নাস্তিক মুক্তমনাদের লড়াই মৌলবাদের বিরুদ্ধে

নাস্তিকতা একটি দার্শনিক অবস্থান, যেমন অজ্ঞেয়বাদিতা ও আস্তিকতা। প্রতিটি মানুষের মনে একটি মৌলিক দার্শনিক প্রশ্নের উদয় হয়, আমি কোথা থেকে এলাম? আমি কিভাবে সৃষ্টি হলাম?
এর উত্তর দুই ভাবে মানুষ পেয়ে থাকে। কল্পনা ও ঐতিহ্য থেকে, অথবা জীববিজ্ঞান বা প্রকৃতিবিজ্ঞান থেকে। বিজ্ঞানের উত্তরে যারা খুশি না, তারা প্রশ্ন করে প্রকৃতি সৃষ্টির সৃষ্টি নিয়ে। বিজ্ঞান এখানে অজ্ঞেয়বাদী, কারণ সে তথ্য উপাত্ত পরীক্ষণ ও বিশ্লেষণ ছাড়া কিছু কল্পনা বা অনুমান করে বলতে নারাজ।

আস্তিকেরা এখানে আশ্রয় নেয় মিথের, কল্পনার যা সে পুর্বপুরুষ থেকে জেনেছে। নানা আদিবাসীরা যারা প্রকৃতি পূজারী, তারা বলে, আমরা এসেছি হিহিরি পিপিড়ি থেকে, কেউ জানে সারস পাখি থেকে, কেউ জানে সমুদ্র থেকে। একেশ্বরবাদের উদ্ভবের পরে অনেক মানুষ মনে করে সে এসেছে ঈশ্বর থেকে। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের কারণে।

নাস্তিক এই কল্পনা প্রসূত “সত্য” মানতে নারাজ। সে মনে করে আস্তিকের যুক্তিতে ফাঁক আছে। আস্তিক মনে করে সে যেহেতু বিশ্বাস করে, তার পুর্বপুরুষ বিশ্বাস করে এসেছে, এত লোক কি ভুল করতে পারে? নাস্তিক তার যুক্তিতে ধর্মগ্রন্থের কাহিনীকে অবৈজ্ঞানিক মনে করে, অবাস্তব মনে করে, ভ্রান্ত বিশ্বাস মনে করে। মেরী মাতা কুমারী ছিলেন, তা হতে পারেনা। হাতীর মাথা কেটে গণেশ এর মাথায় বসিয়ে দেয়া হয়েছে, তা হতে পারেনা। কিংবা গাধার মত কোন প্রাণীর পাখা আছে যা দিয়ে আকাশে ওড়া যায়, সেটাও অসম্ভব। নাস্তিকের যুক্তিতে ধর্মের কাহিনী “সত্য” হতে পারেনা।

আমাদের অস্তিত্বের শুরু কোথায়, এই নিয়ে প্রশ্ন, উত্তর, যুক্তি, পাল্টা যুক্তি থাকতেই পারে, আছেও। এটা কিন্তু কোন সমস্যা নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত এটি দার্শনিক প্রশ্ন।

নাস্তিকতা কিংবা ধর্ম নিয়ে সমস্যা কখন শুরু হয়?
সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন কোন ধার্মিক এসে বলে, আমার ধর্ম “সত্য” ও “শ্রেষ্ঠ”। এটা শুধু বিশ্বাসের ব্যাপার না, এটা আইনের ব্যাপার। আমার ধর্মে যে নিয়ম লেখা আছে, সেটা হবে আইন। আমি যেহেতু ধর্মে বিশ্বাস করি, আমার অধিকার নেতৃত্ব দেয়ার। এটাই থিওক্রেসি, ধর্মতন্ত্র, গণতন্ত্রের বিপরীত। এটা তখন আর দর্শন নেই, প্রচলিত অর্থে ধর্মও নেই যে ধর্ম কেবল পরকাল ও ঈশ্বরের কথা বলে, যে ধর্ম আধ্যাত্নিক। এটি এখন ধর্মের চাদরে ঢাকা রাজনীতি হয়ে গেছে।

মৌলবাদী রাজনীতি।
বুদ্ধিমানেরা মৌলবাদী রাজনীতির ব্যাপারে চুপ থাকলেও, নাস্তিকেরা চুপ থাকেনা। চুপ থাকেনা কারণ তারা তাঁদের “সত্য”কে ভালবাসে এবং সত্য বলতে ভয় পায়না।

মৌলবাদী বলে আমার ধর্মগ্রন্থ আমার সংবিধান, আমার পয়গম্বর আমার নেতা। নাস্তিক সেই ধর্মগ্রন্থ নিয়ে গবেষণা শুরু করে দেয়। কি আছে এই ধর্মগ্রন্থে? শান্তির কি আছে, সহিংসতার কি আছে, অন্যায় অবিচারের কি আছে ও অমানবিক কি আছে? “নেতা” বলে যাকে মৌলবাদী রাজনিতিকেরা “শ্রেষ্ঠ মানুষ” হিসেবে প্রচার করে, নাস্তিকেরা তাকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করে, তার দুর্বলতা খুঁজে বের করে।

মৌলবাদী তখন বলে, নাস্তিকেরা আমার “ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছে”, নাস্তিক হত্যা ওয়াজেব। মৌলবাদী রাজনীতি মানুষ হত্যা শুরু করে। শুধু মুসলমান মৌলবাদীরা নয়, আমেরিকায় খৃস্টান মৌলবাদীরা ডাক্তার খুন করেছে যারা গর্ভপাতে বিশ্বাস করে, হিন্দু মৌলবাদীরা খুন করেছে যারা গরু খায় তাঁদের, এবং বাংলাদেশে ব্লগারদের যারা অনলাইনে ধর্ম ও বিজ্ঞান নিয়ে লিখে।

মৌলবাদী রাজনীতি যে ধার্মিকের ব্যাপার নয়, রাজনীতির, এই প্রশ্নটা বামপন্থীদের সামনে আনা উচিত ছিল। কিন্তু কিছু লোক আছে যাদের আমরা বামাতি বলে জানি, তারা মৌলবাদের রাজনীতি দেখতে পায়না, তারা দেখে ধার্মিক। উল্টো এরা বলে মৌলবাদীরা “শ্রেণী সংগ্রাম” করছে।

নাস্তিকেরা, যে তরুণ ছেলেমেয়েরা নিহত হয়েছে, পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে দেশ ছেড়ে, লুকিয়ে আছে দেশের ভেতর, তাঁদের অবস্থানটি দার্শনিক। যে “সত্য” তারা জেনেছে, মৃত্যুভয়ে সে সত্যকে তারা অস্বীকার করেনি। এই তরুণদের রাজনৈতিক পরিপক্বতা না থাকতে পারে অর্থাৎ মৌলবাদের বিরুদ্ধে কিভাবে অন্যদের সমাবেশিত করতে হবে সেই সব কৌশল জানা নেই। এরা অনেকেই কেবল ধর্মগ্রন্থকেই সমস্যার মুল মনে করে, ভুলভাবে। এই সব দুর্বলতার সমালোচনা হতেই পারে, কিন্তু তাঁদের সততা সক্রেটিস কিংবা গ্যালিলিওর মতই।

বিপরীতে, বুদ্ধিমানরা কি অবস্থা নিয়েছেন? যাদের হাতে রাষ্ট্রযন্ত্র তারা পরামর্শ দেয় নাস্তিকদের বুঝে শুনে লিখতে, যাতে মৌলবাদীরা সংগঠিত হতে না পারে, ধর্মিয় অনুভূতিতে আঘাতের নামে। আপনারা কেন মৌলবাদী রাজনীতি বন্ধের কথা বলেন না? আপনার ধর্মকে যে এরা রাজনীতির ঘুটি বানিয়েছে, এতে আপনাদের লজ্জা ও মনকষ্ট হয়না?

বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অনেক অর্জন আছে। মূল্যবোধ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে চারটি নীতি সামনে এসেছে; গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ। এই সমাজের প্রগতিশীল বিকাশে এই চারটি নীতির বিকাশ ও বাস্তবায়ন অপরিহার্য। এর বিরুদ্ধে যে রাজাকারেরা ছিল, তারা আজ সেই পুরনো ধর্মীয় রাজনীতি ও সহিংসতা নিয়ে এসেছে। আপনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নিয়ে তামাশা করেন কিন্তু এই মৌলবাদী রাজনীতি নিয়ে কথা বলার সময় পাননা। আপনি আসলে কোন পক্ষে?

বাংলাদেশের তরুণ নাস্তিকেরা রাজনীতি ভাল বুঝেনা, হতে পারে, কিন্তু তারা সত্যের জন্য জীবন দিয়েছে। তাঁদের তারুণ্যের সহজাত ন্যায়বোধ থেকে মৌলবাদী রাজনীতির বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে, জীবনের বিনিময়েও। তারা ধর্ম বা ধার্মিকের বিরুদ্ধে দাড়ায়নি, মৌলবাদের ধর্মসন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। কার্যত মৌলবাদীরাই সাধারন মানুষের “আধ্যাত্মিক” ধর্মের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, রাজনৈতিক ধর্মসন্ত্রাস নিয়ে।

নাস্তিকতা কোন অপরাধ নয়, যেটা মৌলবাদীরা প্রচার করে এবং অন্য অনেকেই আজকাল মেনে নিচ্ছেন। মৌলবাদীদের তৈরি আই সি টি আইনের ৫৭ ধারা বহাল রাখা হয়, মূলত নাস্তিকদের প্রকাশের স্বাধীনতা রুদ্ধ করার জন্য। নাস্তিকেরা তাঁদের মতামত প্রকাশ করছে লিখে, আর তার বিরুদ্ধে মৌলবাদের খুন নিয়ে আপনি নিরব। এটা মানুষ হিসেবে লজ্জার।

বাংলাদেশে গনতত্রের বিকাশের, ধর্মনিরপেক্ষতা অর্জনের, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিপক্ষে প্রধান মতাদর্শ ও রাজনৈতিক শত্রু মৌলবাদী রাজনীতি। তরুন নাস্তিকেরা তাঁদের দার্শনিক অবস্থান থেকে দাঁড়িয়েছে। আপনি কি আপনার রাজনীতি নিয়ে মৌলবাদের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছেন?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৮ thoughts on “নাস্তিক মুক্তমনাদের লড়াই মৌলবাদের বিরুদ্ধে

  1. ধর্মীয় মৌলবাদী রাজনীতির
    ধর্মীয় মৌলবাদী রাজনীতির স্বরূপ বিশ্লেষণ করেছেন চমৎকারভাবে।
    উঠে এসেছে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মিথস্ক্রিয়াও। সাধুবাদ। *good*

  2. অনেক যৌক্তিক ও কৌশলী লেখা।
    অনেক যৌক্তিক ও কৌশলী লেখা। যেখানে ফুটে উঠেছে ধর্মের নামে অজ্ঞানতা ও রাষ্ট্রে মৌলবাদের প্রসারতা। ধন্যবাদ আপনাকে যুগোপযোগী বিষয় নিয়ে লেখার জন্য।

  3. আপনি এবং আমি নাস্তিকদের
    আপনি এবং আমি নাস্তিকদের বিষয়টি নিয়ে ভাল লিখেছি,আমার লেখাটির নাম “নাস্তিকদের পাহারা না দিয়ে মুখোশধারী আস্তিকদের পাহারা দিলে মানবতা বাঁচে”। আস্তিক আর নাস্তিকদের নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত অকাট্য যুক্তি দেখিয়ে অনেকে লিখছেন,,, কিন্তু সমস্যা হল- তাদের মাথায় ঢুকছেনা যারা রাষ্ট্র চালাতে ব্যস্ত,,,,

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

44 − 38 =