। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার এরশাদ পতন আন্দোলনকে ভিন্নখাতে নিয়ে যাওয়ার জন্য সহিংস সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হলে দেশের কয়েকটি জায়গা ব্যাতীত সারাদেশেই তখনকার রাজনৈতিক প্রবণতা তা রুখে দিয়েছিলো। কিন্তু এরপর ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর সারাদেশে যে সাম্প্রদায়িক নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে তখন থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিবছরই দেশের কোথাও না কোথাও এমন ঘটনা ঘটে চলেছে। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর সারাদেশে আবারও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্মমতা নেমে আসে। এটি নিয়ে পরবর্তীতে বিচারবিভাগীয় তদন্ত হলেও সেই প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি এমনকি দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ২০১২ সালে রামুর বৈদ্ধবিহার ও বসতিতে হামলা করে একটি সম্প্রদায় তথা এ অঞ্চলের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে ধ্বংস করা হলেও তার কোনো বিচার আজও পর্যন্ত হয়নি। এই ঘটনায় ১৯টি মামলা হয়েছিলো। যেগুলোর মধ্যে একটি ঘটনা আপোষ-মিমাংশা হয়েছে এবং বাকিগুলোর বিচার সম্পন্ন হয়নি। একইভাবে ২০১৩ সালের যুদ্ধাপরাধীর বিচার আন্দোলন চলাকালে এবং ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে সংগঠিত সাম্প্রদায়িক নিপীড়নের ঘটনারও কোনো বিচার হয়নি। যদিও কিছুদিন আগে বাগেরহাটের মোড়লগঞ্জে স্কুল শিক্ষকদের নামে ইসলাম ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগ তুলে তাদের মারধর করার পর চাকরীচ্যুত করে কারাদ- প্রদানের মতো ঘটনা বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করছে। বাংলাদেশের এই পরিস্থিতির দায় রাষ্ট্র ও রাজনীতিকেই নিতে হবে।

সাম্প্রতিক নাসিরনগরে ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক নিপীড়নের ঘটনায় যাদের দায় রয়েছে
১. স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ নিয়ন্ত্রণাধীন গোয়েন্দা ও পুলিশ বিভাগ এবং জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের অবহেলা-ব্যর্থতা-নিরবতার দায় রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের;
. রাষ্ট্রের আইন পরিষদ সদস্য হয়ে ছায়েদুল হক হামলার ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ও সনাতন ধর্মাবলম্বী ও মিডিয়ার বাড়াবাড়ি বলে আখ্যা দেওয়া, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আক্রমণ করে কুরুচিপূর্ণ শব্দ ব্যবহার এবং নাসিরনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার অবহেলা-নিরবতা-যুক্ততা এবং স্থানীয় আওয়ামীলীগে তার অনুসারীদের যুক্ততা সত্বেও তাদের পক্ষ নেওয়ার দায় সাংসদ ও আইন পরিষদের। এ ছাড়াও উক্ত সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার ব্যবস্থা না নেওয়ায় আইন পরিষদ হিসেবে জাতীয় সংসদ দায়ী।
৩. উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে সাম্প্রদায়িক সমাবেশের অনুমতিদান, সমাবেশে বক্তৃতা করা, হামলা নিয়ন্ত্রণ না করা এবং হামলার ঘটনাকে আড়াল করার পেছনে কোনো চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র থাকতে পারে। এ জন্য তারা অপরাধী হিসেবেও দায়ী।
৪. ২৯ অক্টোবর নাসিরনগরের বিভিন্ন মসজিদের মাইক ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক উস্কানি-বিদ্বেষ ছড়ানো জন্য মসজিদের ইমামসহ ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং ঘটনার দিন (৩০ অক্টোবর ২০১৬) সমাবেশে জনসমাগম ঘটানো ও সাম্প্রদায়িক উস্কানি-বিদ্বেষ প্রচারের জন্য খাঁটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত-এর সভাপতি মোঃ মহিউদ্দিন ও প্রচার সম্পাদক মুফতি ইসহাক আল হোসাইনি এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত-এর আহবায়ক রিয়াজুল করিম দায়ী;
৫. বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত রসরাজ দাসের মামলা পরিচালনাকালে পক্ষপাতমূলক আচরণ করেছেন। একটি স্পর্শকাতর বিষয় হিসেবে এ বিষয়ে বিচার বিভাগীয় কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় রাষ্ট্রের বিচার বিভাগও দায় এড়াতে পারেনা;
৬. জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীর মধ্যকার উপদলীয় প্রভাব রক্ষায় নিজ নিজ পক্ষের অনুসারী অপরাধীদের বাঁচানোর অব্যাহত চেষ্টা করছেন, যার দায় বাংলাদেশ আওমীলীগকে নিতে হবে। এ ছাড়াও সাম্প্রদায়িক উস্কানি-বিদ্বেষ ছড়ানো, হামলার উদ্দেশ্যে জনসমাগম ঘটনানো এবং হামলায় সক্রিয়ভাবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)সহ বিভিন্ন ধর্মীয় রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীদের যুক্ততার দায় রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও সংগঠনের;
৭. এ ছাড়াও অন্যন্য উগ্র ধর্মীয় সংগঠন, মাদরাসা শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এবং উগ্রবাদীরা ব্যক্তিগতবাবে ঘটনায় জড়িত থাকার জন্য দায়ী।

সুপারিশ:
১. রাষ্ট্রের ধর্মীয়করণ প্রবণতা দূর করতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সংবিধান প্রতিষ্ঠা করতে হবে; ২. ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সুরক্ষায় বিশেষ আইন প্রণয়ন করতে হবে; ৩. এ যাবৎ সংঘটিত প্রত্যেকটি সাম্প্রদায়িক ঘটনার বিচারে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠণ করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে; ৪. নাসিরনগরের ঘটনায় বিচারবিভাগীয় তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে; ৫. দায়িত্বে অবহেলার দায়ে নাসিরনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিচার করতে হবে; ৬. সরকারি কর্মচারী চাকরী বিধিমালা সংস্কার করতে হবে।

প্রায়শই সাম্প্রদায়িক নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনা ঘটে। কিন্তু কখনওই রাষ্ট্র এ ধরনের যথাযথ মনোযোগ দেয়না। ফলে ঘটনার বিস্তার যেমন ক্রমশ বাড়ছে তেমনি বাড়ছে এর ভয়াবহতা। দেশে নির্বাচনে জয় কিংবা পরাজয় কিংবা যুদ্ধাপরাধীর বিচার, যে কোনো কারণই হোকনা কেন আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। প্রত্যেকটি ঘটনা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, ঘটনাগুলো নিয়ন্ত্রণ কিংবা বন্ধ করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের আইন-বিচার-নির্বাহী বিভাগের অবহেলা-নিরবতা রয়েছে। ফলে রাষ্ট্র ক্রমশ সংখ্যাগড়িষ্ঠের সাম্প্রদায়িকীকরণের পথে এগুচ্ছে, যার পেছনে রয়েছে রাষ্ট্র-রাজনীতির দায়। রাষ্ট্র-রাজনীতির সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি দূর করতে হলে কার্যকর রাজনৈতিক ভূমিকার বিকল্প নেই।

প্রতিবেদন প্রণয়ন: জীবনানন্দ জয়ন্ত
সহযোগিতায়: শেখ বাতেন, আকরামুল হক, জাকিয়া শিশির ও শামিম আরা নিপা ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

33 + = 35