ধর্ম, কচকচানি, সাহিত্য ও কিছু প্রলাপ

জ্বর আসলেই হ্যাপা- নাক দিয়ে বৃষ্টি নামে- মাঝেমাঝে তো চোখ দিয়েও। জনপ্রিয় সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ জ্বর এসেছে কিনা বোঝার একটা সুন্দর উপায় বলেছিলেন তার কোন এক উপন্যাসে। উপন্যাসটার নাম মনে না থাকলেও উপায়টা দিব্যি মনে আছে। সেটা হলো, সিগারেট খাওয়া। যদি সিগারেট খোর সিগারেটে স্বাদ না পায়, তবে বুঝতে হবে তার জ্বর এসেছে কিংবা জ্বর আসি আসি করছে। আমিও সেই টেস্টটা করলাম ক্ষাণিক আগে- বুঝলাম জ্বর এসেছে। কপালও গরম।

জ্বরের ভালো কোন দিক আছে কিনা জানি না তবে ঠান্ডা ঠান্ডা লাগে যে একটু, সেটুকু আমি মোটামুটি এনজয়ই করি। এই গরমে ফ্যান চালিয়ে পাতলা একটা কাঁথা গায়ে কাঁপাকাপি করার মধ্যে গরমকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখানোর একটা ভাব আছে যেন! আর নিয়ম মেনে রুটিনমাফিক পড়া থেকেও রেহাই পাওয়া যায় একটু। পাঠ্য বইয়ের জ্যাম থেকে বেড়িয়ে সুন্দর কোন অপাঠ্য বইয়ে (পাঠ্যের বিপরীত তো অপাঠ্যই না? মজার ব্যাপার অপাঠ্য বইগুলিই সুখপাঠ্য!) ডুব মারা যায়। অনায়াসে দেখা যায় মুভিও- ডাউনলোড করে।

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের ‘শীর্ষ সম্মিলন’ হাতে নিলাম পড়ার জন্য। বহুদিন থেকে টেবিল দখল করে আছে। পড়ি পড়ি করেও পড়া হয়ে ওঠে না। এই সুযোগে পড়ে নেয়া যাক।

হাতে নিয়েই চমকে উঠালাম প্রায়। সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের রচনা আগে পড়িনি আমি। শুধু নাম শুনেছিলাম কয়েকবার, কোথাও কোন চিপায়। মুগ্ধ হলাম বইটার প্রথম কয়েকটা বাক্য পড়েই। সঞ্জীবের বলার সরল সোজা স্টাইল, কাটকাট বাক্য, পটু পাচকের তর্জনীর ডগায় লবণ নিয়ে দেয়ার মত একটুখানি হিউমর- সব অনন্য, অসাধারণ। চমকাবার ২য় কারণ হয়তো তার সাহস। মনে মনে বললাম, “এ বই লেখার সাহস পেলেন কোথায় তিনি!”
ভগবান রাম, যুধিষ্ঠির সহ অন্যান্য সব মহাভারতের, রামায়নের চরিত্রকে তিনি নামিয়ে এনেছেন পৃথিবীতে! তাদের তিনি খ্রিস্টভাষা(!) ভাষা ইংরেজি পর্যন্ত বলিয়ে ছেড়েছেন! তারা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করছে, বিবাদ করছে- অসাধারণ হাস্যরসাত্মক ব্যাপার! পড়িমরি করে গুগোলে সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় লিখে সার্চ দিলাম। উইকিপেডিয়ায় দেখলাম, সঞ্জীব চট্টোপাধায় বেঁচে আছেন এখনো, কোন রামভক্ত এসে তাকে চিতায় পাঠায়নি!

শুরুতেই যুধিষ্ঠির এসে ল্যান্ড করলেন এভারেস্টে। এটাই নাকি স্বর্গ আর দুনিয়া্র পাদানি। সেখানে সাক্ষাৎ তার এডমন্ড হিলারির সাথে। প্রথম এভারেস্ট ক্লাইম্বার।
যুধিষ্ঠির জিজ্ঞেস করল, “হু আর ইউ?”
“আই অ্যাম হিলারি। আমিই প্রথম এভারেস্ট জয় করি।”
“নো স্যার। প্রথম ক্লাইম্বার আমি”
“হু আর ইউ?”
“মাই নেম ইজ যুধিষ্ঠির। রেড মহাভারত? হার্ড অ্যাবাউট প্যাঞ্চ প্যান্ডব?”
“তোমার রেকর্ড কোথায়?”
“মহাভারত। রেকর্ডেড বাই বেদব্যাস।”
এভাবে সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় একে একে নামিয়ে এনেছেন রাম, লক্ষণ, সীতা থেকে শুরু করে মহাভারত রামায়নের অনেক অনেক চরিত্রকে। এমন বিষয় নিয়ে তাদের কথা বলিয়েছেন, যেসব কথা হয়তো কোন রামভক্ত কোনদিন ভাবতেও পারবে না।

বইটা পড়া শেষ করে থ হয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। ভাবলাম এমন অসাধারণ লেখা এদেশের কেউ লিখতে পারে না কেন? এদেশে কী স্যাটায়ার করতে পারে, এমন লেখকের অভাব, না বিষয়ের অভাব? উত্তরটা পেয়ে গেলাম নিজের একটা অভিজ্ঞতা থেকেই। ….. দুদিন আগে একটা ওয়েব সাইটে ঘোরাঘুরি করতে গিয়ে জোক পেলাম একটা। হাসলাম খানিক পড়ে। জোকটা সৃষ্টিকর্তা আর এক বান্দার আলাপচারিতে নিয়ে। জোকটা বাংলায় পড়িনি বলে অনুবাদ করে পোস্ট করলাম ফেবুতে।

জোকটা এমন-
বান্দা খোদাকে জিজ্ঞেস করলো, “হে পরোয়ার দিগার, আমার কিছু প্রশ্ন আছে?”
খোদা বললেন, “কর প্রশ্ন”।
বান্দা বললো, “আপনার কাছে ১ কোটি বছর মানে কতটুকু সময়?”
খোদা উত্তর দিলেন, “এই ধরো এক মিনিট!”
বান্দা আবার জিজ্ঞেস করলো, ” আর একশো কোটি টাকা মানে কতটাকা?”
খোদা ফুৎকার দিয়ে বললেন, “একশো কোটি? ও তো আমার কাছে এক টাকার সমান!”
বান্দা এবারে আর্জি পেশ করল তার, “হে আল্লাহ, আমাকে তাইলে একটাকাই দিন?”
খোদা কিচ্ছুক্ষণ ভেবে বললেন, “আচ্ছা, দিচ্ছি, তুমি এক মিনিট ওয়েট কর”।

অতন্ত নির্দোষ একটা কৌতুক। কিন্তু এটা পড়েই কয়েকজন বান্দার রিঅ্যাকশন হলো দেখার মতো। প্রথমে শাসালো দুএকজন পোস্টটা রিমুভ করার জন্য, কিছুক্ষণ পরই অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ইনবক্সে। গালির চোটে আমার প্রাণ যায় যায় অবস্থা! মনে মনে বললাম, এই রে বান্দাদের অনুভূতি খাড়া হয়ে গেছে!

সামান্য একটা কৌতুক সহ্য করার ক্ষমতা এদেশের মানুষের নেই, এরা কীকরে সেই চরম স্যাটায়ার সহ্য করবে? আর স্যাটায়ার বোঝার মত শিক্ষাদীক্ষা কি আছে?
সুতরাং কোন লেখক যদি ভুল করেও লিখে ফেলে এমন কিছু, তবে তার যে গর্দান যাবে এব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। কে হায়/ স্বেচ্ছায়/ কোপ খেতে ভালোবাসে!

ড্যান ব্রাউন বর্তমান থ্রিলার জগতের সবচেয়ে উজ্জল নক্ষত্র। তিনি তার এঞ্জেল অ্যান্ড ডেমনসে যেভাবে খ্রিষ্টধর্মকে ধুয়েছেন সেটা সেবইয়ের পাঠক মাত্রই জানে। কিন্তু কোন খ্রিষ্টান গিয়ে তার মুন্ডুপাত করে আসেনি (প্রাকটিকালি। মনে মনে মুন্ডুপাত করলে ক্ষতি নেই)। কোন একাডেমি এসে বন্ধ করে দেয়নি সে বইয়ের প্রকাশনী। তাই তিনি নির্ভয়ে লিখে গেছেন এরপরের বেস্টসেলার গুলো। আজ কোরানকে ভিত্তি করে কোন লেখক এমন কোন থ্রিলার লেখার কথা কল্পনাও করতে পারবে, যদি সে বেঁচে থাকতে চায়? লেখক জানে, তার মুন্ড আছে একটাই। সে লিখবে না।

গুরুচন্ডালি ইম্যাগে মলয় রায়চৌধুরীর গল্প পড়েছিলাম একটা। সেখানে তিনি ঈশ্বরকে পৃথিবীতে নামিয়ে সঙ্গম করিয়েছেন এক সন্তানহীনা রমনীর সাথে। তার উপর ৫৭ ধারা এসে ঠাডা ফেলেনি। কোন ঈশ্বরভক্ত এসেও বাড়ি অবরোধ করেনি তার। দিব্যি লিখে যাচ্ছেন এখনও। আর এদেশে কেউ লিখুক তো! দেখতে হবে না আর, ভাইজান, সোজা নরকের টিকেট হাতে ধরিয়ে দেবে।

অনেককে বাংলাদেশের সাহিত্য নিয়ে হাহুতাশ করতে শুনি, দেখি। আমিও করি মাঝেমাঝে। ভাল লেখা কোথায়? কোথায় মনে দাগ কেটে যায় এমন একটা গল্প, কোথায় মনে ধাক্কা দেয় এমন কোন উপন্যাস, কোথায় জীবনদর্শন পাল্টে দেয়ার মতো প্রবন্ধ? না, নেই। এমন বই লেখা হবে বাংলাদেশে, এমন আশাও করি না। তসলিমা নাসরিনের লজ্জা এখনো নিষিদ্ধ। (অবশ্য সেটা কোন মহান সাহিত্য এমনটাও মনে হয়নি)। সেখানে তিনি দেখিয়েছিলেন, হিন্দুদের উপর অত্যাচারের বাস্তব ও ভিতরের চিত্র- সেটা আতে লেগেছিল সরকারের, তারা ব্যান করেছে। বলেছে, এমনটা হয় না এই দেশে, এ নিয়ে লিখে মিথ্যাচার করেছেন তসলিমা। আচ্ছা ধরেই নিলাম, তখন তিনি বাড়িয়ে বলেছিলেন কিন্তু আজ তো সেটাই হচ্ছে আমরা দেখতে পাচ্ছি। আক্রমন হামলা থেকে একটা দিনও স্বস্তিতে নেই এদেশের হিন্দুরা। আজ সেটা সত্য- তবে আজও কেন সে বই নিষিদ্ধ? সরকারের মন মেপে, ভোট নষ্ট হচ্ছে কিনা সেদিকে খেয়াল রেখে লিখতে হবে? এদিকে সাম্প্রতি ‘নবি মোহাম্মদের তেইশ বছর’ নিষিদ্ধ করে বাংলা একাডেমি অশেষ নেকি হাসিল করেছে। রোদেলা প্রকাশনী বন্ধ! এবছর বইমেলাতে কি কোন প্রকাশনী মক্তচিন্তা বিষয়ক কোন বই ছাপতে চাইবে? কোন শক্তিমান লেখক, প্রতিষ্ঠিত লেখককে দেখিনি এর বিপক্ষে দাঁড়াতে। তাদের একজনও যদি বইমেলা বয়কট করার কথা একটাবার বলতো, তবে তাদের প্রতি সম্মানটা আমার হাজারগুন বেড়ে যেত। তবে যদ্দুর জানি, এরা কে কোন সাহিত্য পুরষ্কার পেল তাই নিয়েই ব্যস্ত। আব্দুল গাফফার চৌধুরী একবার নাকি বলেছিলেন, “এদেশে বুদ্ধিজীবি আছে নাকি? সব তো পাকিস্তানীরা ১৪ ডিসেম্বর মেরে খতম করে দিয়েছে।” খুব খারাপ বলননি তিনি।
আর এই নিষিদ্ধটিশিদ্ধ করার মাধ্যমে বাংলা একাডেমি কী প্রমাণ করতে চেয়েছে জানি না, তবে এটা ঠিকই জানি, যাদা প্রতিক্রিয়াশীল, তারা এখনও বাংলা একাডেমির কার্যকলাপকে কাফেরি বলে জানে, মানে। এতে করে বাংলা একাডেমি মুক্তচিন্তার পথটাই শুধু সাময়িকভাবে বন্ধ করতে পেরেছে, এই আর কী। আর শামসুজ্জামান খানের দৌড় জানা আছে। তিনি সমাজ সংস্কৃতি নিয়ে কয়েকটা প্রবন্ধ ছাড়া আর উল্লেখযোগ্য কী রচনা করেছেন, খুঁজে পাচ্ছি না আপাতত। আজ থেকে ১০০ বছর পর এই টাইপ বুদ্ধিজীবিকে প্রগতির বিপক্ষের কাতারে ফেলবে সবাই- স্টাম্পে লিখে দিতে পারি।
যতদিন ধর্মকে ভয় করে, সংস্কারকে ভয় করে, সরকার, আইন, সংবিধান- এদের কথা মাথায় রেখে লেখা হবে, ততোদিন আমাদের লেখকের কিবোর্ড থেকে কোন ভিঞ্চি কোড কিংবা শীর্ষ সম্মিলন আসবে না। এমন ম্যারম্যারে লেখাই আসবে, প্রাণহীন। চর্বিতচর্বন। বড়জোর কয়েকডজন “হলুদ হিমু কালো র্যাব” আসতে পারে। মোল্লার সার্টিফিকেট নিয়ে তো আর বিধ্বংসী গ্রন্থ লেখা যায় না। তবে হ্যাঁ, প্রেমের গল্প, উপন্যাস, ভ্যাজাইনার গন্ধভরা কবিতা- প্রতিবছর আসছে বই মেলায়, প্রচুর, এটা একটা ভাল খবর! আমরা না হয় সেগুলোই পড়ি।
ধুর, জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকছি বোধহয়।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১১ thoughts on “ধর্ম, কচকচানি, সাহিত্য ও কিছু প্রলাপ

  1. আমি বিধ্বংসী কিছু লিখবোনে,
    আমি বিধ্বংসী কিছু লিখবোনে, প্রচারণার দ্বায়িত্ব আপনি নিয়েন ভাই। নাময়াও নিজের বসাইয়া নিতে পারেন।

      1. একটা তো পড়ছিলেন ম্নে হয়, এন্ড
        একটা তো পড়ছিলেন ম্নে হয়, এন্ড দেন আই ডিসাইডেড টু কিক মাইসেলফ… এইটা দিব্যপ্রকাশ থাইকা আসবে এইবার। নবী রাসুল নিয়া আরেকটা প্রডিউস করছিলাম, সাহস পাইতেছি না…

  2. হে হে। কমেন্টটাও সেন্সরড মনে
    হে হে। কমেন্টটা সেন্সরড মনে হইতেছে না। সাাহস করে লিখছেন। ভাবুন বৌ দেখে ফেললে বলতে পারে, “তুমি এইটা বলতে পারলা? আমি তোমার লেখায় কাচি চালাই!”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 1