চাকরী এবং বাকরীর গল্প

চাকরী করার অভিজ্ঞতা এর মধ্যেই বেশ হয়ে গিয়েছে। চাকরীগুলো যতটা না অদ্ভুত ছিলো, চাকরী চলে যাবার গল্প আরো বেশী অদ্ভুত!

প্রথম চাকরী শুরু করেছিলাম একটা অনলাইন পত্রিকায়। পত্রিকা(!) হিসেবে এ অনলাইন দেশে অ-বদানের কথা দেশ জাতি মনে রাখুক না রাখুক, আমি পুরোদমে রাখবো! 😛

মালিক একজন হোটেল ব্যবসায়ী, তিনি সেই পত্রিকার একাধারে সম্পাদক, সহ-সম্পাদক, রিপোর্টার…সব!

যাক গে, সে উনি যা খুশি করুক গে, মরুক গে! আমি গিয়েছি চাকরীর খোঁজে…

বসলাম।

উনি এমনভাবে কতক্ষণ পত্রিকাটার গুণগান বুঝালেন, আমি তো আরেকটু হলে হাততালি দিয়ে বলে উঠতাম, সেরা! সেরা! আপনার পত্রিকা সেরা!

এর পরেই উনি আমার কাজ বুঝিয়ে দিলেন.. :3

বিডি নিউজ, বাংলা নিউজ, রাইজিং বিডি, প্রিয় ডট কম ইত্যাদি পত্রিকায় যা নিউজ দেবে সেগুলো কপি করে পোস্ট করতে হবে। বাসায় বসে!

একটা ইমেইল আইডি দিলো, তাতে পোস্ট যাবে… তা কপি করেও পোস্ট করতে হবে।

সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১১ টা পর্যন্ত কপি পেস্ট করতে হবে। শুক্রবার সকালে করতে হবে! শনিবার ছুটি!

এমন টাইট সিডিউলে ধুম করে পড়ে যাবো, ভাবতেও পারি নি! তবে যাই হোক, ঘরে বসে চা খেতে খেতে খালি কন্ট্রোল সি আর কন্ট্রোল ভি টিপেই ৪০০০ টাকা কামাই করা মন্দ কি!

দাঁতগুলো কেলিয়ে হাসতে হাসতে বাসায় চলে এলাম… সারা রাস্তায় খালি ভেবেছি, “Rest In Peace Journalism!”
বড় হয়ে সাংবাদিক না হয়ে চাউলের আড়ৎ দিলে মন্দ হয় না!

বাসায় এসে শুরু করে দিলাম আমার সাংবাদিকতা! আট ১০ টা অনলাইন পোর্টাল আলাদা ট্যাবে খুলে থ্রি জি স্পিডে পত্রিকা সাজাচ্ছি!

আহ্! লাল রং এর কালিতে যে হেডলাইনটা যাচ্ছে, তা-ও আমার হাতে পোস্ট করা! কত মজা!

দুই দিন পর কপি পেস্ট করতে করতে বিতৃষ্ণা এসে গেলো! ওয়েবসাইট ঘেঁটে আবিষ্কার করলাম, পত্রিকায় আমার মতন আরো দুই জন লোক আছেন, উনারা সকালে আর দুপুরে পোস্ট দেন! আমি সহ চার জনে পত্রিকা চালাই, পোস্ট গুলা সিন করেও খালি চারজন!

কে ঢুকবে এমন অনলাইনে! এমবি নষ্ট করার জন্য!

আমার বিরক্তি এমন লেভেলে চলে গেলো যে আমি ডোরেমন দেখে চা বিস্কিট খেয়ে হাত পা ঝেড়ে ৮ টার দিকে কম্পিউটারে বসে Cricket 2007 খেলতে খেলতে ওভারের মাঝে মধ্যে একটা দুইটা পোস্ট দিতাম!

আমার লেখা গল্প কয়েকটাও Hot news চেম্বারে পোস্ট করে দিয়েছিলাম! মজা লেগেছে! 😀

রেডিও মুন্না-রেডিও পুন্নার পেইজ সার্চ করে ভয়ঙ্কর কিছু বাজে বাজে ভুয়া কথা পোস্ট করেছিলাম!

নায়িকাদেরকে নিয়ে বিনোদন ডেস্কে কোন নিউজ হলে কিভাবে দিতাম জানেন? ধরেন প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার কোন নিউজ, গুগলে সার্চ দিতাম Priyanka Chopra Hot Picture! সবচেয়ে হট টা বেছে দিতাম! 😀

এমনকি খেলার খবর, শেট ওয়াটসন সেঞ্চুরী করার নিউজের জন্য ছবি… Watson and wife’s intimate picture! 😛

বাঁদরামি এগুলো করতে করতে কি হয়েছে জানেন? পোস্টের সিন ৪০০+ করে ফেলছি! বিলিভ ইট অর নট!

এরপর একটা সময় বাঁদরামি করতে করতেও বোরড! পোস্ট দেবার হার এতটাই কমে গেলো, এতটাই কমে গেলো…যেএএএ… আমাকে সেই হোটেল ব্যবসায়ী মালিক কল করা শুরু করলো!

আমার তো আর মন বসে না কম্পিউটার টেবিলে! আর কত!

ব্যস… ফেসবুকের ইনবক্সে কপি পেস্ট বস হোটেল মালিক মেসেজ পাঠিয়ে দিলো, We don’t need you to work for our Newspaper Anymore! 😛

বিশ্বাস করেন, আমার কিবোর্ডের C বাটনটা-ই লুজ হয়ে গেছে! 🙁

এ মজার চাকরী যাবার পর চাকরী নিলাম একটা সনাম ধন্য পত্রিকায়… তাও অনলাইন!

এটা আগের টার মত না। একটা অফিস আছে, মানুষ সেখানে কাজ করে… কম্পিউটারে বসে বসে। প্রতিদিন বিকালে সেখানে প্রায়ই মুড়ি আর চা খেতে দেয়। মানে জাতের নিউজপেপার আর কি!

একদিন হয়েছে কি, আমি রিপোর্ট করে এসেছি ক্যাম্পাস থেকে। সেদিন ক্যাম্পাসে এসেছেন আমাদের প্রধান বিচারপতি।

নিউজ কাভারে প্রথমবারের মত এবং চরমভাবে খিচুড়ি পাকিয়ে গেলো। শুরু থেকে ভালো কাজ যা যা করে আসছি, সে সম্মান বুঝি যায় যায়!

কিন্তু প্রথম ভুল কি আর আমলে নেয়! যদি ভুল থেকে দারুণ কিছু হয়, তবে ভুল-ই ভালো!- মনে মনে এ মন্ত্র যপে টেবিলে বসে পড়েছি।

ব্যুরোচিফ এসে কাঁধে হাত দিয়ে বললো, “অভিষেক, আজকে তো আপনি ফেইল্ড!”

এমন সময় প্লেইটে করে আজকে মুড়ির বদলে আসলো “মিষ্টি”! সাথে সাথে ব্যুরোচিফ বললো,
“নেন, মিষ্টি খান!”

আমার কানে কথা দুইটা ঢং ঢং ঢং করে খালি বাজতেই থাকলো, বাজতেই থাকলো! বাসায় এসে পিসিতে বসে একটা স্ট্যাটাস দিলাম,

“অভিষেক,
আজকে আপনি ফেইল্ড!
নেন মিষ্টি খান!”

আরো তিন চার দিন ভালো মতন অফিস করলাম। মাঝে আমার নানা স্ট্যাটাস নিয়ে উনারা মজা করেন, আমিও হাসি। উনারা হাসান, আমি হাসাই! আমাকে রিপোর্টিং এমনে করো অমনে করো বলে শিখিয়ে দেয়…

/একদিন হঠাৎ ডেকে বললো, আপনাকে পরে দরকার হলে ডাকবো।/

সেবার অনেক মন খারাপ হলেও, পরে অনেক হাসি আসছিলো… আসার কারণও আছে!

উনারা আমার চাকরী বাদ দেবার কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন- ওই মিষ্টির স্ট্যাটাসটা একটা রাজনৈতিক স্ট্যাটাস! :v

হা হা!

এরপর একটা টিউশন মিডিয়ায় কাজ শুরু করেছি! 😛

“মিডিয়া” ছাড়ি নি কিন্তু! হোক না টিউশন মিডিয়া! 😀

সে চাকরি থেকে ছাঁটাই হলাম, এক সুন্দরী মেয়ের থেকে ৭০% কমিশন না নিয়ে ফ্রি তে টিউশনটা দিয়ে দিয়েছি বলে! :V

এরপর কত চাকরী কত কি করে, এইতো সেদিন একটা পত্রিকায় চাকরী শুরু করেছিলাম! কাজ করার ফাঁকে বোর হয়ে যেতাম বলে আমার ডেক্সের ডেক্সটপে Fifa 15 ডাউনলোড করেছিলাম!

সহ-সম্পাদক সাহেব আমাকে গেম খেলতে দেখে আমার পাশে দৌঁড়ে এসে কিছু না বলে ব্যুরোচিফ সাহেবের রুমের দিকে তেড়েতুড়ে চলে গেলেন। আমারও ভ্রুক্ষেপ নেই… গেইম খেলছি! গোল!

রাতে আমার কাছে মেসেজ এলো-
We don’t need you to play Fifa in our office! 😀

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “চাকরী এবং বাকরীর গল্প

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 4 = 2