রোহিঙ্গা সমস্যা জাতিগত, না কি ধর্মীয়

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর হামলা এবং সাঁওতালদের উপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়নকে ছাপিয়ে রোহিঙ্গা সমস্যাটি ফোকাসে চলে এসেছে। বাংলাদেশের মুসলমানদের ভাবখানা এমন যে রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর চালিত অভিযানের বিপরীতে এদেশে বৌদ্ধদের উপর হামলা চালিয়ে দিলে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এ নিয়ে অনেক মানবতাবাদী নাস্তিক তাদের মানবতাবোধ থেকে কথা বলছেন। সকলের এক কথা রোহিঙ্গা সমস্যায় নির্যাতিত হচ্ছে মানুষ। আবার এমন কেউ কেউ আছেন যারা সমস্যাটি ধর্মীয়, না কি জাতিগত তা নিয়েও দ্বন্ধে আছেন।

সমস্যাটি আসলেই ধর্মীয় না কি জাতিগত তা নিয়ে জানার জন্য সিলেট টুডেতে প্রকাশিত এডভোকেট ইমতিয়াজের কলাম থেকে মোটামোটি ভাল একটা ধারনা পাওয়া যায়। এড. ইমতিয়াজ লিখেন, “মায়ানমারের সকল মুসলমানদের উপর কিন্তু অত্যাচারটা হচ্ছে না। অত্যাচারটা হচ্ছে মূলত রোহিঙ্গাদের উপর। রোহিঙ্গারা বাস করে রাখাইন এলাকার মংডু, বুছিডং আর আরও তিন চারটা শহরে। মায়ানমারে অন্যান্য মুসলমানরা যে আছে- রোহিঙ্গাদের তুলনায় ওদের সংখ্যা অনেক বেশী- ওদের উপর এইসব অত্যাচার হচ্ছে না। যদিও অসহিষ্ণুতা নাকি প্রতিদিনই বাড়ছে।” এ থেকে বুঝা যায়, রাখাইন এলাকায় রোহিঙ্গাদের উপর যে অত্যাচার হচ্ছে তাঁর পেছনে আসলে ধর্ম নয়, রয়েছে অন্য কোন কারণ।

এড. ইমতিয়াজের কলাম থেকে জানা যায়, ১৯৪৭-এ ব্রিটিশ শাসনের অবসানকালে যে রকমভাবে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত আর পাকিস্তানের সৃষ্টি হয়েছিল, সে রকমভাবে রাখাইন অঞ্চলের মুসলমানরাও চেয়েছিল মায়ানমারের সাথে না থেকে পাকিস্তানের সাথে থাকতে। রোহিঙ্গা নেতারা বার্মিজ মুসলিম লীগ গঠন করে জিন্নাহ সাহেবের সাথে দেখাও করেছিলেন বলে জানা যায়। কিন্তু, শেষ পর্যন্ত তারা পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হতে পারেনি।

সে যাই হোক, মায়ানমার ওদের সাথে একটা বিরাট অন্যায় করেছে। মায়ানমারে যে নাগরিকত্ব সংক্রান্ত আইন, সেখানে রোহিঙ্গাদেরকে সেই দেশের নাগরিক হিসাবে স্বীকার করা হয়নি। বুঝেন ব্যাপারটা। একটা জনগোষ্ঠী এরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মায়ানমারে বাস করে, কয়েকশ বছর ধরে ওরা যে সেখানে আছে সেটা স্বীকৃত, ওদেরকে আপনি বলে দিলেন তোমরা এই দেশের নাগরিক না। কত বড় অন্যায় ভেবে দেখেছেন? প্রথমবার এইরকম আইনটা কবে হয়েছে ভুলে গেছি, সম্প্রতি ১৯৮৩-৮৪ সনে সেই আইন নতুন করে বানিয়েছে ওরা এইবার ওদের স্ট্যাটাস আরও খারাপ হয়েছে।

আইনে আছে চাইলে একজন রোহিঙ্গা নাগরিকত্বের জন্যে আবেদন করতে পারে, কিন্তু তার জন্য ওকে দলিল দস্তাবেজ দিয়ে প্রমাণ করতে হবে ষাট বছরের চেয়ে বেশী সময় যাবত সে মায়ানমারের বাসিন্দা। সরকারী রেকর্ড ইত্যাদি থেকে এইরকম প্রমাণ করা রোহিঙ্গাদের জন্যে অসম্ভব না হলেও অনেক কঠিন। আর এই কঠিন কাজটা ওরা যদি সাধনও করতে পারে তাইলেও সে হবে ‘ন্যাচারালাইজড’ সিটিজেন। নাগরিকত্বের শ্রেণীবিভাগে যাদের অবস্থান নীচের দিকে।

এইরকম বৈষম্য ওদের সাথে কেন করা হচ্ছে? এর জবাবে বার্মিজরা যে কথা বলে সেটা হচ্ছে এই রোহিঙ্গারা আমাদের নাগরিক না, ওরা কংকালেই আমাদের নাগরিক ছিল না এবং ওরা কোনদিন নিজেদেরকে বার্মিজ নাগরিক দাবীও করেনি, ওরা নিজেদেরকে বার্মিজ বলে না, আলাদা হওয়ার জন্যে ওরা মায়ানমারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, এখনো ওরা সেই যুদ্ধ চালু রেখেছে, ওরা কি করে বার্মিজ নাগরিক হবে? আপনি যদি ওদেরকে জিজ্ঞাসা করেন, তাইলে ওরা কোন দেশের নাগরিক? বার্মিজরা বলে, সে আমরা কি করে জানবো, যাও রোহিঙ্গাদেরকেই জিজ্ঞাসা কর। যদি বলেন যে, না, কিন্তু ওদের উপর যে প্রতিদিন অত্যাচার হচ্ছে সেটা তো অন্যায়। বার্মিজদের জবাব হবে- তোমাদের যদি এতোই মহব্বত ওদের জন্যে, তোমার এক কাজ কর, সব রোহিঙ্গাদেরকে নিয়ে যাও তোমাদের দেশে, আমরা খরচ বাবদ কিছু টাকা দিয়ে দিই।

মায়ানমারের স্বাধীনতার কয়েক বছর পরই রোহিঙ্গারা জেহাদ শুরু করে। রোহিঙ্গা মুজাহিদরা মংডু ও বুছিডংসহ বিভিন্ন জায়গায় সরকারী অফিস আদালতে হামলা করে, নন-মুসলিম লোকজনকে মারে। এইরকম কয়েকদিন চলার পর বার্মিজ আর্মি কড়াকড়ি কয়েকটা অভিযান চালায় আর মুজাহিদরা অস্ত্র শস্ত্র ফেলে আর্মির কাছে আত্মসমর্পণ করে। এইভাবে বেশ কয়েকটা মুজাহিদ গ্রুপ জন্ম হয়েছে, সন্ত্রাস করেছে, আত্মসমর্পণ করেছে। এই সন্ত্রাসী মুজাহিদদের দাবী কি ছিল? ওরা মুসলিম, ওরা মায়ানমারের নাগরিকত্ব মানে না, ওরা রাখাইন প্রদেশ নিয়ে পাকিস্তানের সাথে যোগ দিতে চায়।

আমাদের দেশের একদল লোক রোহিঙ্গা সমস্যাকে মুসলিমদের সাথে বৌদ্ধদের বিবাদ হিসাবে দেখিয়ে উত্তেজনা তৈরি করতে চায়। এতো সরলীকরণ করলে হবে না। সবার আগে যে কথাটা আমাদেরকে মাথায় রাখতে হবে মায়ানমারের রোহিঙ্গারা সেখানকারই একটা এথনিক গ্রুপ। সংখ্যায় যত কমই হোক, ওদের অধিকার আছে সেই দেশের নাগরিক হিসাবে সেখানেই মর্যাদার সাথে বসবাস করার আর সেই দেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করার। কেবলমাত্র রোহিঙ্গা বলেই ওদের সাথে রাষ্ট্র বৈষম্য করবে সেটা তো অন্যায়।

আপনার মানবতা থাকলে হিন্দু-মুসলিম, বৌদ্ধ-খ্রীস্টান, রাখাইন-রোহিংগা না খুঁজে অবশ্য কর্তব্য হলো, বিপন্ন মানবতার কাছে দাঁড়ানো। সরলীকরণ করে মুসলিম নিধন হচ্ছে রব তুলে মানবতার সেবা করা যায় না, বড়জোর দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা যায়। মায়ানমারে নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হলে আওয়াজ তুলুন, মুসলিম কিংবা রোহিঙ্গা নয়-মরছে মানুষ, বিপন্ন মানবতা। বিপন্ন মানবতার বিপরীতে এদেশের সংখ্যালঘু অর্থাৎ বৌদ্ধদের উপর হামলার উস্কানি বরং মানবিক বিপর্যয়ের সূচনা ঘটবে।

(লিখাটি এডভোকেট ইমতিয়াজ আহমেদের কলাম থেকে অনুপ্রানিত হয়ে পোস্ট দেয়া হয়েছে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

71 + = 78