‘ফাঁসী আয়নাদেরই হয়’…আয়নাবাজিতে কি বলতে চাইলেন অমিতাভ রেজা?

দেশের বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে একবাক্যে রায় দেওয়া হয়েছে এই সময়ে তুমুল আলোচনায় থাকা ‘আয়নাবাজি’ চলচ্চিত্রে। ‘ফাঁসী আয়নাদেরই হয়’…. বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নির্দেশক সংলাপ বাস্তবতা বিজর্জিতি, বিভ্রান্তিকর এবং আপত্তিকরও মনে হয়েছে। একজন সিনিয়র রিপোর্টারকে দেশের বিচার ব্যবস্থা নিয়ে জ্ঞান দিতে গিয়ে এই সংলাপ উঠে এসেছে একজন দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকের মুখে। এই একটি সংলাপ পুরো চলচ্চিত্র নির্মাণে পরিচালকের অত্যন্ত দুর্বল হোমওয়ার্ক এবং তার দায়িত্বহীনতাকেও তুলে ধরে। খুবই চটুল সংলাপ পুরো চলচ্চিত্র জুড়েই। এ ধরনের একটা সংলাপ বেশ ভারিক্কি গলায় ওজনদার করে তোলার হাস্যকর চেষ্টাতেই ভয়ংকর দায়িত্বহীন একটা কাজ করে ফেলেছেন ছবির পরিচালক।

দেশের বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে একবাক্যে রায় দেওয়া হয়েছে এই সময়ে তুমুল আলোচনায় থাকা ‘আয়নাবাজি’ চলচ্চিত্রে। ‘ফাঁসী আয়নাদেরই হয়’…. বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নির্দেশক সংলাপ বাস্তবতা বিজর্জিতি, বিভ্রান্তিকর এবং আপত্তিকরও মনে হয়েছে। একজন সিনিয়র রিপোর্টারকে দেশের বিচার ব্যবস্থা নিয়ে জ্ঞান দিতে গিয়ে এই সংলাপ উঠে এসেছে একজন দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকের মুখে। এই একটি সংলাপ পুরো চলচ্চিত্র নির্মাণে পরিচালকের অত্যন্ত দুর্বল হোমওয়ার্ক এবং তার দায়িত্বহীনতাকেও তুলে ধরে। খুবই চটুল সংলাপ পুরো চলচ্চিত্র জুড়েই। এ ধরনের একটা সংলাপ বেশ ভারিক্কি গলায় ওজনদার করে তোলার হাস্যকর চেষ্টাতেই ভয়ংকর দায়িত্বহীন একটা কাজ করে ফেলেছেন ছবির পরিচালক।

‘ফাঁসী আয়নাদেরই হয়’ এই সংলাপটাকে দেশের বিচার ব্যবস্থার সার্বজনীন চিত্র হিসেবে তোলার চেষ্টা করেছেন সেটা এবং চরিত্রের সংলাপ উচ্চারণের সিকোয়েন্স থেকেই বোঝা যায়। রিপোর্টার রিপোর্ট দিয়েছেন, ‘নিরপরাধ আয়না প্রকৃত অপরাধী রাজনীতিবিদ নিজাম সাঈদ চৌধুরীর বদলি হিসেবে জেলে এসে এখন ফাঁসীর দড়িতে ঝোলার অপেক্ষায়, তার কাছে প্রমাণ আছে।’ সম্পাদক রিপোর্টারকে বলছেন, এ রিপোর্ট ছাপা অসম্ভব, এ রিপোর্ট ছাপলে তার চাকরি চলে যাবে। তখন রিপোর্টার বলছে, ‘কিন্তু আয়নার কি দোষ?’ তখন সম্পাদক অত্যন্ত রাগত স্বরে ভারী গলায় বেদ বাক্য শোনানোর মত করে উচ্চারণ করলেন ‘ফাঁসী আয়নাদেরই হয়।’ অর্থাৎ, দেশের বিচার ব্যবস্থার সার্বজনীন চিত্র বোঝাতেই এই সংলাপ দেওয়া হয়েছে। বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে এটি পরিচালক অমিতাভ রেজার সিদ্ধান্ত বা রায়ও বলা যায়। এর মধ্য দিয়ে জেল কর্তৃপক্ষকেও গুরুতর প্রশ্নে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে, এটাও বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

এই সংলাপের মধ্য দিয়ে পরিচালক বলে দিচ্ছেন বাংলাদেশে ফাঁসীর সাজা কার্যকর করার ক্ষেত্রে প্রকৃত অপরাধী নয় বরং অপরাধীদের বদিল হিসেবে যারা জেল খাটেন তারাই ফাঁসীতে ঝোলেন! অর্থাৎ, এটাও তার কাছে সার্বজনীন যে দেশে প্রভাবশালীদের ক্ষেত্রে কেউই জেলও খাটেন না, তারা প্রত্যেকেই আয়নার মত একটি চরিত্র বেছে নেন বদলি হিসেবে! বিচার ব্যবস্থার নানা দুর্বলতা নিয়ে সমালোচনা থাকতে পারে, কিন্তু দেশের বিচার ব্যবস্থা নিয়ে এত গুরুতর অভিযোগ করার মত দায়িত্বহীন কাজ একজন চলচ্চিত্র পরিচালক করতে পারেন না। তার এই সংলাপ সার্বজনীন বাস্তবতারও বিপরীত। দু’একটি ব্যতিক্রম ঘটনা ঘটলেও ঘটতে পারে। কিন্তু সার্বজনীনভাবে প্রকৃত অপরাধীরই ফাঁসীর সাজা কার্যকর হয়, শুধু আয়নাদেরই হয় না।

আসলে যে সিকোয়েন্সে এই সংলাপটি এসেছে, সেখানকার বাস্তবতায় রিপোর্টারের প্রকৃত প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল, ‘সব প্রমাণ থাকার পরও রিপোর্ট ছাপা হবে না কেন?’ আর সম্পাদকের উত্তর হতে পারত, ‘প্রমাণ থাকলেও সব রিপোর্ট ছাপা যায় না, এটাই বাস্তবতা’। সাধারনত রিপোর্ট ছাপা নিয়ে বার্তাকক্ষে এ ধরনের বিতর্কই হয় রিপোর্টার এবং সংবাদ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা সম্পাদক কিংবা বার্তা সম্পাদকের মধ্যে। কিন্তু আয়নাবাজির পরিচালক অমিতাভ রেজা প্রকৃতপক্ষে সংবদপত্রের বার্তাকক্ষে সাংবাদিকদের কাজের ধরন, প্রতিবেদন নিয়ে বিতর্কের বিষয়গুলো সম্পর্কে একেবারেই জানেন না। তিনি তার অজ্ঞতাই তিনি রিপোর্টার এবং সম্পাদক চরিত্রের মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন। যে কারনে অযাচিতভাবে রিপোর্টার এবং সম্পাদক চরিত্রের মুখ দিয়ে বাস্তবতা বিবর্জিত সস্তা সংলাপ আউড়ে দিয়েছেন। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে দেশের বিচার ব্যবস্থা নিয়ে এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন সংলাপের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।

ফ্রানৎস কাফকা ‘দ্যা ট্রায়াল’ বা বিচার গ্রন্থটি লিখেছিলেন ১৯১৪ সালে। জার্মানীতে বড় হওয়া আইনের ছাত্র লেখক কাফকা উপনস্যাসটিতে কয়েকটি চরিত্রের মধ্য দিয়ে প্রায় পুরো ইউরোপের তখনকার বিচার ব্যবস্থার দুর্দশার চিত্রই তুলে এনছিলেন। কিন্তু তিনিও বিচার ও প্রশাসন ব্যবস্থা নিয়ে এত ভয়ংকর প্রশ্ন তোলেননি। লেভ তলস্তয় তার ‘রেজারেকশন’ বা পুনরুজ্জীবন উপন্যাসেও শত বছর আগের রাশিয়ার বিচার ব্যবস্থায় বিচারহীনতার দীর্ঘ চিত্র তুলে ধরেছিলেন। তিনিও এত ভয়ংকর প্রশ্ন তোলেননি বিচার ব্যবস্থা নিয়ে। কারন তারা দায়িত্বশীল লেখক ছিলেন। তারা উপন্যাসে বাস্তবের চরিত্র তুলে আনার বিষয়টি প্রধান হিসেবে বিবেচনা করেছেন। এ কারনে যেসব চরিত্র তুলে ধরবেন তাদের প্রতিদিনের জীবন চিত্র ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। যে কারনে চরিত্র চিত্রায়ন হয়েছে একেবারে নিখুঁত। চলচ্চিত্রে বাস্তবের চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলতে দীর্ঘ হোম ওয়ার্ক করতে হয় নির্র্মাতাকে। যেমন মানিক বন্দ্যেপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাস চলচ্চিত্রয়াণের সময় কুবের মাঝি চরিত্রে অভিয়নের আগে অভিনেতা রাইসুল ইসলাম আসাদ কে মাঝিপাড়ায় প্রায় এক মাস কাটাতে হয়েছিল। নির্মাতা গৌতম ঘোষ এভাবেই তার চলচ্চিত্রের অভিনেতাদের বাস্তবের চরিত্র অনুযায়ী তৈরি করেছিলেন।

আসলে চলচ্চিত্রটি নির্মাণের আগে অমিতাভ রেজা প্রয়োজনীয় হোম ওয়ার্ক করেননি। সেটা আয়নাবাজির রিপোর্টার চরিত্র চিত্রায়নেও ফুটে উঠেছে। সাংবাদিকরা মদ্যপান করেন না তা বলব না। অন্যান্য পেশার মানুষের যেমন করেন, তেমনি সাংবাদিকরাও নানা পার্টিতে, আড্ডায় মদ্যপান করতেই পারেন। কিন্তু রিপোর্টার অফিসের ভেতরে সম্পাদকের টেবিলে বসে তর্ক করতে মদ খাচ্ছে, এমন দৃশ্য আমি জানি না, আমাদের প্রজন্মের আগে কখনও ছিল কি’না। কিন্তু আমার সাংবাদিকতার প্রায় ২০ বছরের ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, এ প্রজন্মের কাউকে এ ধরনের কান্ডজ্ঞানহীন কাজ করতে দেখিনি। আয়নাবাজিতে অনেক পেশার অনেক চরিত্র, কিন্তু মদ খায় শুধু রিপোর্টার এবং আর এক লম্পট নারী নির্যাতক ! লম্পট পার্টিতে গিয়ে মদের গ্লাস নিয়ে নেচে নেচে মদ খান, আর সকালে উঠে রিপোর্টারের মদ্যপান দিয়ে দিন শুরু হয়, এরপর স্থান, কাল পাত্র বিবেচনা না করে রিপোর্টার শুধু মদ খেতেই থাকে! তার আয়নাবাজির চোখে মানে বাংলাদেশে সাংবাদিক ছাড়া আর কোন পেশাজীবী কেউ মদ খায় না! আর মদ খায় শুধু লম্পটরা! অমিতাভ রেজা বাংলাদেশে মদ্যপানের শ্রেণী- স্তরভেদ ভাল করে জানেন না, এটা বিশ^াস করা সত্যিই কঠিন!

অমিতাভ রেজার উচিত ছিল হোম ওয়ার্ক হিসেবে একবার ঢাকার বড় বড় ক্লাব, বার এবং ওয়্যার হাউজগুলোর ক্রেতা তালিকাটি একেবার দেখে নেওয়া। এমনও হতে পারে বিব্রত হওয়ার ভয়ে তিনি সেই তালিকা দেখতে চাননি। অন্য যে কোন পেশাজীবীর চেয়ে দু’পয়সার রিপোর্টারের উপর তাই মদ্যপানের সব দায় চাপিয়ে ‘সবজান্তা শমশের’ সেজেছেন! পরিচালক সাহেব একজন ক্রাইম রিপোর্টারের কাজ এবং অনুসন্ধানের ধরন সম্পর্কেও জানেন না। এ কারনে তিনি হাস্যকরভাবে দেখিয়েছেন রিপোর্টার গোয়েন্দাদের মত আয়নাকে অনুসরণ করছে। এমনকি ধমক দিয়ে বলছে, ‘তথ্য না দিলে তথ্য কিভাবে আদায় করতে হয় সেটা জানা আছে’।

পরিচালক সাহেবের জানা উচিত ছিল একজন ভাল এবং সিনিয়র রিপোর্টার এভাবে ধমক দিতে পারেন না, কিংবা দেন না। কারন এটা রিপোর্টারের স্বাভাবিক ভাষা নয়। একজন অনুসন্ধানী রিপোর্টার প্রথমেই মূল মূল উপলক্ষ কিংবা অভিযুক্ত চরিত্রের কাছে যান না। চারপাশের সূত্র থেকে তথ্য প্রমাণ সংগ্রহ করেন, তারপর চরিত্রের কাছে যান তার কাছ থেকে বক্তব্য সংগ্রহের জন্য। কিন্তু আয়নাবাজির রিপোর্টার অনুসন্ধান শুরুই করছেন তার অনুসন্ধানের মূল উপলক্ষ্য আয়নার কাছে! রিপোর্টার অন্য কোন সূত্রই ব্যবহার করছেন না। তথ্য সংগ্রহের আর কোন কৌশলই ব্যবহার করছেন না। শুধু মোটর সাইকেল নিয়ে আয়নাকে দিনের পর দিন অনুসরণ করছেন, ধমক দিচ্ছেন! এক পর্যায়ে অবস্থাটা এমন যে আয়না সাহেব রির্পোটারের অত্যাচারে বাসা বদল করলেন!

আয়নার নায়িকার কাছে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে দেখা গেল রিপোর্টার নিজেই গড়গড় করে আয়নার ইতিহাস শুনিয়ে দিয়ে এলেন। এখানে সিকোয়েন্সটাও অত্যন্ত হাস্যকর, এফডিসি’র সস্তা ছবির মত। ঝন্টু-মিন্টু আমলের ছবির নায়কের মত রিপোর্টার উঠে গিয়ে ঘাড় উঁচু করে বেশ ভারী গলায় সংলাপ দিচ্ছেন আয়না আর তার মায়ের করুন অতীত সম্পর্কে। পরিচালক সাহেব যদি একটু সংবেদনশীল হতেন, তাহলে এই সিকোয়েন্সটা আরও সুন্দর করতে পারতেন। রিপোর্টার তার ডায়েরি বা নোট দেখে ঘটনাটা বলতে পারতেন। সেটা আরও বাস্তবসম্মতও হত। আসলে বাস্তব পর্যবেক্ষণ কিংবা হোম ওয়ার্ক কোনটাই না থাকার কারনে পরিচালক রিপোর্টার চরিত্রটাকে প্রকৃত অর্থে নির্মাণ করতে পারেননি। এ রকম ব্যতিক্রমী সাংবাদিক চরিত্র থাকতেই পারে। কিন্তু আয়নাবাজিতে এই চরিত্রের উপস্থাপন সাংবাদিকতার প্রতীক হিসেবেই। সেখানেই আমার আপত্তি। অমিতাভ রেজার মনেই হয়েছে রিপোর্টারদের জীবন মানেই একেবারে এলোমেলো অগোছালো ছন্নছাড়া জীবন, বউ তাকে ডিভোর্স করে চলে যায়, বাচ্চাকে নিয়ে দূরে থাকতে চায়! অবাক লাগে, অমিতাভ রেজা দীর্ঘদিন এই গণমাধ্যমের সঙ্গেই কাজ করছেন, অথচ রিপোর্টারদের সম্পর্কে, সাংবাদিকতা সম্পর্কে তার এই অজ্ঞতা, ভাবাই যায় না!

আয়নাবাজিতে একটা বিষয়ে পরিচালক বেশ ভাল কৌশল নিয়েছেন। সমাজতন্ত্রী এবং কমিউনিস্টদের চরিত্র হননে তিনি ভাল মুন্সীয়ানা দেখিয়েছেন। চট করে এটা ধরতে পারা বেশ কঠিন। এই ছবির রাজনীতিবিদ চরিত্র নিজাম সাঈদ চৌধুরী আয়নাকে তার পক্ষে জেল খাটাতে রাজী করাতে তার সংলাপে বলছেন, ‘অনেকের চোখে এটা খুন মনে হতে পারে। কিন্তু আমার কাছে এটা আদর্শ রক্ষার লড়াই। ইয়েস, একজন স্কুল শিক্ষককে খুন করা হয়েছে।’ মানুষকে পথে রাখার জন্য মাঝে মাঝে কখনও কখনও আইনকে নিজের হাতে তুলে নিতে হয়। হিটলার, মুসোলিনি, লেলিন এরা সবাই করেছে।’ ব্যাপারটা খেয়াল করুন, নাৎসী নেতা হিটলার মুসোলিনির সঙ্গে রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রাণ পুরুষকে এক করে দেখালেন পরিচালক। যারা ইতিহাস জানেন না, তাদের কাছে এই সংলাপের পর হিটলার, মুসোলিনি, লেলিন একই ধরনের চরিত্র মনে হবে। পরিচালক নেহায়েত ভদ্রলোক, তাই সরসারি স্ল্যাং ব্যবহার না করে বেশ কৌশলে কমিউনিস্টদের গালিটা দিয়ে দিয়েছেন। অমিতাভ রেজা হিটলার, মুসোলিনি, লেলিনের পার্থক্য জানেন না, এটা বিশ্বাস করার কোন ভিত্তি নেই।

পরিচালক সচেতনভাবে এটা করলেও সেই হোম ওয়ার্কের অভাবে বাকী অংশটা গোঁজামিল দিয়ে ফেলেছেন। নিজাম সাঈদ চৌধুরীর সংলাপ শুনে বোঝা যায়, তিনি বামপন্থী আন্ডারগ্রাউন্ড কোন গ্রুপের নেতা। নির্বাচনকে সামনে রেখে বড় বানিজ্য করতে চান। এ কারনেই তিনি নির্বাচনের আগে জেলে যেতে চান না। কিন্তু পরেই দেখানো হচ্ছে রিপোর্টার চরিত্র টিভিতে খবর দেখছেন। সেখানে খবরে বলা হচ্ছে নিজাম সাঈদ চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হয়েছে তার কার্যালয় থেকে, নির্বাচনের আগে দলের ক্ষেত্রে বড় প্রভাব পড়তে পারে। দলের সভাপতি কোন মন্তব্য করেননি। বাংলাদেশে কমিউনিজমে বিশ^াসী অনেক দল আছে, কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে কোন দলই এখন পর্যন্ত কোন নির্বাচনেই প্রভাবশালী হতে পারেনি, এটা সবাই জানে। তাহলে পরিচালক কোন দেশের বাস্তবতার কথা বলছেন, প্রকৃতপক্ষে কি বোঝাতে চেয়েছেন?

পুরো ছবিটার সংলাপ এবং সিকোয়েন্সে আরও অনেক গোঁজামিল আছে। মাঝখানে আয়নাকে হাসাপাতালে নিয়ে এসে ড্রেসিং করে জেলে পাঠানো এবং একেবারে শেষে আয়নার জেল থেকে পালানোর সিকোয়েন্সগুলো একেবারেই বিশ^াসযোগ্য হয়নি। বাবার সঙ্গে মেয়ের সংলাপ এবং হলিউট স্টুডিও’র সামনে পুলিশ অফিসারের সংলাপ এমনকি রাজনীতিবিদ নিজাম সাঈদ চৌধুরীর সংলাপও খুব বেশী কেতাবী মনে হয়েছে। বিশেষ করে পুলিশের সংলাপ এফডিসি’র সেই ঝন্টু-মিন্টু-ছটকু যুগের সিনেমার মত সংলাপ হয়ে গেছে।

তবে আয়নাবাজিতে প্রশান্তির কিছু উপাদান কম হলেও আছে। এমনি এমনি তে আর একটা ছবি দর্শকপ্রিয় হয় না।শহুরে যাপিত জীবনের প্রচ্ছায়া ঘিরে আছে পুরো ছবি। দর্শকের সঙ্গে নিবিড় হওয়ার যোগসূত্রটাও এখানে। কিছু কিছু দৃশ্য যেমন সদরঘাটে লঞ্চের শব্দে বুড়িগঙ্গায় ভোর, চঞ্চল ও নাবিলার রোমান্টিক দৃশ্য, হালকা বৃষ্টি¯œাত আবহাওয়ায় চেনা ঢাকা শহরকেও দেখা গেছে অন্য এক প্রশান্তিরে দৃষ্টিতে। চঞ্চল চৌধুরীর কল্পনায় কানে হাত লাগিয়ে মোবাইলে কথা বলা খুব ভাল লেগেছে। বাচ্চাদের অভিনয়ের স্কুলের দৃশ্যগুলোও দারুন দাগ কেটেছে। আমি চলচ্চিত্র বোদ্ধা নই। তবে একটা সময়ে চলচ্চিত্র সংগঠনে কিছুদিন যুক্ত থাকার কারনে যতটা বুঝি আয়নাবাজিতে ক্যামেরার কাজটা ভাল হয়েছে কিন্তু ‘ফিল্মিক’ হয়নি। তবে আয়নাবাজি’র সম্পাদনায় সেই টেম্পোটা ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। যদিও বেশ কিছু স্থানে শব্দের ব্যবহার সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না।

সবচেয়ে বড় পাওয়া হচ্ছে হচ্ছে চঞ্চল চৌধুরীর অসাধারন অভিনয়। এখানে একাই তাকে অনেকগুলো চরিতে অভিনয় করতে হয়েছে। প্রতিটি চরিত্রে অভিনয়ের ক্ষেত্রে তিনি যত্নবান। পরিচালকের ভাগ্য বলতে হবে চঞ্চল চৌধুরীর মত একজন অভিনেতাকে প্রধান চরিত্রে পাওয়া। এমনকি চঞ্চল চৌধুরীর অনবদ্য অভিনয়ের জন্য নায়ক চরিত্র নিয়ে পরিচালকের হোম ওয়ার্ক না থাকার দুর্বলতাটাও বোঝা যায়নি।

এ প্রজন্মের পরিচালকদের একজনের চলচ্চিত্র আমাকে মুগ্ধ করেছিল। বিশেষ করে চলচ্চিত্রটির অসাধারন নির্মাণ শৈলী। সেটি গিয়াসউদ্দিন সেলিমের মনপুরা। সেই মনপুররার কাহিনীর খুব দূরান্বয়ী একটা ছাপ আয়নাবাজিতেও পেলাম। চঞ্চল চৌধুরী মনপুরারও নায়ক ছিলেন বলেই হয়ত এ ধারনটা মাথায় আসছে। মনপুরাতেও একজনের খুনের দায় নিয়ে ফেরার হয়ে নির্জন দ্বীপে বাস করতে হয় নায়ক চরিত্রের চঞ্চল চৌধুরীকে। সেখানেও নায়িকা কে নিয়ে যেদিন দূরে কোথাও চলে যাওয়ার কথা তার আগের রাতে পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যায়। নায়িকা নদীর পাড়ে একা দু:খ ভারাক্রান্ত। আয়নাবাজিতেও নায়িকার সঙ্গে সিলেট যাওয়ার আগের দিন আনয়াকে তুলে নেওয়া হয়। নায়িকা একা কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে। মনপুরার শেষ দৃশ্যগুলোও আলোড়িত হয়েছে নায়ক চঞ্চল চৌধুরীর ফাঁসীর মিথ্যা খবরকে কেন্দ্র করে, আয়নাবাজির শেষ দৃশ্যেও সেই ফাঁসী নিয়েই শিহরন। যদিও এখানে গল্পটা একেবারেই আলাদা।

কেউ কেউ বলার চেষ্টা করেছেন কোরিয়ার টাম্বলউইড(২০১৩) ছবির কাহিনী নকল করে আয়নাবাজি বানানো হয়েছে। আমি কোরিয়ার ছবিটা অনেক কষ্টে যোগাড় করে দেখলাম। আমি সমালোচকদের অনুরোধ করব, ভুল তথ্য দিয়ে কিংবা অযৌক্তিকভাবে একটা দায় চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। টাম্বলউইড ছবির নায়কও দাগী আসামীদের বদলি হিসেবে জেল খাটেন, আয়নাবাজির নায়কও তাই। এটুকুই মিল। এর বাইরে টাম্বলউইডের গল্প একেবারেই পৃথক। নকলেরও একটা সংজ্ঞা আছে, নকল কোনটাকে বলা হবে তারও কিছু নির্ধারক আছে। সেই নির্ধারকগুলো যেমন সিন, সিকোয়েন্স, ডিটেইলস, ন্যারেটিভস সবকিছুই দু’টো ছবির ক্ষেত্রে আলাদা। কোন অর্থেই টাম্বলউইডের নকল বলা যায় না আয়নাবাজিকে। একটা ছবির সঙ্গে আর একটা ছবির কাহিনীতে সামান্য মিল থাকলেই নকল বলাটা সমালোচকদেরও অজ্ঞতা প্রমাণ করে।

টাম্বলউইড নির্মাণ শৈলীর দিক থেকে অকে উন্নত ছবি। অমিতাভ রেজাও তার প্রথম ছবি দারুন ব্যবসা সফল করে প্রমাণ করেছেন তিনি চাইলে আরও বড় কিছু করার ক্ষমতা রাখেন। তার প্রতি অনুরোধ ভবিষ্যতে ছবির কাজে হাত দেওয়ার আগে সার্বিকভাবে হোমওয়ার্কটা ভালভাবে করে নেবেন, তাহলে ব্যবসা সফলের পাশপাশি সত্যিকারের ভাল ছবিও নির্মাণ সম্ভব হবে।তখন পরিচালক শব্দের পরিবর্তে আপনার নামের আগে তখন নির্মাতা শব্দটি ব্যবহারেও কোন সংকোচ থাকবে না।

রাশেদ মেহেদী, বিশেষ প্রতিনিধি, সমকাল

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “‘ফাঁসী আয়নাদেরই হয়’…আয়নাবাজিতে কি বলতে চাইলেন অমিতাভ রেজা?

  1. আয়নাবাজি নিয়ে যতগুলো রিভিউ এই
    আয়নাবাজি নিয়ে যতগুলো রিভিউ এই পর্যন্ত পড়েছি, তারমধ্যে আপনার এই রিভিউ পড়ে রিভিউর প্রকৃত স্বাদ পেলাম।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

80 + = 83