যে রোদে সব পুড়ে যায় (২য় পর্ব)

সাত-পাঁচ ভেবে পায়ে হেঁটেই যেতে হয়। শহরের শেষ মাথাগুলো খুব সম্ভবত এরকম আবর্জনার স্তূপই হয় সবসময়। মধ্যবিত্ত সমাজের এই একটা ব্যাপার খুব ভালো মনে হয়। এর গিরিগিটীর মতো রঙ পাল্টাতে বেশ পটু। প্রচণ্ড রোদে কাউকে আর রাস্তায় ভণিতা করতে হচ্ছেনা। নির্বিকারে পচা-গলা মাড়িয়ে যাওয়া যাচ্ছে, নয়তো নাক সিটকানোর একটা অভিনয়ের মধ্যে থাকতে হতো। মধ্যবিত্তরা এইসব ছোটখাটো কাজের মাধ্যমে নিজেকে সমাজের অন্যস্তর থেকে আলাদা করে ফেলতে পছন্দ করে। প্রলেতারিয়েত দের কাছ থেকে নিজেকে আলাদা করে পেটি বুর্জোয়াদের মতো বেঁচে থাকার একটা অতল ইচ্ছা। যদিও মাঝে মাঝে এই ভয়াবহ প্রতারণা থেকে বের হয়ে যেতে ইচ্ছে করে তবুও অন্য কোথাও যেখানে টাকা সমাজের একমাত্র সম্মান নির্ধারক হিসেবে টিকে থাকে, খুব সম্ভবত সবখানেই; সেই জায়গাগুলোর জন্যই এইসব। তাই শূন্য পকেটেও নিজের সম্মান ধরে রাখাটা মুখ্য হবার পর পুরনো চামড়ার চটিজুতো বেরুবার সময় একটুখানি থু থু দিয়ে চকচকে করে নিতে হয়। অথবা মুচিকে বলতে হয় সেলাইটা এমনভাবে করতে যাতে বাইরে থেকে তা দেখা না যায়, যদিও সোলের তলায় পেরেকগুলো বারবার পায়ে বিঁধে বিঁধে তার শ্রেণীসংগ্রামের কথা জানিয়ে দেয়।

ধীরে ধীরে আরও চড়া হয় রোদ। তিন মাস আগে কেনা টি শার্ট টি রোদে পুড়ে যেতে চায়। প্রাণপণে তাই শরীর বাঁচিয়ে চলতে থাকে সবাই। শরতের এমন অদ্ভুত আচরণে যেন গোটা শহর হতবিহবল। অন্য সময়ে ১৫ টাকায় এক বোতল পানি কিনে খাওয়াটা অতি স্বাভাবিক হলেও এখন আর তা স্বাভাবিক না। হয়ত ব্যাপারটা এমনি হবার কথা ছিল। জন-মানুষহীন রাস্তায় তার ১ বেলার খাবারের মূল্যে কেবল পানি খাওয়াটা অযাচিত হয়ে পড়ে। এখানে তার নিজেকে আলাদা করে ফেলার মতো কোন প্রতিযোগী নেই। যেখানে প্রলেতারিয়েতের ছিটেফোঁটা নেই সেখানে পেটি বুর্জোয়া হবার অভিনয় টা শুধুই অর্থের অপচয় বলেই ধরে নেয়া যেতে পারে। বরং এক্ষেত্রে ৩০ টাকা অনেক মূল্যবান হয়ে দাঁড়ায়। তাই রাস্তার পাশে কাজের বসে থাকা ভ্রাম্যমাণ রুটি-কলা বিক্রেতার খাবারও নেহায়েত খারাপ মনে হয়না কারও।

তিনজনে মিলে ছয়-সাত গ্লাস পানি খাবার পরে মনে হয় কয়েকটি সিগারেটও কিনে নেয়া যেতে পারে। উজ্জ্বল কিংবা অনিক কেউই মানব্যাগ নিয়ে আসেনি। পকেটের এমন আকস্মিক শূন্যতায় উজ্জ্বলের ক্ষুধাটা যেন আরও মোচড় দিয়ে উঠে। একটা ড্রাইকেইক এর পর দ্বিতীয়টা বাহুল্যতা হলেও খেতে খুব দ্বিধা করেনা সে। ক্ষুধা ব্যাপারটা যে ছোঁয়াচে এটা বুঝতে অনিক কিংবা সাইরাস কারও দেরী হয়না। শুধু হাতে টাকাটা থাকলে ক্ষুধাটা তেমন আর চেপে বসেনা এই যা। সবার খাওয়া শেষে শেষ পানি কেনার টাকাটাও যখন ফুরিয়ে যায় তখনি কেমন এক বিষণ্ণতা নেমে আসে হঠাত। এই বিষণ্ণতা কাটিয়ে ওঠা খুব জরুরী হয়ে পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলির কথা মনে করার চেষ্টা করে অনিক। সেই সময়, যখন টাকাটা অতটা সম্মানবর্ম হয়ে ওঠেনি তখন এইভাবে কাটিয়ে দেয়া যেত দিনের পর দিন। অন্তত মাসের শেষের দিনগুলো যখন পকেটে কেবল সস্তা সিগারেটের টাকাটা খুব হাতড়ে খুঁজে পাওয়া যেত।

পড়াশুনা শেষ করে একটা ভালো চাকরী বেঁচে থাকার জন্য যতোটা জরুরী হয়ে পড়ে তার চেয়ে বেশী জরুরী হয়ে পরে সামাজিক ভাবে টিকে থাকার জন্য। পুঁজিবাদী সমাজ ব্যাবস্থায় মধ্যবিত্তরা শিক্ষাকে বুর্জোয়া হবার একটা সরল যন্ত্র হিসেবেই দেখতে পছন্দ করে। সেই যন্ত্রের সরলীকরণে সবাই মেতে উঠতে চায়। তাই হাপরের মতো আগুনজ্বলা উন্মত্ত গরম বাতাসও যেন কারও বুকে আগুন ধরিয়ে ফেলেনা বরং অন্য কিছু ভাবতে বলে কেবল। ধীরে সমাজের উপরে উঠে যেতে হবে। প্রকৃত পুঁজিবাদ না হতে পারলেও তার চলাটা অন্তত অনুসরণ করতে হবে। এই অনুসরণ আর অনুকরণে একটা কাঠামো দাঁড়িয়ে গেছে আজকাল। অস্থায়ী সম্পদের স্বপ্নে বিভোর সবাই খুব বেশী কিছু ভাবতে আগ্রহী না। পড়াশুনাটা চুকিয়ে একটা সামাজিক অবস্থান তৈরি করা এবং নিজের অতীতকে মুছে ফেলা। নিজের অনাগত উত্তরাধিকারের শ্রেণীটাকে আরেকটু এগিয়ে রাখাটা খুব দরকারি। কিন্তু তারো আগে নিজেকে উপযুক্ত করে তোলা, নাক সিটিকিয়ে চলা। ব্যাপারটা একদল ইঁদুরের মতো যারা উঁচু দেয়াল বাইতে চেষ্টা করছে সবাই একসাথে। কেউ কাউকে টেনে ধরে উপড়ে উঠে যাচ্ছে কেউ কেউ পড়ে যাচ্ছে। যে পড়ে যাচ্ছে সে উপড়ে উঠে যাওয়াকে গালি দিচ্ছে আর যে উপড়ে উঠে গিয়েছে সে নিচে পড়ে যাওয়া ইঁদুরকে।

এইসব জেনে যাবার পর সমস্ত কিছুই অসহ্য লাগতো অনিকের। ভেঙ্গে ফেলার বারবার চেষ্টা করে সে ব্যর্থ হয়েছে এমনও হয়নি কখনও। শুধু সারাদিনে চায়ের কাঁপে আদার চলে এইসব বিপ্লব ভালো লাগে তার। রাতে ঘুমাবার আগে ভরপেট খাবার পর এক গ্লাস পানি তাকে এইসব থেকে অসম্ভব মুক্তি দিলে পরে কল্পনায় পুড়ন প্রেমিকাকে দেখে দেখে ঘুমিয়ে পড়াটা আরও বেশী সরল জীবন মনে হত তার। কিন্তু উজ্জ্বল কি এই স্বপ্ন থেকে মুক্তি পেতে পেরেছিল? এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে কি মিলবেনা এই দ্বিধা-দ্বন্দে অসংখ্য দিন পার হবার পর আবারও তারা একই পথে এসেছে। আবারও একটা রক্তঝড়া দুপুরে শহরের শেষ মাথায় যেখানে আবর্জনার স্তূপের উপর মাথা চারা দিয়েছে অবহেলার অজস্র কাশফুল। তারই পাশে থমকে যাওয়া শীতলক্ষ্যার শাখা নদী।

সস্তায় কেনা সিগারেট টা ফুরিয়ে যায় খুব দ্রুত। শুনশান রাস্তায় কেউ কোথাও নেই। মাঝে মাঝে হুডে ঢাকা রিকশায় হাতের মুঠোয় হাত চেপে চলে চায় রমণীরা। কেউ কেউ তাদের দিকে একবার দেখে। হঠাত দেখায় মনে হতেই পারে বিভ্রান্ত তিন যুবক যেন অনিশ্চিত যাত্রায় হেঁটেছে। তবু এই শরতের নিঃসঙ্গ দুপুর জানে, এইখানে কোন বিভ্রান্তি নেই। এখানে কেবল মাত্র একটি গল্পও নেই। আছে গল্পের ভেতরের গল্প। তারপর আবারও তার ভেতরে কিংবা বাইরের গল্প। এই গল্পে রমণীরা ছিলোনা। যেমনটা কখনোই ছিলোনা রবীন্দ্র পরবর্তী সময়ে আর কোন প্রেম কিংবা প্রেমিকা।

আগের পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 4 = 6