উনিশশো সাতচল্লিশ থেকে দুহাজার ষোলো : প্রলম্বিত ইতিহাস

ভারত যখন বিভক্তির উপকণ্ঠে, সেই ১৯৪৭ সালে অবিভক্ত বঙ্গে তখন দাবী ওঠে আবারও বঙ্গ ভঙ্গের। এবং অতি অবশ্যই ধর্মের ভিত্তিতে । দাবিদার এবার আর ব্রিটিশ নয়, দেশীয়। হিন্দু মহাসভা চাইছিল হিন্দুদের জন্য পৃথক স্বতন্ত্র ও স্বাধীন আবাসভূমি । শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি এতদূর পর্যন্ত গিয়েছিলেন যে তিনি বলেন ভারত বিভাগ না হলেও বঙ্গ বিভাগ করতে হবে। সাধারণ হিন্দুদের তাতে সমর্থন ছিল কিনা নিশ্চিত নয় তবে নেতারা যেহেতু চাচ্ছিলেন সম্ভবত সেহেতু বিভক্তি রোধ করা যায়নি। তাদের যুক্তি ছিল হিন্দুরা অবিভক্ত বঙ্গে যেখানে মুসলমানেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ সেখানে নিরাপদে কিংবা নিরুদ্বিগ্নে থাকতে পারবে না।ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঙালি অধ্যাপক জয়া চ্যাটার্জীর বই Bengal divided.  Hindu communalism and partition, 1932-1947 তে দেখা যাচ্ছে যে ভারতের অমৃতবাজার পত্রিকা বঙ্গবিভাগ এবং দাঙ্গার জন্য যথেষ্ট প্রোপাগান্ডা চালিয়েছে। অনেক হিন্দু নেতাই বঙ্গবিভাগের ইন্ধন যুগিয়েছে। অতএব হিন্দুরা বাংলাভাগের দায় এড়াতে পারেনা। তবুও অন্যদিকে প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিম আর কংগ্রেসের শরৎ বসু এই বিভক্তি রুখে দিয়ে তারা বরং অখণ্ড বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছিলেন। তাদের যুক্তি ছিল বাংলার হিন্দু মুসলমান অভিন্ন সত্তা, জাতিতে তারা বাঙ্গালী। অবিভক্ত বাংলা ভারতবর্ষের বৃহৎ শক্তি হবে আর যদি হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আলাদা পশ্চিমবঙ্গ গঠিত হয় তাহলে “পশ্চিমবঙ্গ ভারত সাম্রাজ্যের উপনিবেশ হইবে ” এবং “হিন্দুরা বিদেশি পুজিপতিদের অধীনস্থ দিন মজুরের অবস্থা প্রাপ্ত হইবে।” প্রস্তাবিত স্বাধীন বাংলায় হিন্দু মুসলমান কোন সম্প্রদায়ের প্রভুত্ব অস্বীকার করে আবুল হাশিম বলেন “বাংলায় হিন্দু মুসলমান সংখ্যা প্রায় সমান। এমতাবস্থায় স্বাধীন বাংলায় হিন্দুরা ন্যায়সঙ্গত অধিকার লাভে বঞ্চিত হইবে এবং দেশের ধনসম্পদের অংশ পাইবে না – একথা অচিন্ত্যনীয়”।পাঠক, এইখানে একটু লক্ষ্য করুন। উপরোক্ত কথার অর্থ দাড়ায় হিন্দুরা যতক্ষণ সংখ্যায় মুসলমানের সমান থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত সমঅধিকার লাভ করবে। সংখ্যালঘু হলেই তার উপর নেমে আসবে সংখ্যাগুরুর শাসন শোষণ। আবুল হাশিম প্রকারান্তরে কি এই হাইপোথিসিস কেই স্বীকার করেন নি?

/ALTERNATES/w640/BAYAAN+1.jpg” width=”500″ />

এবার দেখুন আবুল হাশিমের পুত্র বদরুদ্দীন উমর কী বলছেন। গত একুশে ফেব্রুয়ারি তার একটা সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে প্রথম আলোতে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ফারুক ওয়াসিফ। সেখানে তিনি বলছেন, সাতচল্লিশ সালে দেশভাগের পরই কেবল পূর্ব বাংলায় অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির বাস্তব পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিলো। কেন এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো সেই ব্যাখ্যাও দিয়েছেন বদরুদ্দিন উমর। তিনি বলছেন দেশভাগের পূর্বে জমিদার, মহাজন, মোক্তার, উকিল সবই ছিলো হিন্দু। কিন্তুু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরে রাজনৈতিক ক্ষমতা চলে আসে মুসলমানদের হাতে। অর্থাৎ হিন্দুরা হয় মুসলমানের অধস্তন। এবং অধস্তন হওয়ার কারনে হিন্দুরা আর তখন মুসলমানের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। মানে হিন্দুরা কাবু হয়ে গেছে। একটা সম্প্রদায় হিসেবে হিন্দুরা তখন খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাই আর মুসলমানেরা সাম্প্রদায়িকতা দেখানোর জায়গা পাচ্ছে না বা সুযোগ নেই। এই পরিস্থিতিতে বাঙালি মুসলমানেরা অসাম্প্রদায়িক হয়ে ওঠে। এই হলো বদরুদ্দিন উমরের ভাষ্য। অর্থাৎ এই অসাম্প্রদায়িকতা কোন মহৎ, আধুনিক বা মানবিক চেতনাজাত নয়, উপযুক্ত সাম্প্রদায়িক প্রতিদ্বন্দ্বীর অভাবে অসাম্প্রদায়িক হয়ে উঠা, এই আরকি ।

মজার বিষয় হচ্ছে পিতা আর পুত্রের ব্যাখ্যার মধ্যে রৈখিক সম্পর্কটা। আবুল হাশিম বলছিলেন যে যেহেতু হিন্দু মুসলমান সংখ্যা পূর্ব বঙ্গে সমান সমান সেহেতু পূর্ববঙ্গে সকলেই সমান অধিকার ভোগ করতে পারবে। শ্যামাপ্রসাদ বুঝেছিলেন এই সংখ্যা বেশিদিন সমান থাকবেনা। আর হিন্দুমহাসভা ও কংগ্রেসের মহাসভাপন্থি নেতারা ভবিষ্যৎ বঙ্গে হিন্দুর সংখ্যালঘু হবার সম্ভাবনা ও নির্যাতিত হবার আশঙ্কা উপলব্ধি করেই বঙ্গ ভঙ্গ চেয়েছিলেন। শরৎ বসু কি ভেবেছিলেন তা আমার বুদ্ধিতে আসেনা।বদরুদ্দীন উমরের ব্যাখ্যা কিন্তুু শ্যামাপ্রসাদের আশঙ্কাকেই সত্য প্রমাণ করে। যাইহোক অখণ্ড বাংলা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা করার জন্য এঁরা সাধুবাদ পেতেই পারেন। কিন্তু সেই বাংলায় হিন্দু মুসলমানের সম্প্রীতি ও সমঅধিকারের যে ছবি তাঁরা এঁকেছিলেন অনেক আগে থেকেই সেই ছবি নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে।কিন্তুু এখন আর সন্দেহ নেই, এটি এখন নিষ্ঠুর বাস্তবতায় উপনীত হয়েছে। যে উদ্বিগ্নতা সাতচল্লিশে ছিল যার জন্য আবুল হাশিম, শরৎ বসু, সোহরাওয়ার্দিরা সফল হতে পারেনি, সেই উদ্বিগ্নতা এখনও আছে।এখনো সংখ্যাগুরু মুসলমান তার সংখ্যালঘু হিন্দু প্রতিবেশির আশঙ্কা উদ্বেগ ও ভয় দূর করতে পারে নি। গান্ধির কাছে আবুল হাশিম ও সোহরাওয়ার্দি অখণ্ড বাংলার দাবী নিয়ে আলোচনা করতে গেলে গান্ধী তাদের কাছে হিন্দুদের নিরাপত্তার দাবী জানান।সোহরাওয়ার্দি বলেন“কলকাতায় শান্তি বজায় আছে”। তিনি কি করে কিছুদিন আগে ঘটে যাওয়া দাঙ্গার কথা ভুলে গেলেন? সংখ্যালঘুরা এখনো দাবীদাওয়া নিয়ে ঘুরছে পথে পথে, কিন্তু তাদের দাবী মেনে কাজ করার মতো কেউ নেই। আছে শুধু একপাল নষ্ট রাজনীতিক আর গোয়ালভরা বুদ্ধিব্যবসায়ী যারা অনবরত বলেই যাচ্ছে “বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ।’’ সম্প্রীতির নিদর্শন আমরা দেখতে পাচ্ছি নাসিরনগর, অভয়নগর, মনিরামপুর, গোবিন্দগঞ্জ, রামু, উখিয়া, সিলেটসহ সারা দেশজুড়ে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

4 + 4 =