যে কারণে মাথাচাড়া দিচ্ছে উগ্রপন্থা

গুলশান হত্যাকাণ্ডের ঘটনা অনুমিত না
হলেও অকল্পনীয় ছিল না। গত সাড়ে
সাত বছরে বাংলাদেশে এমন অনেক
ঘটনা ঘটেছে যা এ ধরনের হত্যাকাণ্ডে
ইন্ধন যোগাতে সহায়ক ভূমিকা পালন
করতে পারে। বর্তমান সরকার রাষ্ট্রীয়
দমন-নিপীড়ন এবং বিরোধীদের প্রতি
অতি আগ্রাসী মনোভাব
বাংলাদেশে র্যাডিকালিজম বা
উগ্রবাদকে উস্কে দিয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এমন
পূর্বানুমান অনেক আগেই করেছেন। গত
অর্ধযুগের বাংলাদেশের পত্রপত্রিকা
ঘেঁটে দেখলে এর সত্যতা পাওয়া
যাবে। টিভি টকশোতেও আলোচকরা
বলেছেন, বিরোধীদের প্রতি
সরকারের কঠোর নীতি, বিচারবর্হিভূত
হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক নিপীড়ন, গুম-
খুন, বিনা অপরাধে কারাগারে আটক,
রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিদের লাগামহীন
বক্তব্য ইত্যাদি ঘটনা বাংলাদেশে
চরমপন্থা বা উগ্রবাদকে উস্কে দেবে,
দিচ্ছে।
এ কারণে গুলশানের ঘটনাকে
বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। হুট
করে কিছু মানুষ জঙ্গি-সন্ত্রাসী বা
ভায়োলেন্ট হয়ে হত্যাযজ্ঞ
চালিয়েছে ব্যাপারটা এমনও না।
গুলশানের ঘটনাকে বিচার করতে হলে
গত সাড়ে সাত বছরের (২০০৯ থেকে
বর্তমান) বাংলাদেশ পাঠ জরুরি।
কিভাবে একটি রাষ্ট্রে চরমপন্থা
মাথাচাড়া দিয়ে উঠে এসবের পাঠ ও
আলোচনা জরুরি। যখন রাজনৈতিক
আলোচনার সব দরজাগুলো খোলা
থাকে এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়াতে
সব দলের বা মতের মানুষ অংশগ্রহণ করতে
পারে তখন চরমপন্থী হয়ে ওঠার
সম্ভাবনা কম থাকে। কিন্তু
রাজনৈতিক অংশগ্রহণের এসব পথকে
যদি সংকুচিত করে ফেলা হয় এবং
যারা অংশগ্রহণ করতে চায় তাদের যদি
প্রতিক্রিয়া থেকে বাদ দেয়া হয়, তখন
তারা এটিকে অবমাননাকর হিসেবে
দেখে এবং এটি তাদের ক্রোধ ও
ঘৃণাকে বাড়িয়ে দেয়। আর শুধু দলগত
পরিচয়ের কারণে কেউ যদি
প্রত্যাখ্যাত হয় ক্রোধ আরও তীব্রতর হয়।
এসবই চরমপন্থাকে উস্কে দেয়।
এখন আমরা যদি গত সাড়ে সাত বছরের
বাংলাদেশ পর্যালোচনা করি
তাহলে কী দেখতে পাই? এ সরকার
ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তাদের
রাষ্ট্রীয় নীতি হয়ে দাঁড়ায় কিভাবে
বিরোধীদের মূলোৎপাটন করা যায়
তার ছক আঁকা। আর বিরোধী নির্মূল
করতে গিয়ে এমন কিছু নাই যে সরকার
করেনি। গত সাড়ে সাত বছরে কত শত
মানুষকে সরকার্ নির্বিচারে হত্যা
করেছে? কত মানুষকে গুম করেছে,
কতজনকে জেলে পাঠিয়েছে, কত মানুষ
পুলিশের ভয়ে নিজ বাড়িতে রাত্রি
যাপন করতে পারছে না, তার কোনো
ইয়াত্তা নেই।
স্রেফ সরকারের মতের বিরোধী
রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থক হলেই
তাকে ‘বন্দুকযুদ্ধ’নাম দিয়ে হত্যা করা
হবে? যে মানুষগুলোকে র্নিবিচারে
হত্যা করা হচ্ছে তারাওতো কোনো
বাবা-মায়ের সন্তান, কারো ভাই বা
কারো আত্মীয়। একটা রাষ্ট্রের
মূলনীতি যখন হয় বিরোধীদের অস্তিত্ব
মুছে ফেলা; তাদের রাজনৈতিক
অধিকার কেড়ে নেয়া; তাদেরকে
ভবঘুরে করে রাখা; তাদের ব্যবসা-
প্রতিষ্ঠানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও
তাদের সামাজিক মর্যাদা কেড়ে
নেয়া- এই পরিস্থিতিতে চরমপন্থা
মাথাচারা দিয়ে উঠবে সেটিই
স্বাভাবিক। কারণ, কোনো সুর্নিদিষ্ট
অভিযোগ ছাড়া শুধু রাজনৈতিক
প্রতিহিংসার শিকার হয়ে পুত্রের
সামনে পিতা খুন হলে, ভাইয়ের
সামনে ভাই খুন হলে; পুত্র ও ভাইয়ের
প্রকৃস্থ থাকার কথা না। তাদের মধ্যে
প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, সরকার
এবং একটি শ্রেণির প্রতি ঘৃণা তৈরি
হবে। তারা প্রতিহিংসা পরায়রণ হয়ে
উঠবে। তাদের মধ্যে উগ্রবাদ চেয়ে
বসবে। তখন তাদের কাছে
মানবিকবোধের চেয়ে ত্রাস সৃষ্টি
মাধ্যমে মানুষের জীবন কেড়ে নেয়াই
জীবনের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াবে।
যখন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ভেঙে
পড়ে; মানুষকে মত প্রকাশের সমান
সুযোগ দেয়া হয় না এবং রাজনৈতিক
অংশগ্রহণের আর কোনো সুযোগ থাকে
না তখন মানুষ উগ্রপন্থার দিকে ঝুঁকে
পড়ে।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের
যে চরমপন্থা মাথাচারা দিয়ে
উঠেছে তা যদি অভ্যন্তরীণ
উগ্রপন্থীদের দ্বারা সংঘটিত হয়ে
থাকে তাহলে তার লাগাম টেনে
ধরা অসম্ভব কিছু না। সরকার আন্তরিক
হলেই দেশে স্বাভাবিক অবস্থা
ফিরিয়ে আনা সম্ভব। কারণ, বর্তমান যে
রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে
তা বর্তমান সরকারেরই সৃষ্টি। বিরোধী
মত ও দলের প্রতি সরকারের আগ্রাসী
নীতি বাংলাদেশকে আজ এ পথে
নিয়ে এসেছে। এজন্য সরকারকেই
উদ্যোগ নিতে হবে। সব রাজনৈতিক
দলকে তাদের রাজনৈতিক অধিকার
ফিরিয়ে দিতে হবে। তাদের মত ও
পথকে শ্রদ্ধা করতে হবে। বিচারবহির্ভূথ
হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে হবে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “যে কারণে মাথাচাড়া দিচ্ছে উগ্রপন্থা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

79 + = 80