একজন সংখ্যালঘু বলছি

এদেশে হিন্দু ও অন্য ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যালঘু বলে ডাকা হয়। এটা রাষ্ট্রীয় ভাবেই স্বীকৃত। সেদিন কোন একটা খবরে পড়লাম, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলছেন, ‘সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সবার’। নিসন্দেহে উনি একটা মহৎ কথা বলেছেন। নির্যাতিতের পাশে সবাইকে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

কিন্তু সংখ্যালঘু কেন? হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান কেন নয়? ৭১ তো আমাকে এ কথা বলেনি! শেখ মুজিব তো বলেছিল এদেশটা সবার, তাহলে নিজের দেশে একজন হিন্দু বা বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষকে কেন সংখ্যালঘু উপাধি নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে? যেখানেই যাও সেখানেই অবহেলা কারণ তুমি সংখ্যালঘু। অফিসে,রাস্তায় তোমাকে নিজের ধর্ম নিয়ে নানা কটুকথা শুনতে হবে এবং সংখ্যালঘু বলে বুকটা ফেটে যাওয়া সত্ত্বেও তোমাকে হাসি হাসি মুখ করে থাকতে হবে যেন সংখ্যাগুরু ভাইটা কষ্ট না পায়।

কই আমার সংবিধানে তো রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম ছিলো না। আমার সংবিধান তো ছিলো ধর্মনিরপেক্ষ। আমার ৭১ আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল একটা ধর্মান্ধ উগ্র জাতির হাত থেকে ত্রিশ লক্ষ শরীরের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া বাংলাদেশ হবে সবার। হ্যাঁ বাঙালি জাতির পিতা তার কথা রেখেছিলেন। এদেশের সংবিধান ছিল ধর্মনিরপেক্ষ। এরপর জেনারেল এরশাদ এসে রাষ্ট্র ধর্ম করে দিল ইসলাম, যা স্বাধীনতার চেতনার সাথে একদম যায়না। তারমানে জেনারেল এরশাদ এসে যেটা করলেন সেটা হল পাকিস্তানী চেতনা থেকে বের হয়ে আসা বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তানে পরিণত করলেন। এরশাদের সেই স্বাধীনতার চেতনা পরিপন্থি পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সেদিন প্রতিবাদ জানিয়েছিল বাংলাদেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামলীগ ও বিএনপি। এরশাদের সেদিনের সেই রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সংবিধানে আনার ঘটনা বাংলাদেশে সৃষ্টি করলো মুসলমান ও অমুসলমানের। এরপর জেনারেল এরশাদ ক্ষমতাচ্যুত হন।

ক্ষমতায় আসে সেদিনের সেই দুই আন্দোলনকারী দল আওয়ামলীগ ও বিএনপি। অথচ তারা কেউই আর সে বিষয়ে কোন উদ্যগ নেয়নি। কারণ পাকিস্তানী প্রেতাত্মা ততদিনে চেপে বসেছে বাঙলার আনাচে কানাচে। বিএনপির শরিক ছিল ৭১ এর স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি জামায়াত। তারা তো চাইবেই বাংলাদেশ একটু একটু করে পাকিস্তান হয়ে উঠুক। এরপর আওয়ামলীগ ক্ষমতায় আসলো। আদালতে রায় হল রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল থাকবে। আদালতের রায়ের ব্যাপারে আমার কোন মন্তব্য নেই। মন্তব্য করবো জনগণের মানসিকতা নিয়ে।

৭১ কে যদি আমরা বুকে ধারণ করতাম তাহলে সেদিন দেখতাম রাস্তায় মানুষ নেমেছে একটা ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের দাবিতে। উহু আমরা ৭১ ভুলে গেছি। আমাদের মাটি থেকে ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত শুকিয়ে গেছে। তা না হলে মুক্তিযুদ্ধের মুল চেতনা থেকে বের হয়ে আসতে পারতাম না। বাংলাদেশ যে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হবে, মুক্তিযুদ্ধের কালে সেটা ছিল আমাদের বাংলাদেশের আপামর জনগণের প্রানের দাবি। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ এম কামরুজ্জামান সে সময়ে একাধিক বক্তৃতায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় তিন নীতির—গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার—ঘোষণা দিয়েছিলেন।

পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিরূপে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে রেসকোর্সের জনসভায় বঙ্গবন্ধু সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন যে, ‘বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র “বাংলাদেশ” রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা।’ পরে তিনি এর সঙ্গে আরো একটি নীতি যোগ করেন—জাতীয়তাবাদ। ১৯৭২ সালে এই চার নীতিই বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্র-পরিচালনার মূলনীতিরূপে গৃহীত হয়। এরপর পালটে যায় সব এক এরশাদের হাতের ইশারায়। স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি বলে যে আওয়ামলীগকে জানি তারাও আর ফিরে যেতে চায় না বাহাত্তরের সেই সোনালী সংবিধানে। কারণ বাঙালির মগজে ইতিমধ্যে এক ভয়ানক পাকিস্তান ঢুকে গিয়েছে ইতিমধ্যে। এখন যে বা যারাই সংস্কার করতে যাবে তারাই জনপ্রিয়তা হারাবে।

ভোটের রাজনীতিতে জনপ্রিয়তা হারানোর মত সততা আমি কারও ভেতরেই দেখিনা। সামরিক শাসক এরশাদ যেদিন বললেন রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম তার কিছু পর থেকেই মুলত অন্যান্য সম্প্রদায়ের উপর শুরু হয় অত্যাচারের মুল পর্ব। ভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙার পর কি পরিমানে হিন্দু নির্যাতন হয়েছিলো সে তথ্য স্পস্ট ভাবে আমাদের পাওয়ার আর কোন উপায় না থাকলেও ২০০১, ২০১২, ২০১৬ থেকে বেশ পরিস্কার ধারণা পাওয়া যায়। এই নির্যাতনের সাথে, এই সম্প্রীতি নষ্টের সাথে রাষ্ট্রের মুল মালিক মুসলমান যেহেতু রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম তত্বের এক দারুণ যোগাযোগ রয়েছে।

আজকের একটা ঘটনা দিয়ে শেষ করি। ঘটনাটা আজ বিকেলের। একদল মানুষ ত্রান নিয়ে যেতে চাচ্ছিলো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে। পুলিশ তাদের বাধা দেয়। কারণ সেখানে গিয়ে সমাবেশ জাতীয় কিছু করলে নাকি দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেঁধে যেতে পারে। দ্বিতীয় পক্ষ কারা? সেই হামলাকারীরা? এরকম নির্লজ্জ একটা হামলা যারা চালালো তাদের সাথে সংঘর্ষের ভয়ে যখন আমাদের প্রশাসন নাসিরনগরে ত্রান নিয়ে যেতে দিতে চান না তখন হতাশা আরও আঁকড়ে ধরে। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে বাংলাদেশ আমিও তোমার সন্তান- এ মাটিতেই আমি বেড়ে উঠেছি, অথচ তুমি কি দারুণ অচ্ছুৎ বানিয়ে রেখেছো আমাকে!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “একজন সংখ্যালঘু বলছি

  1. ক্ষমতায় আসে সেদিনের সেই দুই
    ক্ষমতায় আসে সেদিনের সেই দুই আন্দোলনকারী দল আওয়ামলীগ ও বিএনপি। অথচ তারা কেউই আর সে বিষয়ে কোন উদ্যগ নেয়নি।
    কারণ এটাকে বলে রাজনীতি। এরা আসলে তখন এরশাদের বিরোধিতার করার জন্যই তার রাষ্ট্রধর্ম কনসেপ্টটার বিরোধিতা করেছে। তখনও হয়ত তারা ব্যাপারটাকে মানতো না। বিরোধিতা করার সেটা একটা পন্থা বা ইস্যু বলেই বিম্পি বলুন আর আওয়ামিলিগ বলুন- আন্দোলন করেছে।
    আসলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে কিচ্ছু নেই। আওয়ামিলিগ এটা বেচেই খাচ্ছে এখন। তা না হলে সাঁওতাল দের উপর এই যে নির্যাতনটা সেটাকে একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা কোন মন্ত্রী বলতে পারেন?
    লিখেছেন ভাল। প্রব্লেমটা হলো এদেশের হিন্দুরা ভীত হয়ে আছে। তারা যদি সবাই স্পিক আউট করতো, তবে হয়ত চিত্রটা অন্য হতে পারতো। মনে মনে ঘৃণা রেখে লাভ নেই, যদি না সেটা প্রকাশিত হয়। আমরা সেই হামলাকারীদের ঘৃণা করি, সেটার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে হবে কথায়, লেখায়। যেটা অনেকেই করছেন না। হ্যা, এমনকি হিন্দু হলেও না, যদিও তার লেখার বা বলার ক্ষমতা আছে।
    প্যাথেটিক

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

42 − 38 =