জঙ্গিবাদের গহীণ অরণ্যে

জঙ্গিবাদ বর্তমান পৃথিবীর অন্যতম প্রধান বৈশ্বিক সমস্যা। এটি কোন দেশের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সীমানায় আবদ্ধ নেই। গ্রিনহাউজ গ্যাসের মতই অবলীলাক্রমে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের ভূগোলজুড়ে। অর্থনীতির বিশ্বায়নের সাথে পাল্লা দিয়ে ঘটেছে সন্ত্রাসের বিশ্বায়ন। বর্তমান পৃথিবীতে জঙ্গিবাদ আবির্ভূত হয়েছে বিশ্বের প্রধান নিরাপত্তা সমস্যা হিসেবে। বাংলাদেশ কিছুদিন আগেও যেমন খাদ্য নিরাপত্তা এবং তারপরে ভেবেছে জলবায়ু নিরাপত্তা নিয়ে, আজ তাকে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতই গলদঘর্ম হতে হচ্ছে জনগনের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে। বলা নিষ্প্রয়োজন যে এর মূলে রয়েছে জঙ্গিবাদের বিস্তার ও তার অপ্রতিরোধ্য গতি এবং সে বিস্তার ও গতিরোধের বিষয়ে প্রশাসনের অহীনা,ভুল সিদ্ধান্ত, নিষ্ক্রিয়তা এবং অকর্মণ্যতা। তারা আসলে জঙ্গিবাদের গাছটাকে বাঁচিয়ে রেখে শুধু মাঝেমধ্যে ডালপালা ছেটে জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণের এক অত্যাশ্চর্য পলিসি গ্রহণ করেছে।

জঙ্গিবাদের উৎপত্তি এবং বিস্তারের পেছনে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক ফ্যাক্টর সম্মিলিতভাবে ক্রিয়াশীল । কোন একটি মাত্র ফ্যাক্টর দিয়ে জঙ্গিবাদের উৎপত্তি ও বিস্তার ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। তাই একটা হলিস্টিক এ্যপ্রোচ গ্রহণ করাই সমীচীন। জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে যারা মাঠপর্যায়ে সহিংস আক্রমণ চালায় তাদেরকে আইডেন্টিফাই করতে গিয়ে আমরা তাদেরকে অশিক্ষা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক বিভাজনের আউটকাম এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত মানুষ এবং সর্বোপরি একটি ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক দলের হাতিয়ার বলে চিহ্নিত করে এসেছি।জঙ্গিবাদের এই তত্ত্ব একটি সনাতনী তত্ত্ব হিসেবে যথেষ্ট পপুলার, ইফেক্টিভ এবং আমরা এটাকে বাতিল করছি না এই মুহূর্তে। তবে এটাকে পুনশ্চিন্তন এবং পুনর্বিন্যাসের সময় এসেছে।

বর্তমানে সন্ত্রাসের যে বিশ্বায়ন সেটার কোন অভিন্ন মূলসূত্র আছে কিনা সেটা খুজেঁ দেখা দরকার।সমস্ত নেতিবাচক ঘটনার জন্য চোখ বুজে আমেরিকা, ইসরায়েল, পুজিবাদ আর সাম্রাজ্যবাদের দোষ দিয়ে চেঁচিয়ে লাভ নেই। এগুলো বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে । বিভিন্নজনের লেখায় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর আবির্ভাবের কারণ হিসেবে বিশ্বব্যাপী মার্কিন ও কয়েকটি ইউরোপীয় ধনতান্ত্রিক দেশের এশিয়া, আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকাতে উপনিবেশ স্থাপন এবং সাম্রাজ্যবাদী শাসন-শোষণকে দায়ী করা হয়।আমেরিকার সি আই এ প্রভৃতিকে সন্ত্রাসী সংগঠনের জন্মদাতা এবং মদদদাতা বলেও উল্লেখ আছে। আমরা কিন্তুু সেসব অভিযোগকে উড়িয়ে দিচ্ছিনা।বরং এগুলোর দায় যে আছে সেটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। অপশাসন, শোষণ, ন্যায়বিচারের অভাব, দারিদ্র্য, বেকারত্ব,সামাজিক ও রাজনৈতিক বঞ্চনা প্রভৃতি ব্যক্তি বা গোষ্ঠির মধ্যে “নির্যাতিত এবং বঞ্চিত হওয়ার অনুভূতি “(feeling of deprivation and persecution) জাগিয়ে তোলে।এই অনুভূতিতে যখন অধিকসংখ্যক মানুষ উদ্দীপিত হয় তখন সমাজে বা রাষ্টে একটা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরী হতে পারে। এই প্রকারের সামাজিক বা রাজনৈতিক সংকট আইডেন্টিফাই করা খুব কঠিন কাজ নয়।এটা প্রধানত সুশাসনের অভাবজনিত সমস্যা যার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে শাসক শ্রেণীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ । কিন্তুু বর্তমান দুনিয়াতে আমরা যে বিশেষ এক ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রম দেখছি তা কী নিছক সুশাসনের অভাবজনিত সমস্যা বা রাজনৈতিক সমস্যা? আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া এবং সিরিয়ার সমস্যাকে যদি আমি সাম্রাজ্যবাদ সৃষ্ট রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবেও মেনে নিই, তারপরও প্রশ্ন থাকে যে ওসব সমস্যার মাঝে একটা বিশেষ ধর্মের নাম আসে কেন? ওটা কেন মার্কিন বা ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ বনাম আরব জাতীয়তাবাদ বা ইরাক/লিবিয়া/সিরিয়ার স্বশাসনের অধিকারের লড়াই না হয়ে আমেরিকা বনাম ইসলামের লড়াই হয়ে ওঠে? পশ্চিমা মিডিয়া যুদ্ধটাকে আমেরিকা বনাম ইসলামের লড়াই হিসেবে চিত্রিত করে বলেই কী আমরা সেভাবেই দেখি লড়াইটাকে? নাকি সত্যি সত্যিই ওই লড়াইয়ে ইসলামের রাজনৈতিক এবং ধর্মতাত্ত্বিক অভিলাষ আছে বলেই পশ্চিমা মিডিয়া সেটাকে ওইভাবে উপস্থাপনের সুযোগ পায়?

সিরিয়া ইরাকের কথা বাদ দিলাম। সেখানে বহুরকম উপাদান একসাথে জটাজাল বিস্তার করে আছে। আমরা নিজেদের দিকে তাকাই। বাংলাদেশে আহমদ শরীফকে মুরতাদ ঘোষণা করা,হুমায়ুন আজাদ, রাজিব হায়দার, অভিজিৎ রায় প্রভৃতি লেখক,জুলহাস মান্নানের মতো সমকামী অধিকার কর্মীকে হত্যার পেছনে কোন সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতি, কোন ঔপনিবেশিক শাসন বা কোন সুশাসনের অভাব কাজ করেছে বলতে পারেন? জাফর ইকবাল জামায়াত শিবিরের বিরুদ্ধে কথা বলেন। তাঁকে হত্যাচেষ্টার পেছনে আমরা প্রাথমিকভাবে জামায়াত শিবিরের দিকে অঙ্গুলী নির্দেশ করেছিলাম। কিন্তুু বিস্ময়কররূপে জানতে পারলাম তিনি “ইসলামের শত্রু” এবং এজন্যই তাকে হত্যা করতে গিয়েছিল একজন স্বপ্রণোদিত ইসলাম রক্ষাকারী। এই হত্যা কার রাজনীতি? সাম্রাজ্যবাদের নাকি ধর্মতন্ত্রের? কোন স্বাধীন চিন্তার মূলধারার লেখক বা ব্লগারের মৃত্যু সংবাদের নিচে সারা দেশের অগণিত মানুষের যে নগ্ন উল্লাসভরা কমেন্ট দেখি সেটা কোন ভাবাদর্শ থেকে উৎসারিত? ওটা কী
এন্টি-কলোনিয়াল আইডিওলোজি নাকি মধ্যযুগীয় ধর্মবাদী ডগমা?ভাববার অবকাশ আছে।

বিশ্বায়ন যেমন একটি বাস্তবতা, তেমনি সাম্রাজ্যবাদের সাথে বিশ্বায়নের সম্পর্কও একটি বাস্তবতা;এবং সন্ত্রাসেরও একটা বিশ্বায়িত রূপ আমরা দেখতে পাচ্ছি। এই ইন্টারকানেক্টেড ওয়ার্ল্ডে বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে বোমা পড়লে পটুয়াখালীর বাউফলে তার উত্তাপ টের পাওয়া যায়। তারপরও একটা প্রশ্ন আমাদের থেকেই যায়। এই যে বিশ্বায়িত সন্ত্রাস এটা কি স্রেফ অর্থনৈতিক প্রেষণা অর্থাৎ বাজার দখল, পণ্য বিক্রয়, প্রফিট গেইন এবং অন্যান্য নিওলিবারেল পলিসিকে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস?সেই সাথে এটা কি ভূরাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ভূগোলে বৃহৎ শক্তি বা শক্তিসমূহের নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা ও বিস্তারের হাতিয়ার? শুধু মিলিটারি ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সের ব্যবসা আর মুসলিম বিশ্বের প্রতি ক্রিস্টিয়ানিটি এবং জুডাইজমের যৌথ ষড়যন্ত্রের শতাব্দীপ্রাচীন থিওরি দিয়ে কি এই সংকটের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়? এই সমস্ত বিষয়কে হিসেবে নিয়েই কি আমরা দৃষ্টিটাকে আরো খানিকটা প্রসারিত করতে পারি না? ধর্মের ঘাড়ে চড়ে সাম্রাজ্যবাদ অথবা সাম্রাজ্যবাদের কব্জায় পড়ে ধর্ম -যেভাবেই হোক না কেন সন্ত্রাসের সাথে ধর্মের একটা যোগ সারা বিশ্বব্যাপী পরিলক্ষিত হচ্ছে। এইখানে আমি শুধু ধর্মের নামে যে সকল সহিংসতা ঘটছে সেগুলোকেই বিবেচনায় নিচ্ছি। (এর বাইরে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব প্রভৃতি কারনে শতশত সহিংসতা ও মৃত্যু ঘটে থাকে পৃথিবীতে। সেগুলো ভিন্ন বিষয়। ) আমরা আমাদের সমস্ত কিছুকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে রাজি আছি, কিন্তুু কেন জানি যে ধর্ম বারবার সহিংসতায় ব্যবহৃত হচ্ছে, সেই ধর্মকে-সেটা যে ধর্মই হোক- ধর্মীয় বিশ্বাসকে একবারের জন্যও মাইক্রোস্কোপের নিচে বসাতে রাজি নয়। উল্টো আমরা সেই ধর্মকে রক্ষার নামেই নরমেধ যজ্ঞের আয়োজন করছি। রাষ্ট্রপ্রধান থেকে আমজনতা সেই ধর্মের স্তুবগীত গাচ্ছি।” এটা শান্তির ধর্ম “, “ওরা সহি মুসলমান না “, “ওটা আসল ইসলাম না “, ” ওইটা ভুল ব্যাখ্যা ” আর ” ওরা মস্তিস্কবিকৃত ” এইসব বলে একইসাথে অপরাধ, অপরাধী এবং অপরাধের উৎসকে আড়াল করছি।

ধর্মকে বাতিল করে দিতে বলছি না কেউ, শুধু বলছি এর অন্তর্গত বিশ্বাসগুলোকে একটু খুটিয়ে দেখতে। যদি সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায় সেটা স্বীকার করে তার প্রয়োজনীয় সংস্কারের দ্বারা মানবিক, আধুনিক এবং সময়োপযোগী করে তুলতে। কিন্তুু এখানেই একটা গলদ। ধর্মবিশ্বাসগুলো তো আবার বিশ্বাসীদের কাছে অভ্রান্ত, অবিনশ্বর, চিরকালীন, পবিত্র এবং অবশ্যপালনীয়। আমরা তাহলে কিভাবে সংস্কার আনবো? যিনি এই ধর্মবিশ্বাসের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত, সংস্কারবাদীকে তো তিনি ভালো চোখে দেখবেন না। ধর্মের শত্রু মনে করবেন। তিনি যদি ধর্মের হেফাজত করার জন্য ধর্মের শত্রুকে হত্যা করেন তখন কি আপনি এই হত্যার পেছনে সাম্রাজ্যবাদ আর মোসাদ খুঁজবেন? এ তো গেল একটা দিক। হত্যার নির্দেশ সম্বলিত অনেক আয়াত, হাদিস এবং অন্যান্য আরো নিদর্শনের রেফারেন্স সহ উল্লেখ আছে প্রচুর ব্লগারের লেখাতে। কেউ যদি সেই লেখা পড়ে লেখককে হত্যা করে তখনও কি আপনি কারণ খুঁজবেন সামাজিক বৈষম্য আর রাষ্ট্রীয় অনাচারে? ব্রেন ওয়াশের কথা বলছেন অনেকেই। বিশ পচিঁশ বছরের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া, তাও আবার মেধাবী ছাত্র, এদের ব্রেনওয়াশড হয় কিভাবে? ওদেরকে তো প্রচুর তথ্য ও তত্ত্ব দিয়েই ওয়াশ করা হয়। সেই তথ্য ও তত্ত্বগুলো কি মিথ্যা? যেকোন ছাইভস্ম মার্কা জিনিস দিয়ে নিশ্চয়ই ওই পূর্ণবয়স্ক মেধাবী ছেলেগুলোর ব্রেন ওয়াশ হয়না। তাদের সামনে প্রচুর কনক্রিট এভিডেন্স বা ডকুমেন্টস হাজির করা হয়েছে। এবং এই ধরনের জিনিস ধর্মীয় গ্রন্থে বিরল নয়, বরং বেশ বেশীই আছে। আচ্ছা, এই ছেলেগুলোকে না হয় ব্রেনওয়াশ করা গেল। এদেরকে যারা ব্রেনওয়াশ করলো ওরা কারা? ওরাও কি অন্যের দ্বারা ওয়াশড্? শফি হুজুরের কি মোসাদ কানেকশন আছে? হেফাজতের আই এস আই বা সি আই এ কানেকশন আছে? হেফাজত এবং ওলামালীগের কি কোন রাজনৈতিক অভিলাষ মানে ক্ষমতায় গিয়ে দেশ শাসনের আশুু লক্ষ্য আছে? এরা যা বলে, যে দাবী দাওয়া করে সেগুলো কি সাম্রাজ্যবাদীদের শিখিয়ে দেওয়া? সাম্রাজ্যবাদ কী তা কি ওরা বোঝে ভালোমতো? কিন্তু ওরা ধর্ম বোঝে। এরা ইম্যানুয়েল ওয়ালারস্টেইন আর নোম চমস্কি পড়েনা, নিও লিবারবেল ইকোনমিক পলিসি সম্পর্কে জানে না। কিন্তুু ধর্মীয় বই যথেষ্টই পড়ে। ওদের আচার আচরণ, দাবী দাওয়া এসবের ব্যাখ্যা করার জন্য তাই দুনিয়ার তাবৎ তাবৎ দর্শন আর সমাজতত্ত্ব, রাষ্ট্রতত্ত্ব এবং অর্থনীতি বোঝার দরকার নেই। আগে ওরা যা পড়ে, যা মানে, যা বিশ্বাস করে, এবং ওদের যাবতীয় বিশ্বাস যেখান থেকে আসে সেখানে হাত দিন।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

19 − 16 =