বাঙালিত্ব : হুমায়ুন আজাদের চোখে

বাঙালি জাতীয়তাবাদ বাংলাদেশের ভিত্তি। এটি অবিসংবাদিত এবং ঐতিহাসিক সত্য।এর দীর্ঘ একটা সুপ্ত পর্যায় শেষে পরবর্তীতে উত্থান ও বিকাশপর্ব আছে। জাতীয়তাবাদ বিকাশের প্রথম শর্ত একটি গোষ্ঠীর মধ্যে একাত্ববোধ এবং দ্বিতীয়ত এই গোষ্ঠীটি নিজেদেরকে অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র বলে মনে করে। এই  একাত্ববোধ কিংবা স্বাতন্ত্র্যবোধ অনেকগুলো বিষয়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারে। যেমন অভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য, ভৌগোলিক সংলগ্নতা, ধর্মীয় সমরূপতা, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক নৈকট্য প্রভৃতি। যে কোন নিদিষ্ট জাতীয়তাবাদের বিকাশে এগুলোর একটি বা একসাথে একাধিক বিষয় ক্রিয়াশীল থাকতে পারে। যেমন গ্রেট ব্রিটেন,ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র প্রভৃতি দেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়কে কেন্দ্র করে জাতীয়তাবাদ বিকাশ লাভ করে।

ভারত উপমহাদেশ দু’ ভাগে বিভক্ত হয়েছিল ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ কে কেন্দ্র করে।আবার অসংখ্য জাতি ধর্ম ও ভাষার বিশাল দেশ ভারত একসাথে থেকে গেলো প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারের “ভারতীয়ত্ব” এর ভিত্তিতে। আবার পাকিস্তান ভেঙ্গে অভ্যুদয় ঘটলো বাংলাদেশের যার মূলে ছিল ভাষা ও সংস্কৃতিভিত্তিক জাতীয়তাবাদ। জার্মানি, ইটালি ও স্লাভ অঞ্চলের মানুষদের মধ্যে মাতৃভাষা, লোকসংস্কৃতি ও প্রাচীন ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের প্রতি প্রবল আকর্ষণ থেকে বিকশিত হয় সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ।মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ একই ধর্মের অনুসারী এবং একই ভাষায় কথা বললেও তারা একটি জাতিরাষ্ট্র গঠন করতে পারেনি ; ভিন্ন ভিন্ন অনেকগুলো দেশ হয়েছে রাজনৈতিক নানা কারনে।

জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ শক্তিগুলো তাঁদের নিজেদের নির্ধারিত পন্থায় রাষ্ট্র গঠন করতে চায়। কখনো সফল হয়, কখনো সাফল্য লাভের জন্য সংগ্রাম পর্ব চালিয়ে যায়। বাঙালির ভেতর জেগে ওঠা ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দ্বি- জাতি তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করে বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে অনিবার্য করে তোলে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালিদের সাংস্কৃতিক ঐক্যকে উপেক্ষা করে ধর্মভিত্তিক পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ গড়ে তুলতে চেয়েছিল। তাঁদের এই অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ বাংলাদেশীদের কাছে চরম ভাবে মার খায়। ফলাফল হিশাবে প্রথমে বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পায় এবং পরবর্তীতে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নামের স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় হয় । বলাই বাহুল্য এসবের পিছনের শক্তিটি হচ্ছে বাঙালি জাতীয়তাবাদ।

আমরা ভাষার পরিচয়ে পরিচিত হতে ভালবাসি। বাঙালি বলে গর্ব বোধ করি। কিন্তু এই বাঙালিত্বের স্বরূপ কি? গর্ব করার মতো কি এমন আছে আমাদের? প্রথাবিরুদ্ধ লেখকের দৃষ্টিতে দেখে নিই বাঙালির বাঙালিত্বের সারসংক্ষেপঃ


হুমায়ুন আজাদ রচনা করতে চেয়েছিলেন বাঙালির জীবন ও স্বপ্নের ব্যাকরণ। তিনি সত্যনিষ্ঠ ,নির্মোহ, নির্ভীক ও অনুসন্ধিৎসু লেখক। তাঁর লেখাতে প্রকাশ পেয়েছে বাঙ্গালিত্বের প্রতি অশেষ শ্লেষ। তবে তা কোন ভিনদেশীর বিদ্বেষপূর্ণ অন্ধ সমালোচনার মতো নয়, বরং একটা সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে গঠনমূলক বিশ্লেষণ । তিনি চেয়েছিলেন প্রচলিত ও জনপ্রিয় মিথকে সরিয়ে সত্য- হোক তা যতই রুঢ়-তাকে উন্মোচন করতে। বাঙালির প্রতি দরদ থেকেই তিনি  কাজটি করেছেন । বাঙালির চিকিৎসার জন্য তিনি বাঙালির আসল রোগটা ধরতে চেয়েছেন। বাঙালিকে তিনি বলেছেন একটি “রুগ্ন জনগোষ্ঠী”। এর কারণও উল্লেখ করেছেন অসংখ্য। তিনি বলেছেন, বাঙালি অনেক শতাব্দী ধরে মানসিক সংকীর্ণতা ও কূপমণ্ডূকতায় ভুগছে। এর কারণ ক্ষুদ্র আয়তনের মধ্যে বসবাস এবং একটি বৃহৎ উপমহাদেশের এক প্রান্তে অবস্থান।

প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর থাকে একটি বিশেষ চরিত্র অথবা প্রশংসনীয় কোন বৈশিষ্ট।  যেমন কোন জাতি সরল, কোন জাতি পরোপকারী, কেউবা পরিশ্রমী, কোনটা আবার বিনয়ী, কোন জনগোষ্ঠী উচ্চাভিলাষী কিংবা স্বল্পভাষী প্রভৃতি। কিন্তু হুমায়ুন আজাদ বাঙালির মধ্যে এমন কোন গুণ দেখতে পারছেন না যার সংস্পর্শে এসে মনুষ্যত্বের প্রসার ঘটতে পারে। বাঙালির চরিত্রে গুণের চাইতে দোষই বেশি দেখছেন তিনি। তিনি লিখছেন “ জাতি হিসাবে বাঙালি বাচাল ও বাকসর্বস্ব; অপ্রয়োজনেও প্রচুর কথা বলে”।  বাঙালি যুক্তি মানে না এবং মিথ্যা কথাও বলে অনেক। তিনি দক্ষিণ ভারতের এক উপজাতির উদাহরণ দিয়ে বলেন তারা নাকি চল্লিশ বসর বয়স হওয়ার পর কথা বলা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু বাঙালির বয়স বাড়ার সাথে কথা বলার পরিমানও বাড়ে। এতো বেশি কথা বলার কারণ হিসাবে তিনি দেখছেন বাঙালির অপ্রাপ্তি, হতাশা ও ব্যর্থতাকে। এরা কথা দিয়ে জীবনের না পাওয়ার শূন্যতাকে পূরণ করতে চায়। এদের ভাষা অতিশয়োক্তিতে জীর্ণ। এটা বাঙালির লঘুতা ও পরিমাপবোধহীনতার প্রকাশ। 

আজাদের কথা অনুযায়ী বাঙালি ভদ্র নয় কিন্তু সুবিধা আদায়ের জন্য সে চরম বিনয়ী হতে পারে। এরা ক্ষমতার পূজারী, অপচয় ও অপব্যয়প্রবণ এবং সময়ের মূল্যবোধহীন। পিতৃতান্ত্রিক পরিবারে পিতা স্বৈরাচারী। বাঙালি লোভী ও শক্তিমানের ক্রীতদাস। তবে “ অন্যরা বানরের বংশধর হতে পারে, বাঙালি প্রভুভক্ত জীবের বংশধর, কিন্তু প্রভুভক্ত নয়”। কারণটা বলছেন আজাদ “ বাঙালি জানে প্রভু শাশ্বত, কিন্তু কোন বিশেষ প্রভু নশ্বর। এক প্রভু নিঃশেষ হলে আর এক প্রভু ধরে’’। বাঙালি যৌন আলোচনায় সুখ পায় কিন্তু তা করে গোপনে এবং ভাব ধরে যে সে যৌন বিষয়ে কিছুই জানে না। তিনি লিখছেন “ বাঙালির যৌবনমাত্রই ব্যর্থ ও যন্ত্রণাপীড়িত”।

বাঙালির আর একটা বড় দোষ তিনি দেখছেন-পরশ্রীকাতরতা। তবে শত্রুর উন্নতির চাইতে বন্ধুর উন্নতিতে বাঙালি বেশি কাতর হয়। বাঙালি খুব বড় হতে চায় না। তার দর্শন হচ্ছে বেশি বড় হয়ো না ঝড়ে ভেঙ্গে  যাবে, বেশি ছোট হয়ো না ছাগলে খেয়ে ফেলবে। এই মাঝারি হবার স্বপ্ন লালন করে বাঙালি হয় বড়জোর নিন্মমাঝারি।

বাঙালির সৃষ্টিশীলতা সামান্য। এরা না তাত্ত্বিক না উদ্ভাবক। এরা অনুকরণপ্রিয়। বাঙালির কোন মৌলিক সৃষ্টি বা বিশ্লেষণ নেই। সব কিছুই ঋণ করা তার। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেছেন গত দু’শতকে সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, সমাজবিজ্ঞান, চিত্রকলা, সংগীত কিংবা নৃত্যকলা কোথাও বাঙালির কোন মৌলিক সৃষ্টি নেই। বাংলার সব প্রধান সাহিত্যিকেরাই ধার নিয়েছেন পশ্চিমাদের কাছ থেকে। মাইকেল মধুসূদন দত্তকে তিনি বলছেন  বাঙালির “ প্রথম বিশ্বভিখারি ও ত্রাতা’। রামমোহন রায়, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ সবাই ঋণী পশ্চিমের কাছে। বাঙালির সৃষ্টিশীলতাকে তাই তিনি বলছেন ঋণাত্মক সৃষ্টিশীলতা। তা মৌলিক নয়। বাঙালির প্রতিভা ঋণ ও অনুকরণ করার প্রতিভা। মাইকেল যদি পশ্চিমের সাহায্য না নিতেন তার পক্ষে সম্ভব হতো না মেঘনাদ বধ কাব্য লেখা, বঙ্কিম স্কটকে না পড়লে পারতেন না আধুনিক সাহিত্য লিখতে।

বাঙালি কোন সাহিত্য আন্দোলন সৃষ্টি করতে পারেনি। তিরিশের কবিরা রবীন্দ্রবলয় থেকে মুক্তির আশায় হাত পেতেছিলেন ইউরোপীয় সাহিত্যের কাছে। তিরিশের প্রধান কবিরা ছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র। নতুন কবিতার জন্য নিজেরা কোন তত্ত্ব দাড় না করিয়ে তারা অনুপ্রেরণা নিয়েছেন ইউরোপ থেকে। হুমায়ুন আজাদের মতে যে বাঙালি লেখক ইউরোপীয় ভাবধারাকে আত্মস্থ করে নিজের লেখায় তার প্রতিফলন ঘটাতে পারেনি সে হতেও পারেনি বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ পুরুষ। খাঁটি বাঙালি কখনও হননি মহৎ লেখক। অর্থাৎ বিশুদ্ধ বাঙালির প্রতিভা সামান্য । তবে তার মতে উনিশ শতকই হচ্ছে মহৎ বাঙালিদের শতাব্দী। এই শতকে বাংলাতে এমন কিছু মানুষ জন্মেছিলেন যারা তাঁদের বঙ্গীয় চরিত্রের সাথে ইউরোপীয় চরিত্রের মিশেল ঘটাতে সক্ষম হয়েছিলেন। এজন্যই রামমোহন, বিদ্যাসাগর, মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, সুনীতিকুমার, সুভাষ বসু প্রমুখ সেই সময় এবং বর্তমানেও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হন। 

এগুলোকে তিনি বলেছেন বাঙালির “ সীমাবদ্ধতার সূত্র”।  কারণ অন্বেষণ করেছেন তিনি এই সীমাবদ্ধতার।  তাঁর মতে প্রথাবদ্ধতাই আমাদের সীমাবদ্ধতার মূল কারণ। তিনি বলেন “ আমাদের সমাজ মৌলিকতা বিরোধী, সৃষ্টিবিমুখ, পুনরাবৃত্তিপরায়ণ, ও নিয়ন্ত্রনবাদী”। সীমাবদ্ধতার জন্য আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকেও দায়ী মনে করেন তিনি। তার ভাষায় “ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রশ্নের কোন স্থান নেই”। ফলে তা মননশীলতাকে বিকশিত হতে দেয় না । আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বাধীন নয়, সৃষ্টিশীলও নয়।


হুমায়ুন আজাদ যেটাই বলেন সেটাই আবার অনেকের গাত্রদাহের কারণ হয়ে দাড়ায়। আসলে যে সত্য হুমায়ুন আজাদ উচ্চারণ করেন তা সহ্য করার ক্ষমতা সকলের হয়না। তাছাড়া আজাদের শত্রু এবং সমালোচকের অভাব নেই। বাঙালির চরিত্র সম্পর্কে উপরে হুমায়ুন আজাদের যেসব বক্তব্য উল্লেখ করলাম সেগুলো পড়ে সমালোচকেরা আজাদকে ইউরোপঘেষা বলবেন হয়তো। তাদের জন্য হুমায়ুন আজাদের বক্তব্যের স্বপক্ষে অন্য কিছু লেখকের বক্তব্য উপস্থাপন করছি।

ডঃ সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়ের একটি উক্তিতে আজাদের কথার সত্যতা ধরা পড়ে। “ জাতি, সংস্কৃতি ও সাহিত্য” গ্রন্থে  বাঙালি সংস্কৃতির আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি লিখছেন “ আকারে যেমন, প্রকৃতিতেও তেমনি বাঙ্গালি ভারতীয় বটে। বাঙালি তার আধুনিক সংস্কৃতিতে হয়তো চার আনা ইউরোপীয়, তাহার সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার উপর নির্ভর করে সে কতটা ইউরোপীয় হইবে … এবং আট আনা ভারতীয়, বাকি চার আনা সে বাঙালি এবং এই চার আনার মধ্যে আবার কতটা ভারতীয়ত্বের বিকার… বাকিটুকু খাঁটি বাঙালি অর্থাৎ গ্রাম্য বাঙালি”। খাঁটি বাঙালিত্বে আস্থা ছিল না হুমায়ুন আজাদেরও । রবীন্দ্রনাথের মনোভাবও সম্ভবত বিরুপ ছিল বাঙালির উপর । হয়তো সেই জন্যই তিনি লিখেছিলেন-

সপ্তকোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী
রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করো নি ।

  

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তাঁর” সংগঠন ও বাঙালি প্রবন্ধ” গ্রন্থেও উন্মোচন করেছেন বাঙালির চরিত্র। বাঙালির আত্মপরায়নতা, স্বার্থপরতা, হীনম্মন্যতা, ভীরুতা, ক্ষুদ্রতা, সংগঠনহীনতা …..অসংখ্য বদগুণের কথা উল্লেখ করেছেন উদাহরণসহ এবং ব্যাখ্যা করেছেন বাঙালির এমন চরিত্রহীনতার ঐতিহাসিক ও সামাজিক -সাংস্কৃতিক কারণসমূহ।

চারিত্রপূজা নামে রবীন্দ্রনাথের একটা প্রবন্ধগ্রন্থ আছে। এই গ্রন্থের বিদ্যাসাগরচরিত নামে পরপর দুটো প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে।প্রথম প্রবন্ধে যেটা প্রকৃতপক্ষে একটি লিখিত বক্তৃতা, তার শুরুর বাক্যটা উল্লেখ করা যায় এখানে। রবীন্দ্রনাথ লিখছেন ” ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চরিত্রে যাহা সর্বপ্রধান গুণ–যে গুণে তিনি পল্লী-আচারের ক্ষুদ্রতা, বাঙালিজীবনের জড়ত্ব সবলে ভেদ করিয়া একমাত্র নিজের গতিবেগপ্রাবল্যে কঠিন প্রতিকূলতার বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া, হিন্দুত্বের দিকে নহে, সাম্প্রদায়িকতার দিকে নহে, করুণার অশ্রুজলপূর্ণ উন্মুক্ত অপার মনুষ্যত্বের অভিমুখে আপনার দৃঢ়নিষ্ঠ একাগ্র একক জীবনকে প্রবাহিত করিয়া লইয়া গিয়াছিলেন…..তিনি যথার্থ মানুষ ছিলেন “। অর্থাৎ এই চরিত্রগুণ বাঙালির মধ্যে বিরল যাহা ঈশ্বরচন্দ্রের ছিলো, গড়পড়তা বাঙালির নেই। এই প্রবন্ধের অন্যত্র রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন “মাঝে মাঝে বিধাতার নিয়মের এরূপ আশ্চর্য ব্যতিক্রম হয় কেন, বিশ্বকর্মা যেখানে চারকোটি বাঙালি নির্মাণ করতেছিলেন, সেখানে হঠাৎ দুই একজন মানুষ গড়িয়া বসেন কেন, তাহা বলা কঠিন”। এই বিদ্যাসাগরচরিতের শেষাংশে তিনি যা উল্লেখ করেছেন সেটাকে বাঙালির সামগ্রিক চরিত্রের সবচেয়ে সুসংগত এবং যথাযথ সারসংক্ষেপ বলাটাই সংগত।” আমরা আরম্ভ করি, শেষ করি না; আড়ম্বর করি, কাজ করি না; যাহা অনুষ্ঠান করি তাহা বিশ্বাস করি না; যাহা বিশ্বাস করি তাহা পালন করি না; ভূরি পরিমাণ বাক্যরচনা করিতে পারি, তিল পরিমাণ আত্মত্যাগ করিতে পারি না; আমরা অহংকার দেখাইয়া পরিতৃপ্ত থাকি, যোগ্যতা লাভের চেষ্টা করি না; আমরা সকল কাজেই পরের প্রত্যাশা করি, অথচ পরের ত্রুটি লইয়া আকাশ বিদীর্ণ করিতে থাকি; পরের অনুকরণে আমাদের গর্ব, পরের অনুগ্রহে আমাদের সম্মান, পরের চক্ষে ধূলিনিক্ষেপ করিয়া আমাদের পলিটিকস্‌, এবং নিজের বাক্‌চাতুর্যে নিজের প্রতি ভক্তিবিহ্বল হইয়া উঠাই আমাদের জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য।”


বাঙালির শরীরে এবং চরিত্রে আছে বিভিন্ন জাতির মিশ্রণ। একটু অন্যভাবে দেখলে দেখা যায় এই চারিত্রিক মিশেল বাঙালির অধস্তনতার নিদর্শন। বিজয়ী রাষ্ট্র বিজিত রাষ্ট্রে নিজেদের কৃষ্টি ও জীবনাচার প্রতিষ্ঠা করে। ফলে ঘটে যায় সাংস্কৃতিক মিশ্রণ। কোন এলাকাতে যত বেশি বহিঃশক্তির আধিপত্য, তা সে সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক অথবা অর্থনৈতিক, সেখানে তত বেশি মিশ্রণ। প্রাচীন বঙ্গদেশে প্রথম আগমন ঘটে আর্যদের। তারা সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের মাধ্যমে এ অঞ্চলের অনার্যদের উপর আধিপত্য বিস্তার করে। নিজেদের সংস্কৃতি নিয়ে দারুণ অহংবোধ আর অনার্য সংস্কৃতি সম্পর্কে তাঁদের ছিল তীব্র তাচ্ছিল্য। তাঁদের এই তাচ্ছিল্য আমাদের পূর্বপুরুষদের পরাজিত অবস্থাকেই তুলে ধরে। তারপরে এই ভূমিতে এসেছে আরও কত বিদেশি শাসক শোষক। কিন্তু বাঙালির সাধ্য হয়নি কোন রাষ্ট্র আক্রমণ করে সেখানে সাম্রাজ্য বিস্তার করা। ইতিহাসজুড়ে বাঙালিরা নিজের  দেশ রক্ষায় ব্যস্ত ছিল। সাম্রাজ্য বাড়াবে কখন? তবে আদি বাঙালির সংগ্রাম কখনও থেমে যায়নি। যুদ্ধ তারা করেছে শত্রুর সাথে। সফলতা খুব বেশি আসেনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত কোন না কোন ভাবে অন্যের অধীনেই ছিল বাঙালি। অবশ্য স্বাধীন হওয়ার পরেও বাঙালি অন্য ভাবে পরাধীন রয়েছে।

বাঙালির বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে কিছু সুমহান অর্জন থাকলেও কলঙ্ক অনেক। এই শতাব্দীতে বাঙালি মাতৃভাষা রক্ষার্থে প্রাণ দিয়েছে এবং একটি দুর্ধর্ষ বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে। এগুলো অনবদ্য অর্জন। আবার এই অর্জনের পাশেই দাড়িয়ে আছে বাঙালির কলঙ্ক। এটা স্বীকার্য যে সুস্থ জাতীয়তাবাদের বৈশিষ্ট হচ্ছে গ্রহণমূলক (inclusive)। তবে তা নির্বিচারে নয় বরং চোখ কান খোলা রেখে। কিন্তু উপনিবেশিক পাকিস্তানি শাসকেরা এই গ্রহণের নীতি না মেনে বেঁছে নিয়েছিল বর্জনের নীতি (exclusive)।

বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক জীবন এমনকি সাহিত্য, সংগীত তাঁদের কাছে হয়ে উঠে অপাংক্তেয়। তারা রবীন্দ্রসংগীতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। লজ্জার বিষয়, এই উদ্যোগকে সমর্থন ও সাধুবাদ জানায় কিছু বাঙালি বুদ্ধিজীবী। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে আবুল মনসুর আহমদ, আবুল কালাম শামসুদ্দিন, অধক্ষ্য ইব্রাহিম খাঁ, কবি আহসান হাবীব, কবি ফররুখ আহমদ, কাজী আবদুল ওদুদ, শাহেদ আলী প্রমুখ। উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করা কিংবা বাংলা ভাষার মধ্যে ব্যাপক হারে আরবি, ফারসি ও উর্দুর অন্তর্ভুক্তিকেও সমর্থন দিয়েছিল তৎকালীন অনেক বিশিষ্ট বাঙালি। সাহিত্যে প্রবেশ করে পাকিস্তানবাদ। এর দুই বড় প্রবর্তক ও সমর্থক হচ্ছে সৈয়দ আলী আহসান ও সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন। যদিও তাদের এইসব হীন প্রচেষ্টা দেশপ্রেমিক বাঙালিরা রুখে দিয়েছিল, তবুও এগুলো বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের সংকটের চিহ্ন বহন করে। বাংলা ভাষা, বাংলা সংস্কৃতির চাইতে তারা আরবিয় সংস্কৃতির সাথে এক অলীক নৈকট্য বোধ করত। এই স্বপ্নদোষ এখনো অনেকের মাঝেই দেখা যায়। এটা বাঙালির হীনম্মন্যতার পরিচায়ক।  মুক্তিযুদ্ধের কালে বাঙালির ভেতর জন্ম নিয়েছিল রাজাকার, আলবদর, আল শামস বাহিনী। স্বাধীনতার পরে হত্যা করে জাতির জনককে; আর কেউ নয়, এই বাঙালিরাই। এ পাপ মোচনের নয়। পাকিস্তান আমলে  স্বৈরাচারী সামরিক নিষ্পেষণের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও বাঙালি বার বার ফিরে গেছে সামরিক শাসনের দুয়ারে। পরপর পাঁচবার  দুর্নীতিতে শীর্ষ দেশ হওয়ার বিরল কলঙ্ক অর্জন করেছে বাঙালি। বিভিন্ন অপরাধে বাঙালির শিরচ্ছেদ হচ্ছে বিদেশে। রাজনৈতিক নেতারা অদূরদর্শী, পরমুখাপেক্ষী।  

তারপরও বাঙালির  গর্ব করার মতো বিষয় আছে। এ জাতি শুরু থেকেই নির্যাতিত, কিন্তু বিদ্রোহী। সশস্ত্র সংগ্রাম করেছে অনেক। সূর্যসেন, প্রীতিলতা,আসাদ,জগৎজ্যোতি, মতিউর, সালাম, বরকত, রফিক সব এ মাটির সন্তান। বাঙালির সান্ত্বনা, বাংলায় জন্মেছিলেন কবি আব্দুল হাকিম যার নির্ভীক উচ্চারণ –  

“ যে সব বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী
   সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি”।।

  

জন্মেছিলেন চণ্ডীদাস যিনি বলে গেলেন–

“ সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই”

এ মাটিতেই বড় হয়েছেন  লালন, নজরুল, রবীন্দ্রনাথের মতো মানবতাবাদী দার্শনিক ও কবি । আর এভাবেই দ্বৈত চরিত্র ও দোদুল্যমানতা নিয়ে এগিয়ে চলেছে বাঙালির সমাজ ও ইতিহাস ।  

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “বাঙালিত্ব : হুমায়ুন আজাদের চোখে

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

67 − 65 =