মুহম্মদের ঐতিহাসিকতা ও ঐতিহাসিক মুহম্মদ, পর্ব-২

বাংলা ব্লগ দুনিয়ায় ইসলামের প্রানপুরুষ মুহম্মদকে নিয়ে শয়ে শয়ে লেখা আছে, কিন্তু তার সবটাই মুহম্মদ সংক্রান্ত ইসলামী বিরবণ কে মেনে নিয়ে, যার ঐতিহসিক সত্যতা কোন ভাবেই প্রতিপাদন করা সম্ভব নয়। এমনকি নাস্তিক ব্লগাররা ইসলাম ও মুহম্মদে সম্পর্কে প্রচুর প্রবন্ধ লিখলেও তার কোনটিতেই ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের চেষ্টা হয়নি এমনকি এ সংক্রান্ত বিশাল গবেষনা সম্পর্কে তারা অবগত আছেন বলেও তাদের লেখা থেকে মনে হয়না। একমাত্র মুক্তমনা ব্লগে কয়েক বছর আগে বিপ্লব পাল তার একটি প্রবন্ধে বিষয়টাকে বুড়ি ছুয়ে গিয়েছিলেন; এ ছাড়া আর কোন লেখা আমার চোখে পড়েনি। বিপ্লব পালের আর্টিকেলটি পড়ার পর থেকেই আমি বিষয়টি নিয়ে ভাবতে থাকি এ সংক্রান্ত গবেষনালব্ধ তথ্যগুলি বিশদভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন অনুভব করি। ইষ্টিশন ব্লগে নিয়মিতভাবে এই সিরিজটি প্রকাশ করছি। যারা আরো ভালভাবে জানতে চাইবেন তারা সরাসরি ইবনে ওয়ারাকের Origines of Koran এবং রবার্ট স্পেনসারের Did Muhammad Exist বইদুটি দেখতে পারেন।

ইসলামী ইতিহাসের আরবী ভিত্তি ও উপরিকাঠামো

বাংলা ব্লগ দুনিয়ায় ইসলামের প্রানপুরুষ মুহম্মদকে নিয়ে শয়ে শয়ে লেখা আছে, কিন্তু তার সবটাই মুহম্মদ সংক্রান্ত ইসলামী বিরবণ কে মেনে নিয়ে, যার ঐতিহসিক সত্যতা কোন ভাবেই প্রতিপাদন করা সম্ভব নয়। এমনকি নাস্তিক ব্লগাররা ইসলাম ও মুহম্মদে সম্পর্কে প্রচুর প্রবন্ধ লিখলেও তার কোনটিতেই ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের চেষ্টা হয়নি এমনকি এ সংক্রান্ত বিশাল গবেষনা সম্পর্কে তারা অবগত আছেন বলেও তাদের লেখা থেকে মনে হয়না। একমাত্র মুক্তমনা ব্লগে কয়েক বছর আগে বিপ্লব পাল তার একটি প্রবন্ধে বিষয়টাকে বুড়ি ছুয়ে গিয়েছিলেন; এ ছাড়া আর কোন লেখা আমার চোখে পড়েনি। বিপ্লব পালের আর্টিকেলটি পড়ার পর থেকেই আমি বিষয়টি নিয়ে ভাবতে থাকি এ সংক্রান্ত গবেষনালব্ধ তথ্যগুলি বিশদভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন অনুভব করি। ইষ্টিশন ব্লগে নিয়মিতভাবে এই সিরিজটি প্রকাশ করছি। যারা আরো ভালভাবে জানতে চাইবেন তারা সরাসরি ইবনে ওয়ারাকের Origines of Koran এবং রবার্ট স্পেনসারের Did Muhammad Exist বইদুটি দেখতে পারেন।

প্রকৃতপক্ষে সোভিয়েত প্রাচ্যবিদরা বিংশ শতাদ্বীর ৩০ এর দশক থেকেই ইসলামিক বিবরনের ঐতিহাসিকতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে আসছেন। উদাহরণস্বরুপ বলা যায় সোভিয়েত ঐতিহাসিক ক্লিমোভিচ ইসলামকে একটি আন্দোলন হিসাবে দেখেছেন যা আদিতে ছিল ধর্মনিরপেক্ষ। মুহম্মদ এই আন্দোলনের নেতৃত্বে এসে একে একটি ধর্মীয় চরিত্র দেন। একি সাথে আন্দোলন তার প্রগতিশীল ও দরদী চরিত্র হারায়। তার মতে মক্কা ছিল প্রধান বানিজ্যকেন্দ্র, মক্কার বাসিন্দারা ছিলেন প্রায় সকলেই ব্যবসায়ী। অথচ বানিজ্যের প্রধান উৎস ছিল কাবার তীর্থযাত্রীগন, আর কাবার দখল ছিল কিছু ধনী কুরাইস পরিবারের হাতে। এই অল্পসংখ্যক ধনী কুরাইস পরিবারের বিরুদ্ধে দরিদ্রতর শ্রেনীর শ্রেনীসংগ্রাম হিসাবে ইসলাম জন্ম নেয়।

আধুনিক ভাষাতাত্বিক গবেষনার আলোকে ক্লিমোভিচের এই বিশ্লেষন আদৌও গ্রহনযোগ্য নয়। কারণ আমাদের মক্কা থেকে ইসলামের উদ্ধব তত্বে সংশয় প্রকাশ করার যথেষ্ট কারণ আছে । শুধু তাই নয় প্যাট্রিসিয়া ক্রোন দেখিয়েছেন বানিজ্যকেন্দ্র হিসাবে মক্কার উল্লেখ সমকালীন (মুসলিম এবং অমুসলিম) কোন উৎসেই পাওয়া যায় না (Meccan Trade: Patricia Crone) । এটা হল এককথায় অবিশ্বাস্য ঘটনা কারণ বলা হয়েছে পূর্ব-পশ্চিম ও উত্তর দক্ষিনের সব বানিজ্যপথগুলি মক্কায় এসে মিলিত হত।মক্কার মাধ্যমেই ভারতের বিলাসদ্রব্য আরবের বনিকদের মাধ্যমে বাইজানটাইন সাম্রাজ্যে ঢুকত। এতিহাসিক ওয়াট বলেছেন- “by the end of sixth century A.D , (the Quraysh) had gained control of most of the trade from the Yemen to the Syria”।কিন্তু দেখা যায় মুহম্মদের কথিত জন্মের ৫ বছর আগে ৫৬৫ খৃষ্টাব্দে লেখা ষষ্ঠ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক Procopius of Caesarea তার বিবরণে মক্কার কোন উল্লেখ করেননি। (মুসলিম ঐতিহাসিকরা অনেকসময় টলেমির বিবরনে প্রাপ্ত মাকোরাবা নামে একটি স্থানের উল্লেখ দেখিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন এটাই ইসলামের নবীর জন্মভূমি মক্কা।)বানিজ্যকেন্দ্র হঠাৎ করে গড়ে ওঠে না। কিন্তু সমসাময়িক গ্রিক, রোমান, আরামায়িক, সিরিয়ান কোন বিবরনেই মক্কার উল্লেখ নেই।

পৃথিবীর ম্যাপে মক্কার ভৌগলিক অবস্থান লক্ষ্য করেছেন, সবদিক থেকে সমস্ত বানিজ্যপথগুলো মক্কায় এসে মিলছে এর থেকে কষ্টকল্পনা আর কি হতে পারে। কি ভাবছেন! কাহিনী আরো বাকি আছে। একাদশ শতাব্দীর মুসলিম ঐতিহাসিক আল আজরাকি (১০৭০ সাল) ইসলামপূর্ব আরবের তীর্থস্থান যেমন মিনা, আরাফা, উকাজ, মাজান্না ইত্যাদীর নাম করেছেন কিন্তু মক্কার নাম নিতেই ভূলে গিয়েছেন। দ্বিতীয়বার ভাবনার পরে পরিশিষ্ট অংশে মক্কার স্থান হয়েছে। প্যাট্রিসিয়া ক্রোন এটাও দেখিয়েছেন উপজাতি অধ্যুষিত আরবে সমস্ত তীর্থস্থান অবস্থিত ছিল ফাঁকা মরুভূমিতে যেখানে কোন পক্ষেরই কর্তৃত্ব থাকত না, মক্কার মতো কোন শহরে নয়। (Meccan Trade: Patricia Crone)। কোরানের আল্লা অবশ্য মক্কাকে একেবারে ভূলে যাননি, তিনি শুধু একবার মক্কার উল্লেখ করেছেন –
“ তিনি মক্কা উপত্যকায় উহাদের হস্ত তোমাদের হইতে এবং তোমাদের হস্ত উহাদের হইতে নিবারিত করিয়াছেন, উহাদের উপর তোমাদের বিজয়ী করার পর, তোমরা যাহা কিছু কর আল্লাহ তাহা দেখেন”[সুরা ফাতহ, আয়াত ২৪] (সৌদি আরবের বাদশাহ ফাহাদ কতৃক কোরানের বাংলা অনুবাদ থেকে গৃহীত)।
কিন্তু এ থেকে কিছুই বোঝার উপায় নেই।

মক্কা ও মদিনায় পুরাতাত্বিক খননকার্য চালাতে পারলে হয়ত এই রহস্যের সমাধান পাওয়া যেতে পারত। গবেষনার ফলাফল ইসলামের বিরুদ্ধে যেতে পারে এই আশংকায় সৌদি ও অনান্য মুসলিম রাষ্ট্রগুলি নিরপেক্ষ দলকে কোনরকম অনুসন্ধানের সুযোগই দেয় না। অতএব আমাদের পরোক্ষ উপাদানের উপর নির্ভর করা ছাড়া কোন উপায় নেই।

আসুন খানিকক্ষনের জন্য ইসলামী বিবরনের উপর আস্থা রাখি। নিচে ইসলামী ইতিহাসের একটি ক্রমবিবরণী দিয়ে দিলাম। যারা বিশদে ইসলামী ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায় জানেন, তারা স্বচ্ছন্দে এই অংশটি বাদ দিয়ে যেতে পারেন:

৫৭০ খৃষ্টাব্দ: মুহম্মদের জন্ম
৬১০ খৃষ্টাব্দ: মু্ম্মদের নবয়ুৎ প্রাপ্তি
৬২২ খৃষ্টাব্দ: হিজরা বা মহম্মদ ও তার অনুগামীদের মদিনায় আশ্রয়লাভ
৬২৪ খৃষ্টাব্দ: বদর যুদ্ধ
৬২৫ খৃষ্টাব্দ: উহুদ যুদ্ধ
৬২৭ খৃষ্টাব্দ: খন্দক যুদ্ধ
৬২৮ খৃষ্টাব্দ:হুদাইবিয়ার সন্ধি
৬৩০ খৃষ্টাব্দ:মহম্মদের মক্কা বিজয়
৬৩২ খৃষ্টাব্দ: মহম্মদের মৃত্যু, খলিফায়ে রাসেদিনের শুরু
৬৩২-৩৩ খৃষ্টাব্দ: ধর্মদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, মুহম্মদের মৃত্যু সংবাদে ইসলামত্যাগ করে মূর্তাদ হবার ধুম পরে যায়। খলিফা আবু বকর এই বিদ্রোহীদের দমন করেন।
৬৩৩ খৃষ্টাব্দ: ইয়ামানার যুদ্ধ, সিরিয়ার ধর্মপ্রচারক মুসায়লামার অনুগামীদের বিরুদ্ধে মুসলিমরা যুদ্ধযাত্রা করে। মুসায়লামার জনপ্রিয়তা সম্ভবত মুহম্মদের থেকে কম ছিল না। যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
৬৩৩ খৃষ্টাব্দ: আরবদের ইরাক আক্রমন
৬৩৪-৬৪৪ খৃষ্টাব্দ: খলিফা উমরের আমল
৬৩৬-৩৭ খৃষ্টাব্দ: আরবদের সিরিয়া ও প্যালেষ্টাইন জয়
৬৩৯ খৃষ্টাব্দ: আরবদের আর্মেনিয়া ও মিশর জয়
৬৪৪ খৃষ্টাব্দ: আরবদের পারস্য দখল
৬৪৪-৬৫৬ খৃষ্টাব্দ: খলিফা উসমানের আমল
৬৫৩ খৃষ্টাব্দ: উসমান কোরান সংকলিত করেন
৬৫০-৬০ খৃষ্টাব্দ: আরবরা উত্তর আফ্রিকা জয় করল
৬৫৪ খৃষ্টাব্দ: আরবদের সাইপ্রাস ও রোডস দখল
৬৫৬-৬৬১ খৃষ্টাব্দ: খলিফা আলির আমল
৬৬১ খৃষ্টাব্দ: আলির মৃত্যু, খলিফায়ে রাসেদিনের সমাপ্তি
৬৬১-৬৮০ খৃষ্টাব্দ: উমাইয়া শাসনের সূত্রপাত, মুআবিয়ার আমল
৬৭৪: আরবদের কনস্ট্যানটিনোপল অবরোধ
৬৮০-৮৩ খৃষ্টাব্দ: প্রথম ইয়াজিদের শাসন
৬৮৫-৭০৫ খৃষ্টাব্দ: আবদ আল মালিকের শাসন। কিছু ইসলামী সূত্র অনুসারে তিনি কোরান সংকলিত করেন
৬৯১ খৃষ্টাব্দ: Dome of the Rock লিপি। প্রথমবারের মত কোরানের আয়াত উৎকির্ণ হল।
৬৯০ খৃষ্টাব্দ: ইসলামী সূত্র অনুসারে ইরাকের শাসনকর্তা হাজ্জাজ বিন ইউসুফ কোরান সংকলিত করেন। কোরানের অনান্য সংস্করণ পান সেগুলো পুড়িয়ে ফেলেন। সূত্রমতে তিনি কোরান পরিবর্তনও করেন
৭০৫-১৫ খৃষ্টাব্দ: প্রথম আল ওয়ালিদের শাসন।
৭১১-১৩: মহম্মদ বিন কাসেমের ভারত অভিযান। আরবদের সিন্ধু জয়
৭১১-১৮ খৃষ্টাব্দ: মুসলিমদের স্পেন জয়
৭৩২ খৃষ্টাব্দ: ত্যুরের যুদ্ধে চার্লস মার্টেল মুসলিমদের অগ্রগতি রোধ করলেন।
৭৫০ খৃষ্টাব্দ: আব্বাসীয় বিপ্লব, উমাইয়া শাসনের অবসান
৭৫০-৬০ খৃষ্টাব্দ: ইবনে ইশাক প্রথম সিরাত গ্রন্থ লিখলেন
৮৩০-৬০ খৃষ্টাব্দ: ষটি প্রধান হাদিস এই সময়ের মধ্যে লেখা হয়
(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৮ thoughts on “মুহম্মদের ঐতিহাসিকতা ও ঐতিহাসিক মুহম্মদ, পর্ব-২

    1. অাপনার মেনশন করা বই দুটো
      অাপনার মেনশন করা বই দুটো পড়েছি অাগেই;
      তবে বাংলায় কলম ধরার জন্য অনেক বড় একটা ধন্যবাদ অাপনার প্রাপ্য!

      ইসলামী সুত্র ছাড়া মুহাম্মদের সমসাময়িক খোঁজ মাত্র দুটি জায়গায় পাওয়া যায়;এছাড়া মুহাম্মদ এবং মক্কাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়না; অবশ্য এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারন অাছে!

      অামি লেখার জগতে কৃপণ, তবে অারও দু/তিন পর্ব পড়ার পর থেকে বিস্তারিত মন্তব্য করতে শুরু করার চেষ্টা করবো!

      অার হ্যা, অাপনার সিরিজটি শেষ হলে;দারুন একটা ইবুক করে দেবার ইচ্ছা রইল!

      জ্ঞান সর্বদাই উভয়মূখী, তাই সত্যি ভাললাগছে অাপনার লেখা..
      শুভেচ্ছা!

  1. ভাই অামি গর্বিত,
    ভাই অামি গর্বিত,
    এই নাপিতের লেখা অাপনি পড়েন!
    অাপনার লেখা পড়ছি নিয়মিত..
    শেষ করবেন অবশ্যই! ইবুক করে দেবো দারুন করে..

    সব দিকই মুমিনদের জানানোর দায়িত্ব অামাদের!

    শুভেচ্ছা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

8 + 2 =