জন্মভূমি নেই, জন্মদাগ আছে

“উপজাতি”, “ট্রাইবাল”, “ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী”, ‘এথনিক পপুলেশন” পরিচয়ের কমতি নেই ওদের। এত পরিচয়ের ভারে নিজের জন্মভূমিকে নিজের দেশ বলার অবকাশটুকু পেলনা ওরা। “নিজ ভূমে পরবাসী” হওয়ার অনুভবটা পুরনো ক্ষতের মত বয়ে বেরিয়েছে দীর্ঘকাল, তাই জন্মদাগ হয়ে গেছে। লড়াইটা ওদের শেষ হচ্ছেই না কোনমতে। অস্তিত্বের সংকটে ওরা লড়েছে শতবর্ষ ধরে। একে একে ব্রিটিশ গেছে, পাকিস্তানিরা গেছে। আর, প্রতিটা প্রস্থানে গেছে ওদের তাজা তাজা প্রাণ, ছোপ ছোপ রক্ত।

কিন্তু, ওদের রক্তে হিমোগ্লোবিন বোধ হয় কম, পর্যাপ্ত লাল নয়; তাই ওদের রক্তের তেমন বাজার মূল্য নেই।

কথা বলছি এই বঙ্গদেশের আদিবাসী সাঁওতাল সম্প্রদায়ের প্রসঙ্গে। সিধু, কানু, চাঁদ, ভৈরব মাঝি, ফুলমনি, জানমনিরা একদা লড়েছিলেন সাদা চামড়ার ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে। সশস্ত্র গণসংগ্রামে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন ইংরেজ শাসনের ভিত। ১৮৫৫ সালের এই “সাঁওতাল বিদ্রোহ”ই ছিল ভারতবর্ষের স্বাধিকার আন্দোলনের প্রথম কদম। সিধু, কানু, সাঁওতাল বিদ্রোহ আজ ইতিহাস।

সিধু, কানুর উত্তরসূরিদের উপর এসেছে নয়া আঘাত।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, এবার আদি ভূমিপুত্রদের শত্রু অচিন দেশের অচেনা কেউ নয়। একই আলো-হাওয়ায়, জলে-কাদায় বেড়ে ওঠা বাঙালিরা। এই অতি পরিচিত জনেরাই অস্ত্র হাতে ধেয়ে এসেছে, নির্দয়ভাবে পিটিয়ে খুন করেছে ওদের, আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে বসতবাড়ি, ঘটিবাটিসহ লুট করে নিয়ে গেছে ওদের সর্বস্ব!

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে ১২ জুলাই ও ৬ নভেম্বরে সাঁওতাল পল্লীতে হামলা, লুটপাটের কারিগর চিনিকল কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারি পেটোয়া বাহিনী। জানা গেছে, এই যৌথ বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাপমারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি শাকিল আলম বুলবুল। যিনি কিনা আবার ‘ইক্ষু খামার ভূমি উদ্ধার সংহতি কমিটি’র সভাপতি!

?oh=c0dbe7dc5f65a5ed8d97023b08ac32ed&oe=5889AE9A” width=”512″ />

ফলশ্রুতিতে লাশ হয়েছেন শ্যামল হেমব্রম, মঙ্গল মাড্ডি, রমেশ টুডু। যাদের যথাযথ সৎকারেও এগিয়ে আসেনি কেউ। আহত হয়েছে প্রায় অর্ধশত, এর মধ্যে দ্বিজেন টুডু, চরণ সরেন, বিমল কিছকুর অবস্থা গুরুতর। উপর্যুপরি হামলা, অগ্নিসংযোগ, আর লুটপাটে স্তব্ধ সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম এলাকার সাঁওতালরা। স্বজন হারানোর বোবা কান্না নিয়ে ওরা গৃহহীন, অন্নহীন। স্থানীয় সাংসদ ও চেয়ারম্যানের তাবেদার বাহিনী সাথে চিনিকল কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে ভূমিপুত্রদের হাতে মারা ও ভাতে মারা কোনটাই বাকি রাখা হচ্ছে না। গত আটদিনে ক্ষুধা তৃষ্ণায় জর্জরিত প্রতিটি সাঁওতাল আবাল, বৃদ্ধ বণিতার শূন্যদৃষ্টি প্রশ্নবিদ্ধ করছে বাঙালি সুশীল মানবতাবোধকে।

?oh=272250b872e42fddcbdde41d2a5ae3b6&oe=58C80155″ width=”512″ />

সাঁওতালদের অপরাধ তারা তাদের পূর্বপুরুষের জমি ফেরত চেয়েছেন। যা তাদের কাছ থেকেই অধিগ্রহণ করা হয়েছিল চিনিকলের জন্য!

২.

১৯৫৫ সালে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জ ইউনিয়নে চিনিকলটি স্থাপিত হয়। ১৯৬২ সালের ৭ জুলাই আখ চাষের জন্য সাপমারা ইউনিয়নের রামপুরা, ফকিরগঞ্জ, মাদারপুর এবং সাহেবগঞ্জ ও কাটাবাড়ি ইউনিয়নের কটিয়াবাড়ি এলাকায় ১৫টি আদিবাসী গ্রাম এবং ৫টি বাঙালির গ্রাম মিলিয়ে মোট ১ হাজার ৮৪২ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়।

এই অধিগ্রহণের শর্তে উল্লেখ ছিল, কখনো আখ চাষ না করা হলে ওই কৃষিজমি তার প্রকৃত মালিকদেরকেই ফিরিয়ে দিতে হবে।

মহিমাগঞ্জ চিনিকল বন্ধ হয়ে গেছে ২০০৪ সালে। কিন্তু অধিগ্রহণকৃত জমি তাদের প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে সেটা করা ঘটেনি। কিছু বাঙালি তাদের জমি ফেরত পেলেও, সাঁওতালরা ফিরে পাননি পূর্বপুরুষের জমির উপর তাদের ন্যায্য অধিকার। সেই জমি বছরের পর বছর আখ চাষের বদলে বাণিজ্যিক ইজারা দিয়ে অধিগ্রহণের শর্ত ভঙ্গ করা হয়েছে। চলেছে তামাক, সবজি, ও ধানের চাষ। যার প্রধান সুবিধাভোগী চিনিকল কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় সাংসদ ও তার ডানহাত খ্যাত শাকিল আলম। ‘বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল’ নাম দিয়ে চিনিকলের জন্য অধিগ্রহণকৃত এই জমি নিজেদের সম্পত্তির মত করে ভোগদখল করে, ফসল বেচা টাকা লুটেপুটে খেয়ে দিনগুলি বেশ ভালই কাটছিল এই ত্রয়ীর।

বাগড়া বাধিয়েছে সাঁওতাল ভূমিপুত্ররা। নিজেদের বাপ দাদার জমির ন্যায্য অধিকার চেয়ে। এতে করে যে আঁতে ঘা লাগবে চিনিকল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় সাংসদের পাণ্ডাদের তাতে আর আশ্চর্য কী! হীনস্বার্থে ব্যাঘাত ঘটায় সেই রোষের আগুন ‘সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস’ হিসেবে পুড়িয়েছে ভূমিপুত্রদের। উল্টো আদিবাসী সাঁওতালদেরই বলা হয়েছে ‘দখলদার’, ‘সন্ত্রাসী’!

?oh=ce027b13c7638fbb307be6dddbb8097f&oe=58D1DCDC” width=”512″ />

আদিবাসীদের উপর হামলাকে ‘সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস’ হিসেবে চিহ্নিত করছি এর কারণ হলো- সাঁওতালদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের জন্য তাদেরকে ‘সংখ্যালঘু’ ভেবে নিয়েই হামলার প্রণোদনা পেয়েছে হামলাকারী গোষ্ঠী। তারা খুব ভাল করেই জানে আদিবাসীদের ব্যাপারে রাষ্ট্রের মনোভাব কী! জানে আদিবাসীদের উপর যেকোনো প্রকার অত্যাচার করেই পার পেয়ে যাওয়া সহজ। হামলা করে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়ে,গরু-বাছুর, টেলিভিশন, সেলাই মেশিন থেকে ঘটিবাটি পর্যন্ত লুটপাট করে, খুন জখম করে আবার ওদের নামেই মামলা করা যায়। কারণ এদের দেখার কেউ নেই। জাতিসত্তা হিসেবে ওরা এমনকি রাষ্ট্র স্বীকৃতও নয়!

আর, আদিবাসী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের ঘটনা বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়।

৩.

আমাদের এই অঞ্চলে(ভারতবর্ষে) ‘সাম্প্রদায়িকতা’ বেশ পুরনো শব্দ; ঠিক তেমনি সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত বেশ পুরনো প্রবণতা ও ঘটনা। নানা রূপ ও প্রকরণে সাম্প্রদায়িকতার প্রকাশ ঘটতে পারে। সেটার ভিত্তি হতে পারে ধর্ম, ভাষা, বর্ণ, জাতিসত্তা, লৈঙ্গিক বিন্যাস ইত্যাদির পার্থক্য।

সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমেই চলে আসে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা। এটাই সবচেয়ে আলোচিত। ‘অসাম্প্রদায়িক চেতনা’র আলোচনায় বা সাম্প্রদায়িক প্রবণতার নিদানের কথা বলার সময় এটার কথা বেশি উঠে আছে।

এ অঞ্চলের মানুষের ভেতর সাম্প্রদায়িকতা যে বেশ গভীরে শিকড় গেড়েছে সেটা ব্রিটিশ ভারতে ইংরেজরা বেশ ভালভাবেই বুঝেছিল। তাই হিন্দু, মুসলমানের ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে পুঁজি করে, মাঝে মাঝে ইন্ধন জুগিয়ে “ডিভাইড এন্ড রুল” পন্থার শাসন স্বচ্ছন্দেই জারি রাখতে পেরেছিল। তারই ধারাবাহিকতায় নাটকের শেষ অঙ্কে ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’র ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে দেশভাগ হলো। জন্ম হলো- ভারত ও পাকিস্তানের।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে আসার সময় আমরা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার কূপমণ্ডূকতা বেরিয়ে আসার চেষ্টা করি। সদ্য জন্ম নেওয়া নতুন দেশ বাংলাদেশের তাই অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা। যেটা মুক্তিযুদ্ধের চেতনারই অংশ। আর, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কোন বায়বীয় বিষয় নয়, নয় কেবল জাতীয়তাবাদী আবেগ। এর নির্দিষ্ট গাঠনিক ও প্রায়োগিক দিক আছে। যা ৭২’এর সংবিধানে প্রতিফলিত হয়। এবং রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয় গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদকে।

?oh=98a58f99623cdefd31ceecc14856d36b&oe=58D5335C” width=”512″ />

ধর্মনিরপেক্ষতার প্রসঙ্গে সংবিধানের ১২ অনুচ্ছেদে বলা হয়-

ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা। ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি বাস্তবায়নের জন্য-
(ক) সর্বপ্রকার সাম্প্রদায়িকতা, (খ) রাষ্ট্র কর্তৃক কোন ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদাদান, (গ) রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার, (ঘ) কোন বিশেষ ধর্মপালনকারী ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য বা তাঁহার উপর নিপীড়ন বিলোপ করা হইবে।

দেখা যাচ্ছে, ৭২’এর সংবিধানের মাধ্যমে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বিষয়টা অন্তত কাগজে কলমে হলেও সচেতনভাবেই কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা হয়। এবং সেটা সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য।

কিন্তু, জাতিসত্তার পার্থক্যগত সাম্প্রদায়িকতার বিষয়টা খুব একটা আমলে না নেওয়ায় ৭২’র সংবিধানে ‘বাংলাদেশের নাগরিক জাতিতে বাঙালি বলিয়া পরিচিত হইবে’ এই আপ্তবাক্যের মাধ্যমে সাঁওতাল, গারো, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, খুমি, খেয়াং, মনিপুরী, ওঁরাং প্রভৃতি মিলিয়ে প্রায় ৫৪টি জাতিসত্তা অস্তিত্ব সাংবিধানিকভাবে অস্বীকার করা হয়েছে। ফলে সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যায় প্রায় ত্রিশ লাখ আদিবাসী তাদের নিজ নিজ জাতিসত্তায় পরিচয় পেতে পারেনি রাষ্ট্রীয়ভাবে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী মেনোফেস্টোতেও আদিবাসীদের স্বীকৃতি দেয়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল।

Terrorism, discriminatory treatment and human rights violations against religious and ethnic minorities and indigenous people must come to an end permanently.

Their entitlement to equal opportunity in all spheres of state and social life will be ensured. Special measures will be taken to secure their original ownership on land, water bodies, and their age-old rights on forest areas.

All laws and other arrangements discriminatory to minorities, indigenous people and ethnic groups will be repealed. Special privileges will be made available in educational institutions for religious minorities and indigenous people. Such special privileges will also apply for their employment.

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপুমনি নিজে ২০০৮ ও ২০০৯ সালে ‘আদিবাসী দিবস’-এ বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে ‘আদিবাসী’দের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সংহতি প্রকাশ করেন। কিন্তু, পরবর্তী এর কিছুই বাস্তবায়ন হতে দেখা যায়নি। আর, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তো পাহাড়ী আদিবাসীদের “তোরা সবাই বাঙালি হয়ে যা” বলেই ক্ষান্ত হয়েছিলেন! উল্লেখ্য, ২০০৭ সালে জাতিসংঘের ‘আদিবাসী অধিকার সনদ’এ এখনো স্বাক্ষর করেনি বাংলাদেশ।

৪.

সাঁওতাল ভূমিপুত্রদের উপর হামলা ঘটনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এতক্ষণ সাম্প্রদায়িকতা, সংবিধান প্রসঙ্গ টানলাম শুধুমাত্র এই সত্যটা বোঝাতে যে- পাহাড় সমতলের আদিবাসীরা সাংবিধানিকভাবেই অস্বীকৃত ও অরক্ষিত। তাদের ব্যাপারে রাষ্ট্রীয় এই অবস্থান যে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসকে উৎসাহ দেবে সেটা বলাই বাহুল্য। পাহাড়িদের তবুও নামেমাত্র হলেও রক্ষাকবচ ‘পার্বত্য শান্তি চুক্তি’ আছে, সমতলের আদিবাসীদের তেমন কিছুও নেই!

লেখাটার এ পর্যায়ে এসে পাঠক যদি চিন্তা করেন, এগুলোর সাথে ধর্মনিরপেক্ষতার সম্পর্ক কোথায় তাহলে বলবো, পুরো ব্যাপারটা আরেকবার ভাবুন। তখন আপনি গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতাল পল্লীতে হামলা ও নাসিরনগরের হিন্দু সংখ্যালঘুদের উপর হামলাকে কানেক্ট করতে পারবেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর, ও গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উভয়ই পুড়েছে সাম্প্রদায়িক আগুনে। একটা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা, আরেকটা জাতিসত্তাগত সাম্প্রদায়িকতা। উপর্যুপরি সংশোধনীর পর বাংলাদেশের সংবিধানের যে সাংঘর্ষিক জগাখিচুড়ি অবস্থা দাঁড়িয়েছে তাতে করে হিন্দু, বৌদ্ধ, ক্রিশ্চিয়ান সংখ্যালঘুরা দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর নাগরিক। আর, আদিবাসীরা নামেমাত্র নাগরিক। এদের মানবাধিকার নিয়ে রাষ্ট্র, গণমাধ্যম কেউই ততটা চিন্তিত নয়।

এই ইস্যুতে অর্থাৎ ধর্মীয় ও জাতিসত্তাগত সাম্প্রদায়িক নিপীড়নের ঘটনা বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগের অবস্থান ‘সর্প হয়ে দংশন করে ওঝা হয়ে ঝাড়া’র মত। তারা মুখে ‘অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ’ গড়ার কথা বললেও আদতে সেটা রাজনৈতিক ভণ্ডামি হিসেবেই প্রমাণিত হয়েছে বারেবারে। সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের ঘটনায় এই দলের নেতাকর্মীদেরই বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে নেতৃত্ব দিতে, জড়িত থাকতে, ইন্ধন দিতে।
সাম্প্রতিক সময়ের উদাহরণ হিসেবে- ২০১০সালে খাগড়াছড়ির বাঘাইহাট ট্রাজেডি, ২০১২সালে কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উপর হামলা, ২০১৪ সালে যশোরের মালোপাড়ায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনার কথা উল্লেখ করা যায়।
আর, কদিন আগের নাসিরনগরের ঘটনা তো আছেই!

প্রতিটি ঘটনার পর শেখ হাসিনার আওয়ামী সরকারকে দেখা গেছে একই ভূমিকায়। প্রথমে ঘটনার নিন্দা জানিয়ে দায়সারা বিবৃতি দেওয়া, এরপর হামলাকারী ও ভিক্টিমদের মধ্যে নেগোশিয়েটরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া( ঠিক যেমন গ্রাম্য মাতব্বরেরা করে থাকে), পরিশেষে, ভিক্টিমদের কিছু চাল, ডাল, তেল আর ঢেউটিন দিয়ে নাটকের যবনিকাপাত।
‘র‍্যাবের অস্ত্র উদ্ধার’এ যাওয়া মত এই ঘটনাও প্রতিবার একই নিয়মে, একই সিকুয়েন্সে ঘটে!

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের বিচার তাই আলো মুখ দেখতে পারেনা কখনোই।

মানবাধিকার ও আইনী সহায়তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র(আসক)’এর একটা পরিসংখ্যান উল্লেখ করলে চিত্রটা স্পষ্ট হবে।

বিগত ৫ বছরে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বসতবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয়ের ওপর ২৮০৩টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। আর, এই সময়ে এই ধরণের ঘটনায় মামলা হয়েছে ২৭৩টি।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, একশটা সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটলে সেই প্রেক্ষিতে মামলা হয় মাত্র একটা। সেটারও ‘বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে’!

এই হলো আওয়ামীলীগ সরকারের ‘অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ’ এর চিত্র!
প্রসঙ্গত বলি, বিএনপি ও জামায়াত জোটের অন্তত ‘কপট অসাম্প্রদায়িক’ সাঁজার রাজনৈতিক ভণ্ডামি নেই। ডানপন্থি দল হিসেবে তারা রক্ষণশীল ও সাম্প্রদায়িক চরিত্রের। এবং তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোতে সেটাই প্রতিফলন দেখা যায়।

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসবাদী ঘটনার নেপথ্যে যেমন ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষ কাজ করে, ঠিক তেমনিভাবে কাজ করে রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি। ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষকে কাজে লাগিয়ে ভোটের রাজনীতিতে ফায়দা লোটার প্রবণতাও বাংলাদেশের রাজনৈতিক চর্চার অন্যতম দিক।

স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে একাধিকবার সামরিক শাসন, স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনীতিতে পুনর্বাসন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে শক্তিশালি করার লক্ষ্যে সংবিধানে অনাবশ্যক সংশোধনী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে পদস্খলিত করেছে। উপসর্গ হিসেবে দেখা দিয়েছে ধর্মীয় উগ্রবাদ, সাম্প্রদায়িকতা। সাথে বোনাস হিসেবে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি!

আর, ফলাফল হিসেবে ঘটেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হামলা , গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতাল পল্লীতে হামলা, দেশের অমিত সম্ভাবনাময় মুক্তচিন্তক লেখকদের হত্যাকাণ্ডের মত ঘটনা। যাতে করে এমন ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে যে, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটা কেবল এক ধর্মের রাষ্ট্র, এক জাতির রাষ্ট্র, এক দলের রাষ্ট্র।

এ দেশের আকাশ, মাটি, জল, সবুজের উপর যেন তাদেরই কেবল একচ্ছত্র আধিপত্য। আর করো কোন বক্তব্য নেই, অধিকার নেই। ভাবটা এমন- পরিচয় কেবল মুসলিম আর বাঙালি; আসেন সবাই সাপলুডু খেলি!

শুরু করেছিলাম, সাঁওতাল ভূমিপুত্রদের কথা দিয়ে; তাদের কথা দিয়েই শেষ করি। ওরা সিধু, কানু, ভৈরবের উত্তরসূরি। ওরা একলব্যের উত্তরসূরি। বারবার লণ্ডভণ্ড হয়েছে ওদের ঘর, সংসার, স্বপ্ন। কিন্তু আত্মসম্মান বিকিয়ে দেয়নি কখনো। প্রয়োজনে রাইফেল, বন্দুক, কামানের সামনে দাঁড়িয়ে গেছে তীর ধনুক হাতে। আবার কখনো নয়দিনের অনাহারের পরেও ফিরিয়ে দিয়েছে অত্যাচারী, দুমুখো প্রশাসনের ত্রাণসামগ্রী! আসলেই তফাতটা কেবল শিরদাঁড়াতেই।

?oh=307480e620e1a71cf0f04166e10ee9f9&oe=58BE128B” width=”512″ />

সাঁওতালদের লড়াইটা এবার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই। হামলা মামলা রুখে দিয়ে পূর্বপুরুষের আবাসভূমিতে ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই। নিজেদের জাতিগত সংস্কৃতি অটুট রাখতে মাথা না নোয়ানোর লড়াই।

ভূমিপুত্রদের জন্মদাগ মুছে ফেলে জন্মভূমিতে অধিকার প্রতিষ্ঠার এই সংগ্রাম হয়তো ইতিহাস গ্রন্থে নতুন অধ্যায় জুড়ে দেবে।

তথ্যসুত্রঃ

১। গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালদের গ্রামে হামলা, লুটপাট

২। সাঁওতাল হামলায় স্থানীয় সাংসদের ইন্ধন

৩। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান

৪। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের মেনোফেস্টো

৫।বিগত পাঁচ বছরে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর হামলার ঘটনা-(আসক)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “জন্মভূমি নেই, জন্মদাগ আছে

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 5 = 4