সাঁওতাল সমস্যা: বিপিএল ঝান্ডার নিচে

আগামীকাল সকালেই পত্রিকা ঘরে ঘরে পৌঁছে যাবে সবার। শিরোনামে কী থাকবে? নিশ্চয়ই সাওতাল ইস্যু নিয়ে কিছু থাকবে না। খেলার পাতায় বড় করে মাশরাফি সাকিবের পিক আসতে পারে। বিপিএল জমে উঠেছে বোধহয়, না?


হাঁসুলি বাঁকের উপকথা পড়েছিলাম অনেক আগে। যখন পড়েছিলাম, তখন মোটেও জানতাম না, তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায় এত বড় লেখক। তখন আমার কাছে লেখক বলতে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়- তার অদ্ভুতুড়ে সিরিজ তখন গিলতাম। তবে তারাশঙ্কর যে যে-সে লেখক নন সেটা বুঝতে আমার মোটেও সময় লাগেনি। হাঁসুলি বাঁকের উপকথা পড়েই তার সম্পর্কে আমার ধারণা পাল্টে যায়। (ধারণা পাল্টে যাওয়া বলাটা ঠিক হচ্ছে না, কারণ তার সম্পর্কে কোন ধারণাই ছিল না, পাল্টাবে কী!)

হাঁসুলি বাঁকের উপকথা কাহার’দের জীবন নিয়ে লেখা এক মহাকাব্যিক উপন্যাস। কাহারদের জীবন, তাদের সংগ্রাম, তাদের আদিম সংস্কৃতি, রীতি, নতুন শতকের প্রভাবে তাদের জীবনের রুপান্তর- এসবই উঠে এসেছে সে উপন্যাসে।

কাহারেরা শুদ্র। তাদের পেশা মূলত পাল্কি বহন করা, কিন্তু কালের বিবর্তনে তাদের সরে আসতে হয় সে পেশা থেকে। এরপর কৃষিকাজ, অন্যের জমিতে কামলা দেয়া এসবই হয়ে উঠে তাদের জীবন ধারনের মূল পন্থা। কিন্তু অন্যের জমিতে কাজ করতে গিয়ে তারা দেখতে পায়, মালিক তাদের ঠিক বিশ্বাস করছে না, সরু চোখে দেখছে। এমনকি মারও খাচ্ছে তারা মাঝেমাঝেই ভূস্বামীদের হাতে। ঘৃণার স্বীকার হচ্ছে কাহারেরা। গল্পের শেষে দেখা যায়, কারখানা গড়ে উঠছে একটা। কাহারেরা যোগ দিচ্ছে দলে দলে সেখানে। তাদের পৈত্রিক পেশা বাদ দিয়ে নতুন জীবনের আশায় পা রাখছে আধুনিক বিশ্বে। কারখানায় যোগ দেয়ার পর সে জনগোষ্ঠীর কী হয় সেটা জানিয়ে দেয় না তারাশঙ্কর আমাদের। কিন্তু আমরা বুঝে যাই কী হবে এরপর। আমরা বুঝে নেই, এই কারখানায় যোগ দেয়ার মাধ্যমেই ধ্বংস হবে একটা জনগোষ্ঠীর স্বাতন্ত্র- তারা মিশে গিয়ে হারিয়ে যাবে সংখ্যাগুরুর মাঝে।

শান্তি নিকেতনের পাশে কিছু শুদ্র গোষ্ঠি নাকি ছিল। (এখনো আছে হয়তো।) সেখানে নাকি প্রায়ই যেতেন তারাশঙ্কর। কথা বলতেন তাদের সাথে। নোট করতেন খাতায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু পেলে। সেসব নিয়ে অবশ্য হাসাহাসি করার লোকের অভাব ছিল না। তারাশঙ্কর সে হাসাহাসিকে আমলে নিলে নিঃসন্দেহে আমরা হাঁসুলি বাঁকের উপকথার মত মাস্টারপিস পেতাম না।

যাক গে……
আজ কাহারেরা নেই। অন্তত আমি জানি না, তারা কোথাও আছে কিনা। হারিয়ে গিয়েছে বলা যায়। কিন্তু সাওতালেরা আছে। আছে মারমা চাকমা সহ আরো কিছু আদিবাসীগোষ্ঠী। কিছুদিন আগেও আমি একজনের সাথে এই সব অবাঙালিদের কী বলে ডাকা হবে সে নিয়ে তর্ক করেছি। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী না আদিবাসী। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বললে তারা যে সংখ্যালঘু এটা যেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া হলো। অন্যদিকে আদিবাসী বললে, তারা যে বহুকাল আগে থেকেই এই ভূভাগে বাস করে আসছে, এ স্বীকৃতিটা দিয়ে দেয়া গেলো। আদিবাসী বলার পক্ষেই ছিলাম তাই।

কতো ছোট বিষয় নিয়ে ছিল সে আলোচনা, বিতর্ক!
আর মাত্র কিছুদিনের মধ্যেই আজ সেসব বিষয় যেন অমূলক মনে হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন, যেখানে এইসব জনগোষ্ঠিকে দেশে থাকতেই দেয়া হচ্ছে না, সেখানে তাদের কী বলে অড্রেস করা হবে, এটা নিয়ে কথা বলাটা বাতুলতা। আজ সাওতালদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে।তাদের থাকার কোন জায়গা নেই। খোলা আকাশের নিচে বসে আছে তারা। সরকার তাদের ত্রাণ দেয়ার চেষ্টা করেছে। তারা নেয়নি। তারা জানে ত্রাণে তারা ঘরবাড়ি পাচ্ছে না এটলিস্ট। চিকা মেরে হাত গন্ধ করবে কেন তারা?

কিছুদিন পর চাকমা মারমাদের অবস্থা এমন হবে। পুড়িয়ে দেয়া হবে বাড়িঘর। তাদের হয় দেশছাড়া করা হবে নয়তো এদেশেই থেকে তারা অত্যাচারিত হতে হতে মরবে। যেখানে হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দির ভাঙ্গায় এ পর্যন্ত কিছু হলো না, সেখানে এরা তো কজন সাওতাল। এদের পিছনে তো কেউ নেই!

আগামীকাল সকালেই পত্রিকা ঘরে ঘরে পৌঁছে যাবে সবার। শিরোনামে কী থাকবে? নিশ্চয়ই সাওতাল ইস্যু নিয়ে কিছু থাকবে না। খেলার পাতায় বড় করে মাশরাফি সাকিবের পিক আসতে পারে। বিপিএল জমে উঠেছে বোধহয়, না?

আমার কেন জানি মনে হয়, মিডিয়া যেভাবে বিপিএলকে কাভার করছে, তার অর্ধেকও যদি নাসিরনগরের মানুষগুলোর জন্য করতো বা করতো এই নির্যাতিত সাওতালদের জন্য, তাহলে হয়তো চিত্রটা অন্যরকম হতো। কাহারদের মত হয়তো সাওতালদের হারিয়ে যেতে হতো না।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “সাঁওতাল সমস্যা: বিপিএল ঝান্ডার নিচে

  1. চাকমা মারমারা এরচেয়ে ভয়াবহ
    চাকমা মারমারা এরচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার শিকার হইছে। কাপ্তাই লেক দেখছেন? গেছেন কখনো? ওইটার তলায় আছে পার্বত্য অঞ্চলের অন্যতম বৃহত্তম জনপদ। সেইসব ইতিহাস বাঙ্গালীরা কয়জন জানে?

    আপনি পাথরযুগে পইড়া আছে উৎস। আপনি ব্লগার হইতে পারবেন না… 😉

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

90 − = 80