সর্বশেষ নবী সর্বশ্রেষ্ঠ না

শিরোনামের বক্তব্য তীর্যক ও সরাসরি। লেখার শেষ-সিদ্ধান্তও তাই। অত্যন্ত নিরাবেগ এবং নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গী নিয়েই লেখাটি পড়ার আবেদন থাকবে। যুক্তি উপস্থাপনায় যুগ-যুগ ব্যাপী লালিত আবেগের উপর কুরআনের দিক-নির্দেশনাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। যে বিষয়টি অনেকের জন্য আপাত-আহত হবার কারণ হবে তা আমার জন্যও কোন সময় যে ছিল না তা নয়। তবে সত্য সবসময়ই সুন্দর, শক্তিশালী এবং শেষবিচারে তা সবার জন্য সর্বাধিক কল্যাণকর।

এক. সর্বশ্রেষ্ঠ তত্ত্বের বিষবৃক্ষ

সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (তাঁর উপর শান্তি) “সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব”, “তাঁকে সৃষ্টি করা না হলে কিছুই সৃষ্ট হত না”, “তিনি সকল নবী-রাসূলগণের নেতা বা ইমাম”- এগুলো বিশ্বের মুসলমান সম্প্রদায়ের বৃহত্তর অংশের অসত্য দাবী।
সর্বশেষ নবীর সর্বশ্রেষ্ঠত্বের দাবী এজন্য অসত্য যে, তার সপক্ষে মহিমান্বিত কুরআন মাজিদে কোন দলিল নাযিল করা হয় নি, অন্যদিকে দাবীর অন্তঃসারশূন্যতা নির্ণয়ে বিস্তর বক্তব্য এসেছে।

দাবীটি মিথ্যা শুনে ধর্মভীরু মুসলমান মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ হবে। বক্তব্যের সততা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে, ঔদ্ধত্যপূর্ণ মনে হবে। আমাদের মাঝে নবী-প্রেমের কপট দরদী ভুরি ভুরি- যারা তাঁর উপর নাযিলকৃত কুরআন অনুশীলন করেনি, রাসূলুল্লাহর নামে সূরা মুহাম্মদও পড়েনি।

মিথ্যার যে পাহাড় আমরা ইসলামের নামে রচনা করেছি, তা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য আমাদের এখন জোর দিয়ে বলা প্রয়োজন যে, “সর্বশেষ নবী সর্বশ্রেষ্ঠ না”; যেভাবে ঈসা মাসিহ আল্লাহর পুত্র না। অতি জনপ্রিয় অথচ ভয়ানক একটি মিথ্যা বিশ্বাসকে চালু রেখে দ্বীনের অন্যান্য বিভ্রান্তিকে সংশোধনে প্রয়াসী হয়ে আমরা সফলকাম হব না।

মুসলমান তার বিশ্বাসের ভূমিতে “সর্বশেষ নবী সর্বশ্রেষ্ঠ” তত্ত্বের যে বিষবৃক্ষ রোপন করেছে, তা খ্রীস্টানদের ত্রিত্ববাদের মতই, বরং তার চেয়েও ভয়াবহ। শেষে আগত দু’জন নবীর কেউই তাঁদের দায়িত্বহীন উম্মতের জিম্মাদার বা ত্রাণকর্তা নন।
যার উপর সর্বশেষ আসমানী গ্রন্থ আল-কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে, সেই নবী “সর্বশ্রেষ্ঠ মানব”- এটি বিশ্বের সিংহভাগ মুসলিম সম্প্রদায়ের ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সে চেতনে-অবচেতনে তা লালন করে, এই বিশ্বাস নিয়েই ঘুমাতে যায়, আবার জাগে।

এই বিশ্বাস তাকে এক ভিন্ন মাত্রার আনন্দ দেয়। এটি নিয়ে সে যে কোন ধর্মীয় জলসায় প্রায় ব্যতিক্রমহীনভাবে এবং জোর গলায় গর্ব করে। এ বিশ্বাস তাকে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের উপর নিজেকে একটি উচ্চতর মর্যাদায় ভাবতে উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করে।

কেবলমাত্র পৃথিবীতেই নয়, আখেরাতেও এই মর্যাদা তাকে আলাদা অগ্রাধিকার প্রদান করবে তেমন প্রত্যাশা-প্রত্যয়ও সে পোষণ করে। তাই সে এই বিশ্বাসের কথা স্বজাতি এবং সুযোগ পেলে অন্যদের কাছেও জোরেশোরে প্রচার করে। বিশ্বাসের এই বদ্ধ-ভূমিতেই তার নিরন্তর বসবাস।

দুই. কুরআন-বিচ্ছিন্নতার মহাসংকট

মানবসভ্যতার সংকট মূলতঃ মুসলমান সম্প্রদায়ের সংকট। মুসলমানের মহাসংকট কুরআন-বিচ্ছিন্নতার নতিজা। সে যখন কুরআন-কেন্দ্রিক মুসলমান হবে তখন মুসলিম উম্মাহ তথা মানবতার সংকট সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসবে।
আল্লাহ নিজে যা তাঁর গ্রন্থে বলেননি, মুসলমান প্রতিনিয়ত সেইসব মনগড়া কথার দাওয়াত দেয়। যে দূষ্কর্ম তার আগে থেকেই ইহুদী-খ্রিস্টান ও অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায় করে আসছে।

সাহসিকতা ও সত্যিকারের বীরত্ব তথা জিহাদের পরিচয় এখানেই। এইসব মিথ্যার বিরুদ্ধে কুরআন দ্বারা তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলাই এখন মুসলিম উম্মাহর মুক্তির সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সর্বশ্রেষ্ঠ তত্ত্বের মিথ্যাটি শেষনবীর নামে চালানো এক অতি বড় হীন চক্রান্ত- একজন মুসলমানের যাবতীয় গলদ বিশ্বাস আর ভিত্তিহীন পোষাকী ক্রিয়াকর্মের সূত্রপাত সেখান থেকেই। বিষয়টি মুসলিম জাতির অস্থি-মজ্জার মধ্যে এমনভাবে সংক্রামিত করে দেয়া হয়েছে যে তারা এটি বিশ্বাস না করে পারেনা।

শেষনবীকে জবরদস্তিমূলক ও নিষ্প্রয়োজনীয় ভাবে ‘শ্রেষ্ঠতম’ বানাতে গিয়ে আমরা তাঁর সম্মান ভীষণভাবে ক্ষুন্ন করেছি। তাঁর চেয়েও বড় জুলুম করে চলেছি আল্লাহ তায়ালার উপর এই মিথ্যা আরোপ করে। মিথ্যার ভাইরাসে আক্রান্ত আম-মুসলিমও আজ ভীষণ অসুস্থ।
দেড় সহস্রাব্দের কুরআনী উত্তরাধিকারিত্বের কোন প্রমাণ তার কথোপকথনে নেই- সে মনীষীর জীবন থেকে উদ্ধৃতি দেয় কিন্তু কুরআনে এসে বোবা। কুরআনের শাশ্বত ও চিরন্তন সত্যে তার আগ্রহ নেই বললেই চলে। কুরআনকে প্রতিস্থাপিত করা হয়েছে মুসলিম ইতিহাস আর কল্পকাহিনী দ্বারা; সেগুলোই তার ধর্মীয় জীবনাচরণের উপজীব্য। মি’রাজ সংক্রান্ত ঘটনায় অতিরঞ্জনেরও অতি করা হয়েছে; যেখানে কুরআন আমাদের প্রয়োজনীয় ধারণা প্রদান করে।

এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহ এবং তাঁর নবী-রাসূলগণের নামে চালু করা সকল মিথ্যা থেকে বেরিয়ে আসতে পারলেই মুসলমান জাতির মহামুক্তি। প্রজ্ঞাময় আল্লাহ বহুবার প্রশ্ন রেখেছেনঃ তার চেয়ে বড় জালেম আর কে হতে পারে যে আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে? অর্থাৎ এমন বিষয় যা তিনি বলেন নি, তা তাঁর মহান শানে, দ্বীনের বা রাসূলের নামে তৈরি করা।

ইন্নাল্লাহা গনিয়্যুল ‘আনিল ‘আলামিন- আল্লাহর পূর্ণ কর্তৃত্ব, সার্বভৌমত্ব, মুখাপেক্ষিহীনতার কথা বলা হয়েছে এর মাধ্যমে। স্রষ্টা তাঁর কোন সৃষ্টিরই মুখাপেক্ষী নন। যখন বলা হয়, “মুহাম্মদকে সৃষ্টি না করলে আল্লাহ কিছুই সৃষ্টি করতেন না”, তখন সেই ঘোষণার মাধ্যমে একজন মুসলমান মূলতঃ মহামহিম ও অমুখাপেক্ষী আল্লাহকে তাঁরই এক সৃষ্টির মুখাপেক্ষী করে দেয়।

মহাপরাক্রান্ত আল্লাহকে টেনে এমন জায়গায় নামানো হয় যা তিনি নন- যা থেকে তিনি পবিত্র। অন্যদিকে খাতামান নাবিয়্যিনকে টেনে এমন এক তথাকথিত মর্যাদায় অভিষিক্ত করা হয় যা তিনি নন। এটা স্রেফ শয়তানি উক্তি- যেমনটি খ্রিস্টান সম্প্রদায় হযরত ঈসাকে (তাঁর উপর শান্তি) আল্লাহর সন্তান সাব্যস্ত করার মাধ্যমে করেছে। শয়তান ও তার দোসররাই এর প্রচার-প্রসার করে থাকে।

তিন. মিথ্যাবাদী মুসলমান!

যাকে প্রমান হিসেবে উপস্থাপন করে সম্প্রদায়ের এক বৃহৎ অংশ শ্রেষ্ঠত্বের দাবী করে থাকে তার সূত্র কুরআন বহির্ভূত- “হে মুহাম্মদ! তুমি সৃষ্টি না হ’লে আসমান-যমীন, আরশ-কুরশী, চন্দ্র-সূর্য ইত্যাদি কিছুই আমি সৃষ্টি করতাম না।“ কুরআন থেকেও অনেক আয়াত উপস্থাপন করা হয় যা শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপাদনে সম্পর্কহীন, খন্ডিত এবং শেষবিচারে উদ্দেশ্য প্রণোদিত, অসাড়।

যেমন. ‘বক্ষ-বিদারন’, ‘শেষনবী সকল নবীগণের উপর সাক্ষী’, ‘নেয়ামতকে পূর্ণ করা’, ‘আগের নবীগণ বিশেষ কাল ও জাতির জন্য, কিন্তু শেষনবী কিয়ামত পর্যন্ত সকলের জন্য’ ইত্যাদি বিষয়ে অনেক ব্যর্থ চেষ্টা-কসরত করা হয় তাঁকে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমান করতে।

যিনি সৃষ্টির সেরা, তিনি নবীগণের নেতা হবেন না কেন? অতএব তিনি ‘সাইয়্যিদুল মুরসালুন’ বা ‘ইমামুল আম্বিয়া’। আসলেই কি সর্বশেষ নবী “সাইয়্যিদুল মুরসালুন”?

“কিছুই সৃষ্টি করতাম না” টাইপের বাণীকে ‘জাল হাদীস’ মেনে নিলেও অনেকে ‘সাইয়্যিদুল মুরসালুন’-এর খুঁটিকে শক্ত করেই ধরে রাখে- কোনভাবেই হাতছাড়া করতে চায় না। তাতে বাণিজ্য হারাবার ঝুঁকি থাকে।

নবীজিকে সর্বশ্রেষ্ঠ করা গেলে তার প্রবক্তা হিসেবে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগত ভাবে নিজেও তার সুবিধা ও ভাগ আদায় করা যায়। আর সেটাই হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে।

শেষনবীর কিছু ভাষ্যের ব্যাপারে সাধারণতঃ কাউকে সোচ্চার হতে দেখা যায় না।
ক. “তোমরা নবীদের মাঝে কাউকে শ্রেষ্ঠত্ব দিও না।”
খ. “আমাকে তোমরা মূসার উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিও না।”

হযরত ইউনুস ইবনে মাত্তার (তাঁর উপর শান্তি) কথা এসেছে বিশেষভাবে- “তোমাদের কেউ যেন না বলে আমি মুহাম্মদ ইউনুস থেকে শ্রেষ্ঠ।” আরও বলা হয়েছে – “যে ব্যক্তি বলে আমি ইউনুস ইবনে মাত্তার থেকে উত্তম সে অবশ্যই মিথ্যা বলে।”

বাহ্যিকভাবে লোকসমাজকে খুশি করা কোন নবীরই কাজ নয়- যেমন লৌকিকতা সাধারণ মানুষ চর্চা করে থাকে। শেষনবী যখন বলেন, আমাকে তোমরা মূসার উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিও না অথবা যে আমাকে ইউনুস ইবনে মাত্তার চেয়ে উত্তম মনে করে সে মিথ্যাবাদী- তখন তা কোন লৌকিকতা বা কথার কথা নয় (অমা আনা মিনাল মোতাকাল্লিফীন-৩৮:৮৬)।

এই ভাষ্য কুরআনের শিক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই স্বীকারোক্তির মাধ্যমে তাঁর মহিমা এতটুকুও ম্লান হয় নি বরং এক অনির্বচনীয় সৌন্দর্য ফুটে উঠে। হযরত ইউনুসের প্রতি তাঁর পূর্ণ শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ ঘটে- যাঁর নাম অন্যান্য বহু নবীর নামের সাথে উল্লেখ করে শেষনবীকে আদেশ করা হয়েছে তাঁদের সবার এক্তেদা বা অনুসরণ করতে।

পরিহাস এই যে, আমরা শেষনবীকে হযরত ইউনুসের চেয়ে কেবল উত্তমই মনে করিনা, তাঁকে সর্বোত্তম মনে করি; শুধু তাই নয়, সকল নবী-রাসূলগণের নেতা ঘোষণা করি। দেখা যাচ্ছে, নবীজির ভাষ্য অনুযায়ীই তাঁকে সর্বশ্রেষ্ঠত্বের তকমা প্রদানকারীরা চরমতম মিথ্যাবাদী।
‘ইমামুল আম্বিয়া’ বা ‘নবীগণের নেতা’ তাই একটা মিথ। এটি হতে পারত স্রষ্টার পক্ষ থেকে সৃষ্টির কাছে তাঁর নাযিলকৃত কিতাবের সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। কিন্তু এই অতীব গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি পুরো কুরআনে অনুপস্থিত।

চার. সকল কপট ও ভ্রান্ত বিশ্বাসের প্রসূতি

হ্যাঁ, সর্বশেষ নবীর সর্বশ্রেষ্ঠত্বের ধারণা এমন একটি আকিদা যা ইসলাম সম্পর্কিত অন্যান্য সকল ভ্রান্ত বিশ্বাসের প্রসূতি। একই সাথে যাবতীয় কপট বিশ্বাস থেকে মুসলমানদের সত্যে প্রত্যাবর্তনের পথে তা প্রধানতম অন্তরায়।

ভ্রান্তি, ভ্রান্তি, শুধুই ভ্রান্তি! ভ্রান্তি আর ভেজালের অথৈ পাথারে মুসলমান হাবুডুবু খাচ্ছে। ধর্মের বাজারে এখান থেকে সেখানে গিয়েও তার নিস্তার নেই। ইসলামী লেবাসে মোড়ানো সব জলসাই মেকী। বাজারে যে ইসলাম বিকোয় তা কুরআনে টেকে না; আর কুরআনের ইসলাম বাজারে চলে না। এখানে কেতাবধারী পাদ্রী-পুরোহিত, ইমাম-রাব্বী একই সূত্রে গাঁথা- একই সমান্তরালে। সব মিলিয়ে সত্যানুসন্ধিৎসু মুসলমানের ত্রিশংকু অবস্থা।

মুসলিম উম্মাহ এই মিথ্যা আর লালন করতে পারে না, জারি রাখতে পারে না। এর মাধ্যমে সে নবীর উপর যারপরনেই জুলুম করে চলছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। এই মিথ্যাচারের মাধ্যমে সে আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে ঠুনকো প্রতীয়মান করে চলছে। এই মিথ্যা প্রচারের মাধ্যমে সে নিজেকে মহীয়ান করার পরিবর্তে ঘৃণিত-ধিকৃত করে তুলছে।

এহেন বিশ্বাস তাকে দায়িত্বহীন ও কুরআন-বিমুখ করেছে। ‘সেরা নবীর উম্মত’ হিসেবে বিনা টিকিটে জান্নাত-যাত্রায় সাহসী করে তুলেছে।
নবী সম্পর্কিত এই পঙ্কিল বিশ্বাসকে পুঁজি করেই নকল ইসলামের সিপাহসালাররা দ্বীনকে বাণিজ্যে রূপান্তরিত করেছে। এই বিষাক্ত বিশ্বাসের দূষিত বাতাসে কলুষিত মুসলিম মানস।

সত্যের সাথে মিথ্যা মিলিত হলে তার যোগফল মিথ্যা হয়ে যায়। আর জেনেবুঝেই যে এই মিথ্যার বাজার কায়েম করা হয়েছে সে গুমরও ফাঁস করে দেয়া হয়েছে (২:৪২, ৩:৭১)। মুসলমান মনগড়া তত্ত্বের চর্চা করে নকল মুসলমানে পরিণত হয়েছে।

পাঁচ. ইন্নাকা লামিনাল মুরসালিন

কুরআন শেষনবী সম্পর্কে সকল দ্ব্যর্থতা পরিহার করে সরাসরি জানিয়ে দেয়- “ইন্নাকা লামিনাল মুরসালিন”- নিশ্চয়ই তুমি প্রেরিত রাসূলগণের একজন [إِنَّكَ لَمِنَ الْمُرْسَلِينَ]-২:২৫২, ৩৬:৩।

ঠিক একই বাক্যরীতি ‘কা’ সর্বনামের পরিবর্তে তিন তিনজন নবীর নাম ব্যবহার করে করা হয়েছে।

ক. আর নিশ্চয়ই ইলইয়াস রাসূলগণের একজন [وَإِنَّ إِلْيَاسَ لَمِنَ الْمُرْسَلِينَ]-৩৭:১২৩।

খ. আর নিশ্চয়ই লূত রাসূলগণের একজন [وَإِنَّ لُوطًا لَمِنَ الْمُرْسَلِينَ]-৩৭:১৩৩।

গ. আর নিশ্চয়ই ইউনুস রাসূলগণের একজন [وَإِنَّ يُونُسَ لَمِنَ الْمُرْسَلِينَ]- ৩৭:১৩৯।

তিনজন মহান নবী সম্পর্কিত এই আয়াতগুলোর মোকাবেলায় সূরা বাক্বারা এবং সূরা ইয়া-সীনের আয়াত দুটি ছিল যথার্থ ক্ষেত্র যেখানে শেষনবীর উচ্চতর মর্যাদা এভাবে ঘোষিত হতে পারতঃ-

ক. ইন্নাকা সাইয়্যিদুল মুরসালুন বা
খ. ইন্নাকা ইমামুল মুরসালুন

কিন্তু “ইমামুল আম্বিয়া”র দাবীদারদের খুশি হবার কোন সুযোগ এখানে রাখা হয় নি। সূরা সাফ্ফাতে হযরত ইলইয়াস, হযরত লূত, এবং হযরত ইউনুস সম্পর্কে যেভাবে বলা হয়েছে, আল্লাহ তাঁর শেষনবী সম্পর্কে তা থেকে আলাদা কোন বাক্যবিন্যাস করেননি।
ফেরাউনের সমক্ষে হযরত মূসার (তাঁর উপর শান্তি) জবানিতেও একই অভিব্যক্তি ফুটে ওঠেঃ এরপর আমার রব্ব আমাকে প্রজ্ঞা দান করেন এবং আমাকে রাসূলগণের একজন করেন [فَوَهَبَ لِي رَبِّي حُكْمًا وَجَعَلَنِي مِنَ الْمُرْسَلِينَ]-২৬:২১।

কুরআনে সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে -“আর মুহাম্মদ একজন রাসূল ছাড়া আর কিছু নয়; তাঁর পূর্বে অনেক রাসূল অতিক্রান্ত হয়েছে” [وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ]-৩:১৪৪। “মরিয়ম-তনয় মাসিহ একজন রাসূল ছাড়া আর কিছু নয়; তাঁর পূর্বে অনেক রাসূল অতিক্রান্ত হয়েছে” [مَا الْمَسِيحُ ابْنُ مَرْيَمَ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ]-৫:৭৫।

নামবাচক বিশেষ্য ‘মুহাম্মদ’ এবং ‘আল-মাসিহ ইবনে মারইয়াম’ বাদ দিলে সূরা নিসা এবং মায়িদার আয়াতদ্বয়ের বাকী অংশের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। একই বক্তব্য আল্লাহ তাঁর দু’জন প্রেরিত মহান নবী সম্পর্কে বলছেন।

সূরা নাজমে (৫৩:৫৬) বলা হয়েছেঃ হাজা নাজিরুম মিনাল নুযুরিল উলা- অতীতের সতর্ককারীদের ন্যায় এই নবীও একজন সতর্ককারী।
তুমি বলো- “আমি রাসূলগণের মধ্যে অভিনব কেউ নই, এবং আমি জানি না আমার প্রতি কি করা হবে বা তোমাদের প্রতি কি করা হবে। আমার কাছে যা প্রত্যাদিষ্ট হয়েছে তা ব্যতীত আমি কিছুই অনুসরণ করি না, আর আমি একজন সুস্পষ্ট সতর্ককারী ব্যতীত আর কিছুই নই।“-৪৬:৯

উপরে উদ্ধৃত আয়াতসমূহ থেকে শেষনবী অন্য সবার চেয়ে সেরা এমন কোন প্রমান কি বেরিয়ে আসে?

কুরআনে একাধিক ঘটনা রয়েছে যেখানে দেখা যায়, আল্লাহ তাঁর শেষনবীকে এমন কোন বিষয়ের শিক্ষা দিচ্ছেন যা পূর্ববর্তী নবীগণ চর্চা করেছেন।

বিত্তশালী সমাজপতিদের মর্জি মাফিক নবীর দরবার থেকে হতদরিদ্র শ্রেণীর মুসলমানদের তাড়িয়ে দেবার আবদার হযরত নূহ নবী প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

”আর আমি তো মুমিনদের তাড়িয়ে দেবার পাত্র নই।-২৬:১১৪
“আর হে আমার সম্প্রদায়! এর বিনিময়ে আমি তোমাদের কাছে ধনদৌলত চাই না। আমার শ্রমফল কেবল আল্লাহর কাছেই রয়েছে, আর যারা বিশ্বাস করেছে তাদের আমি তাড়িয়েও দেবার নই।

নিঃসন্দেহ তাদের প্রভুর কাছে তারা মুলাকাত করতে যাচ্ছে, কিন্তু আমি তোমাদের দেখছি একটি অজ্ঞ সম্প্রদায়। আর হে আমার সম্প্রদায়! কে আমাকে সাহায্য করবে আল্লাহ্‌র বিরুদ্ধে যদি আমি তাদের তাড়িয়ে দিই? তোমরা কি তবে ভেবে দেখবে না?”-১১:২৯-৩০
পূর্বে ক্রীতদাস ছিলেন কতিপয় এমন মুসলমানের ক্ষেত্রে একই ঘটনা ঘটলে শেষনবী তাঁদের মসজিদ থেকে বাইরে যেতে বলেন, যা নিম্নোক্ত আয়াত নাযিলের প্রেক্ষাপট হয়ে দাঁড়ায়।

“আর তাদেরকে তাড়িয়ে দিও না যারা সকাল-বিকাল স্বীয় পালকর্তার এবাদত করে, তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে। তাদের হিসাব বিন্দুমাত্রও তোমার দায়িত্বে নয় এবং তোমার হিসাব বিন্দুমাত্রও তাদের দায়িত্বে নয় যে, তুমি তাদেরকে বিতাড়িত করবে। নতুবা তুমি জালেমদের অন্তর্ভূক্ত হবে”।-৬:৫২

সর্বশেষ নবীর জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ হওয়া জরুরী নয়। কিন্তু বিশ্বাসটিকে সবচে’ জরুরী বিষয়ে পরিণত করা হয়েছে এবং একই সাথে তা মুসলিম উম্মাহ এবং মানবজাতির উপর চাপিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এই ভ্রান্তি আমাদের ভাঙতে হবে যদি সত্যিকারের মুসলমান হিসেবে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হতে চাই।

ছয়. শেষনবীর পরিচয় ও উপাধি

“তোমাদের সবার প্রতি আমি আল্লাহ প্রেরিত রাসূল” [إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا]-৭:১৫৮। “আমি তোমাকে সমগ্র মানবজাতির জন্যে সুসংবাদাতা ও সতর্ককারী রূপে পাঠিয়েছি” [وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا]-৩৪:২৮।

‘রাসূলুল্লাহ’ তাঁর সময় থেকে পুরো মানবজাতির জন্য নবী যেহেতু তারপর কোন নবীর আগমন ঘটবে না। এখান থেকে এই সর্বশ্রেষ্ঠত্ব প্রমানিত হয় না যে, তিনি সকল পূর্ববর্তী নবীগণের ইমাম বা নেতা।

এমন বিশেষায়িত বৈশিষ্ট্য অন্যান্য নবী-রাসূলগণের ক্ষেত্রেও রয়েছে। স্বয়ং মহামহিম আল্লাহ তাঁর শেষনবীকে কী কী অভিধায় অভিহিত করেছেন?

১. মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল (৪৮:২৯)।

২. তিনি ‘খুলুকিন আজীম’ বা উত্তম চরিত্রের অধিকারী (৬৮:৪); তিনি ‘রহমাতাল্লিল ‘আলামিন’ (২১:১০৭)।

৩. মুহাম্মদ কোন ব্যক্তির পিতা নন; বরং আল্লাহর রাসূল এবং শেষনবী (خَاتَمَ النَّبِيِّينَ-৩৩:৪০)।

৪. নবী সাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী। আল্লাহর আদেশক্রমে তাঁর দিকে আহবায়ক এবং উজ্জ্বল প্রদীপ (৩৩:৪৫-৪৬)।

৫. তিনি আমাদের মতই একজন মানুষ যার প্রতি প্রত্যাদেশ হয় যে, আল্লাহই একমাত্র ইলাহ (১৮:১১০; ৪১:৬)।
যত যত নামে হযরত মুহাম্মদকে (তাঁর উপর শান্তি) অভিহিত করা হয়েছে তার মধ্যে একক এবং অদ্বিতীয় উপাধি হল খাতামান নাবিয়্যিন বা শেষনবী। তাঁর নাম নিয়ে আয়াত শুরু হয়ে এই মহান পরিচয়ের কথা বলে তা শেষ হয়েছে।

আল্লাহ তাঁর এই নবীর মর্যাদা প্রসঙ্গে অন্যত্র বলেন- আমি তোমার যিকর বা স্মরণকে সমুন্নত করেছি (৯৪:৪)। এভাবে আরও যত মর্যাদায় তাঁকে অভিষিক্ত করা হয়েছে, সেগুলোই কি আমাদের জন্য উদ্ধৃত করা যথেষ্ট নয়? যা বলেন নাই, যেভাবে বলেন নাই সেটা করার এখতিয়ার আমাদের কোত্থেকে এল?

এটাও উল্লেখ করা প্রয়োজন যে আমরা ‘রাসূলুল্লাহ’র অর্থ শুধুমাত্র শেষনবীতেই সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি। কুরআনে একই পরিচয় অন্যান্য নবীগণের ক্ষেত্রেও করা হয়েছে, যেমন. হযরত মূসা, হযরত ঈসা, হযরত সালেহ (সালামুন ‘আলাল মুরসালিন)।

সাত. তাহলে সর্বশ্রেষ্ঠ কে?

যে ইব্রাহীমের ধর্মমত অনুসরণ করে তাকে দ্বীনে সর্বোত্তম বলা হয়েছে [وَمَنْ أَحْسَنُ دِينًا مِمَّنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُ لِلَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ وَاتَّبَعَ مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا]-৪:১২৫। কথায় তাকে সর্বোত্তম বলা হয়েছে, যে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকে, বিশুদ্ধ আমল করে আর নিজেকে শুধু মুসলমান হিসেবেই পরিচয় দেয় [وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِمَّنْ دَعَا إِلَى اللَّهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ]-৪১:৩৩।

হযরত ইব্রাহীম (তাঁর উপর শান্তি) আল্লাহর নবী, উত্তম আদর্শ, মুসলিম জাতির পিতা ও মানবজাতির নেতা বা ইমাম। আর আল্লাহ রব্বুল আলামীন স্বয়ং তাঁকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছেন- [وَاتَّخَذَ اللَّهُ إِبْرَاهِيمَ خَلِيلًا]। কোন সৃষ্টিকে খলীল বা বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করার উদ্ধৃতি কুরআনে এই একটিই- এরচে’ বড় অর্জন একজন সৃষ্টির জন্য আর কী হতে পারে?

কিন্তু ‘ইমামুল আম্বিয়া’, সাইয়্যিদুল মুরসালুন’– এগুলো হযরত ইব্রাহীমসহ কারও জন্যই কুরআনে প্রয়োগ করা হয়নি। মূলতঃ কুরআনে সর্বশ্রেষ্ঠত্ব সংক্রান্ত কোন বিশেষায়ন কারও ক্ষেত্রে করতে দেখা যায় না।
তবে ‘সাইয়্যিদ’ পদটি কুরআনে বিদ্যমান এবং তা হযরত ইয়াহইয়ার (তাঁর উপর শান্তি) ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লাহ তাঁর এই বান্দা সম্পর্কে ঘোষণা দিচ্ছেন তিনি পরিণত বয়সে ‘নেতা’ হবেন।

কোন নবীকে অন্যদের উপর মর্যাদা দেয়া হয়েছে বলে কুরআনে তিনজন নবীর নাম আমরা পাই, ক. হযরত মূসা যার সাথে আল্লাহ কথা বলেছেন; খ. হযরম ঈসার কথা বিশেষভাবে এসেছে যাকে রুহুল কুদুস দ্বারা শক্তি দান করেছেন; গ. আর হযরত দাউদকে যবুর দানের কথা বলেছেন।

শেষনবীকে প্রশ্ন করা হল, “হে আল্লাহর রাসূল, মানুষের মাঝে সবচে’ সম্মানিত ব্যক্তি কে”? তিনি বললেন- “যে তোমাদের মাঝে সবচেয়ে তাক্বওয়াবান”। নির্দিষ্ট করে জানতে চাইলে বললেন- “আল্লাহর নবী ইউসূফ যিনি নবীর পুত্র এবং আল্লাহর নবীর পৌত্র, আল্লাহর খলীলের প্রপৌত্র।”

একই কথার প্রতিধ্বনি আমরা শুনতে পাই সূরা হুজুরাতে– “আর নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সেই সর্বাধিক সম্মানিত যে সবচে’ তাক্বওয়াবান”। [إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ]-৪৯:১৩
“নিশ্চয় আমাদেরকে হাশরের ময়দানে খালি পা, বস্ত্রহীন এবং খতনাবিহীন অবস্থায় উপস্থিত করা হবে; …….। আর কেয়মাতের দিন সবার আগে যাকে কাপড় পড়ানো হবে তিনি হবেন ইব্রাহীম।”

কেউ একজন খাতামান নাবিয়্যিনের কাছে এসে সোৎসাহে আহবান করেছিলঃ ‘ও সৃষ্টির সেরা’ বলে, তখন তাকে এই বলে সংশোধন করতে কালবিলম্ব করেন নি তিনিঃ সে হচ্ছে ইব্রাহীম।

‘হাদীস’ গ্রন্থসমূহ থেকে সর্বোত্তম সৃষ্টি সম্পর্কিত ধারণা আমাদের এতটুকুই। এর বাইরে নবী-কথন নামে চালানো কিন্তু কুরআনের শিক্ষার সাথে সামঞ্জস্যহীন বা সাংঘর্ষিক এমন যে কোন বিবৃতি প্রথমেই পরিত্যাজ্য।

আট. নির্দায় ঘোষণা

আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর চাপানো এই ডাহা মিথ্যা থেকে মুসলিম উম্মাহর সম্মিলিতভাবে নির্দায় ঘোষণার সময় এসেছে। মহাসত্যের মহাআলোকবর্তিকা কুরআনকে পরিত্যাক্ত রেখে মুসলমান জাতি অন্ধকারের ঘোর অমানিশায় নিমজ্জিত।

সর্বশ্রেষ্ঠ তত্ত্বের মাধ্যমে ইহুদি-খ্রীস্টানদের মতই একক আল্লাহর সাথে শরীক সাব্যস্ত করা হয়েছে। মুসলমান তার মন-মগজে আল্লাহ তায়ালার পাশেই হযরত মুহাম্মদের এক মিথ্যা মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছে। নবীকে অনুসরণের পরিবর্তে মুসলমান নবী-বন্দনায় মজেছে সহজে পার পাবার বাসনায় যা কখনোই বাস্তবায়িত হবার নয়। সৃষ্ট নবীকে স্রষ্টা আল্লাহর কাতারে স্থাপনের মাধ্যমে সে তাওহীদের একক অবস্থান, শক্তি ও সৌন্দর্যকে ধ্বংস করে ফেলেছে।

আল্লাহকে ভালবাসতে চাইলে নবীর অনুসরণের (এত্তেবা) কথা বলা হয়েছে। আর অনুসরণ মানে অনুকরণ বা অভিনয় নয়। রাসূলকে অনুসরণের মানে কুরআনের অনুসরণ এই হেতু যে তিনি কেবলমাত্র কুরআন অনুযায়ীই চলতেন আর তাঁকে সেই নির্দেশই দেয়া হয়েছে।
মিথ্যার মহাপ্রাচীর ভাঙার মধ্য দিয়েই মুসলিম মন-মানসে বদ্ধমূল হাজারো কলুষ বিশ্বাসের মূলোৎপাটন করা সহজ হবে। সর্বপ্লাবী আঘাত এই মিথ্যার উপরই হানতে হবে। মুসলমান সত্যের সাথে মিথ্যাকে মিশ্রিত করার অভিযোগে অভিযুক্ত। সত্যকে লুকিয়ে সে আত্মঘাতি।
দ্বীনের ধ্বজাধারীরা ইসলামকে নগন্য মূল্যে কেনাবেচা করে আল্লাহর চূড়ান্ত লানতের যোগ্য। “নিশ্চয় যারা সেসব বিষয় গোপন করে, যা আল্লাহ কিতাবে নাযিল করেছেন এবং সেজন্য অল্প মূল্য গ্রহণ করে, তারা আগুন ছাড়া নিজের পেটে আর কিছুই প্রবেশ করায় না। আর আল্লাহ কেয়ামতের দিন তাদের সাথে না কথা বলবেন, না তাদের পবিত্র করা হবে, বস্তুতঃ তাদের জন্যে রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব।”-২:১৭৪।

হযরত ইব্রাহীম ও অন্যান্য নবীগণ (সালামুন ‘আলাল মুরসালিন) সম্পর্কিত বহুবিধ কুরআনী তথ্য গোপন করা হয় শুধুমাত্র এজন্য যে, শেষনবীকে নিয়ে রচিত শয়তানের এই মিথ্যাটি যেন প্রশ্নবিদ্ধ না হয়। মহামিথ্যাকে টিকিয়ে রাখতে আরও বহু মিথ্যার সহায়তা নেয়া হয়। পাশাপাশি সত্যকে সকল প্রচেষ্টায় দমিয়ে রাখা হয়।

এমন অনেক বিষয় রয়েছে কুরআনে, শেষনবীর বেলায় যার উল্লেখ আমরা জোরেশোরে করি; কিন্তু হযরত ইব্রাহীম বা অন্য নবীর বেলায় আমরা তা প্রকাশ করি না।

যেমন. ‘উসওয়াতুন হাসানাহর’ (উত্তম আদর্শ) আলোচনায় শুধু শেষনবীর কথাই বলা হয়, অন্যান্য নবীগণের উদ্ধৃতি দেয়া হয় না। অথচ উত্তম আদর্শের সাথে হযরত ইব্রাহীমের নাম যুক্ত করে আল্লাহ আয়াত নাযিল করেছেন।
যেমন. হযরত ইব্রাহীম নিজেই এক ‘উম্মত’ বা সম্প্রদায় তুল্য, তাঁর প্রতিষ্ঠিত দ্বীনের এত্তেবা করার জন্য সরাসরি শেষনবীকে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে (১৬:১২০-১২৩)। শেষনবী যে সেই নির্দেশের যথার্থ প্রতিপালনকারী ছিলেন তারও সত্যায়ন করা হয়েছে (৩:৬৮)।

যেমন. হরহামেশাই আমরা সূরা বনী-ঈসরাইলের প্রথম আয়াত শুনি- “পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রি বেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত”। অথচ হযরত ইব্রাহীম সম্পর্কিত ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ আয়াত প্রায় শুনিনা বললেই চলে (৬:৭৫)– “আর এইভাবে আমরা ইব্রাহীমকে দেখিয়েছিলাম মহাকাশমন্ডল ও পৃথিবীর সার্বভৌম রাজত্ব যাতে তিনি হতে পারেন দৃঢ়প্রত্যয়ীদের অন্তর্ভুক্ত”।

হযরত ইব্রাহীম সম্পর্কিত সত্যই কি শুধু গোপন করা হয়? না, হযরত ইব্রাহীম, হযরত ঈসা, মুসা, নূহ এবং অন্যান্য মহান নবীগণ (সালামুন ‘আলাল মুরসালিন) ও মু’মিনগণ সম্পর্কিত আরও বহু সত্যই আছে যা আলোচিত হয়না।

যেমন. মসজিদের শত মুসল্লির প্রায় নিরানব্বই জনই সূরা আহযাবের ৫৬ নম্বর আয়াত জানে যে, “আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি আশীর্বাদ প্রেরণ করেন” [إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ] । কিন্তু তাদের একজনও একই সূরার ৪৩ নং আয়াত জানে কিনা সন্দেহ- তিনিই (আল্লাহ) তোমাদের প্রতি আশীর্বাদ প্রেরণ করেন এবং তাঁর ফেরেশতাগণও। [هُوَ الَّذِي يُصَلِّي عَلَيْكُمْ وَمَلَائِكَتُهُ] ।

সূরা আন’আমে (৬:৮১-৯০) আঠার জন নবী-রাসূলের নামোল্লেখ করে শেষনবীকে আল্লাহ নির্দেশ দিচ্ছেন তাঁদের সবার এক্তেদা করতে- ফাবি হুদাহুমুক্তাদি। যিনি এক্তেদা করেন তাকে বলা হয় মুক্তাদি, আর যার বা যাদের এক্তেদা করা হয় তাদের বলা হয় ইমাম। এখানে শেষনবীর ইমাম হিসেবে উল্লেখিত নবীদেরকে বোঝানো হয়েছে।

যে শরিয়তের ধারাবাহিকতা হযরত নূহ (তাঁর উপর শান্তি) থেকে চলে আসছে, তার উপর দৃঢ় থাকতে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে সূরা শুরায় (৪২:১৩)। “তিনি তোমাদের জন্যে দ্বীনের ক্ষেত্রে সে শরিয়তই নির্ধারিত করেছেন (শারা’য়া লাকুম), যার আদেশ দিয়েছিলেন নূহকে, যা আমি প্রত্যাদেশ করেছি তোমার প্রতি এবং যার আদেশ দিয়েছিলাম ইব্রাহীম, মূসা ও ঈসাকে এই মর্মে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত কর এবং তাতে অনৈক্য সৃষ্টি করে না।”

মহান নবী ঈসা-মূসার মর্যাদা সম্পর্কিত অনন্য বিবৃতি রয়েছে যা আলোচিত হয়না, উর্ধ্বে তুলে ধরা হয়না; শেষনবীর সর্বশ্রেষ্ঠত্ব তত্ত্বের মিথ্যা ম্লান হয়ে যাবার আশংকায়। কত রঙে, কত বর্ণে হযরত মূসা (তাঁর উপর শান্তি) আর তাঁর কওম বনী ইসরাইলের কাহিনী থেকে আমাদেরকে শিক্ষা দেয়া হয়েছে। একই কথা হযরত দাউদ-ইয়াকুব-ইউসূফ-নূহের (সালামুন ‘আলাল মুরসালিন) ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

ধৈর্যের শিক্ষা দিতে শেষনবীকে আদেশ দেয়া হচ্ছে তিনি যেন রাসূলগণের মধ্যে যাঁরা ছিলেন ধৈর্যধারণে দৃঢ়-প্রতিজ্ঞ তাঁদের অনুসরণ করেন [فَاصْبِرْ كَمَا صَبَرَ أُولُو الْعَزْمِ مِنَ الرُّسُلِ]-৪৬:৩৫

হযরত ইউনুস কেন্দ্রিক আর একটি সম্পর্কও উল্লেখযোগ্য। ধৈর্য্যধারণ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাঁর শেষনবীকে সতর্ক করছেন এই বলে- “অতএব তুমি তোমার প্রতিপালকের আদেশের অপেক্ষায় সবর কর এবং মাছওয়ালার (ইউনুস) মত হয়ো না”-[ فَاصْبِرْ‌ لِحُكْمِ رَ‌بِّكَ وَلَا تَكُن كَصَاحِبِ الْحُوتِ]-৬৮:৪৮।

কুরআনে নাযিলকৃত বিষয়ের মধ্যে আরও অনেক মহাসত্যই রয়েছে যা ধর্মের প্রবক্তরা স্বেচ্ছায়, সচেতনভাবে চেপে যায়। ইহুদি-খ্রীস্টান-মুসলমান সম্মিলিতভাবে যাবতীয় মিথ্যাচারের মাধ্যমে বস্তুতঃ একক আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রত্যাখ্যানকারী।

সৃষ্টির কাছে স্রষ্টার পক্ষ থেকে সকল সত্য এসে গেছে। আসমান থেকে কোন সত্যই আর আসতে বাকী নেই। শুধু যুগ যুগান্তরের ধুলাবালি আর কালিমা মোচনের সময় এখন।

‘ইসলাম প্রচার বা প্রতিষ্ঠা’ বলতে যারা যাই বুঝুক- যদি তারা উদ্দেশ্যে সৎ হয়- তাদের কর্তব্য প্রথমেই ইসলামের নামে চালু এইসব বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে কুরআনে দিয়ে লড়ে যাওয়া। তাহলে লক্ষ্যের দিকে অনেকখানি এগিয়ে যাওয়া যায়।
এইসব বিভ্রান্তির কারণ, নিজ দায়িত্ব পালন না করে মুসলমান নবীর বড়ত্বের দোহাই দিয়েই পার পেয়ে যেতে প্রত্যাশী, যেমনিভাবে ইহুদী-খ্রিস্টান সম্প্রদায় মুসা-উযাইর-ঈসার ক্ষেত্রে একই কাজটি করেছে।
কত ভয়ানক সেই মিথ্যা, যাকে লালন করতে গিয়ে আমাদেরকে প্রতিনিয়ত প্রতারক আর মুনাফিকের ভুমিকায় অভিনয় করতে হয়! যাকে জিইয়ে রাখতে আমরা কুরআনের সত্যকে জেনেও তা জোর গলায় বলতে পারিনা!

নয়. সত্যে প্রত্যাবর্তন

যারা ঈমানের দাবীদার, মুসলমান হিসেবে নিজেকে প্রমান করতে চায় ও মুসলমান হয়েই মরতে চায় তাদেরকে শেষনবীর সর্বশ্রেষ্ঠত্বের দাবী থেকে সরে আসতে হবে। এটা মিথ্যা দাবী, অবশ্যই তা প্রত্যাহার করতে হবে- এটা মূর্খোচিত, মতলবী উচ্চারণ।
এটা ‘হাদীসান ইউফতারা (মনগড়া কথা)’, ‘লাহওয়াল হাদীস (অসাড় কথাবার্তা)’- এর সপক্ষে আল্লাহ কোন দলিল নাযিল করেন নি। শেষনবীর জন্য এর কোন প্রয়োজন নেই- তিনি যা তাতেই যথার্থ প্রশংসার যোগ্য।

হযরত মুহাম্মদ সর্বশ্রেষ্ঠ মানব, নবীগণের নেতা, তাঁকে সৃষ্টি না করলে কিছুই সৃষ্টি হত না ইত্যাদি বলে যা এতদিন চালানো হয়েছে তা সর্বৈব মিথ্যা। মতলববাজ গোষ্ঠী তাদের কায়েমী স্বার্থ টিকিয়ে রাখতে আর শয়তান তার অবিনাশী শপথ প্রতিপালনে তা করে যাচ্ছে।

মুসলিম জাতি ও সমাজকে আজ সমন্বিত ও সম্মিলিতভাবে এই সৎ ও সাহসী উচ্চারণ করতে হবে যে, হযরত মুহাম্মদের সর্বশ্রেষ্ঠত্বের এতদিনকার চালু ধারণা সম্পূর্ণ মিথ্যা। এর উচ্চারণকারী কণ্ঠকেও কঠোর প্রতিরোধ করতে হবে।

শেষনবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানব না হওয়ার মধ্যে ইসলামের বা মুসলমানের কোন ক্ষতি-বৃদ্ধি নেই। তিনি কস্মিনকালেও সর্বশ্রেষ্ঠ মানব না হওয়ার জন্য কোন গ্লানি বোধ করবেন না।

একজন খাঁটি মু’মিনও এজন্য গোঁ ধরবে না যে, কেন তাকে নবী-রাসূল নির্বাচিত করা হলনা। নির্ভীক উচ্চারণের মধ্য দিয়ে বরং তাদের সুদূরপ্রসারী অনেকগুলো কল্যাণ হবেঃ-

১. শত শত বছর ধরে চালু এই মিথ্যা উৎপাটনের মাধ্যমে মুসলমান ব্যক্তিগত ও সম্প্রদায়গতভাবে শিরকমুক্ত হয়ে তার ঈমানকে পরিশুদ্ধ করার পথে অনেকদূর এগিয়ে যাবে।

২. একটি ভয়াবহতম মিথ্যার পথ ধরে শত-সহস্র মিথ্যার বেড়াজালে মুসলমান সমাজ যুগযুগব্যাপী নিষ্পিষ্ট যাকে উপেক্ষা করার শক্তি ও সাহস সে পায়না। বহুনামে বহু মিথ্যা দেবতার মূর্তি সে ইতোমধ্যে রচনা করেছে- সেগুলোকে অবলীলায় অবজ্ঞা করা এখন তার পক্ষে সহজ হবে।

৩. মিথ্যার বিপণন ও বাণিজ্যে অনেক জাজ্ব্যল্যমান সত্য চাপা পড়েছিল- তা প্রকাশিত হবার অপার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

৪. মিথ্যার অপনোদন ও সত্য প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য ও শক্তি মানবজাতির কাছে সুস্পষ্ট হবে। এক আল্লাহর সৃষ্টি হিসেবে মানবজাতির সমন্বয় ও বৃহত্তর ঐক্যের পথ প্রশস্ত হবে।

৫. বিশেষ করে খ্রীষ্টান ও ইহুদী সম্প্রদায়ের জন্যও সহজ হবে স্বীয় নবীগণ সম্পর্কে তাদের মধ্যে যারা মিথ্যা রচনা করেছিল তা থেকে প্রত্যাবর্তনে। হযরত ঈসা এবং তাঁর মহীয়সী জননী মারইয়াম ছিদ্দিকাকে স্রষ্টার অপার সৃষ্টি হিসেবে দেখতেই প্রয়াসী হবে।

৬. মুসলমান তার ‘সর্বশেষ নবীর সর্বশ্রেষ্ঠত্বের মিথ্যা গোঁ’ পরিহার করলে, অন্যান্য ধর্ম সম্প্রদায় যারা হযরত মুহাম্মদকে নবী হিসেবে স্বীকারই করে না- সেই নীতি থেকে সরে আসতে পারে।

৭. বিশ্বের বহু ধর্মীয় জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন নামে মান্য ও পূজ্য আদম, ইব্রাহীম এবং নূহের অনুসারীদের পারস্পরিক বিভেদ-বৈষম্য দূরীকরণেও তা ভূমিকা রাখবে।

জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পুরো মানবজাতির কমন দূষমন শয়তান আদম-সন্তানদের মধ্যে বিদ্বেষ-বিভেদ (বাগইয়াম বাইনাহুম) আর বিভ্রান্তির দুর্ভেদ্য প্রাচীর রচনা করে তাদের জাহান্নামে যাবার পথকে যে সুপ্রশস্ত করে রেখেছে- দ্রুত তাদের সেই বোধোদয় হোক!

দশ. শেষকথাঃ আশরাফুল মাখলুকাত?

মানবকূল কি সকল সৃষ্টির সেরা বা আশরাফুল মাখলুকাত? আমরা কি স্রষ্টার সকল সৃষ্টির খবর রাখি?
পবিত্র আত্মা বা হযরত জিবরাইল আমীন (তাঁর উপর শান্তি)-এর ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে কুরআনে বহুবার। যিনি মানবজাতির কাছে আল্লাহর বাণী বাহক; আসমানে যাঁর কথা প্রতিপালিত হয়। এতদূর পর্যন্ত বলা হয়েছে, যে জিবরইালের শত্রু আল্লাহ স্বয়ং তার শত্রু।

শরীফ-এর আধিক্যবাচক বহুবচন আশরাফ, অর্থাৎ সবচে’ ভাল। সমগ্র কুরআনে এই শব্দের ত্রিবর্ণীয় মূল থেকে জাত একটি পদেরও অস্তিত্ব নেই। তবে মুসলমানের মুখে অতি প্রিয় এই শব্দটি; সে কুরআন থেকে শুরু করে সবকিছুতেই তা জোড়া লাগায়- কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ক্বাবা শরীফ, হুজরা শরীফ, মাজার শরীফ ইত্যাদি।

কেন আমদানি হল এই শব্দটি? আল্লাহ বলেন, কুরআনুল কারীম; বাল হুয়া কুরআনুম মাজীদ; আমরা বলি– না, বরং এটা কুরআন শরীফ। সমস্যাটা কোথায়? আল্লাহ যা কিছু যেভাবে বলেন তা আমাদের কেন ভাল লাগে না? এগুলোই কি প্রতিস্থাপন চক্রান্ত নয়?

তাই আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা কোন কুরআনী ধারণা নয়। আদম-সন্তানদেরকে সম্মানিত করা হয়েছে এবং অধিকাংশ সৃষ্টির উপর তাকে মর্যাদা দেয়া হয়েছে বলে ঘোষণা রয়েছে [وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَى كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلًا]-১৭:৭০।
এখানে কাছিরান (অধিকাংশ)-এর ব্যবহার অর্থবহ, কুল্লুন (সকল) ব্যবহৃত হয়নি; কুরআনের অন্যত্র ‘কুল্লুন’-এর বহু ব্যবহার রয়েছে। সৃষ্টিজগতে মানুষের চেয়েও সেরা সৃষ্টি থাকতেই পারে।
নিশ্চয়ই পবিত্রতম সত্তা আল্লাহ সর্বজ্ঞাতা, সর্বশ্রেষ্ঠ। (সংক্ষেপিত)

-Abu Sayed Khan
ইমেইলঃ [email protected]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

97 − 88 =