অপ-শাসনের রাষ্ট্রে আমার করনীয় ও কিছু হাবিজাবি ইতিকথা

বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম গণ প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করে ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হয় এবং আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র দেওয়া হয়। ১৭ই এপ্রিল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথ তলায় (বর্তমান মুজিবনগর) আমাদের প্রথম সরকারের আনুষ্ঠানিক স্বপথ গ্রহণ [ভিডিও রেফারেন্স ১,২] হয় যেখানে অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউসুফ আলী আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন [৩,৪]। এই ঘোষণাপত্রের অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়ন করার জন্যই আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলেন। প্রস্তাবিত দেশের প্রতি অনুগত থেকে সাম্যের ভিত্তিতে সবার জন্য মর্যাদা শীল জীবন হবে এই চাওয়াই পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মুক্তিকামী সকলকে এক করেছিল। এই ঘোষণাপত্রের ধারাবাহিকতায় ১৯৭২ সালের ৪ঠা নভেম্বর যখন বাংলাদেশের সংসদে আমাদের প্রথম সংবিধান গৃহীত হয় তখন সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছিল “যে সকল মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগণকে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদদিগকে প্রাণোৎসর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল -জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সেই সকল আদর্শ এই সংবিধানের মূলনীতি হইবে”। অঙ্গীকার করা হয়েছিল এমন একটি গণতান্ত্রিক শোষনমুক্ত সমাজ যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হবে [৫]।

স্বাধীন বাংলাদেশের বয়স এখন ৪৫ বছর। এর মাঝে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে গনতন্ত্রের চর্চা নিরবিচ্ছিন্ন ছিলনা। স্বাধীনতার পর দুর্নীতি, অপশাসন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দেশী-বিদেশী চক্রান্ত এবং বঙ্গবন্ধু হত্যা মুক্তিযুদ্ধের মূলনীতি বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে আসে। ১৫ বছরের সামরিক শাসন আমাদের মাঝে পাকিস্তানের ভূতকে আবার নতুন করে পাকাপোক্ত করে দিয়ে যায়। ধর্ম নিরপেক্ষ সংবিধানে রাষ্ট্র ধর্ম অন্তর্ভুক্তি, শোষনমুক্ত সমাজের ধারনা থেকে সরে এসে একটি অতি প্রতিক্রিয়াশীল জাতীয়তাবাদের প্রতিষ্ঠা আমাদের আকাংক্ষিত রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে এগুতে দেয়নি। আমরা যখন ৯০ এ সংসদীয় নির্বাচনে আবার ফিরে আসি ততদিনে আমাদের প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থা, চিকিৎসা এবং শিক্ষার মত অতি আবশ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো আবার শাসকশ্রেনীর শাসনের হাতিয়ার উঠে। ২০০৭ এর আগ পর্যন্ত আমাদের চারটি নির্বাচিত সরকার বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করার প্রয়োজন মনে করেনি। যদিও ১৯৯৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপীল বিভাগ মাসদার হোসেন বনাম সরকারের মামলার রায়ে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ করার পক্ষে রায় দিয়েছিলেন[৬]। শোষনের সুবিধার্তে বিচার বিভাগকে পরাধীন রাখা ও জনগণকে আইনের শাসন থেকে বঞ্চিত রাখা প্রত্যেকটি সরকারের রুটিন কাজেরই অংশ ছিল। ২০০৭ এর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিচার বিভাগ স্বাধীন হলেও এখনো পুরোপুরি ফাংশনাল নয়। বিচার বিভাগের নিজস্ব সচিবালয় তৈরি করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অবিচারের যে অপসংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে তার প্রতিকার ও স্বাধীন চর্চা সুশাসনের অনুপস্থিতিতে অবশ্য সম্ভবও নয়। অপশাসন ও দুর্নীতির পরিপূরক আমাদের পুলিশ বাহিনীতে সময়ের পরিক্রমায় র‍্যাব, সোয়াটের সংযোগ ঘটেছে বটে কিন্তু তাতে জনগণের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি; সরকারের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে জনগণকে দাবিয়ে রাখতে এখন তারা ট্যাক্টিকালি অনেক বেশি দক্ষ। কিলিং টিম হিসেবে র‍্যাব পৃথিবীতে নাম পাকাপোক্ত করে ফেলেছে। ১৯৭৩ এর অধ্যাদেশে যে স্বায়ত্ত্বশাসন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পেয়েছিল তা এখন মোটেও কার্যকর নয়। মেরুদন্ডহীন বিশ্ববিদ্যালয় গুলো বিশ্ববিদ্যালয় নামের কংকাল ছাড়া আর কিছুই নয়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে গবেষণা নেই বললেই চলে। শিক্ষকেরা গবেষণার মুল্যবান সময় দলীয় লেজুড়বৃত্তির পেছনে খরচ করতেই বেশি স্বাছ্যন্দ বোধ করেন। তার বাইরে উনারা আর একটা কাজ করে বেশি আরাম পান যেটা করে তা হল, একটা কাল্পনিক সামন্ততান্ত্রিক জগতে বাস করা, যেখানে উনারা শাসক আর দল বিহিন সাধারন ছাত্ররা প্রজা। অবশ্য উনাদের মাঝে ব্যতিক্রম শিক্ষকের সংখ্যা একেবারে কম না হলেও উনারা প্রভাবশালী দের কারনে কোণঠাসা। ৯০ তে গণতান্ত্রিক সরকার ফিরিয়ে আনতে দলমত নির্বিশেষে যে ছাত্ররা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন তারা আজ বহু বিভক্ত। আন্দোলনের মেরিট এখন রাস্তাঘাট অবরোধ, গাড়িঘোড়া ভাংচুর, আর নাগরিক ভোগান্তির মাঝে সীমাবদ্ধ।
এক কথায় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ফাংশনালিটি ঠিক রাখার মত কোন সুস্থ অঙ্গ আর নেই।

তো এই রাষ্ট্রে যে আমরা ১৬ কোটির বেশি মানুষ বাস করি, খাই-দাই-ঘুমাই-স্বপ্ন দেখি, নতুন প্রজন্ম তৈরি করি, গারমেন্টসে কাজ করি, মজুরি করি, চাকরি করি, রেমিটেন্স পাঠাই তাদের কী জীবনের আর কোন উদ্দেশ্য থাকতে নেই? আছে। ঐ যে বললাম আমরা স্বপ্ন দেখি। স্বপ্ন দেখি মোটামোটি আইনের শাসন আছে এমন একটা সভ্য সমাজ যেখানে আপনি-আমি একটু নিঃশ্বাস ফেলতে পারি। আপনি-আমি সবাই কমবেশি স্বপ্ন দেখি, মুখে না বললেও আমরা চাই এই সবের অবসান হোক। কিন্তু কথা হইতে পারে যে আপনি তো বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে হতাশ, কথা বলেন না, বাংলাদেশের রাজনীতির কথা উঠলে নাক সিটকান, উপেক্ষা করেন, বলেন যে কিচ্ছু হবে না। ভাবেন বাংলাদেশের রাজনীতি করে চোর-বাটপার-সন্ত্রাসী, আওয়ামীলীগ-বিএনপি-জামাত আর ছাত্রলীগ-ছাত্রদল। ……সত্যিই কি তাই ? নাহ, আসলে আপনি মুখে বললেও সত্যি সত্যি রাজনীতি অসচেতন না, আপনি ঠিকি রাজনীতি নিয়ে ভাবেন, প্রতিদিন এইসব অরাজকতা দেখেন তারপর হতাশ হয়ে যান। হতাশ হওয়া অবশ্য দোষের কিছু না, আমরা মানুষ হিসেবে হতাশ হব এইটাই স্বাভাবিক। তাই বলে আপনি নিশ্চই চোখ বন্ধ করে বসে থাকেন না। আপনি চায়ের টেবিলে, ফেসবুকে, ঘরোয়া আড্ডায় ঠিকি কিছুটা আলাপ করেন, না করলেও আপনার বন্ধুদের আলাপ শুনেন, পত্রিকাতে দেশের খবর নেন, তা না হলেও টিভি খুলে মাঝে মধ্যে টকশো দেখেন। আর যদি একবারেই হতাশ হন তো কেউ কেউ শেষমেশ তাবলিগ-জামাত এ স্পিরিচুয়াল পিস খোঁজেন। এবং আমাদের জীবন বয়ে চলে। আবার ঘুম থেকে উঠি, দাঁত ব্রাশ করে নাস্তা খেয়ে লাইনে দাড়িয়ে টিকিট কেটে নয়তো সিএনজি-ট্যাক্সিক্যাবের সাথে যুদ্ধ করে কাজে যাই। সন্ধ্যায় একই কায়দায় বাসায় ফিরি। কিন্তু তাতে কি আপনার রাজনীতি ভাবনা থেমে থাকে, একেবারে রাজনীতি ভুলে যান? আসেন আরেকটা উদাহরন দেই, এই যে আমেরিকায় নির্বাচন হইল, তো আপনি কি এইটা নিয়া মাথা ঘামান নাই, ট্রাম্প জিতছে এতে আপনি বিরক্ত বা হতাশ হন নাই? হইছেন। বিরক্ত না হইলেও এইসব দেইখা মজা পাইছেন। আমরা কমবেশি সবাই রাজনীতি সচেতন। কেউ প্রকাশ করন, কেউ করেন না। কথা হইল আপনার এই সচেতনতা দরকার আছে। আপনি এই দুনিয়ায় বাচতে চাইলে আপনার রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে হবে, অভিমত দিতে হবে। এটা যেমন আপনার অধিকার তেমনি কর্তব্য। আপনার সক্রিয় উপস্থিতি যতদিন না পর্যন্ত শাসকের কান পর্যন্ত পৌঁছাবে, আর সে চিৎকার শাসকের কানের পর্দা ছিদ্র করবে আপনি আপনার প্রাপ্য বুঝে পাবেন না। আপনার অধিকার, আপনার সম্পদ তা অন্যের অবৈধ দখলে থাকবে।

আসেন শেষমেশ একটা সহজ আলাপ করি। ধরুন, আপনি আমি ও তৃতীয় কোন ব্যক্তি একটি সমাজের ভিন্ন ভিন্ন অংশের সদস্য এবং যথারীতি নিপীড়নে অভ্যস্ত্ শাসক সমাজ আপনাকে নিপীড়ন করে যাচ্ছে অথবা ঐ তৃতীয় ব্যক্তি আপনাকে অন্যায় অত্যাচার করে কিন্তু রাষ্ট্র আপনাকে অত্যাচার থেকে মুক্ত না করে উলটো তাকে সাহায্য করছে। এখন আমি যদি আপনার উপর রাষ্ট্র বা শোষকের অন্যায় আক্রমনের প্রতিবাদ না করি, চুপ থাকি তাইলে সাময়িক কালে আমি হয়তো ভুক্তভোগী না, আমি হয়ত উপেক্ষা করে ঝামেলার বাইরে থাকলাম। কিন্তু এইটা কী ভাবছেন আমি কিন্তু অপশাসনের অন্যায়, অনৈতিক এবং বেয়াইনী কর্মকে মৌন সম্মতি দিয়া দিলাম। শোষক কিন্তু এই অন্যায় কাজে অভ্যস্ত হয়ে গেল, রাষ্ট্র তাঁর স্বাভাবিক কাজ না করে, আইনের সুরক্ষা না দিয়ে এই অন্যায়-অবিচার একদিন আমার সাথেও করে বসবে অন্য কোন অছিলায়। তখন আর আমার কিছু করার থাকবে না। এক্ষেত্রে আমার কি উচিত হবে না যে আপনার ন্যায় স্বার্থে পাশে দাঁড়ানো, একজন সুনাগরিক হিসেবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা?

রেফারেন্সঃ
১। http://tinyurl.com/hc7v8e2
২। http://tinyurl.com/h4ng67z
৩। http://en.banglapedia.org/index.php?title=Mujibnagar_Government
৪। হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্রঃ তৃতীয় পত্র, পৃষ্ঠা ৪
৫। http://bdlaws.minlaw.gov.bd/bangla_pdf_part.php?id=957
৬। http://www.jugantor.com/old/window/2014/11/01/167546

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

9 + 1 =