লাল মৌলানাঃ যে উত্তরাধিকার আমরা গ্রহণ করি

২০১০এর ডিসেম্বরে ঢাকাভিত্তিক ইংরেজি দৈনিক নিউ এইজের সম্পাদক নুরুল কবীর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মৌলানা ভাসানি ফাউণ্ডেশন আয়োজিত মৌলানা ভাসানির ওপর অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারের জন্য একটি প্রবন্ধ ল্যাখেন। ২০১১র ১৪-২৬ নভেম্বর ১৩টি কিস্তিতে এই প্রবন্ধটির পরিবর্ধিত সংস্করণ প্রকাশ হয় নিউ এইজে। প্রকাশ হওয়ার পরপরই এই লেখাটি দৃষ্টি আকর্ষণ করে গণসংহতি আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকির। তিনি প্রবন্ধটিকে রাজনীতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করায় এটিকে একটি গ্রন্থ আকারে প্রকাশ করার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেন। ২০১২র ফেব্রুয়ারিতে অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশ হয় দি রেড মৌলানাঃ এন এসে অন ভাসানীজ এভার-অপোজিশনাল ডেমোক্রেটিক স্পিরিট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইমেরিটাস সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ঢাবির ইংরেজি বিভাগে তাঁর সাবেক ছাত্রের লেখা বইটির ফরওয়ার্ড লিখেছেন। ২০১৪ থেকে এই দেশে যে অনিশ্চয়তার কাল শুরু হয়েছে তাতে সমাজপরিবর্তনকামীদের কাছে মৌলানা আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন। শাসকগোষ্ঠী তাঁর বিরুদ্ধে চালাচ্ছে নৈঃশব্দের ষড়যন্ত্র, পাশাপাশি চলছে, তাঁকে খন্ডিত ও বিকৃতভাবে উপস্থাপন। এই সময়ে তাঁকে পলিটিকালি ডিফেন্ড করা জরুরী। আর সেই বিবেচনায় এই ওয়েল-রিসার্চড বইটি অবিকল্প। আমার লেখাটি প্রচলিত অর্থে বুক রিভিউ নয়। আমি বইটি থেকে মৌলানার জীবনের টার্নিং পয়েন্টগুলো চিহ্নিতকরণের একটি চেষ্টা চালিয়েছি এই লেখায়, আর যেখানে যেখানে আবশ্যক বলে মনে করেছি, ব্যক্তিগত পঠনপাঠন থেকে প্রাসঙ্গিক তথ্য/মত যুক্ত করেছি। আপনারা উপকৃত হলে আমার পরিশ্রম স্বার্থক হবে।

উনিশ শতকের শেষদিকে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার সিরাজগঞ্জের এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে একটি পুত্রশিশুর জন্ম হয়, যার ভালো নাম রাখা হয় আবদুল হামিদ খান, আর ডাকনাম চ্যাগা মিয়া। তিনি শৈশবেই তাঁর বাবা মা দুজনকেই হারান। ছিলেন এক আত্মীয়ের আশ্রয়ে, যার হাতে নির্মমভাবে প্রহৃত হতেন গরু চড়ানোর কাজে দক্ষতা দেখাতে না পারায়, এই অত্যাচার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায় ১৮৯৩তে বেরিয়ে পড়েন পৃথিবীর পথে। নেন ক্ষেতমজুরের কাজ। সামন্ত-অভিজাততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা তাঁর স্নায়ুতে যন্ত্রণা তৈরি করে, মানুষে-মানুষে জমিভিত্তিক বৈষম্য তিনি নিতে পারেন না, হয়ে ওঠেন বিদ্রোহী। কৃষক ক্ষেতমজুরদের প্রতি শ্রেণী মৈত্রী, আর জমিদার ও মহাজনদের প্রতি শ্রেণী ঘৃণায়, তাঁর হৃদয় পরিপূর্ণ করে ওঠে। এই আবেগ দ্বারাই সারাজীবন চালিত হয়েছেন তিনি।

আসামে এসেছিলেন তিনি জনৈক পীরের মুরিদ হতে। উদ্দেশ্য ছিলো সরল, পীরের সেবাযত্ন করা আর তাঁর মালসামান টানা, এবং এলাকায় কোনো ধর্মীয় কাজে অংশ নেবার পরে পেট ভরে খাওয়া। কিন্তু সহমুরিদদের সাথে মিশতে গিয়ে উপলব্ধি করলেন, আখেরাত অনেক দূর, দুনিয়ার জীবনেই হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকা বিপর্যস্ত হচ্ছে। ক্রমশ তিনি দুনিয়াবি জীবনেই আগ্রহশীল হয়ে উঠলেন। তাই তিনি আসামের গরিব বাঙালি অভিবাসীদের স্বার্থবিরোধী লাইন সিস্টেম আর বাঙালি খেদাও প্রোগ্রামের বিরুদ্ধে সুদৃঢ় অবস্থান নিলেন। হওয়ার কথা ছিলো পীর, হলেন পলিটিকাল একটিভিস্ট। এটা যদি ইহজাগতিক দৃষ্টিভঙ্গি না হয়, তাহলে ইহজাগতিকতা কি, সে আমার জানা নেই।

দেওবন্দে যান ১৯০৭এ, উপমহাদেশের বিখ্যাত দারুল উলুম দেওবন্দে পাঠ নিতে, থাকেন ১৯০৯ পর্যন্ত। সেখানে সাক্ষাৎ পান শায়খুল হিন্দ মাহমুদুল হাসানের, যিনি কোরান ও হাদিসে সুপণ্ডিত ছিলেন, এবং দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন ভারতবর্ষ থেকে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শক্তিকে তাড়াতে হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের বিকল্প নেই। সাক্ষাৎ পান আরেকজনের, তিনি, মৌলানা আজাদ সোবহানি। বাজারে কানাঘুষো ছিলো আজাদ সোবহানি আসলে কমিউনিস্ট। এর প্রতিক্রিয়ায় তিনি মুচকি হেসে বলতেন, “হ্যাঁ, আমি কমিউনিস্ট, তবে আল্লাহকে সাথে নিয়ে”। অবিভক্ত ভারতের ঐক্যবদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টি বিভিন্ন মিটিংসমাবেশে ডাকতো আজাদ সোবহানিকে, যেমনটা জানা যায়, অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদের সূত্রে। তরুণ আবদুল হামিদের ওপর এঁদের প্রভাব পড়ে।

এই সময়ই গড়ে ওঠে তাঁর রাজনীতিক দর্শন। এটাকে বলে রুবুবিয়াহ। রুবুবিয়াহ শব্দটি এসেছে আরবি রব শব্দ থেকে। এই দর্শন অনুসারে দুনিয়ার সবকিছুর মালিক রব, অর্থাৎ সৃষ্টিজগতের প্রতিপালক, মুসলমানদের বিশ্বাসে আল্লাহ। রুবুবিয়াহের কনসেপ্ট অনুযায়ী, যেহেতু আল্লাহ সবকিছু সৃষ্টি করেছেন মানুষের জন্য, তাই মানুষ সবকিছু সমতার সাথে ভোগ করবে। মানুষে মানুষে কোনো ধরণের ভেদাভেদ থাকবে না, মাথার ওপর আল্লাহকে রেখে, মানুষ সমান। এই দর্শন লোকজ ঐতিহ্যের ভেতর থেকেই সরাসরি সামন্ত-অভিজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, শুধু তাই নয়, আখেরে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধেও দাঁড়ায়।

ইদানিং অনেকেই ভাসানীকে ‘ইসলামি সমাজতান্ত্রিক’ আখ্যায়িত করছেন। এই চিন্তাটা অদ্ভূত। তিনি যা চাইতেন তা হচ্ছে ইসলামের সামন্ত-অভিজাততান্ত্রিক মূলধারার বিপরীতে একটি সমাজতান্ত্রিক ধারা দাঁড় করাতে, জর্মন ধর্মতাত্ত্বিক ও কৃষক বিদ্রোহী টমাস মুনজের (১৪৮৯-১৫২৫) যেভাবে ক্রিশ্চিয়ানিটির সমাজতান্ত্রিক ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে সামন্ত-অভিজাততান্ত্রিক ক্যাথলিক চার্চ ও সামন্ত-অভিজাততন্ত্রের সাথে আপোসকামী লুথারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন।

বিশ শতকের সূচনালগ্নে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে যে বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের সূত্রপাতে হয়েছিলো ভাসানী তাতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯০৯ থেকে ১৯১৩। ১৯১৩তে তাঁর মনে হয় জনবিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসবাদী তৎপরতার মাধ্যমে সমাজপরিবর্তন সম্ভব নয়, তিনি পথ পাল্টান, এবং রাজশাহী-টাঙ্গাইল-গৌরিপুর-সিরাজগঞ্জে জমিদারদের বিরুদ্ধে কৃষকদের সংগঠিত করা শুরু করেন। এতে উপনিবেশিক কর্তৃপক্ষ তাঁর ওপর বেজার হয়। প্রথমে তাঁকে পারসোনা নন গ্রাটা ঘোষণা করা হয় ময়মনসিংহে, এরপর পাবনা-রাজশাহী অঞ্চলে, এক সময় সমগ্র বাংলা প্রদেশে। তিনি উপনিবেশিক ‘আইনশৃঙ্খলার’ জন্য হুমকি হয়ে উঠেছিলেন। কর্তৃপক্ষের চোখে ‘সন্ত্রাসবাদী’।

১৯১৭তে ভাসানী ময়মনসিংহে একটি অনুপ্রেরণামূলক ভাষণ শোনেন। এবং প্রথমবারের মতো পার্টিজান রাজনীতিতে যোগ দেন। ভাষণটি ছিলো সর্বজনশ্রদ্ধেয় রাজনীতিবিদ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের। দাশের ইহজাগতিক গণতান্ত্রিক চিন্তাভাবনায় মুগ্ধ হয়ে যান ভাসানী, এবং, নিজেকে যুক্ত করেন ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের নানাবিধ কর্মকাণ্ডে। ১৯১৯এ এসে তিনি দলটির প্রাথমিক সদস্য হন এবং নিজেকে নিয়োজিত করেন সার্বক্ষণিক রাজনীতিতে।

১৯২৪এ আসামের ভাসান চরে তিনি অভিবাসী বাঙালি কৃষকদের এক বিশাল কনফারেন্স আয়োজন করেছিলেন, এখান থেকেই তিনি পান ‘ভাসানের মৌলানা’ উপাধি, কালক্রমে আবদুল হামিদ খানকে ছাপিয়ে ওঠে ‘মৌলানা ভাসানী’।

রক্তেমাংসে বাঙালি হলেও জাত্যাভিমানি ছিলেন না ভাসানী। তাই যখন তিনি খেয়াল করলেন কিছু অসাধু বাঙালি ব্যবসায়ী সাধারণ অবাঙালি ও অমুসলিম অহমিয়দেরকে ক্রয়বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন একক ব্যবহার করে ঠকাচ্ছে তিনি এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। এবং শেষ পর্যন্ত ক্রয়বিক্রয়ের ক্ষেত্রে একই একক ব্যবহার করতে বাধ্য করেন এই বাঙালি ব্যবসায়ীদের যাতে অবাঙালি ও অমুসলিম অহমিয়রা উপকৃত হয়।

ভারতীয় মুসলমানরা কংগ্রেসের রাজনীতিতে টিকতে পারেন নাই, হিন্দু মহাসভার প্রকাশ্য এবং ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের প্রচ্ছন্ন হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা তাঁদেরকে ঠেলে দিয়েছে মুসলিম লিগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির দিকে, দুর্ভাগ্যবশত ভাসানীর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে এবং ১৯৩০এ তিনি মুসলিম লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন। তিনি ঠিক সেই কারণেই পাকিস্তান চেয়েছিলেন পূর্ববাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান যেই কারণে পাকিস্তান চেয়েছিলো। চল্লিশের দশকে কমিউনিস্টরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নামে ‘গান্ধী জিন্নাহর’ হাত মেলানোর সর্বনাশা লাইন নিয়েছিলো, এতে কমিউনিস্ট আন্দোলনের বারোটা বেজে গেছিলো, লাভ হয়েছিলো ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস এবং মুসলিম লিগের। ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ আর জমিদার-মহাজনদের বিরুদ্ধে কৃষকদের যে অসাম্প্রদায়িক শ্রেণী সংগ্রাম, তাঁকে, সুচতুরভাবে মুসলিম লিগ হিন্দুর বিরুদ্ধে মুসলমানের সাম্প্রদায়িক সংগ্রামে রূপান্তরিত করে। পূর্ববাংলায় এই কাজে সে বিশেষভাবে সফল হয়, ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের স্বার্থে ভূমিবন্দোবস্তের সাম্প্রদায়িক চরিত্রের কারণে, অধিকাংশ জমিদার-মহাজন বর্ণহিন্দু আর কৃষকরা মুসলমান হওয়ায়। যে-কথাটা শুনতে অনেকেরই অস্বস্তি হয়, সেটা হচ্ছে, ১৯৪৭এ পূর্ববাংলার নমঃশূদ্ররা অধিকাংশই পাকিস্তান চেয়েছিলো। বরিশালের যোগেন মণ্ডল একটা বিখ্যাত চরিত্র, যাঁকে নিয়ে আস্ত উপন্যাস লিখেছেন দেবেশ রায়, আরো অনেককেই পাওয়া যাবে।

১৯৪৪এ তিনি আসাম মুসলিম লিগের প্রেসিডেন্ট হন।

ভাসানী মুসলমান ছিলেন, বাঙালি ছিলেন, এবং এই পরিচয়দুটিতে তিনি কোনো বিরোধ দেখতেন না। মাতৃভাষা বাংলার প্রতি তাঁর আন্তরিক ভালোবাসা ছিলো। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হওয়ার পরই যখন জিন্নাহ শুধু উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দিতে চাইলেন, তখন অন্য বাঙালিদের মতো তিনিও এর বিরোধিতা করেন, এবং সর্বদলীয় রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হলে তিনি এর প্রেসিডেন্ট হন।

১৯৪৮এ ভাসানী মুসলিম লীগ থেকে পদত্যাগ করেন। এর কারণ তাঁর মনে হয়েছিলো মুসলিম লিগ পাকিস্তানের জনগণের সাথে বেঈমানি করেছে, বিশেষত, পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের জনগণের সাথে। ১৯৪৯এর জুনে তিনি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামি মুসলিম লীগ গঠন করেন, এর ঠিক ছয় মাস পর ১৯৫০এর ফেব্রুয়ারিতে, হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দি গঠন করেন নিখিল পাকিস্তান আওয়ামি মুসলিম লীগ। শুরুতে এই দুয়ের ভেতর সম্পর্ক ছিলো না, ভাসানীরটা ছিলো পূর্ববঙ্গীয় পার্টি, সোহরাওয়ার্দিরটা সর্বপাকিস্তানী। ১৯৫১য় পশ্চিম পাঞ্জাবের মামদোতের নবাব-কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত জিন্নাহ মুসলিম লিগের সাথে একীভূত হয়ে যায় সোহরাওয়ার্দির নিখিল পাকিস্তান আওয়ামি মুসলিম লীগ; গঠিত হয় নিখিল পাকিস্তান জিন্নাহ আওয়ামি মুসলিম লীগ। ১৯৫১র শেষদিকে আদি ও আসল মুসলিম লীগের কাছে পূর্ব পাঞ্জাবের প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচনে নিখিল পাকিস্তান জিন্নাহ আওয়ামি মুসলিম লীগ পরাজিত হলে সোহরাওয়ার্দি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামি মুসলিম লীগের সাথে মার্জড হয়ে যাওয়ার পদক্ষেপ নেন। এই অশুভ রাজনীতিক বিবাহটি ঘটে ১৯৫২র ডিসেম্বরে, ভাসানী তখন জেলে, ১৯৫৩তে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কমিটি এটাকে নির্দিষ্ট শর্তাধীনে অনুমোদন দেয়।

ভাসানী নেতৃত্ব নেন, এবং ১৯৫৩র পার্টি কাউন্সিলে তিনি পরিষ্কারভাবে বলেন, মার্জড হওয়ার পরেও পূর্ব পাকিস্তান শাখা আঞ্চলিক সমস্যা নিয়েই মাথা ঘামাবে কারণ পাকিস্তানের দুইদিকের সমস্যা একরকম নয়।

ভাসানী ১৯৫৩র নভেম্বরে পার্টির কাউন্সিল সেশনে প্রস্তাব আনেন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামি মুসলিম লীগের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি সরিয়ে দিয়ে পূর্ববাংলার সকল ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য পার্টিকে উন্মুক্ত করতে। সোহরাওয়ার্দি এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন, ‘ট্যাকটিকাল গ্রাঊণ্ডে’, সবাইকে চমকে দিয়ে রাজনৈতিকভাবে সোহরাওয়ার্দির শিষ্য বলে পরিচিত শেখ মুজিবুর রহমান ভাসানীর পক্ষে অবস্থান নেন। সবাই আরেকটা কারণে চমকেছিলো, মাত্র চারবছর আগে ১৯৪৯এ অলি আহাদ যখন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের একটি মিটিংএ একটা প্রস্তাব এনেছিলেন মুসলিম শব্দটি ছাত্রলীগের নাম থেকে সরিয়ে দেয়ার, শেখ মুজিবুর রহমান এর বিরোধিতা করেছিলেন। মাত্র চারবছরে মুজিবের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তনের কারণ কি? ভাষা আন্দোলনের প্রভাব। বদরুদ্দীন উমর সম্ভবত এই কারণেই বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনকে ‘বাঙালি মুসলমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’ বলেন। পরে ঘটনাপ্রবাহের বিকাশের সাথে সাথে একসময় ছাত্রলীগের নাম থেকে মুসলিম বাদ দেয়া হয়।

১৯৫৩র ডিসেম্বরে একটি ঐতিহাসিক ঐক্যজোট গঠিত হয়। মৌলানা ভাসানীর পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামি লিগ আর শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টির মধ্যে। যা যুক্তফ্রন্ট নামে ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছে এবং যা পূর্ববাংলার মাটিতে মুসলিম লীগের রাজনীতি অপ্রাসঙ্গিক করে দিয়েছিলো।

১৯৫৫র অক্টোবরে মৌলানা ভাসানীর প্রায়-একক প্রচেষ্টায় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামি মুসলিম লীগের নাম থেকে মুসলিম সরিয়ে দেয়া হয় এবং এভাবেই; অন্তত আনুষ্ঠানিকভাবে; পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামি লীগ নামক একটি অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিক দলের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৫৬তে পাকিস্তানের কন্সটিটিউয়েন্ট এসেম্বলি সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে হিন্দু-মুসলিম পৃথক নির্বাচনের আয়োজন করতে চাইলে তিনি এর তীব্র বিরোধিতা করেন। অসাম্প্রদায়িকতার অকাট্য প্রমাণ রাখেন তিনি ১৯৬৭র ২৭ জুন দেয়া একটি প্রেস স্টেটমেন্টে, যেই স্টেটমেন্টে তিনি, সামরিক স্বৈরাচারী আইয়ুব খানের পাকিস্তানে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানান।
১৯৫৪তে প্রধানত হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দির আগ্রহেই পাকিস্তান মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে কিছু সামরিক মৈত্রীজোটে ঢোকে যা সিয়াটো ও সেন্টো বলে ইতিহাসে কুখ্যাত। শেখ মুজিবুর রহমান শুরুতে এই চুক্তির বিরুদ্ধে থাকলেও সোহরাওয়ার্দির প্রভাবে তা মেনে নেন। ইত্তেফাক পত্রিকার প্রভাবশালী সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে কনভিন্স করতেও সোহরাওয়ার্দির খুব একটা বেগ পেতে হয় নি।

আনকনভিন্সড থাকেন একজন। ভাসানের মৌলানা। মৌলানা ভাসানী।

১৯৫৭র ৭-৮ ফেব্রুয়ারির কাগমারি সম্মেলনে মৌলানা পাক-মার্কিন সামরিক মৈত্রীজোট বাতিল করার দাবিসম্বলিত প্রস্তাব আনেন, এই ঐতিহাসিক সম্মেলনেই তিনি পাকিস্তানকে ‘আসসালামু আলাইকুম’ জানিয়ে রাস্তা দেখিয়ে দিয়েছিলেন, যার কারণে তাঁকে বলা হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে শুরু হয়েছে স্নায়ুযুদ্ধের যুগ, একদিকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক শিবির। মৌলানা চাইছিলেন একটি জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্র নীতি। কিন্তু হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দি ছিলেন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদপন্থী। আর পার্টিতে আতাউর রহমান খান, শেখ মুজিবুর রহমান, খন্দকার মোশতাক আহমেদ ছিলেন সোহরাওয়ার্দিপন্থী। তাঁদের বিরোধিতায় মৌলানার প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায়। আওয়ামি লিগে রাজনৈতিক সুবিধাবাদী ঝোঁক জয়যুক্ত হয়।

১৯৫৭র ২৪ জুলাই। ভাসানের লাল মৌলানা একদিন যে পার্টি নিজের হাতে তৈরি করেছিলেন অভিমান করে সেই পার্টি ছেড়ে বেরিয়ে যান। এবং গড়ে তোলেন ন্যাশনাল আওয়ামি পার্টি (ন্যাপ)।

১৯৫৮র শেষদিকে পাকিস্তানে পোষাকী গণতন্ত্রেরও অবসান ঘটে এবং নেমে আসে জলপাই রঙের অন্ধকার। জেনারেল আইয়ুব খান মার্শাল ল জারি করেন ১৯৫৮র ৭ অক্টোবর, বিশ দিন পর, তিনি ইস্কান্দার মির্জার কাছ থেকে জোর করে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব নিয়ে নেন। শুরু হয় সামরিক স্বৈরাচারের দশক, আইয়ুব খানের কথিত মৌলিক গণতন্ত্রের দশক, ‘উন্নয়নের’ দশক।

পাকিস্তানের সব পার্টি, ন্যাপসহ, নিষিদ্ধ হয়ে যায়। পাকিস্তানের সামরিক জান্তা মৌলানা ভাসানিকে গ্রেপ্তার করে। শেখ মুজিবুর রহমানকেও।

মার্শাল ল’র বিরুদ্ধে শুরু হয় ছাত্র আন্দোলন। মৌলানা ভাসানী জেল থেকে মুক্তি পান ১৯৬৩তে। তিনি সামরিক জান্তার স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বিবৃতি দেন।

ষাটের দশকেই সূত্রপাত ঘটে আরেক কৌতুহলউদ্দীপক অধ্যায়ের। পঞ্চাশের দশকের শেষদিকে স্তালিনের মৃত্যুর পরই সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির সাথে গণচীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তঃমতাদর্শিক বিতর্ক চলছিলো। আন্তর্জাতিক মতাদর্শিক মহাবিতর্ক। এই মহাবিতর্কের ফলে সমাজতান্ত্রিক শিবিরে ব্রেকআপ হয়। বৈশ্বিকভাবেই কমিউনিস্ট পার্টিগুলোও দুই টুকরো হয়ে যায়, সোভিয়েত ইউনিয়নের লাইন সমর্থনকারীরা পরিচিতি পান মস্কোপন্থী হিসেবে, আর গণচীনের লাইন সমর্থনকারীরা পিকিংপন্থী হিসেবে। পাকিস্তান প্রচণ্ড কমিউনিস্টবিরোধী রাষ্ট্র হওয়ায় পাকিস্তানে কমিউনিস্টরা প্রকাশ্যে কাজ করতে পারতেন না, ন্যাপ গঠিত হওয়ার ফলে, তাঁরা কাজ করতেন ন্যাপের ছত্রছায়ায়। এই মহাবিতর্কে ন্যাপও দুই টুকরো হয়ে যায়, এই লেখায় যে অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদের রেফারেন্স টানা হয়েছে তিনি মস্কোপন্থী ন্যাপের প্রধান হন, আর ভাসানী প্রধান থাকেন চীনপন্থী ন্যাপের।

এই সময়ই রুশ ভারত মৈত্রীর সূত্রপাত হয়, পঞ্চাশের দশকে নেহেরু আর চৌ এন লাইয়ের পত্রালাপের সূত্রে যে “হিন্দি চীনী ভাই ভাই” শ্লোগান শোনা যেতো, তা হারিয়ে যায়। ভারত রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ায় পাকিস্তান চীনের দিকে ঝুঁকে উপমহাদেশে তথাকথিত ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে। ভাসানী ন্যাপ যেহেতু চীনপন্থী কমিউনিস্টদের আশ্রয়স্থল ছিলো, আর চীনপন্থী কমিউনিস্টদের মধ্যে যেহেতু সাময়িকভাবে এমন একটা ইল্যুশন তৈরি হয়েছিলো যে আইয়ুব খান চীনপন্থী, তাই আইয়ুব খানের পররাষ্ট্র নীতির বিরোধিতা থেকে মৌলানা সাময়িকভাবে বিরত থাকেন। তাছাড়া তাঁর নিজেরও গণচীনের প্রতি দুর্বলতা ছিলো, চীন বিপ্লবের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে কৃষকদের ব্যাপক অংশগ্রহণ, ভাসানী কৃষকের সন্তান। তবে পাকিস্তানে আইয়ুব খান যে সামরিক স্বৈরাচারী শাসনের সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন মৌলানা ভাসানী তাকে ছেড়ে কথা বলেন নাই। ১৯৬৮তে পাকিস্তানের দুই অংশেই যে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়, তা শ্রমিকদের অংশগ্রহণের গণঅভ্যুত্থানের চরিত্র পায় ১৯৬৯তে, এবং আইয়ুব খানকে তীব্র আন্দোলনের মুখে ২৪ মার্চ ক্ষমতা ছাড়তে হয়। এই গণঅভ্যুত্থানের অবিসম্বাদিত নেতা ছিলেন মৌলানা ভাসানী।

আইয়ুব খান ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিলেন আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের হাতে, যিনি ১৯৭০এর ৭ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচনের দিন ধার্য করেন, এবং ‘অন্তর্বতীকালীন সামরিক প্রশাসক’ হিসেবে ক্ষমতা হাতে নেন।

এর মধ্যে ঘটে যায় এক মহাদুর্যোগের ঘটনা।

নির্বাচনের ঠিক আগে, ১৯৭০এর ১২ নভেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলে এক প্রলয়ঙ্করী সাইক্লোন আঘাত হানে এবং এই সাইক্লোনে দশ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটে, চুপ থাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত মিডিয়া। মৌলানা ভাসানী ছিলেন ঢাকার এক নার্সিং হোমে, বিবিসির এক নিউজ বুলেটিন থেকে তথ্যটি পান, পেয়ে বাকরুদ্ধ হন। অসুস্থ শরীর নিয়ে ছুটে যান উপদ্রুত উপকূলে।

এই যাত্রার সময় তিনি শিশুর মতো কাঁদছিলেন।

১৯৭০এর ২২ নভেম্বর তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন এবং অনতিবিলম্বে একটা পাবলিক র্যাুলি ডাকেন। ২৩ তারিখের সেই র্যা লিতে প্রচুর লোকসমাগম হয়। ভাসানী সব বাঙালির প্রতি আহবান জানান উপদ্রুত উপকূলের মানুষজনের সর্বপ্রকার সহায়তায় এগিয়ে আসতে।

বাঙালিদের প্রতি পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর এই নির্মম উদাসীনতায় মৌলানার ধৈর্যের বাঁধ ছিড়ে যায়, এবং, ১৯৭০এর ২৩ নভেম্বরের সেই ঐতিহাসিক র্যাড়লিতে, তিনি তাঁর বক্তব্য শেষ করেন স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান জিন্দাবাদ এই রাজনীতিকভাবে অর্থবহ স্লোগান দিয়ে।

ভাসানীর নেতৃত্বে থাকা ন্যাপ নির্বাচন বয়কট করে। শেখ মুজিব-নেতৃত্বাধীন আওয়ামি লিগ নির্বাচনে অংশ নেয়। রেস্ট ইজ হিস্ট্রি।

১৯৭১এ ভারতে অন্তরীণ অবস্থায় ভাসানী সাইফুল ইসলামকে নির্বাচনে অংশ না নেয়ার কারণ হিসেবে বলেছিলেন কৌশলগত বিবেচনার কথা। তিনি ভাবছিলেন তাঁর পার্টি যদি নির্বাচনে যায়, বাঙালি ভোট ভাগ হবে, তিনি চাচ্ছিলেন মুজিব বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতুক। তাঁর হিসেবটা ছিলো এমন, মুজিবের পার্টি আনবে ভৌগলিক স্বাধীনতা, তারপরে বিপ্লব করবো আমরা।

মৌলানা ভাসানীর এই হিসাবনিকাশ কি সঠিক ছিলো?

১৯৭০এর ২২ ফেব্রুয়ারি ছাত্র ইউনিয়নের পিকিংপন্থী গ্রুপ, রাশেদ খান মেনন-নেতৃত্বাধীন, ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা’ গঠনের ডাক দিয়েছিলো। এরও আগে, পূর্ববাংলার শ্রমিক আন্দোলন’এর (পরবর্তীতে পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি) নেতা সিরাজ সিকদার সেই ১৯৬৮ সালেই সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন পূর্ববাংলা গঠনের থিসিস দিয়েছিলেন, এমনকি ১৯৭১এর মার্চে শেখ মুজিবের কাছে সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতি গ্রহণ করার আহবান জানিয়ে চিঠিও দিয়েছিলেন। শেখ মুজিব এসব ডাক শুনেও শোনেন নাই, দেখেও দ্যাখেন নাই, তিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নেগোসিয়েশন চালিয়ে গেছেন। ইয়াহিয়া খানের সাথে। ফলে পাকিস্তানের সামরিক ফ্যাশিস্তরা যখন আক্রমণ চালালো, বাঙালির কোনো যুদ্ধ প্রস্তুতি ছিলো না, এটাই ইতিহাসের তিক্ততম সত্য। ভাসানী নির্বাচনে গেলে ইতিহাস অন্যরকম হতে পারতো। অথবা নির্বাচনে না গিয়েও ভাসানী যদি পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টিকে সমর্থন দান করতেন, আস্থা রাখতেন মুজিবের বদলে সিরাজ সিকদারের ওপরে, ইতিহাস অন্যরকম হতে পারতো।

১৯৭১এর মিলিটারি ক্র্যাকডাউনের পর ভাসানী ভারতে যান, ভারত সরকার তাঁকে অন্তরীণ করে রাখে, তখন পশ্চিমবঙ্গ কাঁপাচ্ছে নকশালরা। ভাসানীর বয়স হয়ে গেলেও তিনি ভারত ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের শাসকদের জন্য থ্রেট ছিলেন। সীমান্তের দুইপারেই তখন জাতীয়তাবাদীরা বিপ্লবের ভয়ে ভীত, নকশাল আর সর্বহারা শব্দগুলো তাঁদের বুকে ত্রাস তৈরি করে, তাই ভাসানীকে অকার্যকর করে রাখতে পেরে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস ও আওয়ামি লিগ নেতৃত্ব নিশ্চয়ই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলো।

ভাসানী নিঃশর্তভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেন। যুদ্ধের মাঝামাঝি প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের একাংশ, খন্দকার মোশতাক আহমেদের উদ্যোগে, পাকিস্তানের সামরিক ফ্যাশিস্তদের সাথে নেগোসিয়েশনের চেষ্টা চালায়। ১৯৭১এর মে মাসের এক প্রেস স্টেটমেন্টে ভাসানী এই দেশদ্রোহী মানসিকতার তীব্র প্রতিবাদ জানান।

১৯৭২এর ২২ জানুয়ারি মৌলানা বাংলাদেশে পা রাখেন। ক্র্যাকডাউনের পর পাকিস্তান সামরিক ফ্যাশিস্তরা সন্তোষে তাঁর সন্ধানে গিয়ে তাঁকে না পেয়ে তাঁর কুঁড়েঘর আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছিলো। তিনি টাঙ্গাইল সার্কিট হাউজে প্রথম রাত্রিযাপন করেন, সকালবেলা, স্থানীয় হিন্দু মুসলিম জনতার ঢল নামে তাঁকে স্বাগত জানাতে।

যুদ্ধবিধবস্ত দেশে শুরু হয়ে গেছিলো লুটপাটের মচ্ছব, এই লুটপাটের একটি বিশ্বস্ত বর্ণনা পাওয়া যাবে মৌলানা ভাসানী সম্পাদিত সাপ্তাহিক হককথায়, সত্যপ্রকাশে আতঙ্কিত হয়ে আওয়ামি লিগ সরকার যার প্রকাশনা নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলো ১৯৭২এর ২৭ সেপ্টেম্বর। মৌলানা ভাসানী এই লুটপাটের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। ১৯৭২এর ৩ এপ্রিলের দৈনিক বাংলা থেকে জানা যায়, মৌলানা ভাসানী শেখ মুজিবকে সতর্ক করে বলছেন, আওয়ামি লিগের একাংশের নেতৃত্বাধীন ‘লুটপাট সমিতির’ লাগাম টেনে ধরতে, যারা শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তার অপব্যবহার করছে জনগণকে পীড়ন করতে।

আওয়ামি লিগ যখন এককভাবে সংবিধান প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নিলো, মৌলানা ভাসানী এর প্রতিবাদ করেন, এবং সকল দেশপ্রেমিক দলের অংশগ্রহণে সংবিধান সভা ডাকার আহবান জানান। আওয়ামি লিগ এই আহবানে সাড়া দেয় নাই। তারা তখন পুরনো পাকিস্তানের স্বৈরাচারের পথেই হাঁটছে।

১৯৭৩এর নির্বাচনে ভাসানী তাঁর দ্বিতীয় ভুলটি করেন। প্রথমে তিনি নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, নির্বাচনী প্রচারণার মাঝখানে, আচমকা ‘অসুস্থ’ হয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। নির্বাচনের দুই দিন আগে মুজিব হাসপাতালে আসেন ভাসানীকে দেখতে, ভাসানী পিতার মতো পুত্রসমতুল্য মুজিবের মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করে দেন, এবং এই ফটোগ্রাফ ছাপা হয় পরদিনের পত্রিকায়।

এর প্রতীকী অর্থ খুব সহজ, ভাসানী আওয়ামি লিগের ওপর বিরক্ত হলেও, ব্যক্তি মুজিবের ওপর আস্থা হারান নাই।

হারানো উচিত ছিলো।

১৯৭৩এর নির্বাচনে ব্যাপক জালিয়াতির কথা সবার জানা। প্রয়োজন ছিলো না। এই জালিয়াতি না হলেও আওয়ামি লিগই জিততো।

সেই সময়ের বাংলাদেশের অবস্থা কতোটা ভয়াবহ ছিলো, এর একটি সাক্ষ্য পাওয়া যায় বাংলাদেশ অবজারভারে, ১৯৭৩এর ৭ জুলাইয়ের। ১৯৭২এর জানুয়ারি থেকে ১৯৭৩এর এপ্রিল, এই সময়কালে, ৪৯২৫ জন গুপ্তহত্যার শিকার হয় আর রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় ২০৩৫ জন। সোনার বাংলার স্বপ্ন ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছিলো।

১৯৭৩এর সেপ্টেম্বরে মস্কোপন্থী বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি এবং মস্কোপন্থী ন্যাপ-মোজাফফরএর সাথে আওয়ামি লিগ তাঁদের ঐতিহাসিক ত্রিদলীয় ঐক্যজোট করে।

আওয়ামি লিগ গঠন করে রক্ষীবাহিনী ও লালবাহিনী। রক্ষীবাহিনী ত্রাসের রাজত্ব তৈরি করে সারা দেশে। লালবাহিনী শ্রমিক এলাকায়।

১৯৭৪এ এক মারাত্মক দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে বাংলাদেশ। ২২ নভেম্বর তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী দাবি করেছিলেন যে ২৭৫০০ মানুষ না খেয়ে মারা গেছিলো। আনঅফিসিয়াল হিসেবে সংখ্যাটা অবশ্য দুই লাখেরও বেশি।

এরকম দুর্ভিক্ষ বাংলায় হয়েছিলো আর মাত্র দুইবার। প্রথমবার পলাশীর যুদ্ধের ১৩ বছর পরে ১৭৭০এ, আর, দ্বিতীয়বার ব্রিটিশ উপনিবেশিক শক্তি ভারতবর্ষ ছেড়ে যাওয়ার আগে ১৯৪৩এ। এবার হলো ‘স্বাধীনতার’ মাত্র তিন বছরের মাথায়।

খাদ্যের অভাব চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের মূল কারণ না। অমর্ত্য সেন জানিয়েছেন। তিনি আরো বলেছেন, তাঁর বিখ্যাত গবেষণায়, ১৯৭৪এ ফলন বরং অতীতের যে কোনো বছরের চেয়ে অনেক ভালো হয়েছিলো।

এই দুর্ভিক্ষ মানবসৃষ্ট।

আরো বিশিষ্টভাবে বললে বলা যায় আওয়ামি লিগসৃষ্ট।

১৯৭৪এর ১৫ এপ্রিলের দৈনিক বাংলার এক সংবাদ থেকে জানা যায় ভাসানী শেখ মুজিবের কাছে আকুল আহবান জানাচ্ছেন রাজনৈতিক কারণে কারাগারে আটকে রাখা বামপন্থী কর্মীদের মুক্তি দেয়ার জন্য। এঁদের মানুষের ভেতর কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিলো। দুর্ভিক্ষ সামাল দিতে দরকার ছিলো অল-আউট এফোর্ট।

১৯৭৪এর ২ জুন ভাসানী সরকারকে চার-সপ্তাহের আল্টিমেটাম দেন দুর্ভিক্ষপীড়িতদের সহায়তায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের। ১৯৭৪এর ৩০ জুন একটি প্রতিবাদ সমাবেশ ডাকেন। সরকার এই সমাবেশে ১৪৪ ধারা জারি করে।

রক্ষীবাহিনীকে মোতায়েন করা হয় সমাবেশ ভণ্ডুল করতে।

৩০ জুন ভোরে মৌলানা ভাসানী গ্রেপ্তার হন। তাঁকে টাঙ্গাইলের সন্তোষে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, এবং ২৪ ঘন্টা, নজরদারিতে রাখা হয়।

১৯৭৫এর ১৫ আগস্ট পর্যন্ত মৌলানা সেখানেই ছিলেন।

১৯৭৪এর ২৮ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি মাহমুদুল্লাহ ইমার্জেন্সি ডাকেন।

১৯৭৫এর নববর্ষে সিরাজ সিকদারকে হত্যা করা হয়। সেটা ছিলো এই স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রথম ক্রসফায়ার। সেই থেকে আজো।

১৯৭৫এর ২৫ জানুয়ারি পাশ হয় চতুর্থ সংশোধনী, মুজিব প্রেসিডেন্ট হন, এবং মাসখানেক পরেই বাকশাল প্রস্তাব করা হয়। তিনি এটাকে অভিহিত করেন ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’ হিসেবে। মস্কোপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি এবং মস্কোপন্থী মোজাফফর-ন্যাপ স্বেচ্ছায় এবং আনন্দের সাথে বাকশালে যোগ দেয়। অন্যরা আণ্ডারগ্রাউণ্ডে যায়। একেবারে আনুষ্ঠানিকভাবে একদলীয় শাসনের সূত্রপাত ঘটে বাংলাদেশে। চারটি রেখে সমস্ত সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করা হয়। সোনার বাংলার স্বপ্ন তখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।

১৯৭৫এর ১৫ আগস্ট আওয়ামি লিগের মোশতাক-তাহেরুদ্দিন চক্র এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সিআইএর এজেন্টদের যৌথ পরিকল্পনায় এক সামরিক কুদ্যেতায় শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। শেখ রেহানা আর শেখ হাসিনা লন্ডনে ছিলেন। তাঁরা ছাড়া মুজিব পরিবারের সবাই নিহত হন।

এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে অবসান ঘটে বেসামরিক স্বৈরাচারের। তবে তার স্থলে চলে আসে সামরিক স্বৈরাচার। পাকিস্তান পর্ব থেকে পূর্ববাংলার জনগণ সমাজ ও রাষ্ট্রের গণতন্ত্রায়নের জন্য লড়াই করে আসছে তা অধরাই রয়ে যায়।

ভাসানী মুজিব হত্যার সংবাদ পান ফজরের ওয়াক্তে। এই সংবাদ শুনে ভাসানী হতবাক হয়ে গেছিলেন। তিনি এক ঘন্টার জন্য নামাজের ঘরে ঢোকেন, যখন বেরিয়ে আসেন, তাঁর চোখ দিয়ে দরদর করে পানি ঝরছিলো।

ভাসানী মোশতাকের সাথে দ্যাখা করতে চান নি। কিন্তু মোশতাকের জন্য ভাসানীর সমর্থন জরুরী ছিলো। ভাসানী স্টিল ম্যাটারড।

১৯৭৫এর ১৬ আগস্ট এ জি ওসমানি সন্তোষে ভাসানীর নিবাসে যান তাঁকে কনভিন্স করতে। কিন্তু ব্যর্থ হন। মোশতাক বুঝতে পারলেন এভাবে কাজ হবে না।

২১ আগস্ট মোশতাক নিজে যান ভাসানীর কাছে। কাজ হয় নি। ভাসানী গলাব্যথার অজুহাত তুলে মোশতাককে ফিরিয়ে দেন।

১৯৭৫এর ৪ অক্টোবর মোশতাক ভাসানীর সমর্থন পান। তবে কিছু শর্তে। রাজবন্দীদের মুক্তি দেয়া, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, এবং অবিলম্বে সাধারণ নির্বাচন প্রদান করা।

নভেম্বরে নানা ক্যু পালটা ক্যুর ভেতর দিয়ে জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসলে ভাসানী তাঁকে গুড লাক জানান। এর কারণ ৭ নভেম্বরের কথিত সিপাহি-জনতা বিপ্লব। মূলত কর্নেল তাহেরের কারণে জিয়াউর রহমানের একটি বিপ্লবী ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছিলো এবং ভাসানী জিয়াকে চিনতে ভুল করেছিলেন।

ভাসানীর একটা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু ধর্মীয় জ্ঞান নেবে না, আব্রাহাম লিংকন আর মাও সেতুঙের ব্যাপারেও জানবে। তিনি মাদ্রাসাশিক্ষিত হলেও মনে করতেন সময়ের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারছে না মাদ্রাসাগুলো। অর্থাৎ তিনি ইসলামি শিক্ষার সংস্কার চাচ্ছিলেন, যার উদ্দেশ্য হবে, শিক্ষার্থীদেরকে মানবসেবায় উদ্বুদ্ধ করা।

ভাসানীর জীবনের শেষ, এবং সম্ভবত সবচে গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী কাজ, ফারাক্কা লংমার্চ করা। এটা তিনি শুরু করেন ১৯৭৬এর ১৬ মে। আজকের সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলন এই লংমার্চেরই উত্তরাধিকার, এটা বাংলাদেশের জনগণের আত্মমর্যাদাবোধের সাথেও সম্পর্কিত।

১৯৭৬এর ১৭ নভেম্বর, ৯১ বছর বয়সে, লাল মৌলানা তাঁর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পেছনে ফেলে রেখে যান এক অক্লান্ত জীবন। অস্বীকার করার উপায় নেই সে জীবনে বহু সীমাবদ্ধতা আছে, কিন্তু যে জীবন শুধু বাংলাদেশেরই নয়, পৃথিবীর যে-কোনো প্রান্তের যে-কোনো সমাজপরিবর্তনকামী মানুষের জন্য এক উজ্জ্বল উত্তরাধিকার হিসেবে রয়ে যাবে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “লাল মৌলানাঃ যে উত্তরাধিকার আমরা গ্রহণ করি

  1. Individual honesty, sacrifice
    Individual honesty, sacrifice, or intelligence can’t change the society; can’t identify the real enemy of the mass people, even the flow of a movement, Maulana Bhasani is the best example. Despite his dedication to change the life of mass people and lots of followers, ultimately he could not achieve the goal. Maulana Bashani is the name of misused jewel of our political arena.
    We shouldn’t carry the continuation of Maulana, we should enhance, modify, and make effective that politics.

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

84 − 74 =