সংবিধানের অসংগতি নিয়ে কথা বলা কি সংবিধান বিরোধী? আশেপাশে কোনো ধারা নাইতো?


হায়রে দেশ! লাখ লাখ মানুষ রক্ত দিছিল মুক্তিযুদ্ধের সময়। তাদের অন্যতম আদর্শ ছিল ধর্মীয় পরিচয়ের বাইরে নিজেদের একটা দেশ। বাংলাদেশ হওয়ার কথা ছিল ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, ছিলও! বঙ্গবন্ধুর সময়ে অন্তত কেউ এই নীতি আল্টাইতে পারে নাই। কিন্তু এরপর নানা কাহিনী হইল। যে লাউ, সে নিজের পূর্বকালীন কদু অবস্থানে চইলা গেল। আমাদের জননেত্রী প্রধাণমন্ত্রী হাসিনাও সেইখান থাইকা সরতে পারতেছেন না। উনিও কথায় কথায় নিজের পিতার নানা স্বপ্নের কথা বলেন। কিন্তু উনি সম্ভবত এইটা আর মনে করতে পারেন না যে উনার পিতার স্বপ্ন কিংবা আদর্শ ছিল একটা ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ।


সংবিধানের অসংগতি নিয়ে কথা বলা কি সংবিধান বিরোধী? আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, “না”। কিন্তু আমাদের দেশের সংবিধানই স্ববিরোধী বক্তব্য ধারণ করে। কিংবা বলা যায় যে আমাদের দেশে সংসদে পাসকৃত আইন সংবিধান বিরোধী।

আমাদের সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ে স্পষ্ট বলা আছেঃ

তৃতীয় ভাগ
মৌলিক অধিকার
চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক্-স্বাধীনতা
৩৯। (১) চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তাদান করা হইল।
(২) রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ-সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে

(ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক্ ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের, এবং
(খ) সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল।

এখন আপনি যদি মনে করেন বাকশাল মানবাধিকারবিরোধী ছিল, কিংবা বঙ্গবন্ধুর কোন কাজের সমালোচনা করে আপনি একটা বক্তব্য দিলেন, তাইলে পরিণতি কী হবে চিন্তা করে দেখেন। কত কত যে আইন প্রসব করা হইছে। বিশেষ ক্ষমতা আইন, তথ্যপ্রযুক্তি আইন, এই ধারা সেই ধারা, সবই চিন্তা এবং বিবেকের স্বাধীনতায় লাগাম দেয়া নিশ্চিত করে। এবং এখনকার আওয়ামী কিংবা ভবিষ্যতে বিএনপি ক্ষমতায় আসলেও তারা এইসব আইন বাতিল করবে না। সেই কারণে ভবিষ্যতে জেঃ জিয়া যে স্বাধীনতা বিরোধীরে প্রধাণমন্ত্রী বানাইছিল এই সত্যটা উচ্চারণ করলেও ফাইসা যাইতে পারেন।

যাইহোক, আমাদের সংবিধানে এমন কিছু ব্যাপার আছে যা ব্যক্তির মতামতকে সরাসরি নাকচ করে। আমি জাতিতে নিজেকে কি দাবী করব সেইটা আমার অধিকার, আমার নিজের পছন্দের বিষয়। সংবিধান কারো জাতি কি সেটা ঠিক করতে পারে না। মনে করেন এখন ১৯৬০ সাল। পাকিস্তানের সংবিধানে লেখা হইলো যে এখন থেকে পাকিস্তানের জনগণ জাতি হিসেবে পাকি/মুসলমান এবং নাগরিকগণ পাকিস্তানী বলিয়া পরিচিত হবেন। মানতেন কেউ? ভাষাই মানতে পারেন নাই, জাতিগত পরিচয় তো আরও বড় ব্যাপার। জাতিগত পরিচয় এবং নাগরিকত্ব নিয়ে আমাদের সংবিধানে বলা আছেঃ

প্রথম ভাগ
প্রজাতন্ত্র
নাগরিকত্ব
১ [ ৬। (১) বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হইবে।
(২) বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসাবে বাঙালী এবং নাগরিকগণ বাংলাদেশী বলিয়া পরিচিত হইবেন।]

নাগরিকত্ব নিয়ে আমার কোন বক্তব্য নাই, এটাই যৌক্তিক। কিন্তু জাতি হিসেবে নিজে বাঙ্গালী হইলেও অন্যের উপর আমি এই পরিচয় চাপাইয়া দিতে পারি না। সাওতালরা এইদেশে হাজার বছর ধরে সাওতাল নামেই পরিচিত, চাকমারা চাকমা শত শত বছর ধরেই চাকমা। এমনকি আপনি আমি নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনায় তাদেরকে সাওতাল কিংবা চাকমা হিসেবেই বলি, বাঙ্গালী হিসেবে না। বাঙালি পরিচয় চাপাইয়া দিতে চাওয়া অন্যায়, রাস্ট্রের বড়রকম ভুল যা সংবিধানে যুক্ত করবার মাধ্যমে জবরদস্তি করে চাপাইয়া দেয়া হইছে। আমি মনে করি সংবিধানে এই ভুল এবং অযৌক্তিক কথাটা থাকা উচিত না।

আমাদের সংবিধানে আরও আছেঃ

দ্বিতীয় ভাগ
রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি
উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি
১ [ ২৩ক। রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।]

আপনি তো উপরে সংবিধানে সবার উপর বাঙ্গালী পরিচয় চাপাইয়া উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা এইসবকেও অস্বীকার করতেছেন। যদিও আমি মনে করি তারা নিজ নিজ অঞ্চলের আদিবাসী। চাকমারা চাকমাই, বাঙালি চাকমা না। সাওতাল সাওতালই, বাঙালি সাওতাল না। ২০০৭ সালে নির্বাচিত সরকার নাই এই দোহাই দিয়া বাংলাদেশ আদিবাসী সনদে সাক্ষর করে নাই। এখনো করতেছে না। আবার সংবিধানে আদিবাসী কথাটাই নাই। তার মানে দাঁড়ায় বাঙ্গালীরাই আদিবাসী, কিংবা এইদেশে আদিবাসী ছিলই না। কিন্তু জেনেটিকালি প্রমাণিত যে সাওতাল কিংবা এমন কিছু উপজাতি বা আদিবাসীদের বসবাস এই অঞ্চলে অনেক প্রাচীন আমল থেকে। এই অঞ্চলের সবচেয়ে পুরানো বাসিন্দা আদি অস্ট্রিকদের সাথে তাদেরই মিল বেশি। সেহেতু মিশ্র জাতির আমরা বাঙ্গালীরা হইলাম অভিবাসী, আদিবাসী না। কিন্তু সংবিধানে তো আবার আদিবাসী বইলা কিছু নাই, তাইলে এইযে আদিবাসী দাবী করা হয়, এরা আসলে আদিবাসী না। এরা আদিবাসীদের ভুত, আদিবাসীদের প্রেতাত্মা। আর যেহেতু তারা ভুত, প্রেতাত্মা, সেহেতু তাদের নির্মুল করাই শ্রেয়। চেহারাসুরতেও তো বাঙ্গালীর চেয়ে উন্নত না অনেকে, এদের তো বান্ধাইয়া সংরক্ষণ করবার দরকার নাই।

যাইহোক, আমাদের রাষ্ট্র আমার সংবিধানে গণতন্ত্র, মানবাধিকার এইসবের দিকে বিশেষ নজর দিছে। মানবসত্তার মর্যাদার ব্যাপারেও আলাদা উল্লেখ আছে। তাহারা তাহাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবে। কিন্তু কি তামাশা দেখেন, এরা সংখ্যায় এতই কম যে এরা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নিজের প্রতিনিধি নিজেরা নির্বাচন করতে পারবে না কখনই। এদের কথা বলবে কে? আমরা বাঙ্গালীরা? কিন্তু আমরা তো আলাদা কইরা ওদের কথা বলব না, আমরা তো বইলাই দিছি সব বাঙ্গালী। আর ওরা কোথাকার কোন চ্যাটেরবাল? চাকমা নাকি সাওতাল! এইসব আবার কি? চাকমা আর সাওতাল বইলা এখন যা আছে কিংবা আগে যা ছিল, সবই মিডিয়ার সৃষ্টি কিংবা রুপকথার বানোয়াট গল্প।

দ্বিতীয় ভাগ
রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি
গণতন্ত্র ও মানবাধিকার
১১৷ প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে
২[ এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে]৷

সংবিধানের আরও চমৎকার সংযোজন হইলো সমাজুন্ত্র এবং শোষণমুক্তির বাণীঃ

দ্বিতীয় ভাগ
রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি
সমাজতন্ত্র ও শোষণমুক্তি

১[ ১০।মানুষের উপর মানুষের শোষণ হইতে মুক্ত ন্যায়ানুগ ও সাম্যবাদী সমাজলাভ নিশ্চিত করিবার উদ্দেশ্যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হইবে।]

শুনতে আর পড়তে কত ভালোলাগে। আমাদের রাষ্ট্র মহান আদর্শ ধারণ করে। গণতন্ত্র আর সমাজতন্ত্রের উন্নতমানের খিচুড়ি বানাইয়া আমরা ব্যাপারগুলারে চমকপ্রদ করছি। কিন্তু শোষণমুক্তি কিংবা সাম্যবাদের যে কথা বলা হইছে, তা কি এই গণুন্ত্রে সম্ভব, যেইখানে দেসেরই বিচ্ছিন্ন নানা গোষ্ঠীর পক্ষে সংসদে কিংবা স্থানীয় সরকারেই দাড়ানোর মত কাউরে পাওয়া যাবে না? পার্বত্য অঞ্চল বাদে অন্য কোথাও তো কেউ নির্বাচিতও হবে না। কিন্তু তারা ভুত, প্রেতাত্মার জীবন নিয়া হইলেও বর্তমান। আবার শোষণ মানে কেবল অর্থনৈতিক শোষণ না। মানসিক শোষণও শোষণ। আমি কি নামে পরিচিত হইব, কি ধর্ম মানব, কোন রীতিতে নিজেরে অটল রাখব এইসবের বাইরে যাইতে বাধ্য করাও শোষণ। হায়রে আমাদের রাষ্ট্র, তারা এইসব কথা কানে নেয় না। এই কারণেই বঙ্গবন্ধুও কইয়া বসেন, “তোরা বাঙ্গালী হইয়া যা!” জেঃ জিয়া পাহাড়ে পাহাড়ীদের আধিপত্য কমাইতে ঝাকে ঝাকে সেটেলার পাঠাইতে পারেন। সেটেলার বলা উচিত না, বাঙ্গালী বলাই উচিত। পাহাড়ে যারা ছিল ওরাও বাঙ্গালী, আমাদের সংবিধান তো তাই বলে। বাঙ্গালী বাঙ্গালীর কাছে গেলে ক্ষতি কি?

সংবিধানে ধর্ম থাকা নিয়া আর কোনো কথা বলব না। অতিরিক্ত চিল্লাইলে ফাইসা যাইতে পারি। সরকার কিছু না করলেও আমাদের ঈমানদার মুসলিম ভাইয়েরা হুলিয়া জারী কইরা বসতে পারেন।

হায়রে দেশ! লাখ লাখ মানুষ রক্ত দিছিল মুক্তিযুদ্ধের সময়। তাদের অন্যতম আদর্শ ছিল ধর্মীয় পরিচয়ের বাইরে নিজেদের একটা দেশ। বাংলাদেশ হওয়ার কথা ছিল ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, ছিলও! বঙ্গবন্ধুর সময়ে অন্তত কেউ এই নীতি আল্টাইতে পারে নাই। কিন্তু এরপর নানা কাহিনী হইল। যে লাউ, সে নিজের পূর্বকালীন কদু অবস্থানে চইলা গেল। আমাদের জননেত্রী প্রধাণমন্ত্রী হাসিনাও সেইখান থাইকা সরতে পারতেছেন না। উনিও কথায় কথায় নিজের পিতার নানা স্বপ্নের কথা বলেন। কিন্তু উনি সম্ভবত এইটা আর মনে করতে পারেন না যে উনার পিতার স্বপ্ন কিংবা আদর্শ ছিল একটা ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ।

আর কি বলি? আমি গুছাইয়া লিখতে পারি না সেইভাবে। কইতে গেলাম সংবিধান নিয়া, আইসা পড়লাম জাতির পিতার স্বপ্নে। আফসোস, উনার স্বপ্ন সংরক্ষণের কোন বিশেষ বিধান সংবিধানে নাই! সেইটা থাকলে অন্তত বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রই থাকতো। রাষ্ট্র হইতো সকল ধর্ম, সকল বর্ণের জন্য, কোনো ধর্মীয় ট্যাগ ছাড়াই…

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “সংবিধানের অসংগতি নিয়ে কথা বলা কি সংবিধান বিরোধী? আশেপাশে কোনো ধারা নাইতো?

  1. সংবিধানের বাণী শুধু লিখিত আছে
    সংবিধানের বাণী শুধু লিখিত আছে কোন প্রয়োগ নাই।তবে প্রয়োগ হবে তখন,যখন রাষ্ট্র আপনাকে সংবিধানবিরোধী বলে চিহ্নিত করতে চাইবে।
    জনগনের মুক্তির জন্য আমাদের সংবিধান ব্যবহার হয় না,শাসকগোষ্ঠীর স্বার্থে জনগণ কে দমিয়ে রাখতেই তারা এর ব্যবহার করে আসছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

22 − = 19