রোহিংগা শরনার্থী ইস্যুঃ ধর্ম, রাজনীতি এসব নানাবিধ হিসাব বাইরে রেখে আপনার মানবিক বোধ কি বলে?


যারা রোহিংগাদের এদেশে মানতে চাইছেন না, তাদের মধ্যে অনেকের যুক্তি বাংলাদেশ তো নিজেদের দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা দিতেই ব্যর্থ্য হচ্ছে। এতে রাষ্ট্রের দায় আছে, কিন্তু আচরণ করে মানুষেরা। রাষ্ট্র একটা খারাপ কাজের প্রতিকার করতে পারেনি দেখে একটা ভালো কাজ করতে পারবে না এমন যুক্তি হাস্যকর। রাষ্ট্র এবং মানুষের করা উচিত সে কাজটাই, যা সবচেয়ে মানবিক। আমাদের সামনে এখন পথ দুটিঃ হয় আমরা নিজেদের কিছু ক্ষতির আশংকা করেও তাদের আশ্রয় দেব অথবা নিশ্চিত মৃত্যু কিংবা নির্যাতনের মুখে তাদের আবার ঠেলে দেব।

এখন আপনার মানবিক বোধ কি বলে সেটা আপনার ব্যাপার। তবে এটাও ভেবে দেখবেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনার পূর্ব পুরুষদেরই কেউ হয়তো ভারতীয় সীমান্তে গিয়ে ভীড় করেছে জীবন বাঁচাতে, পেছনে পাকিস্তানী ঘাতকেরা। সামনে অস্ত্র তাক করে পাহারায় ভারতীর সেনারা যারা কোনক্রমেই নিজ দেশে অবৈধ অনুপ্রবেশ ঘটতে দিতে রাজী নয়। আপনার অনুভূতি কেমন হতো?


বার্মা কিংবা মায়ানমারে ম্যাসাকার চলছে নাকি চলছে না এ ব্যাপারে বিতর্ক অবান্তর। মায়ানমারের সামরিক বাহিনী কর্তৃক নির্যাতন চলছে এবং তার মাত্রা ব্যাপক, সেটা নিয়ে সন্দেহ নেই। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পরা হাজার ভুয়া ছবির বাইরে প্রকৃত হত্যাকান্ড, নির্যাতন এবং ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়ার ছবিও কম নয়। এর বাইরে হাজার হাজার মানুষের ঢলও এটাই প্রমাণ করে যে সেখানকার পরিস্থিতি রোহিংগাদের জন্য সুখকর নয়। একজন মানুষ, সে চোর চামার হোক, খুনী হোক কিংবা ধর্ষকই হোক, তার যদি বিচার করতে হয় সেটার জন্য প্রতিটা রাষ্ট্রের নিজস্ব আইনী কাঠামোয় বিচারের ব্যবস্থা আছে। সামগ্রিকভাবে দমনপীড়ন কোন সমাধান নয়, মানবিক ব্যাপারও নয়।

অনেকের কাছে বড় প্রশ্ন রোহিঙ্গারা আসলেই মায়ানমারের নাগরিক কিনা। একটা মানুষ কতদিন একটা অঞ্চলে থাকলে সেখানকার নাগরিক হয়? এর কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা আছে বলে আমার জানা নেই। আর এখন মায়ানমারে যেসকল রোহিংগার বসবাস, তাদের পূর্বপুরুষেরা অন্তত এক শতাব্দি আগে থেকে হলেও সেখানে ছিলেন যখন সে অঞ্চল ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অংশ। আর জমিজমা সহ তাদের সহায় সম্পত্তি কেড়ে নেয়া নয়, বরং অনেকটা পরিকল্পিত সেটেলমেন্ট ছিল।আর আরাকান কিংবা রাখাইন প্রদেশ ইতিহাসের একটা বড় সময় ধরে মুসলিম শাসকদের অধিকারেও ছিল, যদিও সেটা এখনকার যাদের রোহিঙ্গা বলা হয় তারা যে মায়ানমারের নাগরিক তা প্রমাণের জন্য যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করবার দরকার নেই। বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চল, ভারতের সেভেন সিস্টার্স এবং মায়ানমারের সম্মিলিত আয়তন বিশাল। এ অঞ্চলের জনসংখ্যার ঘনত্বও অনেক কম। এবং এ অঞ্চলের জাতি উপজাতির সংখ্যাও অনেক যারা আবার এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলে গেছে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এ কারণে আপনি রাখাইনদের আরকানেও দেখতে পাবেন, কক্সবাজারেও আছে আবার পটুয়াখালীতেও এদের বাস। এভাবে রোহিংগারা বাঙ্গালীদের মত দেখতে হলেও এদের ভাষাগত এবং ধর্মীয় বিশ্বাস পুরোপুরি বাঙ্গালীদের মত নয়। তাদের ভাষা চাটগাইয়াদের মত আবার সুন্নী মুসলমান হলেও সুফী ভাবধারার ইসলাম চর্চা করে। বাঙ্গালীর অপভ্রংশ হয়ে এরাও নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে। ব্রিটিশ শাসনের শেষদিকে এসে আরাকান কিংবা রাখাইন প্রদেশে যাদের সংখ্যা বহুগুণে বৃদ্ধ্বি পায়।

আরাকানে রোহিংরা কিংবা মুসলিম উপস্থিতি ১৪০০ সালের দিকেও ছিল বলে প্রমাণ আছে। ১৬০০ সালের দিকে মুসলিম সালতানাতে পরিণত হয়। তবে মুসলিম উপস্থিতির বাইরে আরাকানে রোহিংগাদের উপস্থিতি বাড়বার একটা বড় কারণ ২য় বিশ্বযুদ্ধ। এ সময় ব্রিটিশরা পিছু হটবার সময় রোহিংগাদের সে অঞ্চলে ব্যাপকহারে অভিবাসী হিসেবে প্রেরণ করে। তারা আরাকানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এবং জাপানী শক্তির মাঝে একটা বাফার জোন তৈরী করতে ব্যবহৃত হয়। ব্রিটিশদের অস্ত্রে বলীয়ান হয়ে তারা স্থানীয় বার্মিজদের উপর ম্যাসাকারও চালায়। তিক্ততা কিংবা শত্রুতার শুরু প্রধাণত সেখান থেকেই।

এরপর দেশভাগের আগে রোহিঙ্গাদের একটা অংশ পকিস্তানের সাথে যুক্ত হবার দাবী তোলে আরাকানের, মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ তাতে সাড়া দেননি। কিন্তু সশস্ত্র সংগ্রাম চালায় কিছু গ্রুপ। বার্মিজদের ক্ষোভের কারণও এমনকিছু গ্রুপের উৎপাত। হাজার হাজার বৌদ্ধভিক্ষু তাদের অত্যাচার থেকে রক্ষা পেতে অনশন আন্দোলনও করেছে। এসব গ্রুপের হামলার শিকার হয়েছে বার্মিজরা আবার সেনাবাহিনী তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে তাদের দমনও করে, অস্ত্র সমর্পণ করে বিদ্রোহী গ্রুপগুলোর শতশত সদস্য। দমনের সময় নিরীহ রোহ্নগারাও নির্যাতনের শিকার হয়। এরই মাঝে লম্বা একটা সময় ধরে কিন্তু মায়ানমারের সংসদে রোহিংগা সাংসদও ছিলেন, কিন্তু ১৯৮২ সালের এক অদ্ভুত নাগরিকত্ব আইনের কারণে তাদের পরিচয়ই নেই মায়ানমারে।

যাইহোক, আরাকান রাজ্যে রোহিংগাদের সংখ্যা এখন মোট জনসংখ্যার ৪০%। উদবাস্তু, বিদেশে অবস্থানকারী এবং শরণার্থীদের হিসাব করলে তা হয় ৬০%। একটা প্রদেশের জন্য শতকরা জনসংখ্যার এই হার তুচ্ছ কিছু না। রাতারাতি জনসংখ্যা এমন হয় না। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের ঘরবাড়ি, পরিবার পরিজনসহ উপস্থিতি প্রমাণ করে যে তারা সে অঞ্চলে খুব কম সময় ধরে অবস্থান করছে না। আবার মায়ানমারের ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন বলে ওরা মায়ানমারের নাগরিক না। যেখানের প্রথম ধারাটাই খুবই হাস্যকর। যেই ধারা মানলে মায়ানমারের অর্ধেক উপজাতি বা জাতিসত্ত্বার লোকেরাই নিজেদের নাগরিক হওয়ার দাবী করতে পারবে না। এই আইন বলে যেঃ

– পূর্ণ নাগরিক হতে হলে তাদের পূর্ব পুরুষেরা যে ১৮২৩ সালের আগে বার্মায় বসবাস করতো তা প্রমাণ করতে হবে অথবা পিতামাতাকে তার জন্মের সময় মায়ানমারের নাগরিক হতে হবে।
– এসোসিয়েট সিটিজেনশিপ নামের আরেক ধরণের নাগরি আছেন যারা ১৯৪৮ সালের ইউনিয়ন সিটিজেনশিপ ল’ দ্বারা নাগরিকত্ব প্রাপ্ত হয়েছিলেন।
– ন্যাচারালাইজড সিটিজেন হবেন তারা, যারা ৪ঠা জানুয়ারী ১৯৪৮ সালের পূর্ব হতে মায়ানমারে বসবাস করতেন এবং ১৯৮২ সালের পর নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেন।

মায়ানমারে দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহনযোগ্য নয়, অন্য দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করা মাত্র মায়ানমারের নাগরিকত্ব বাতিল হয়ে যায়। আবার বিদেশীদের জন্য মায়ানমারের ন্যাচারালাইজ সিটিজেনশিপ প্রাপ্তি সম্ভব নয়, যদি না তারা সে দেশে তাদের নিকট পারিবারিক যোগসুত্রের প্রমাণ দিতে পারেন। এ কারণেই রোহিঙ্গারা মায়ানমারের নাগরিক হতে পারে না এই সময়ে। অনেক ঝামেলার পর আদিপুরুষের বসবাসের প্রমাণ দিতে পারলেও তারা হয় ন্যাচারালাইজড নাগরিক, যা নাগরিকত্বের বেলায় তৃতীয়শ্রেণীর মত।

ভাগ্য ভালো, আমাদের দেশে এমন আইন তৈরী করা হয়নি। তাহলে হয়তো যে ৩০-৪০ লাখ উপজাতি, আদিবাসী আছেন, তাদের রোহিঙ্গাদের পরিণতি বরণ করে নিতে হতো। কারণ, শিখার অভাব এবং দাপ্তরিক প্রমাণপত্রের অভাবে তাদের পূর্বপুরুষ যে ১০০ বছর আগেও এ অঞ্চলে ছিলেন কিংবা তাদের সম্পত্তি যে তাদেরই, সে প্রমাণ দিতে অধিকাংশ পাহাড়ি মানুষও ব্যর্থ হতেন।

যাইহোক, প্রশ্ন এখন রোহিংগাদের এদেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় দেয়া উচিত নাকি অনুচিত সেটা। আমার মতে উচিত। কারণ, তাদের উপর অত্যাচারের মাত্রা এমন পর্যায়ে গেছে যে এখন আপনি মানুষ হলে আদের প্রতি সহানুভূতি দেখাতে বাধ্য। রোহিংগারা আমাদের মধ্যে মিশে গেলে কিছু অপরাধ বাড়বে তাতে সন্দেহ নেই। তবে একটা জাতির সবার অপরাধী হওয়া সম্ভব নয়। ওরা অশিক্ষিত, নির্যাতিত মানুষ। ওরা নিজেদের অধিকারের কথাও বলতে পারে না, এমন কোন শিক্ষিত যোগ্য নেতা নেই যিনি তাদের সমস্যার কথা নিয়ে কথা বলতে পারবেন। সন্সদে জায়গা নেই, দেশে চাকরী নেই, উচ্চশিক্ষার সুযোগ নেই। ওরা পরবর্তী প্রজন্মকে আলোকিত করবে কি দিয়ে? শিক্ষার অভাবে মুল্যবোধ গড়ে উঠছে না ওদের শিশুদের। এর সুযোগ ধর্মীয় উগ্রপন্থীরাও নিচ্ছে। রহিংগারাও একসময় বার্মিজদের উপর অত্যাচার করেছে, তার দোহাই দিয়ে এখনকার বার্মিজদের অত্যাচারকে যুক্তিসঙ্গত বলা যায় না।

যারা রোহিংগাদের এদেশে মানতে চাইছেন না, তাদের মধ্যে অনেকের যুক্তি বাংলাদেশ তো নিজেদের দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা দিতেই ব্যর্থ্য হচ্ছে। এতে রাষ্ট্রের দায় আছে অবশ্যই, কিন্তু আচরণ করে মানুষেরা। রাষ্ট্র একটা খারাপ কাজের প্রতিকার করতে পারেনি দেখে একটা ভালো কাজ করতে পারবে না এমন যুক্তি হাস্যকর। রাষ্ট্র এবং মানুষের করা উচিত সে কাজটাই, যা সবচেয়ে মানবিক। আমাদের সামনে এখন পথ দুটিঃ হয় আমরা নিজেদের কিছু ক্ষতির আশংকা করেও তাদের আশ্রয় দেব অথবা নিশ্চিত মৃত্যু কিংবা নির্যাতনের মুখে তাদের আবার ঠেলে দেব।

এখন আপনার মানবিক বোধ কি বলে সেটা আপনার ব্যাপার। তবে এটাও ভেবে দেখবেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনার পূর্ব পুরুষদেরই কেউ হয়তো ভারতীয় সীমান্তে গিয়ে ভীড় করেছে জীবন বাঁচাতে, পেছনে পাকিস্তানী ঘাতকেরা। সামনে অস্ত্র তাক করে পাহারায় ভারতীর সেনারা যারা কোনক্রমেই নিজ দেশে অবৈধ অনুপ্রবেশ ঘটতে দিতে রাজী নয়। আপনার অনুভূতি কেমন হতো? ঠিক এমনটাই হয়তো এই রোহিংগাদের, যারা দৈহিক গড়নে মানুষ এবং তাদেরও রক্ত নিশ্চিতভাবেই লাল। হতে পারে তাদের ভেতরে অপরাধপ্রবণ মানুষের সংখ্যাও অনেক, তবে নিস্পাপ মানুষের সংখ্যাও কম নয়। তাদের কেউ যদি আমাদের দূরে ঠেলে দেবার কারণে মারা যায়, তবে এ দায় কিছুটা হলেও আমাদের। আমরা কিভাবে এত এত মানব সন্তানকে মৃত্যুর দিকে আবার ঠেলে দেয়াকে যৌক্তিক মনে করতে পারি? আমিতো মনে করি পাকিস্তানের কোন নিরীহ মানুষও যদি আমাদের দেশে আশ্রয় চাইতো, তাহলে তাদের জন্যও সহানুভূতিশীল হওয়া উচিত। একটা মানবশিশু যখন জন্ম নেয়, তখন তার মানবিক বোধ, আচার আচরণ, মুল্যবোধ, বিশ্বাসের অনেককিছুই গড়ে উঠে পরিবার, সমাজ থেকে। একটা রোহিংগা, পাকিস্তানী কিংবা আফ্রিকান কালো শিশুকেও জন্মের পর বাঙ্গালী পরিবারের কাছে দিয়ে দেয়া হলে শিশুটা বেড়ে উঠবে বাঙ্গালী মনন নিয়ে। আমার সত্যিই মনে হয় সবার উপর মানুষ সত্য, তাহার উপর নাই। যদিও একটা মানুষই হয়ে উঠতে পারে আরেকটা মানুষের দূর্ভোগের কারণ, তারপরও।

এমন নয় যে ১০-১২ লাখ রোহিংগার সবাই এদেশে চলে আসছে, এদের ২ কিংবা ৫ লাখ যতজনই আসুক, তাদের নিরাপদ আশ্রয় দেয়া আমাদেরও উচিত। আমরাও তো একসময় কোটিকোটি মানুষ অন্য দেশের মুখাপেক্ষী হয়েছিলাম। ধর্ম, ভাষা এবং জাতিগত সাদৃশ্য থাকবার কারণে তাদেরও বাংলাদেশ অভিমুখী হওয়াটাই স্বাভাবিক।

বাংলাদেশের উচিত এই ব্যাপারটা জাতিসংঘে তোলা, আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানো মায়ানমারের উপর। কারণ, অস্ট্রিচের মত মুখ গুঁজে থাকাটাই সমাধান নয়, সমস্যায় যেহেতু আমরাও পড়ছি, সমাধানের পথ খুঁজতে আমাদেরও উদ্যোগী হতে হবে। মানবিক দিক বিবেচনায় সীমিত সামর্থ্যে তাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়াও আমাদের দ্বায়িত্ব।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

1 + 3 =